বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের হল সম্মেলন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার পেছনে শীর্ষ নেতাদের সাংগঠনিক অদক্ষতা ও সমন্বয়হীনতাকেও দায়ী করছেন নেতা-কর্মীরা। কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কমিটির মেয়াদ ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। এখনো হল কমিটি না হওয়ার কারণ হিসেবে নেতা-কর্মীরা আরও বলছেন, শীর্ষ নেতাদের এমন ধারণা আছে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল সম্মেলন হয়ে গেলে দ্রুত তাঁদের কমিটিও ভেঙে দেওয়া হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো ছাত্রলীগ ‘সমান্তরাল প্রশাসন’ হিসেবে এককভাবেই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। প্রতিটি হলে এখন ছাত্রলীগেরই অঞ্চলভিত্তিক ৮-১০টি করে পক্ষ তৈরি হয়েছে। এতে নেতৃত্বের জট ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। নিয়ন্ত্রণ না থাকায় নেতা-কর্মীদের কেউ কেউ বেপরোয়া হয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনেও জড়িয়ে পড়ছেন।

২০১৮ সালের ৩১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান সনজিত ও সাদ্দাম। তাঁদের এক বছরের গঠনতান্ত্রিক মেয়াদ ২০১৯ সালের জুলাইয়ে শেষ হয়। আল নাহিয়ান ও লেখক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পাওয়ার দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে আগামী ৪ জানুয়ারি। এর মধ্যে করোনা পরিস্থিতির কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বছরখানেক বন্ধ ছিল ছাত্রলীগের স্বাভাবিক সাংগঠনিক কার্যক্রম।

দায়িত্বে আসার শুরু থেকেই ‘দ্রুততম সময়ের মধ্যে’ হল সম্মেলন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এলেও সেই কথা রাখতে সফল হননি সনজিত ও সাদ্দাম। তবে এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগেরও দায় রয়েছে। কারণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল কমিটিতে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতাও ‘ভাগ’ পান। অর্থাৎ তাঁদের কিছু অনুসারী বিভিন্ন হলের শীর্ষ নেতৃত্বে আছেন। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় দুই শীর্ষ নেতার অনুমোদন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল কমিটি ঘোষণার অলিখিত রীতি রয়েছে।

গত মাসে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হিসেবে বিদেশে যান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল নাহিয়ান খান ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন। সেই সফরের আগে ২৮ নভেম্বর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হল সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করেন সনজিত-সাদ্দাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই সম্মেলন হয়নি।

সর্বশেষ ২৮ নভেম্বর থেকে সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হলে হল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যে একধরনের চাঞ্চল্য তৈরি হয়। কিন্তু এর মাত্র কয়েক দিন আগে সনজিত হাসপাতালে ভর্তি হয়ে পিত্তথলির অস্ত্রোপচার করান। এর ফলে ২৮ নভেম্বর সম্মেলন করার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

এমন পরিস্থিতিতে নেতা-কর্মীদের ‘মন রক্ষায়’ ২৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে হল পর্যায়ে শীর্ষ পদপ্রত্যাশী ব্যক্তিদের জীবনবৃত্তান্ত আহ্বান করা হয়। ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য তিন শতাধিক শিক্ষার্থী জীবনবৃত্তান্ত জমা দেন। ৩ ও ৪ ডিসেম্বর জীবনবৃত্তান্তগুলো যাচাই-বাছাই করা হয়।

এসব প্রক্রিয়া শেষে ৮ ডিসেম্বর রাতে ছাত্রলীগের দেখভালের দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগের চার জ্যেষ্ঠ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও বি এম মোজাম্মেল হকের সঙ্গে ছাত্রলীগের তিন শীর্ষ নেতার (আল নাহিয়ান খান, সনজিত ও সাদ্দাম) বৈঠক হয়। সেখানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও উপস্থিত ছিলেন। সেই বৈঠকে ২৩ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল সম্মেলন আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়।

ছাত্রলীগ সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে সেই সভায় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য অংশ নেননি। সভাটি শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পর কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগকে হল সম্মেলনবিষয়ক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে নিষেধ করা হয়। বলা হয়, হল সম্মেলনের বিষয়টি নিয়ে তাঁরা (আল নাহিয়ান ও লেখক) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলবেন।

হল সম্মেলনের বিষয়টি নিয়ে গত তিন দিনে ছাত্রলীগের অন্তত আটজন নেতার সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁদের মধ্যে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের একাধিক নেতা এবং বিভিন্ন হল শাখার শীর্ষ পদপ্রত্যাশীরা রয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, দায়িত্ব পাওয়ার শুরুর দিকে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের কারণে ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী এবং সনজিত-সাদ্দাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল কমিটি গঠনে আগ্রহী ছিলেন না। কারণগুলোর মধ্যে আছে ‘প্রটোকল’ কমে যাওয়ার আশঙ্কা, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা কমিটির মেয়াদ প্রলম্বিত করা ইত্যাদি। এরপর ২০১৯ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন ঘিরে ছাত্রলীগ ব্যস্ত হয়ে পড়লে হল কমিটির বিষয়টি আলোচনার বাইরে চলে যায়। নানা অভিযোগে সেই বছরের সেপ্টেম্বরে রেজওয়ানুল ও রাব্বানী ছাত্রলীগের পদ হারালে হল কমিটি গঠনের বিষয়টি আরও পিছিয়ে যায়।

ছাত্রলীগের ওই নেতা-কর্মীরা আরও বলেন, আল নাহিয়ান খান ও লেখক ভট্টাচার্য ছাত্রলীগের দায়িত্বে আসার পর থেকে নিজেদের বলয় তৈরি ও ‘প্রটোকল’ পাওয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল কমিটি গঠনের বিষয়টি বিলম্বিত করেন। এর মধ্যে করোনা পরিস্থিতি এসে তা আরও পিছিয়ে দেয়। জ্যেষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ছাত্রলীগের ৮ ডিসেম্বরের সভায় আল নাহিয়ান ও লেখক ইঙ্গিত পান যে দ্রুততম সময়ে কেন্দ্রীয় সম্মেলন হয়ে যেতে পারে। এরপরই হল কমিটি গঠনের বিষয়টি আরও পেছাতে তৎপর হন তাঁরা। জানুয়ারিতে হল সম্মেলন আয়োজনের যে কথা বলা হচ্ছে, তা–ও শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

একটি হলের শীর্ষ পদপ্রত্যাশী নেতা প্রথম আলোকে বলেন, ‘দীর্ঘ তিন বছর ধরে আমরা শীর্ষ নেতাদের প্রটোকল দিয়ে যাচ্ছি। এর জন্য নিজেদের একাডেমিক পড়াশোনায়ও মনোযোগ কম দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা সেই পরিশ্রমের কোনো ফল দেখতে পাচ্ছি না। এটা হতাশাজনক। হল কমিটি হয়ে গেলে আগের মতো প্রটোকল না–ও পাওয়া যেতে পারে—এই আশঙ্কা থেকে কমিটি দেওয়া হচ্ছে না। এ ছাড়া শীর্ষ নেতাদের মধ্যে এমন ধারণা আছে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল সম্মেলন হয়ে গেলে কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিও দ্রুত ভেঙে যেতে পারে।’

তবে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল নাহিয়ান খান বলছেন, দ্রুত হল কমিটি হোক, এটি তাঁদেরও চাওয়া। বিষয়টি দীর্ঘায়িত হওয়ার জন্য এককভাবে কাউকে দোষ দিয়ে ‘পানি ঘোলা করার’ সুযোগ নেই। আল নাহিয়ান প্রথম আলোকে বলেন, ‘২৩ ডিসেম্বর হল সম্মেলনের একটি তারিখ ঠিক হওয়ার পর আমরা আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক জননেত্রী শেখ হাসিনাকে বিষয়টি জানিয়েছি। তিনি আমাদের ডিসেম্বরের পরিবর্তে আগামী জানুয়ারিতে হল সম্মেলন করার নির্দেশনা দিয়েছেন। কারণ, ডিসেম্বরে অনেক জাতীয় অনুষ্ঠান আছে। ডিসেম্বরেই আমরা হল সম্মেলনের তারিখ ঠিক করব। জানুয়ারিতেই হবে হল সম্মেলন।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ছাত্রলীগের দেখভালের দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বলেন, এসব সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিষয়। জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আবদুর রহমানের মুঠোফোনে কল করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন আগের মতোই এখনো বলছেন, ‘দ্রুততম সময়ে’ হচ্ছে হল সম্মেলন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘হল কমিটি গঠন নিয়ে ইতিমধ্যে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে। সংগঠনে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনা, নতুন রক্তসঞ্চালন ও সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য হল সম্মেলন জরুরি হয়ে পড়েছে। সম্মেলন না হওয়ার কারণে কর্মীদের মধ্যে একধরনের হতাশা আছে—এটি আমরা গভীরভাবে অনুভব করি। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও হলে সুশৃঙ্খল ও সুসংহত রাজনীতিরও কিছুটা ব্যত্যয় ঘটেছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে হল সম্মেলন আয়োজনের চেষ্টা চলছে।’

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন