বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আর জেলাভিত্তিক হিসাবে পঞ্চম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে নৌকা সবচেয়ে বেশি হেরেছে কুষ্টিয়ায়। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের মধ্যে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ জয় পেয়েছে মাত্র একটিতে। বাকি ১০টিতেই নৌকা হেরেছে। আটটিতে দলের বিদ্রোহী, একটিতে স্বতন্ত্র ও আরেকটিতে বিএনপি–সমর্থিত প্রার্থী জয়ী হয়েছেন।

নির্বাচনের এ ফলাফলের পর নৌকার প্রার্থী নিমাই চাঁদ মণ্ডল বলেন, তিনি ফলসী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তারপরও কেন ভোটের ফল এমন হলো তা বলতে পারছেন না।

দলের এমন বিপর্যয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসগর আলী বলেন, ফল বিপর্যয় হয়েছে, এটা মানতে হবে। তবে কেন, কী কারণে এমন হলো, সেটা খুঁজে বের করা হবে। দলের ভেতর যদি কারও ইন্ধন বা কারসাজি থাকে, সেটা দেখে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কুষ্টিয়ায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা যে শুধু হেরেছেন তা নয়, পাঁচজন প্রার্থী মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেই আসতে পারেননি। এর মধ্যে তিনজন জামানত হারাচ্ছেন। তাঁদের একজন হাটশ হরিপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী এম সম্পা মাহমুদ। ভোটের এমন ফল সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রচার শুরুর পর থেকেই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা ষড়যন্ত্র শুরু করেন। ভোটের কয়েক দিন আগে তাঁরা প্রকাশ্যে বিদ্রোহীদের প্রচারণায় অংশ নেন। এ কারণে এমন ফল হয়েছে।

ঝিনাইদহে নৌকার প্রার্থী পেয়েছেন ৪২ ভোট

ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার ফলসী ইউপিতে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী নিমাই চাঁদ মণ্ডল মাত্র ৪২ ভোট পেয়েছেন। এ ইউপিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী বজলুর রহমান ৪ হাজার ৬২৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বর্তমান চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান পেয়েছেন ৪ হাজার ১৭৯ ভোট।

নির্বাচনের এ ফলাফলের পর নৌকার প্রার্থী নিমাই চাঁদ মণ্ডল বলেন, তিনি ফলসী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তারপরও কেন ভোটের ফল এমন হলো তা বলতে পারছেন না। তবে এ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দুটি পক্ষ আছে। একটির নেতৃত্ব দেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি বজলুর রহমান, আরেকটির নেতৃত্ব দেন উপজেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ফজলুর রহমান। তিনি নিরপেক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাই আশা ছিল ভোটে জিতবেন।

জয়ে এগিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা

পঞ্চম ধাপে গত বুধবার দেশের ৭০৭টি ইউপিতে নির্বাচন হয়। এর মধ্যে ১৫টি ইউপির ফলাফল প্রকাশিত হয়নি। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয় গতকাল বৃহস্পতিবার ৬৯২টি ইউপির চেয়ারম্যান পদের ফলাফলের তথ্য দিয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ জয় পেয়েছে ৩৪১টিতে। আর স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন ৩৪৬টিতে। এ ধাপে ৫০ শতাংশ ইউপিতে জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। অবশ্য এ ধাপে ৪৭টি ইউপিতে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী দেয়নি। এসব ইউপিতে আওয়ামী লীগের নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছেন।

প্রথম আলোর প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ১৬০ জন ছিলেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয় পেয়ছেন ৮৩ জন বিএনপি নেতা এবং জামায়াতে ইসলামীর পাঁচজন নেতা।

স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচন আনুষ্ঠানিকভাবে বর্জন করেছে রাজনীতির মাঠে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মূল প্রতিপক্ষ বিএনপি। তারপরও প্রতিটি ধাপেই নৌকার জয়ের হার ক্রমান্বয়ে কমেছে। প্রথম ধাপের ভোটে ৭৬ শতাংশ ইউপিতে জয় পেয়েছিল আওয়ামী লীগ। গত ১১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ধাপে ক্ষমতাসীনেরা জয় পায় প্রায় ৫৯ শতাংশ ইউপিতে। গত ২৮ নভেম্বর তৃতীয় ধাপে ৫৪ শতাংশ ইউপিতে জয় পেয়েছিলেন ক্ষমতাসীনেরা। গত ২৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত চতুর্থ ধাপে আওয়ামী লীগ জয় পায় ৫১ দশমিক ৪৯ শতাংশ ইউপিতে। আর পঞ্চম ধাপে আওয়ামী লীগের জয়ের হার ৪৯ দশমিক ২৭ শতাংশ। অবশ্য পঞ্চম ধাপে ৪৭টি ইউপিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন না। সেটি বাদ দিলে এ ধাপে আওয়ামী লীগের জয়ের হার ৫২ দশমিক ৮৬ শতাংশ।

এর আগে ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের জয়ের হার এবারের তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপের চেয়ে ভালো ছিল। ওই নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিয়েছিল। অবশ্য সে নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ছিল। ২০১৬ সালে ছয় ধাপে মোট ৪ হাজার ১০৪টি ইউপিতে ভোট হয়। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ২ হাজার ৬৫২টি, অর্থাৎ প্রায় ৬৫ শতাংশ ইউপিতে জয় পেয়েছিল।

সিলেটে ভরাডুবি, রাজশাহীতে বিপর্যয়

পঞ্চম ধাপে সিলেট বিভাগের ৭৫টি ইউপিতে ভোট হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ইউপির ফলাফল স্থগিত আছে। বাকি ৭৩টি ইউপির মধ্যে আওয়ামী লীগ জয় পেয়েছে মাত্র ২৯টিতে। এখানে প্রায় ৬০ শতাংশ ইউপিতে আওয়ামী লীগ হেরেছে। বিদ্রোহী প্রার্থী জয় পেয়েছেন ১৭টিতে আর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ে বিএনপির ১৫ জন নেতা এবং জামায়াতের ৪ জন নেতাও জয় পেয়েছেন।

ভোটের এমন ফলের বিষয়ে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, স্থানীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভোটাররা আঞ্চলিকতা, গোষ্ঠী, গ্রাম—এসব বিষয় বিবেচনায় রাখেন। এখানে প্রতীকের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ও সামাজিক অবস্থানকেই ভোটাররা বেশি গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে কোন দলের প্রার্থী কতজন জিতলেন, তা বিবেচনা করে কোনো দলের জনপ্রিয়তা বিবেচনা করতে চাইলে ভুল হবে।

পঞ্চম ধাপে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ১৬টি ইউপির মধ্যে ১১টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা হেরেছেন। ছয়টিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও পাঁচটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিএনপির পাঁচ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। রাজশাহী-৪ আসনের সাংসদ ও বাগমারা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এনামুল হকের এলাকা মাড়িয়া ইউপিতেও নৌকার প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। ভোটের ফলে নৌকা তৃতীয় হয়েছে। এখানে জয় পেয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী ও সাংসদের ছোট ভাই রেজাউল হক।

বাগমারা উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, প্রার্থী মনোনয়নে কিছুটা ত্রুটি ছিল। প্রার্থীদের অযোগ্যতা ও তাঁদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না থাকায় নৌকার প্রার্থীদের পরাজয় হয়েছে।

শুধু বাগমারা নয়, পুরো রাজশাহী বিভাগেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বেশির ভাগ হেরে গেছেন। এ বিভাগে পঞ্চম ধাপে ১২৪টি ইউপির ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ ৬৬টিতে হেরেছে। অর্থাৎ এ ধাপে রাজশাহী বিভাগের ৫৩ শতাংশ ইউপিতে হেরেছে নৌকা। রংপুর বিভাগেও আওয়ামী লীগের ফল খারাপ হয়েছে। এ বিভাগে ৫১ শতাংশ ইউপিতে নৌকা হেরেছে।

দলের প্রার্থীদের ভরাডুবির বিষয়ে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা বীরেন্দ্রনাথ সরকার প্রথম আলোকে বলেন, স্থানীয় নেতারা প্রার্থী মনোনয়নে অনিয়ম করেছেন এবং দলের বিদ্রোহীদের বসানোর কোনো উদ্যোগ নেননি। ফলে বিদ্রোহী প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছেন।

(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন প্রথম আলোর সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদকপ্রতিনিধিরা)

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন