আবু তাহের। আওয়ামী লীগের আলোচিত ও বিতর্কিত নেতা। এবার তিনি হতে চান লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। ফলে বদলে যাচ্ছে সম্মেলনের নিয়মকানুন। এই প্রথমবারের মতো দলের জেলা সম্মেলনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হতে ‘মনোনয়নপত্র’ কিনতে হচ্ছে। তা-ও লাখ টাকায়। 
দলীয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সম্মেলন প্রস্তুতি সভায় আবু তাহের প্রস্তাব করেন, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হতে হলে ১০-১৫ লাখ টাকা করে দিতে হবে। এটা ‘সম্মেলনের খরচ’-এর জন্য। সবার বিরোধিতার মুখে শেষ পর্যন্ত এটা এক লাখ টাকা নির্ধারণ হয়।
এখন ‘জেলা সম্মেলনের জন্য প্রার্থীর মনোনয়নপত্র’ শিরোনামে ফরম ছাপিয়ে এই টাকা নেওয়া হচ্ছে। গতকাল শনিবার মনোনয়নপত্র সংগ্রহের শেষ দিন পর্যন্ত সভাপতি পদে আবু তাহেরসহ ছয়জন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে সাতজন মনোনয়নপত্র কিনেছেন। আগামী ৩ মার্চ সম্মেলনের দিন ধার্য আছে।
১১ বছর আগে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ সম্মেলনের সময় আবু তাহের ছিলেন কারাগারে। তবে তাঁকে জেলা কমিটির সদস্য করা হয়। এবার একাধিক প্রার্থী ও দলীয় নেতা অভিযোগ করেছেন, তাঁরা যাতে ‘মনোনয়নপত্র’ সংগ্রহ করতে না পারেন তার জন্য নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করা হয়।
জানতে চাইলে আবু তাহের প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারি দল হয়ে সম্মেলনের খরচের জন্য কারও কাছ থেকে চাঁদা তোলার পক্ষপাতী ছিলাম না আমি। তাই দলের সভায় অনেকে অনেক প্রস্তাব তুলে ধরেন। আমিও বলেছিলাম, যাঁরা প্রার্থী হবেন তাঁরা পাঁচ-দশ লাখ টাকা করে দেবেন। দুই সাংসদের কাছ থেকে দশ লাখ টাকা করে চাঁদা নেওয়ার প্রস্তাব করি। কিন্তু সাংসেদরা তা দিতে পারবেন না বলে জানান। পরে প্রার্থীদের জন্য এক লাখ টাকা ঠিক করা হয়।’
নিয়ম হচ্ছে, সম্মেলনের সময় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য বৈধ কাউন্সিলরদের একজন প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করবেন। আরেকজন বৈধ কাউন্সিলর তাঁকে সমর্থন দেবেন। এভাবে একই পদে একাধিক প্রার্থী হলে ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচন হবে। আগে মনোনয়নের কিছু নেই।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রবীণ নেতা মন্তব্য করেন, জেলা কমিটির পদ পেতে যদি এক লাখ টাকা দিয়ে ‘মনোনয়নপত্র’ নিতে হয় তাহলে তো গ্রামগঞ্জের গরিব, সৎ, ত্যাগী নেতারা আর আওয়ামী লীগের বড় পদে আসতে পারবেন না। এই প্রক্রিয়ায় তো দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ টাকাওয়ালাদের কাছে চলে যাবে। প্রসঙ্গত, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র ফি ছিল ২৫ হাজার টাকা।
জেলা স্টেডিয়ামে আওয়ামী লীগের এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের।
দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আলাপের সময় তাঁরা অনেক কথা বললেও কেউ নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। এঁদের তথ্য হচ্ছে, জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটির একাধিক শীর্ষ নেতার সঙ্গে তাহেরের মতবিরোধ রয়েছে। যদিও তাহেরের দাপট ও পেশিশক্তির কাছে অনেকে অসহায়। এ সুযোগে তাহের দলীয় অন্য নেতা ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছেন।
জেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যেকোনো মূল্যে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদটি নিজের কবজায় নিতে তাহের প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন। এমনিতেই স্থানীয় প্রশাসনের বড় একটি অংশ তিনি ও তাঁর পরিবার কবজায় রেখেছেন। তিনি নিজে লক্ষ্মীপুর পৌরসভার মেয়র। তাঁর মেজো ছেলে এ কে এম সালাউদ্দিন ওরফে টিপু উপজেলা চেয়ারম্যান।
বড় ছেলে এ এইচ এম বিপ্লব তিনটি হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। এর মধ্যে ২০১১ সালে আইনজীবী নুরুল ইসলাম হত্যা মামলায় তাঁর ফাঁসির দণ্ড মাফ করেছিলেন রাষ্ট্রপতি। আর কামাল ও মহসিন হত্যা মামলায় ২০১২ সালে তাঁর যাবজ্জীবন সাজা কমিয়ে ১০ বছর করেছেন রাষ্ট্রপতি।
সভাপতি পদপ্রার্থী হওয়ার বিষয়ে আবু তাহের বলেন, ‘আমি দলের জন্য কাজ করি, তাই দলীয় পদে প্রার্থী হয়েছি। আমি চাই, দলের নেতা-কর্মীরা ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচিত করুক।’
১১ বছরের বেশি সময় পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সম্মেলনকে কেন্দ্র করে জেলা শহরে ব্যানার, বিলবোর্ড, পোস্টার লেগেছে। এর বেশির ভাগই তাহেরের।
সভাপতি পদ যে ছয়জন ‘মনোনয়নপত্র’ কিনেছেন তাঁরা হলেন বর্তমান কমিটির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণ নেতা এম আলাউদ্দিন, লক্ষ্মীপুর সদর আসনের সাংসদ এ কে এম শাহজাহান কামাল, বর্তমান কমিটির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আ ন ম ফজলুল করিম, সহসভাপতি গোলাম ফারুক, পৌর মেয়র ও বর্তমান কমিটির সদস্য আবু তাহের, আবদুল গোফরান ও শফিকুল ইসলাম।
সাধারণ সম্পাদক পদে ‘মনোনয়নপত্র’ কিনেছেন বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহিম, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরউদ্দিন চৌধুরী, বর্তমান যুগ্ম সম্পাদক সৈয়দ মোজাম্মেল হক, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম, আইন সম্পাদক আবুল বাশার, যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক ও সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) জসিমউদ্দিন এবং বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক নুরুল হুদা পাটওয়ারী।
এবারের সম্মেলনে কাউন্সিলর করা হয়েছে ২২১ জনকে। এঁদের কয়েকজন অভিযোগ করেছেন, তাহেরের পক্ষ থেকে তাঁদের নানাভাবে হুমকি-চাপ দেওয়া হচ্ছে। একাধিক প্রার্থীও নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ এনেছেন।
তাঁর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয় সেগুলো সত্য নয় বলে দাবি করে আবু তাহের মুঠোফোনে বলেন, ‘আমি কিছু একটা করতে গেলেই আপনারা আমার পেছনে উঠেপড়ে লাগেন। প্রকাশ্যে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে আলোচনার আয়োজন করেন। আমি সব প্রশ্নের জবাব দেব।’
সম্মেলনের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা কমিটির বর্তমান সভাপতি এম আলাউদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহিম প্রথম আলোকে জানান, কাউন্সিলরদের ভোটেই সরাসরি নেতা নির্বাচিত হোক এটাই সবার দাবি। সে লক্ষ্যে প্রস্তুতি চলছে। তবে কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে দলীয় সভানেত্রীর নির্দেশ সবাই মেনে নিতে প্রস্তুত।

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন