default-image

মুক্তিযুদ্ধের রাষ্ট্রীয় খেতাব বাতিলের কোনো এখতিয়ার জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) নেই বলে জানিয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা হাফিজউদ্দিন আহমেদ ও শাহজাহান ওমর। তাঁরা বলেন, এ ব্যাপারে ‍মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী যে কথা বলেছেন, সেটাও তাঁর এখতিয়ারবহির্ভূত।

গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে দলের স্থায়ী কমিটি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে হাফিজউদ্দিন আহমেদ ও শাহজাহান ওমর এসব কথা বলেন। হাফিজউদ্দিন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘জেড’ ফোর্সের ‘এ’ ও ‘বি’ কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন। শাহজাহান ওমর ছিলেন ৯ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার। দুজনেই বর্তমানে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে ভাইস চেয়ারম্যান পদে আছেন।

হু ইজ জামুকা। কে এদের চেনে। কোথায় জিয়াউর রহমান, কোথায় এগুলো।
হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম

হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম বলেন, ‘জামুকার এগুলো কাজ না, জামুকা হলো কে ভাতা পাবেন কে পাবেন না, কে মুক্তিযোদ্ধা, কে মুক্তিযোদ্ধা হবেন না। বীর উত্তম, স্বাধীনতার ঘোষক, জেড ফোর্সের অধিনায়ক, সেক্টর কমান্ডার, সেনাবাহিনীর প্রধান, জেনারেল, প্রেসিডেন্ট … তাঁদের ব্যাপারে এখতিয়ার আছে? হু ইজ জামুকা। কে এদের চেনে। কোথায় জিয়াউর রহমান, কোথায় এগুলো।’

প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করে হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এই খেতাব নিল কি গেল, কিছু আসে যায় না। তিনি (জিয়াউর রহমান) এখন মৃত। খেতাব নিলেও জিয়াউর রহমান জিয়াউর রহমান থাকবেন। লক্ষ-কোটি মানুষের কাছে, অনাগত ভবিষ্যতের কাছে তিনি এই দেশের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা রূপেই ইতিহাসে চিহ্নিত থাকবেন।’

মেজর (অব.) হাফিজ বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সঙ্গে তৎ​কালীন উপ-সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান কখনো সম্পৃক্ত ছিলেন না। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের তো বিচার হয়েছে। কই কোনো সাক্ষী, কোনো ব্যক্তি কেউ কী বলেছে যে উনি এই ধরনের হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছেন বা এটা করেছেন।’

বিজ্ঞাপন

বর্তমান সরকার দেউলিয়াত্বে শেষ পর্যায় পৌঁছে গেছে, জাতিকে দেওয়ার আর কিছুই নেই উল্লেখ করে মেজর (অব.) হাফিজ বলেন, ‘আন্তর্জাতিকভাবে তাদের (সরকার) কেলেঙ্কারির কথা ফাঁস হচ্ছে। জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে নিবদ্ধ করার জন্য আজ জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের মতো একজন ব্যক্তি সম্পর্কে এই ধরনের অলীক মিথ্যা তথ্য জাতির কাছে হাজির করেছে। এটা দুঃখজনক। জিয়াউর রহমান কোনো ধরনের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। হি ওয়াজ এ ন্যাশনাল হিরো।’

‘বীর উত্তম, বীরশ্রেষ্ঠ, বীর বিক্রম, বীর প্রতীক মামাবাড়ির আবদার না ​কি, ছেলের বাড়ির মোয়া। এটা তো আমরা যুদ্ধ করে অর্জন করেছি।
শাহজাহান ওমর, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান

শাহজাহান ওমর বীর উত্তম বলেন, ‘কী কারণে হঠাৎ​ করে জামুকা একটা প্রস্তাব করল, বোধগম্য নয়। জামুকা কে? মুক্তিযুদ্ধের সময় তিন ধরনের মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। একটা হচ্ছে মিলিটারি ফোর্স, আরেকটা হলো ফ্রিডম ফাইটার, তিন নম্বর হলো যুদ্ধের শেষ দিকে বিএলএফ নামের একটা সংগঠন করা হয়েছিল, যেটা বাংলা মুজিব বাহিনী। জামুকা হলো যেমন ফ্রিডম ফাইটার তৎ​কালীন ছাত্র-কৃষক-যুব-শ্রমিক যাঁরা যুদ্ধে গেছেন, ট্রেনিং করেছেন, তাঁদের ভাতা, সম্মানী, সুযোগ-সুবিধা কীভাবে অধিকতর দেওয়া যায়—দিস ইজ দ্য জব অব জামুকা। জামুকার কোনো এখতিয়ার নেই মিলিটারি অফিসার যাঁরা মুক্তিযোদ্ধা, তাঁদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার।’

default-image

শাহজাহান ওমর বলেন, ‘বীর উত্তম, বীরশ্রেষ্ঠ, বীর বিক্রম, বীর প্রতীক মামাবাড়ির আবদার না ​কি, ছেলের বাড়ির মোয়া। এটা তো আমরা যুদ্ধ করে অর্জন করেছি। জিয়াউর রহমান ঘোষণা করেছেন হি ডিকলার ওয়ার এবং নিজে যুদ্ধ করেছেন। জিয়াউর রহমানের কল পেয়ে যুদ্ধে নেমেছি। আমি তিনবার গুলিবিদ্ধ হয়েছি। আমাকে বীর উত্তম খেতাব দিয়েছে। এই খেতাব কেউ দয়ায় দেয়নি। এই খেতাব কেড়ে নেওয়ার আপনারা কে?’

শাহজাহান ওমর বলেন, জিয়াউর রহমানকে নিয়ে কয়েক দিন পরে আর কিছু বলবে, তিনি নাগরিকও না । তাতেও জিয়াউর রহমানের কিছু আসে-যায় না, বীর উত্তম নিলেও তাঁর কিছু আসে-যায় না জিয়া ইজ জিয়া, তিনি বাংলাদেশের একাত্তরের সাত কোটি মানুষের অন্তরে গাঁথা, তাঁর অবদান হৃদয়ে গাঁথা।

জামুকার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ১৪ ফেব্রুয়ারি বিএনপির কর্মসূচি


সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন একটি লিখিত বক্তব্য দেন। খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তিনি আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি রোববার সব জেলা সদরে প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার, স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁর অসীম বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা ও অবদানের জন্য বীর উত্তম খেতাব পেয়েছেন। পরে তাঁর কোনো কার্যক্রমই ১৯৭১ সালে তাঁর অবদানকে মিথ্যা করে দিতে পারে না।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) যেসব কারণে জিয়াউর রহমানের ‘বীর উত্তম’ খেতাব বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার কোনোটাই যৌক্তিক বা বাস্তবসম্মত নয়। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার, স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁর অসীম বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা ও অবদানের জন্য বীর উত্তম খেতাব পেয়েছেন। পরে তাঁর কোনো কার্যক্রমই ১৯৭১ সালে তাঁর অবদানকে মিথ্যা করে দিতে পারে না। এ ব্যাপারে যদি মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের যুক্তি মানতে হয়, তাহলে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বহু নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি গণতন্ত্র হত্যা, একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনসহ মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাপরিপন্থী কার্যক্রমের জন্য অভিযুক্ত হবেন।

লিখিত বক্তব্যে বিএনপি বলেছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনার পর দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় তাঁরাই ছিলেন, যাঁরা আগের সরকারের মন্ত্রী-সাংসদ ছিলেন। ১৫ আগস্ট যিনি সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন, তাঁকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সাংসদ করা হয়েছে, দলের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য করা হয়েছে।

বলা হয়, শহীদ জিয়া উপ-সেনাপ্রধান থেকে সেনাপ্রধান হয়েছেন স্বাভাবিক নিয়মে। কিন্তু একই দিন যিনি মন্ত্রীর মর্যাদায় রাষ্ট্রপতি মোশতাক আহমেদের নিরাপত্তা উপদেষ্টা হয়েছিলেন, সেই জেনারেল (অব.) আতাউল গণি ওসমানীকে কি আওয়ামী লীগ ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী করেনি? সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের ওপরের পদে নিযুক্ত চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ মেজর জেনারেল খলিলুর রহমানকে আওয়ামী লীগ নৌকা প্রতীকে ১৯৭৯ সালে জামালপুর থেকে সাংসদ বানিয়েছে। এসবের উল্লেখ করে বিএনপির নেতারা বলেন, জিয়াউর রহমান যদি সংবিধান লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত হন (যদিও তাঁর তেমন কিছু করার সুযোগই ছিল না), তাহলে তার চেয়ে বড় পদে নিযুক্ত করার বিষয়ে তৎকালীন মন্ত্রী-সাংসদদের ব্যাপারে সরকারি দলের নেতাদের এবং মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের মতামত জনগণ জানতে চায়।

বিজ্ঞাপন

একাধিক স্বাধীনতাবিরোধীকে আ. লীগে ও মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হয়েছে


বিএনপির দাবি, জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধীদের দিয়ে মন্ত্রিসভা গঠনের অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, ১৯৭২ থেকে ৭৫ সালের মধ্যে দালাল আইনে গ্রেপ্তার বহু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিকে তৎকালীন সরকারই মুক্তি দিয়েছিল। ওই সব ব্যক্তিকে জেলখানায় বিশেষ সুবিধা দেওয়া এবং তাঁদের পরিবারকে সহায়তা করার কথা আওয়ামী লীগের নেতারাই বলেছেন। অন্যদিকে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের বিভিন্ন মেয়াদে একাধিক চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধী ব্যক্তিকে আওয়ামী লীগে ও মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হয়েছে।

বিএনপির নেতারা বলেন, বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিরা যেদিন দেশত্যাগ করেন, সেদিন জিয়াউর রহমান ছিলেন ক্ষমতাহীন ও গৃহবন্দী। সেদিন সেনাপ্রধান ছিলেন মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ। অথচ এ ব্যাপারেও জিয়াউর রহমানকে দায়ী করে প্রকৃত দায়ীকে আড়াল করার অপচেষ্টা করা হয়েছে। এসব ব্যক্তিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে যখন বিদেশে থাকতে বাধ্য করার শর্তে চাকরি দেওয়া হয়, তখনো জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ছিলেন না। কাজেই এ ব্যাপারে তাঁকে দায়ী করা যায় না।

বিএনপি বলেছে, তথাকথিত এক-এগারোর অবৈধ সরকারের কুশীলবদের নির্বিঘ্নে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ এবং তাদের অন্যতম একজনকে বিদেশের দূতাবাসে এক্সটেনশন দিয়ে চাকরিতে রেখেছে বর্তমানে ক্ষমতাসীন সরকার। অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকারী এসব ব্যক্তির প্রতি এবং ১৯৮২ সালে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলকারী এরশাদ সরকারের বিষয়ে বর্তমান সরকারের আচরণ অন্যায় অপরাধ না হলে অন্য কাউকে এমন বিষয়ে দোষারোপ করা নিঃসন্দেহে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং অগ্রহণযোগ্য।

বিএনপি বলেছে, জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সেক্টর কমান্ডার এবং প্রথম ফোর্সেস কমান্ডার ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ, বুদ্ধিদীপ্ত পরামর্শ এবং সাহসী নেতৃত্বের কথা মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় নেতাদের প্রকাশিত গ্রন্থ এবং সে সময়কার পত্রিকায়-সাময়িকীতে লিপিবদ্ধ আছে। দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তি, রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, সাংবাদিকদের বক্তব্য এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বদলে দেওয়ার বৃথা চেষ্টা যাঁরা করেছেন,Ñতাঁরা বোকার স্বর্গে বাস করছেন।

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান ও সাবেক সাংসদ জহির উদ্দিন স্বপন উপস্থিত ছিলেন।

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন