বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, বদরুদ্দীন উমরের মধ্যে সব সময়ই এমন চিন্তা ছিল যে পৃথিবীতে বিদ্যমান অবস্থার চেয়ে অনেক ভালো অবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। তাঁর পিতা আবুল হাশিম মুসলিম লীগের অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। বদরুদ্দীন উমর প্রথম জীবনে তাঁর বাবা আবুল হাশিমের দ্বারা প্রভাবিত ও পরিচালিত হয়েছেন। প্রথমেই তিনি ‘ইসলামের মর্মবাণী’ নামে একটি পুস্তিকা রচনা করেছিলেন। মুসলিম লীগের রাজনীতিটা তিনি নিজের পারিবারিক অবস্থা থেকেই দেখেছেন। এর ফলে সাম্প্রদায়িকতা কী, তা বদরুদ্দীন উমরের চেয়ে ভালো করে অন্য কেউই বোঝেননি৷

আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, বদরুদ্দীন উমর ‘সাম্প্রদায়িকতা’ নামে যে বই ও প্রবন্ধ লিখেছিলেন, সেই ছোট তিন-চারটি লেখা পাকিস্তানের আদর্শগত ভিত্তি একেবারে খণ্ডন করে দেয়। ছয় দফা আন্দোলন শুরু হওয়ার অব্যবহিত আগে তিনি এই লেখাগুলো লিখেছিলেন। লেখাগুলো খুব প্রভাবশালী হয়েছিল। এই লেখার আগেই হয়তো তিনি নিজের পিতার মতো সম্পূর্ণ ত্যাগ করে গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্রের দিকে আকৃষ্ট হয়েছেন।

আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, ‘বদরুদ্দীন উমর পরিপূর্ণ সিরিয়াসনেসের সঙ্গে জীবন যাপন করেছেন। প্রথম দিকে তিনি যখন বামপন্থী রাজনীতিতে আসেন, তখন দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সমালোচনা করেন। বামপন্থী আন্দোলনকে সঠিক ধারায় নিতে মার্ক্সবাদী ধারার সামনের সারির অনকেই উমরের চিন্তায় আকৃষ্ট হয়েছেন। একপর্যায়ে মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী দলে যুক্ত হওয়ার পর কমরেড তোয়াহা, আবদুল হকসহ অনেকেই বলতে চেয়েছেন, উমর তো বুদ্ধিজীবী; কমিউনিস্ট রাজনীতি করতে হলে মন-মানসিকতার অনেক পরিবর্তন দরকার, মাঠে কাজ করা দরকার। এভাবে তাঁরা উমরকে পার্টির নেতৃত্বে গ্রহণ করতে চাননি। বরং তিনি যাতে নেতৃত্বে আসতে না পারেন, সেই চেষ্টা করেছেন। আমাদের কাছে মনে হয়েছে, একজন মেধাবী ও প্রতিভাবান মানুষকে যতটুকু মূল্য দেওয়া উচিত, গোটা বামপন্থী রাজনীতি থেকে উমর তা পাননি।’

আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেন, ‘বদরুদ্দীন উমরের সব লেখার সঙ্গে আমরা একমত না–ও হতে পারি। কিন্তু এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা তাঁর দ্বারা সমৃদ্ধ হয়েছেন। তাঁর কাছে বামপন্থী আন্দোলনের অনেক প্রত্যাশা ছিল। সেই প্রত্যাশা তিনি পূরণ করতে পারেননি৷ সেই দায় তাঁর একার নয়। আমরা বামপন্থীরাও তাঁকে সেই ভূমিকায় নিয়ে আসার দায়িত্ব পালন করতে পারিনি। তবে প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলেও বদরুদ্দীন উমর তাঁর জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে বামপন্থীদের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করেছেন।’

এ সময় তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘বদরুদ্দীন উমর সত্যিকারের শুদ্ধ বাম রাজনীতির পতাকা তুলে ধরেছেন। বংশপরিচয়, শিক্ষা, চিন্তাচেতনার দিক থেকে অভিজাত হলেও তাঁর মন পড়ে আছে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের মঙ্গল কামনায়।’

আলোচনা সভায় ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় কমিটির সভাপতি আকমল হোসেন বলেন, বদরুদ্দীন উমর একজন মার্ক্সবাদী রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবী। জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে তিনি তথাকথিত বিত্ত ও সামাজিক প্রতিপত্তি লাভ করতে পারতেন। সমাজের ভেতর থেকে লাভটা বের করে এনেও সামনে আবার প্রতিষ্ঠানবিরোধী অবয়ব নিয়ে থাকতে পারতেন, কিন্তু তিনি এ কাজ করেননি।
বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সভাপতি হাসিবুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, ‘বাংলাদেশে এখন নির্বাচন বলতে কিছু নেই। শুধু জাতীয় সংসদ নয়, কোথাও কোনো নির্বাচন হওয়ার বাস্তবতা বা সুযোগ নেই। এই রাষ্ট্র কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক হতে পারে না। এই ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামে বদরুদ্দীন উমর পাঠ জরুরি।’

জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল হাকিম বলেন, বদরুদ্দীন উমর কার্ল মার্ক্সের একজন শিষ্য হিসেবে মার্ক্স-লেনিনের চিন্তাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশ, এমনকি উপমহাদেশে এ ধরনের দৃষ্টান্ত বিরল।

শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-জনতা ঐক্যের আহ্বায়ক আমির আব্বাসের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে বাংলাদেশের সাম্যবাদী দলের (এম-এল) সাধারণ সম্পাদক আবদুল হাকিম, গণমুক্তি ইউনিয়নের আহ্বায়ক নাসিরউদ্দিন আহমেদ, কৃষক ও গ্রামীণ মজুর ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান, ছাত্র ফেডারেশনের একাংশের সভাপতি মিতু সরকার, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক অমল ত্রিপুরা, লেখক সৈয়দ আবুল কালাম, প্রাবন্ধিক নূর মোহাম্মদ প্রমুখ বক্তব্য দেন।

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন