বখতিয়ার আহমেদ ও হিমাংশু সাহা। প্রথমজন শিক্ষার্থী আর শেষেরজন ব্যবসায়ী। শিক্ষা আর ব্যবসার প্রয়োজনে দুজনকে মাঝেমধ্যেই জেলা শহরে যাতায়াত করতে হয়। আর তাতেই পড়তে হয় চরম ভোগান্তিতে। বিএনপির ডাকা টানা অবরোধ-হরতালে যানবাহনের সমস্যাই তাঁদের এ ভোগান্তির কারণ।
টানা হরতাল-অবরোধে অভ্যন্তরীণ পথে বাস যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে। প্রধান ভরসা এখন সিএনজিচালিত অটোরিকশা। তাতে ভাড়া বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। এ তো গেল ভোগান্তি, সঙ্গে বিপদকে হাতের মুঠোয় নিয়ে রাস্তায় বের হওয়ার আতঙ্ক তো আছেই।
জেলা শহর লক্ষ্মীপুর থেকে ১৫ কিলোমিটারের দূরত্বে রায়পুর উপজেলায় যাওয়ার পথে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বখতিয়ার আহমেদ ও হিমাংশু সাহা ছিলেন যাত্রাসঙ্গী। যাত্রাপথে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ হয় তাঁদের সঙ্গে। তাঁরা জানালেন, ৫ জানুয়ারির আগে এ পথটিতে বাস আর সিএনজিচালিত অটোরিকশা পাল্লা দিয়ে চলত কিছু সময় পর পর। জনপ্রতি বাসভাড়া ছিল ২০ টাকা ও অটোরিকশার ভাড়া ৩০ টাকা। বাস আর এখন চলে না। অটোরিকশার ভাড়া দ্বিগুণ বেড়ে হয়েছে ৬০ টাকা, কখনো কখনো তারও বেশি। মাঝেমধ্যে অটোরিকশা চলাচলও বাধাগ্রস্ত হয়, তখন যাতায়াতের একমাত্র সম্বল অতিরিক্ত ভাড়ায় রিকশা।
সড়কপথে লক্ষ্মীপুর জেলা থেকে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামে যাতায়াতের ক্ষেত্রে রায়পুরকে বলা হয় মূল জংশন। এ দুই গন্তব্যে যাতায়াতকারী একাধিক পরিবহন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে এ উপজেলা থেকে সব ধরনের বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে দিনে দেড় শতাধিক বাস এসব গন্তব্যের উদ্দেশে রায়পুর ছেড়ে যেত। সেখানে এখন স্থবিরতা। বেশির ভাগ বাস কাউন্টার বন্ধ।
বাসমালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে দিনে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বাস ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে যাতায়াত করছে। তবে রায়পুরের পরিবর্তে সেগুলো যাতায়াত করছে জেলা শহর থেকে।
গত ৫ জানুয়ারির আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে দিনে ৪৫টি বাস রায়পুর থেকে ছেড়ে যেত জোনাকী সার্ভিস নামের একটি পরিবহন প্রতিষ্ঠানের। কোম্পানির ব্যবস্থাপক শাহজাহান মিয়া গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে অনিয়মিতভাবে দিনে চার-পাঁচটি বাস জেলা শহর থেকে ছাড়া হচ্ছে, তাও যাত্রী থাকা সাপেক্ষে। বাস না চলায় কর্মহীন এসব বাসের চালক ও অন্যরা। প্রতিটি বাসে দুই শিফটে চালক, সহকারীসহ ছয়জন করে কাজ করতেন।
লক্ষ্মীপুরের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানের যোগাযোগের দুটি ব্যবস্থা রয়েছে। একটি সড়কপথ অন্যটি পাশের জেলা চাঁদপুর হয়ে নৌপথে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এ জেলার মানুষের কাছে নৌপথটির ব্যবহার বাড়লেও প্রধান ভরসা কিন্তু সড়কপথ। আর তাতেই এত দুর্ভোগ।
যে রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে এ জেলার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, সেখানে এ জেলায় প্রধান দুই বিরোধী জোটের রাজনীতির ত্রাহি অবস্থা। সরকারি দলের নেতারা বিভক্ত একাধিক উপদলে। আর বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতারা অভিভাবকহীন। আর এ এলাকার মানুষের কাছে আতঙ্ক বা সহিংসতার নাম জামায়াত-শিবির।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনের হিসাব বাদ দিলে চার সংসদীয় আসন নিয়ে গঠিত লক্ষ্মীপুর বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। আর তাতে দলটির বড় শক্তির উৎস জামায়াত-শিবির। তাই চলমান হরতাল অবরোধে বিএনপির নেতা-কর্মীরা মাঠে না থাকলেও প্রকাশ্যে এবং ঝটিকা রাজনৈতিক কর্মসূচি ও এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়াতে সক্রিয় রয়েছে জামায়াত-শিবির। স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন সূত্রের দাবি অনুযায়ী, গত প্রায় দেড় মাসে চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক মহাসড়কে দুই শতাধিক গাড়ি ভাঙচুর এবং বেশ কিছুতে অগ্নিসংযোগ করেছে জামায়াত-শিবির।
রায়পুর থানার পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, গত ৫ জানুয়ারির পর রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় সাতটি মামলা হয়েছে। তাতে এজাহারভুক্ত ১১০ জনের পাশাপাশি ৩০৪ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। তাঁদের মধ্যে গ্রেপ্তার হন ৩০ জন।
স্থানীয় ব্যক্তিদের মতে, সহিংসতায় জামায়াত-শিবির এগিয়ে থাকলেও মামলার আসামির তালিকায় যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের বেশির ভাগই বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী।
রায়পুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মনিরুল ইসলাম হাওলাদার জানান, বিএনপি ও এর অঙ্গসহযোগী সংগঠন মিলিয়ে ৮০ জন পদধারী নেতার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। উপজেলা বিএনপি ১০১ সদস্যের কমিটির মধ্যে ১০ জন, যুবদলের ৭১ সদস্যের মধ্যে ২৫ জন, ছাত্রদলের ৭১ সদস্যের মধ্যে ৩০ জন ও স্বেচ্ছাসেবক দলের ৭১ সদস্যের মধ্যে ১৫ জন মামলার আসামি। এর বাইরে অনেক নেতা-কর্মীকে আটক করে এসব মামলায় আসামি দেখানো হচ্ছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে এখনো কোনো মামলা হয়নি বলে তিনি জানান। ভয়ে মাঠপর্যায়ের নেতারা পালিয়ে বেড়ালেও তিনি এলাকায় প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করেন। গত দেড় মাসে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে পারেননি বলে জানান তিনি।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল খোকনের কাছে এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাঁর দলের অবস্থানের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা দলীয় কর্মসূচি পালন করছি। এ ছাড়া কোথাও কোনো সহিংসতার খবর পেলে তা সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনকে অবহিত করছি।’ সরকারি দল হিসেবে সরাসরি সাধারণ মানুষের পাশে থাকছেন না কেন—জানতে চাইলে তিনি দলীয় দুরবস্থা ও অভিভাবকহীনতার কথা জানান।

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন