রাজধানী ঢাকাসহ দেশের কোথাও আগাম জানান দিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেনি বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট। তবে রাজধানীতে জোটের ব্যানারে ১৮টি জায়গায় চোরাগোপ্তা ধরনের ঝটিকা মিছিল বের হয়েছে। কয়েকটি স্থানে মিছিলে পুলিশের ধাওয়া এবং আওয়ামী লীগের হামলার খবর পাওয়া গেছে। ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল হয়েছে। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ে ২৬ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
এদিকে দুই দিনের বিরতি দিয়ে আবারও সারা দেশে ৭২ ঘণ্টার হরতাল দিয়েছে ২০ দল। আজ রোববার সকাল ছয়টা থেকে বুধবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত হরতাল চলবে। গতকাল শনিবার এক বিবৃতিতে জোটের পক্ষে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদ এ কর্মসূচির ঘোষণা দেন। গত ৬ জানুয়ারি থেকে লাগাতার অবরোধ কর্মসূচির পাশাপাশি এ পর্যন্ত সাত দফায় বিভিন্ন মেয়াদে হরতাল দিল বিএনপি জোট। ইতিমধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা শহরেও হরতালে শৈথিল্য দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় আন্দোলন নিয়ে জোটের মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়ছে।
সিলেট জেলা ছাত্রদলের সভাপতি সাঈদ আহমদ বলেন, ‘এত দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে কর্মসূচি চালানোর অভিজ্ঞতা অনেকের নেই। তাই ক্লান্তি এলেও মামলা-গ্রেপ্তারসহ যাবতীয় হয়রানি বিবেচনায় এ ক্লান্তি ঝেড়ে আমরা আন্দোলন অব্যাহত রাখতে চাই।’
বিএনপি ও জোটের নেতাদের অভিমত হচ্ছে, এখন পর্যন্ত আন্দোলনে প্রাথমিক সফলতা এসেছে। আগে বিএনপি একা সংলাপের কথা বললেও এখন দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহল, এমনকি জাতিসংঘও আলোচনার কথা বলছে। পাশাপাশি আন্দোলনে নেমে সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক রূপ সবার কাছে স্পষ্ট করা গেছে। তবে নাশকতা ও পেট্রলবোমা হামলার যে ভয়াবহ ঘটনা এখন ঘটছে, তাতে বিএনপির ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করেন জোটের নেতারা। এ কারণে বিদেশিদের সমর্থন পেতেও বিএনপিকে বেগ পেতে হচ্ছে বলে জানান একজন নেতা।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান বলেন, ২০ দলের কর্মসূচি দেশ ও বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিএনপির দাবি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটিও একটি অর্জন।
তবে এবারের আন্দোলনেও ২০১৩ সালের মতো জনগণকে সম্পৃক্ত করা যায়নি। এমনকি আতঙ্কের কারণে নেতা-কর্মীদেরও মাঠে নামানো যাচ্ছে না। পুলিশের মামলা-অভিযানের কারণে নেতা-কর্মীদের বড় অংশ আত্মগোপনে চলে গেছে। কিন্তু আন্দোলন দীর্ঘ হওয়ায় এই আত্মগোপন হতাশা বাড়িয়ে তুলছে।
এ অবস্থায় টানা অবরোধের মধ্যে গতকাল সারা দেশে জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও মহানগরের সব ওয়ার্ডে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি দেয় ২০ দল। কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকা মহানগরের ওয়ার্ড পর্যায়ে মিছিলের কর্মসূচি ছিল। জোটের নেতা-কর্মীদের গুম-খুনের প্রতিবাদে এবং নতুন করে সংসদ নির্বাচনের জন্য সংলাপ ও সমঝোতাসহ আর কিছু দাবিতে এ কর্মসূচি দেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, গতকাল দুপুরের দিকে নয়াবাজার থেকে বিএনপি-জামায়াতের একটি মিছিল বাবুবাজার সেতুর কাছে গেলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ধাওয়ার মুখে পড়ে। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ইটপাটকেল নিক্ষেপ হয়। এতে বিএনপি-জামায়াতের চারজন আহত হন। একজনকে আওয়ামী লীগের কর্মীরা মারধর করে পুলিশে দেন।
এ ছাড়া পুরান ঢাকার লালবাগে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়েছে। সকালের দিকে গেন্ডারিয়ায় সতীশ সরকার সড়কে, মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডে, যাত্রাবাড়ীর কোনাপাড়ায়, ডেমরার মাজার রোডে, ফার্মগেট বিজ্ঞান কলেজের পাশে, মিরপুরের কালশী, মতিঝিল ও দক্ষিণখান, মগবাজার চৌরাস্তায় ও বিজয়নগরে বিএনপি-জামায়াত-শিবির মিছিল বের করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, গ্রিন রোড, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ও বুয়েট থেকে ছাত্রদল ছোট মিছিল বের করে। তবে পুলিশের ধাওয়ায় মিছিলকারীরা পালিয়ে যায়।
ঠাকুরগাঁওয়ে ধাওয়া: বিক্ষোভ মিছিলকে কেন্দ্র করে ঠাকুরগাঁওয়ে পুলিশের সঙ্গে নেতা-কর্মীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় পুলিশ রাবার বুলেট ছুড়ে ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। আটক করে অন্তত ২৬ নেতা-কর্মীকে।
বিক্ষোভে অংশ নিতে বিএনপির নেতা-কর্মীরা ঠাকুরগাঁও শহরের দলীয় কার্যালয়ে জড়ো হন। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে পুলিশ সুপার রাস্তায় মিছিল না করে কার্যালয়ের সামনে করতে বলেন। পরে শহীদ মোহাম্মদ আলী সড়কে লোকজনের জটলা দেখে একদল পুলিশ এগিয়ে যায়। সেখানে অবস্থান নেওয়া বিএনপির কর্মীরা পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। জবাবে পুলিশ রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। এ সময় তিনটি যানবাহন ভাঙচুর করেন কর্মীরা। পরে দলীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়।
মাগুরায় সংঘর্ষ: বিকেলে মাগুরার সিমাখালী বাজারে বিএনপি ও যুবদলের নেতা-কর্মীরা মিছিল বের করার চেষ্টা করলে শালিখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিপ্লব কুমার নাথ বাধা দেন। ক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা এ সময় ওসির গাড়ি লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় একজন কনস্টেবল আহত হন। পুলিশ শটগান ও রাইফেলের গুলি ছোড়ে। ঘটনাস্থল থেকে ময়নুদ্দিন নামের বিএনপির এক নেতাকে আটক করে পুলিশ।
চট্টগ্রামে ঝটিকা মিছিল: হালিশহর ও বন্দর থানা বিএনপির কর্মী-সমর্থকেরা গতকাল দুটি ঝটিকা মিছিল করেন। এ ছাড়া নগরে বিএনপির আর কোনো নেতা-কর্মীকে মাঠে দেখা যায়নি। গতকাল ভোর থেকে বিএনপির দলীয় কার্যালয় নাসিমন ভবন পুলিশ ঘেরাও করে রাখে।
বেলা ১১টায় বন্দর থানার মুন্সিপাড়া থেকে আনন্দবাজার পর্যন্ত একটি ঝটিকা মিছিল করেন নেতা-কর্মীরা। মিছিলে নেতৃত্ব দেন বন্দর থানার সভাপতি এম এ আজিজ ও শ্রমিক দলের নেতা শেখ নুরুল্লাহ বাহার। বিকেল চারটার দিকে হালিশহর মহিলা পলিটেকনিক কলেজ ক্যাম্পাসের কাছ থেকে ঝটিকা মিছিল বের করে বিএনপি। পাঁচ মিনিটের এই ঝটিকা মিছিলে ৪০-৪২ জন কর্মী-সমর্থক অংশ নিয়েছিলেন।
বরিশাল ও সিলেটে পুলিশের বাধা: বরিশালে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ বাধা দেয়। সকাল সোয়া ১০টায় নগরের নাজির মহল্লা থেকে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল বের হলে জেলখানার মোড়ে পুলিশ আটকে দেয়। পরে সেখানেই সমাবেশ করেন নেতা-কর্মীরা।
সিলেট নগরের কেন্দ্রস্থলের কোর্ট পয়েন্টসহ উপজেলাগুলোতে ২০ দলের বিক্ষোভ হয়নি। নেতা-কর্মীদের বাইরে বের হতেও দেখা যায়নি। বেলা একটার দিকে নগরের কোর্ট পয়েন্ট থেকে জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক দিলদার হোসেন কয়েকজন কর্মীকে নিয়ে মিছিল বের করার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়।
এ ছাড়া ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ, রংপুর, কক্সবাজার থেকেও ঝটিকা মিছিলের খবর এসেছে। বগুড়ার সান্তাহারে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল থেকে একটি যাত্রীবাহী বাস ভাঙচুর করা হয়েছে।
{প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা}

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন