ডাকসুর সভা

প্রধানমন্ত্রীকে আজীবন সদস্য করার প্রস্তাবে নুরুলের দ্বিমত

বিজ্ঞাপন
default-image

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) আজীবন সম্মানসূচক সদস্য পদ দেওয়া নিয়ে ডাকসুর প্রথম কার্যকরী সভার পর সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হক ও ছাত্রলীগের প্যানেলের প্রার্থীরা পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিয়েছেন৷ ছাত্রলীগের প্যানেলের প্রার্থীরা এবং উপাচার্য ও ডাকসুর সভাপতি মো. আখতারুজ্জামান প্রধানমন্ত্রীকে সদস্য পদ দেওয়ার পক্ষে৷ তবে ভিপি নুরুল হক ডাকসু নির্বাচনকে ‘বিতর্কিত’ আখ্যা দিয়ে এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন৷

আজ শনিবার বেলা ১১টা ২০ মিনিট থেকে দেড়টা পর্যন্ত ডাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রথম কার্যকরী সভা অনুষ্ঠিত হয়৷ একই সময়ে ১৮টি হল সংসদের কার্যকরী সভাও অনুষ্ঠিত হয়৷ ডাকসুর কেন্দ্রীয় সংসদে নির্বাচিত ২৫ জনই অংশ নেন৷

ডাকসু কেন্দ্রীয় সংসদের সভা শেষে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন উপাচার্য ও ডাকসুর সভাপতি মো. আখতারুজ্জামান, সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হক ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) গোলাম রাব্বানী৷

সভা শেষে গোলাম রাব্বানী সাংবাদিকদের বলেন, আজকের সভার শুরুতে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন,একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব শহীদ, জেলহত্যার শিকার জাতীয় চার নেতা, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের শহীদসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়েছে৷ এরপর ডাকসুর সভাপতি উপাচার্যের কাছ থেকে নির্বাচিত ব্যক্তিরা দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন৷ এর পর ডাকসুর অভিষেক অনুষ্ঠানের ব্যাপারে একটি সম্মিলিত সিদ্ধান্ত হয়েছে৷ বলা হয়েছে, এর জন্য দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগবে৷ অভিষেকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হবে৷

প্রধানমন্ত্রীকে সদস্য পদ দেওয়া নিয়ে পাল্টা বক্তব্য
সভা শেষে ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজকের সভায় আমাদের প্রথম প্রস্তাব ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সম্মান জানিয়ে আজীবন সদস্য পদ দেওয়া৷ ইতিপূর্বে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এই সদস্য পদ দেওয়া হয়েছিল৷ কেন্দ্রীয় ডাকসুর সর্বসম্মত সমর্থনের পর আমরা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে আজীবন সদস্য পদ দেওয়ার বিষয়ে উপাচার্যের কাছে প্রস্তাব দিয়েছি৷ উপাচার্য বলেছেন,পরবর্তী সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব আকারে এ বিষয়ে জানাবেন৷’

ভিপি নুরুল হক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে ডাকসুর আজীবন সদস্য পদ দেওয়ার ব্যাপারে সভায় আলোচনা হয়েছে৷ কিন্তু এটি নিয়ে কোনো সমাধানে এখনো পৌঁছাইনি৷ এই নির্বাচন নিয়ে একটি প্রশ্নবিদ্ধ জায়গায় যেহেতু আমরা রয়েছি, সে রকম একটি জায়গা থেকে আমি মনে করি না এখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আজীবন সদস্য পদ ঘোষণা করা উচিত৷ সেই জায়গা থেকে আমিসহ কয়েকজন বিষয়টির বিরোধিতা করেছেন৷’

নুরুল হক যখন এ বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখনই পাশ থেকে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলে ওঠেন, ‘কয়েকজন না, শুধু আপনি (একজন) বিরোধিতা করেছেন৷’ নুরুল হক রেগে গিয়ে বলেন, ‘আমি কিছু বলব না৷ আমার কথা আপনিই বলেন৷’ রাব্বানী সাংবাদিকদের বলেন, ‘ডাকসু একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান...’ তখন সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘নুর, আপনি শেষ করেন৷ রাব্বানী, আপনার বক্তব্য আমরা শুনব৷’

নুরুল হক এরপর বলতে শুরু করেন, ‘প্রধানমন্ত্রী একজন সম্মানিত ব্যক্তি৷ তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী প্রধান৷ ডাকসুর আজীবন সদস্য পদ তাঁর জন্য বড় কিছু না৷ নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে৷ যখন আমরা দায়িত্ব নিচ্ছি, তখন আমার ভাইয়েরা মিছিল করছে, পুনর্নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে৷ ভিপি হিসেবে আমি তাঁদের দাবিকে সমর্থন জানিয়েছি৷ সভায় উপাচার্য স্যারকে অনিয়মের বিষয়ে আমি বলেছি৷ বলেছি যে পুনর্নির্বাচন হওয়া দরকার৷ যেহেতু নির্বাচনটি সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি, শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ নির্বাচনটিকে প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী আটজন নিরপেক্ষ শিক্ষকও পুনরায় নির্বাচন চেয়েছেন৷ আমরা চাই না, এমন একটি বিতর্কিত নির্বাচনে আজীবন সদস্য ঘোষণা করা হোক৷’

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে নুরুল হক বলেন, ‘পুনর্নির্বাচনের দাবিসহ শিক্ষার্থীদের যেসব যৌক্তিক আন্দোলন রয়েছে, সেগুলো আদায় করার জন্যই আমি দায়িত্ব নিয়েছি৷ আমি কিন্তু বলিনি, আমি পুনর্নির্বাচন চাই না৷ পুনর্নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত যেহেতু ডাকসু কার্যকর থাকবে, সেহেতু যেখান থেকে শিক্ষার্থীদের দাবির পক্ষে কথা বলা যাবে, সেখান থেকে আমি কথা বলব৷ সে জন্যই আমি দায়িত্ব নিয়েছি৷’

এরপর ভিপি নুরুল হক চলে গেলে গোলাম রাব্বানী সাংবাদিকদের বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ডাকসুর ২৫ জনের মধ্যে ২৩ জন সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে আজীবন সদস্য পদ দেওয়ার বিষয়টি সমর্থন করেছেন৷ একমাত্র ভিপিই দ্বিমত পোষণ করেছেন৷ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তাঁর বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়৷ এটি সংখ্যাধিক্যের ভিত্তিতে (২৩:২ অনুপাতে) গৃহীত হয়ে গেছে, এটি মীমাংসিত ইস্যু৷ সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেনও প্রস্তাবের পক্ষে ছিল৷ বেসিক্যালি, ২৪:১ অনুপাতে সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়েছে৷ আমাদের সংসদের সভাপতি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন৷ যেহেতু অনুপাত আমাদের পক্ষে, আশা করি ইতিবাচক ফলাফল পাব৷’

জানতে চাইলে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ থেকে নির্বাচিত ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীকে আজীবন সদস্যপদ দেওয়ার পক্ষে ছিলেন না৷

উপাচার্য যা বললেন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ডাকসুর আজীবন সদস্য পদ দেওয়ার বিষয়ে উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী প্রধানমন্ত্রী ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে যে উৎসাহ ও সহযোগিতা দিয়েছেন, যে আশ্বাস তিনি আমাদের দিয়েছেন, সেটির সফল বাস্তবায়ন তিনি করেছেন, যার ফলে আমরা এই নির্বাচন আয়োজনে আত্মপ্রত্যয়ী হয়েছি এবং নিজেদের অত্যন্ত শক্তিশালী অনুভব করেছি৷ সে জন্য ডাকসুর কার্যকরী পরিষদের সবাই একেবারে সহমত জ্ঞাপন করেছেন যে আমরা প্রধানমন্ত্রীকে সম্মান জানিয়ে ডাকসুর আজীবন সদস্য পদ দেব৷ সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, প্রস্তাবটি ধন্যবাদের সঙ্গে গৃহীত হলো৷ গঠনতন্ত্র দেখে পরবর্তী সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যাজেন্ডা আকারে নিয়ে এসে এই মহৎ কাজটি করব৷’

সভার বিষয়ে মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘বৈঠকে যেসব বক্তব্য শুনলাম, সেগুলো এতই আশাপ্রদ এবং তাদের যে মূল্যবোধ, সেগুলো নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়৷ অত্যন্ত বন্ধুসুলভ আচরণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তারা আলোচনা করেছে৷ সম্পাদকীয় পদগুলোতে যাঁরা রয়েছেন তাদের সাধারণ সম্পাদকের (জিএস) সঙ্গে সমন্বয় করে নিজেদের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করতে বলা হয়েছে৷’

ডাকসুর বিপুল কর্মযজ্ঞ সম্পাদনে সহযোগিতার জন্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যদের ধন্যবাদ জানান উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান৷ এ ছাড়া ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে একেবারেই আস্থাশীল থেকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রেখে এত বড় একটি নির্বাচন আয়োজনে সক্ষম’ হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও ধন্যবাদ জানান তিনি৷

যখন ডাকসুর কার্যকরী সভা চলছিল, সেই মুহূর্তে ডাকসুর পুনর্নির্বাচন ও নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের পদত্যাগ দাবি করে ক্যাম্পাসে কালো ব্যাজ ধারণ করে মৌন মিছিল করে ছাত্রদল৷ ছাত্রদলের কর্মসূচির বিষয়ে উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান৷ এখানে সবারই মত প্রকাশের অধিকার আছে৷’

যত দাবি ও প্রস্তাব

সিনেটে ডাকসু থেকে পাঁচজন ছাত্র প্রতিনিধির ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে বলে জানান ভিপি নুরুল হক৷ তিনি বেলন, উপাচার্য স্যার ভিপি, জিএস ও এজিএসকে সিনেটের জন্য পাঁচজন প্রতিনিধি নির্ধারণের দায়িত্ব দিয়েছেন৷ সভায় সব প্যানেলেরই সাধারণ দাবি ছিল, হলে গণরুম-গেস্টরুম এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় সিট দেওয়া বন্ধ করা৷

এদিকে আজকের সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ে রিকশা ও সাইকেলের জন্য একটি আলাদা লেন এবং ক্যাম্পাসে রিকশা ভাড়া নির্ধারণের বিষয়ে প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন ছাত্রলীগের প্যানেলের প্রার্থীরা৷ এ বিষয়ে ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘বিভিন্ন আবাসিক এলাকার মতো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তিন থেকে সাড়ে তিন শ রিকশাকে প্রাথমিকভাবে রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হবে এবং নির্দিষ্ট পোশাক দেওয়া হবে৷ এ ছাড়া, পরবর্তী সভায় আমরা ক্যাম্পাসে গণপরিবহন নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রণয়ন করব৷’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন