নাশকতার কারণে শেষ পর্যন্ত বিএনপি চলমান আন্দোলন থেকে তেমন কিছু অর্জন করতে সমর্থ হবে না বলে মনে করছে সরকার। অবরোধ-হরতাল পালন করতে না পারার মাধ্যমে ইতিমধ্যে তা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। ফলে সংলাপ নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের উদ্যোগে আপাতত সাড়া দেবে না সরকার। 
সরকারের শীর্ষ পর্যায় মনে করছে, এ অবস্থায় প্রশাসনিকভাবে মোকাবিলার পাশাপাশি দলীয় কর্মসূচি, ব্যবসায়ী, শ্রমিক এবং সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে নাশকতাবিরোধী জনমত জোরদার করতে হবে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও সামাজিক সংগঠন নানা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নেমেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের একজন নীতিনির্ধারক প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপি সামনে থেকে এই কর্মসূচি দিলেও তা পালনের ক্ষেত্রে দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকেরাই সম্পৃক্ত হচ্ছেন না। জ্যেষ্ঠ অনেক নেতাও দলের কর্মসূচি সম্পর্কে আগে থেকে জানতে পারেন না। এতে নেতা-কর্মীরা বিচ্ছিন্ন থাকছেন। নাশকতার কারণে মানুষও তাঁদের ওপর ক্ষুব্ধ হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর দুজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, যেকোনো আন্দোলন তুঙ্গে ওঠার ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যেই সফল না হলে তা ব্যর্থ হয়। দীর্ঘ সময় আন্দোলন ধরে রাখা কঠিন কাজ। তাঁরা বলেন, নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ২৭ নভেম্বর ডা. মিলন নিহত হওয়ার পর আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। ৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়েন। ’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একদলীয় নির্বাচনের পর তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৫ দিনের মধ্যে তৎকালীন বিএনপি সরকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইন পাস করে সরে যেতে হয়। একইভাবে ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচন বাতিলের দাবিতে ৩ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা তাঁদের দলীয় মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন। ৭ জানুয়ারি শেখ হাসিনা আন্দোলনের মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং নতুন সরকার গঠিত হয়।
এই নেতারা বলেন, বিএনপির টানা অবরোধ ও হরতালের ৪০ দিন পেরিয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে ঢিলেঢালা আন্দোলন করে সফলতা পাওয়ার নজির দেশে নেই। তার ওপর সাধারণ মানুষকে বীভৎসভাবে পুড়িয়ে মারায় এ আন্দোলনের প্রতি জনগণের কোনো সহানুভূতি নেই।
এ পরিস্থিতিতে সরকারের নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন, বিভিন্ন মহল থেকে সংলাপের দাবি জোরালো হলে সরকারও কৌশলী হবে। তারা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সংলাপের জন্য কিছু শর্ত দিতে পারে। প্রথমেই থাকবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ত্যাগ করা। ইতিমধ্যে ব্রাসেলসভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) সরকারের প্রতি সংলাপে বসার আহ্বানের পাশাপাশি বিএনপিকে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসও তাদের সম্পাদকীয়তে বিএনপিকে সহিংসতা ও জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে।
আরও কিছু শর্তের কথা ভাবা হচ্ছে বলে সরকারের নীতিনির্ধারণী সূত্র দাবি করেছে। এর মধ্যে আছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতি সমর্থন ঘোষণা, নাশকতার দায় স্বীকার করা এবং এর জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া।
তবে উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের সংলাপের আহ্বানে সাড়া না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারের শীর্ষ পর্যায়। সরকার মনে করছে, এই উদ্যোগ মূলত বেকায়দায় পড়া বিএনপিকে টেনে তোলার প্রচেষ্টা। ফলে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নাগরিক সমাজের চিঠির জবাব দেওয়ার সম্ভাবনা কম বলে সূত্র জানায়।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, যাঁরা এ প্রস্তাব দিয়েছেন, তাঁরা বিএনপিকে উদ্ধার করার জন্য মাঠে নেমেছেন। কারণ, সন্ত্রাসী তৎপরতার জন্য বিএনপি ইতিমধ্যে দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধিক্কৃত হয়েছে। তিনি বলেন, সন্ত্রাসী ও জঙ্গি তৎপরতায় যারা সম্পৃক্ত, তাদের সঙ্গে কোনো সংলাপ হবে না।

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন