default-image

তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর থেকেই কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে ১৪–দলীয় জোট। জোটবদ্ধ নির্বাচন করে ক্ষমতায় এলেও এটাকে আওয়ামী লীগের সরকার বলছেন শরিকেরা। এবারের মন্ত্রিসভায় জায়গা হয়নি শরিকদের কারও। ভেতরে–ভেতরে চাপা ক্ষোভ, অসন্তোষ আছে তাঁদের। যদিও এসবে গুরুত্ব দিচ্ছে না আওয়ামী লীগ। এ অবস্থায় জোট টিকে থাকলেও কোনো কার্যক্রম নেই।

দলীয়ভাবে আলাদা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। এতে একটা আলগা ভাব তৈরি হলেও কোনো দূরত্ব তৈরি হয়নি।
রাশেদ খান মেনন, সভাপতি,ওয়ার্কার্স পার্টি

জোটের নেতারা বলছেন, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্ষণ, মাদক, সন্ত্রাস, লুটপাটের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি হিসেবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ১৪–দলীয় জোট গঠিত হয়েছিল। এসব বিষয়ে গত দুই বছর জোটের তেমন কোনো কর্মসূচি নেই।

জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন প্রথম আলোকে বলেন, করোনার কারণে মাঠে জোটের কর্মসূচি নেই। দলীয়ভাবে আলাদা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। এতে একটা আলগা ভাব তৈরি হলেও কোনো দূরত্ব তৈরি হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর তৎপরতার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া দরকার।

বিজ্ঞাপন
জোট অব্যাহত আছে, প্রাসঙ্গিকতাও টিকে আছে। অর্জনগুলো এখনো সংহত হয়নি। সাম্প্রদায়িকতার হুমকি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। ১৪–দলীয় জোটকে সারা দেশে আরও সক্রিয় করতে হবে
হাসানুল হক ইনু , জাসদের সভাপতি

২০০৫ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪–দলীয় জোট গঠিত হয়। ২০০৯ সাল থেকে টানা তিনবার ক্ষমতায়। এর মধ্যে প্রথম দুই দফায় মন্ত্রিসভায় জায়গা পান শরিকদের কেউ কেউ। ২০১৯ সালে তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগের বাইরে শরিক দলের কেউ ঠাঁই পাননি। রাজনীতির মাঠে শক্ত প্রতিপক্ষ না থাকায় আওয়ামী লীগের কাছে শরিকদের অবস্থান দুর্বল হয়েছে বলে মনে করছেন জোটের নেতারা। তবে জোট ছাড়ার কথা ভাবছে না কোনো দল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শরিক দলের একজন নেতা বলেন, ১৪–দল সরকারেও নেই, মাঠেও নেই। নামে জোট আছে ঠিকই, কোনো কার্যক্রম নেই।

বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নূরুল আম্বিয়ার মতে, এখন যে নীতি-আদর্শে দেশ চলছে, এর সঙ্গে জোটের ব্যবধান অনেক। কর্তৃত্বপরায়ণ শাসন চলছে। ১৪ দল এখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। তবে আওয়ামী লীগ চাইলে এটি কার্যকর করতে পারে।

তবে জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু প্রথম আলোকে বলেন, জোট অব্যাহত আছে, প্রাসঙ্গিকতাও টিকে আছে। অর্জনগুলো এখনো সংহত হয়নি। সাম্প্রদায়িকতার হুমকি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। ১৪–দলীয় জোটকে সারা দেশে আরও সক্রিয় করতে হবে।

দুই বছর ধরেই জোটের তেমন কোনো কর্মসূচি নেই। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ১৪–দলীয় জোটের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম গত জুনে মারা যান। এর এক মাস পর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমুকে জোটের সমন্বয়ক ও মুখপাত্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর অনলাইনে কয়েকটি বৈঠক হয়েছে। শরিক একাধিক দলের নেতা প্রথম আলোকে বলেন, জোটের তৎপরতা বাড়াতে অন্য শরিকেরা বললেও কিছু হবে না। এটি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট; আওয়ামী লীগ না চাইলে কিছুই এগোবে না।

শরিক দল ন্যাপের (মোজাফফর) সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগের শিথিলতায় ১৪–দল শিথিল। শরিকেরা প্রকৃত অর্থে চেতনার জায়গা থেকে সক্রিয় হতে চায়। শরিকদের শুধু রাজনীতির হাতিয়ার করলে হবে না। আওয়ামী লীগ যদি মনে করে জোটের উপযোগিতা নেই, সেটিও আলোচনা করা দরকার।

জোটের শরিকদের মধ্যে অসন্তোষ থাকলেও তা নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলছেন না। সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নেওয়া, মন্ত্রিসভায় আবার জায়গা পাওয়ার প্রত্যাশা আছে কারও কারও। আবার বিপক্ষে গেলে রোষানলে পড়ার ভয়ও আছে। তাই জোট ধরে রাখার পক্ষেই আছেন শরিকেরা। তবে কেউ কেউ বলছেন, আওয়ামী লীগ এখন এককভাবে সবকিছু করছে। ১৪–দলীয় জোটের কোনো কার্যকারিতা নেই। এটি আরও আগেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। কোনো কোনো শরিক দল বলছে, সাম্প্রদায়িক উত্থানের মধ্য দিয়ে জোটের প্রাসঙ্গিকতা বাড়ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার হুমকি এবং ডানপন্থীদের তৎপরতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টির (জেপি) সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম। তবে তিনি মনে করেন, রাজনীতির তেমন ইস্যু নেই, শুধু মাঠ গরম করার জন্য কর্মসূচি বরং উসকানি তৈরি করতে পারে। করোনা পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

বিজ্ঞাপন
শরিকদের মধ্যে কারও মন খারাপ থাকতেই পারে। এতে কোনো অসুবিধা নেই। জোটে ঐক্য ঠিকই আছে, কোনো দূরত্ব তৈরি হয়নি। সবার সঙ্গে আলোচনা করে কর্মসূচি ও করণীয় নির্ধারণ করা হবে
আমির হোসেন আমু, জোটের সমন্বয়ক

আওয়ামী লীগের এক কেন্দ্রীয় নেতা জানান, ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ১৪–দলের শরিকদের সাংসদ ছিলেন পাঁচজন। আর বর্তমান সংসদে আছেন আট সাংসদ। এর মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টির চারজন, জাসদের দুজন, তরীকত ফেডারেশনের একজন ও জেপির একজন। এ ছাড়া একাদশ সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাসদ থেকে মইন উদ্দীন খান বাদল সাংসদ হয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে চলে যায়।

জোটের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু প্রথম আলোকে বলেন, শরিকদের মধ্যে কারও মন খারাপ থাকতেই পারে। এতে কোনো অসুবিধা নেই। জোটে ঐক্য ঠিকই আছে, কোনো দূরত্ব তৈরি হয়নি। সবার সঙ্গে আলোচনা করে কর্মসূচি ও করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

তবে শরিক দলের একাধিক নেতা জানান, বিএনপি সংকটে আছে। জাতীয় পার্টিকে কেউ বিরোধী দল মনে করে না। সব মিলে দেশে একটি রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এতে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানের শঙ্কা তৈরি হয়। তাই ১৪–দলীয় জোটের প্রাসঙ্গিকতা বিদ্যমান।

মন্তব্য করুন