default-image

ক্যাসিনো–বাণিজ্য থেকে দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, করোনার নকল সনদ থেকে স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটা, ধর্ষণ থেকে রাস্তায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড—এমন নানা অপকর্মে অভিযুক্ত হচ্ছেন সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের একটা অংশ। দলটির নেতারা বলেছেন, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়া নেতা–কর্মীদের চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকায় দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে একশ্রেণির নেতা-কর্মীর মধ্যে অপরাধে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এঁদের কারণে মাঝেমধ্যেই দল ও সরকার বিব্রত হচ্ছে। কোনো ঘটনা ব্যাপকভাবে প্রচার না পাওয়া পর্যন্ত এ ধরনের নেতা–কর্মী বা দুষ্কৃতকারীরা দলীয় পরিচয় নির্বিঘ্নে ব্যবহার করে যান। তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করাটা আওয়ামী লীগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, অপকর্মকারীদের কঠোর হস্তে দমন করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নিয়মিত তাঁদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং হচ্ছে। যাঁদের আনুকূল্যে এসব হচ্ছে, তাঁরাও দলীয় পদ হারাচ্ছেন। নতুন নেতৃত্ব বেছে নেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

সরকারি দলের নেতারা বলছেন, গত বছরের সেপ্টেম্বরে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের মধ্য দিয়ে যুবলীগের কিছু নেতার অপকর্ম সামনে আসে। কয়েকজনকে আটক করে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। দলীয় পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে অনেককে। পরে সম্মেলনের মাধ্যমে সংগঠনের নতুন নেতৃত্ব ঠিক করা হয়েছে। অন্যান্য সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনেও একই উদ্যোগ নেওয়া হয়।

সর্বশেষ গত ২৬ অক্টোবর নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তাকে মারধর করে আলোচনায় এসেছেন ঢাকা-৭ আসনের সরকারি দলের সাংসদ হাজি সেলিমের ছেলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ইরফান সেলিম। পরদিন আটক হন সাংসদপুত্র। এর আগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ৯ জনকে আসামি করে একটি মামলা হয়। এতে যে ছয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়, তাঁরা ‘ছাত্রলীগের কর্মী’ হিসেবে পরিচিত। যদিও সেখানে অনেক দিন ধরে ছাত্রলীগের কমিটি নেই। ওই ঘটনার পর ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করতে সারা দেশে আন্দোলন শুরু হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই দাবি মেনে নেয় সরকার। আসামিদেরও আটক করে পুলিশ।

হাজারো কমিটির লাখো নেতা

আওয়ামী লীগের দপ্তর সূত্র বলছে, কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ৫০ হাজারের বেশি কমিটি আছে। তাতে পদের সংখ্যা ২৫ লাখের বেশি। এর মধ্যে ৬৪টি জেলা ও ১২টি সিটি করপোরেশনসহ মোট সাংগঠনিক জেলা কমিটি ৭৮টি। এসব জেলার আওতায় ৬২২টি উপজেলা কমিটি, ৫ হাজার ৬৪৩টি ইউনিয়ন কমিটি ও ৪৩ হাজার ৫৯৬টি ওয়ার্ড কমিটি রয়েছে। এর বাইরে অনেক জায়গায় ওয়ার্ডের আওতায় ইউনিট বা মহল্লা কমিটি আছে, যার হিসাব পাওয়া যায়নি। দলের নেতারা বলছেন, প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সাংগঠনিক কাঠামোর পুরো মিল থাকে না। ভৌগোলিক অবস্থান, শহর বা গ্রাম এলাকা বিবেচনায় সাংগঠনিক কমিটির জেলা, উপজেলা বা ইউনিয়নের সমমান ঠিক করা হয়। প্রয়োজনে প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সংগতি রেখে বিভিন্ন সময় কমিটির মান পরিবর্তন করা হয়।

দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে একটা অংশ। তাদের চিহ্নিত করার উদ্যোগ নিয়েছে আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগের মূল দলের বাইরে আটটি সহযোগী ও দুটি ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনেরও তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত কমিটি আছে সারা দেশে। এতেও লাখো নেতা-কর্মী দলীয় পদ পান। বিদেশেও প্রবাসীদের নিয়ে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি রয়েছে। এর বাইরে পেশাজীবী ও বিভিন্ন খাতে আওয়ামী লীগের সমমনা হিসেবে আরও অনেক সংগঠন আছে। এসব সংগঠনের নেতা-কর্মীরাও সরকারি দলের পরিচয় ব্যবহার করেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুসারী হিসেবে এসব কমিটিতে ঢুকে পড়েন অনেকে। অনেক কমিটিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকে। তাঁরা নিজ নিজ পক্ষের শক্তি বাড়াতে অনেক সময় বিতর্কিত ব্যক্তিদের দলে টানেন।

আবার টাকার বিনিময়ে দলীয় পদ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে বিভিন্ন সময়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় এ অভিযোগ ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। সহযোগী সংগঠনের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তখন কিছু নেতাকে বহিষ্কার বা পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। যুবলীগের তৎকালীন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরী এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. কাওছারকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

বিতর্কিতদের বিষয়ে সতর্কতা

বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে নেতৃত্ব ঠিক করতে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ ও মৎস্যজীবী লীগের সম্মেলন করা হয় গত বছরের নভেম্বরে। যুবলীগ ছাড়া বাকিগুলোর পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। এ ছাড়া ঢাকার দুই মহানগরসহ ৩১টি জেলার সম্মেলন হয়েছে গত বছর। কেন্দ্রীয়ভাবে যাচাই-বাছাই করে কমিটি ঘোষণা করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা জানান, কোনো অবস্থাতেই দলের অভ্যন্তরে বিতর্কিত ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় না দিতে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর নির্দেশনায় আট বিভাগীয় কমিটি অঞ্চলভিত্তিক নেতাদের নিয়ে আলাদা করে বৈঠক শুরু করেছেন। একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক প্রতিটি কমিটি সমন্বয় করছেন। এ ছাড়া প্রতিটি কমিটিতে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, সম্পাদকীয় ও নির্বাহী কমিটির সদস্যদের ভাগাভাগি করে রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, সন্ত্রাস বা অপকর্মের অভিযোগ থাকা কাউকে দলে না নেওয়ার নির্দেশনা ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটার ব্যত্যয় ঘটেছে। এবার তাই কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আর কিছু ব্যক্তি দলীয় পদ ছাড়াই বিভিন্ন নেতার পেছনে ঘুরে ফায়দা আদায় করতে চান। তাঁদের বিষয়েও সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

সরকার থেকে দল আলাদা

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নেতা জানান, দল ও সরকার আলাদা করা গেলে দুটিই গতিশীল হবে। তাই ভবিষ্যতের যেকোনো ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দলকে সুসংহত করায় জোর দিচ্ছেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছাড়া এবার কেন্দ্রীয় কমিটিতে আছেন মন্ত্রিসভার মাত্র তিনজন সদস্য। এর মধ্যে পুনরায় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হয়েছেন কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি ও তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। ৮ বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ১৯টি বিষয়ভিত্তিক সম্পাদকীয় পদেও মন্ত্রিসভার কাউকে রাখা হয়নি এবার।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক গোবিন্দ চক্রবর্ত্তী প্রথম আলোকে বলেন, গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্ত ভিত্তি না পাওয়ায় ছায়া সরকারের ধারণা এখানে তৈরি হয়নি। তাই দল ও সরকার আলাদা থাকলে দলের মাধ্যমে জনগণের দাবি সরকারে প্রতিফলিত হতে পারে।

নাগরিক আন্দোলনেই যত ভয়

২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে মাঠে শক্ত কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নেই। তবে সব মিলে তিন মেয়াদে চারটি বড় নাগরিক আন্দোলনের মুখে পড়েছে সরকার। ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চ, ২০১৮ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়কের দাবি এবং সর্বশেষ এ বছর ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার দাবিতে নাগরিকদের আন্দোলন রাজনৈতিকভাবে থামানো যায়নি। কোটা সংস্কার এবং নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে হামলা চালানো হয়েছিল। পরে কৌশল বদলে প্রশাসনিকভাবে দাবি মেনে নিয়ে তা সমাধান করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় সুবিধাবাদীরা যেমন দলে ঢুকছেন, আবার মাঠে শক্ত প্রতিপক্ষ না থাকায় নেতা-কর্মীদের একটি অংশের মধ্যেও একচ্ছত্র মনোভাব তৈরি হয়েছে। তাই সংযত আচরণ না করে তাঁরা স্বার্থসিদ্ধির দিকে ঝুঁকে পড়ছেন।
অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, জাতীয় সংসদের পরিপূরক হয়ে উঠছে নাগরিক আন্দোলন। চাপের মুখে পড়ে সরকার প্রশাসনিকভাবে দাবি মেনে নিচ্ছে। অথচ এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা সংসদে। ভবিষ্যতেও এমন নাগরিক আন্দোলন সামনে আসতে পারে। তাই এখন দলকে সংহত করায় মনোযোগ দিচ্ছে আওয়ামী লীগ।

যদিও আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, প্রতিটি আন্দোলন থেকেই সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছিল বিএনপি। তাতে কাজ হয়নি। জনগণের যৌক্তিক দাবির প্রতি আওয়ামী লীগ সমর্থন জানিয়েছে। দলীয় নেতা-কর্মীরাও এসব আন্দোলনের পক্ষে মাঠে ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

রূপকল্প বাস্তবায়নে বাধা নয়

অধ্যাপক গোবিন্দ চক্রবর্ত্তী বলেন, রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়নই আওয়ামী লীগের লক্ষ্য। তাই ঘোষণা দিয়েই ‘উন্নয়নের গণতন্ত্র’ প্রচার করছে তারা। অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনবরত দুর্বল হচ্ছে। রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। বিরোধী দলগুলোকে দেয়ালে ঠেলে দিলে ধীরে ধীরে এটি প্রশাসনিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, রূপকল্প বাস্তবায়ন এগিয়ে নিতে কোনো বাধা বা আন্দোলনের মুখে পড়তে চায় না সরকার। সরকারের উন্নয়ন প্রশংসিত হচ্ছে। কিন্তু কিছু নেতা-কর্মীর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে সরকারের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মধ্যে পড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয় দল। তাই দুর্নীতি ও নানা অপকর্মে বিতর্কিত ব্যক্তিদের দল থেকে বাদ দিতে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রতিটি বিভাগ থেকে বিতর্কিত ব্যক্তিদের প্রাথমিক একটি তালিকা ইতিমধ্যে তৈরি করা হয়েছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় সুবিধাবাদীরা যেমন দলে ঢুকছেন, আবার মাঠে শক্ত প্রতিপক্ষ না থাকায় নেতা-কর্মীদের একটি অংশের মধ্যেও একচ্ছত্র মনোভাব তৈরি হয়েছে। তাই সংযত আচরণ না করে তাঁরা স্বার্থসিদ্ধির দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। তবে সুবিধাবাদীরা যাঁদের আনুকূল্য পাচ্ছেন, তাঁরা কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারেন না।

মন্তব্য পড়ুন 0