বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কোনো ঘটনা ঘটেনি, তারপরও কল্পিত ঘটনায় মামলা—২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হওয়া মামলাগুলো ‘গায়েবি’ মামলা হিসেবে পরিচিতি পায়। এর মধ্যে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শুধু রাজধানীতেই নাশকতার মামলা হয়েছিল ৫৭৮টি। প্রায় সব মামলার বাদী ছিল পুলিশ। এসব মামলার তথ্য অনুযায়ী, ওই সেপ্টেম্বরে ঢাকায় পুলিশের ওপর হামলা হয় ৯০ বার। উদ্ধার হয় ১ হাজার ১৮৬টি ককটেল ও ৩৭০টি পেট্রলবোমা। তবে শহরময় পুলিশের ওপর এত হামলা, সহিংসতা হলেও তখন কিছুই টের পায়নি ঢাকা শহরের মানুষ।

সাড়ে তিন বছর আগে ঢাকায় যে ধরনের নাশকতার মামলা হয়েছিল, যশোরের ঝিকরগাছার মামলাটিও একই ধরনের বলে দাবি করেছেন বিএনপির নেতারা। ঝিকরগাছা পৌরসভার নির্বাচন ১৬ জানুয়ারি। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান মেয়র মোস্তফা আনোয়ার পাশা। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন ঝিকরগাছা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ইমরান হাসান। এ ছাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলমসহ ছয় প্রার্থীও আছেন ভোটের মাঠে।

এ মামলার বিষয়ে ঝিকরগাছা পৌর নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কর্মকর্তা হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগে মামলা হলে সেটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিষয়। এটা নির্বাচনের কোনো বিষয় নয়।’

আসামি ১১ কাউন্সিলর প্রার্থী

ঝিকরগাছা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সিরাজুল ইসলামের করা মামলায় ৩৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে আরও ৬০ থেকে ৭০ জনকে। আসামিদের মধ্যে ১১ জন কাউন্সিলর প্রার্থী। তাঁরা বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মী। তাঁরা হলেন পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী মশিয়ার রহমান, নুরুজ্জামান, শহিদুল ইসলাম, মিজানুর রহমান ও পিয়াল হাসান; ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আরমান হোসেন; ৭ নম্বর ওয়ার্ডের গোলাম কাদের; ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নিজাম উদ্দীন ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মতিয়ার রহমান, আবদুর রশিদ ও নূরুজ্জামান বাবলা। এ ছাড়া ১ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী মনিরুজ্জামানের দুই ভাই তৌহিদুজ্জামান ও এম ডব্লিউ রায়হানকে মামলার আসামি করা হয়েছে।

■ ১১ আসামি কাউন্সিলর প্রার্থী। তাঁরা বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ■ মামলার দুজন সাক্ষী বলছেন, ঘটনার বিষয়ে তাঁরা কিছু জানেন না।

মামলার এজাহারে বলা হয়, ‘৩১ ডিসেম্বর রাত পৌনে নয়টার দিকে পুলিশের একটি দল জরুরি মোবাইল ডিউটিতে থাকার সময়ে খবর আসে পায়রাডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে থার্টি ফার্স্ট নাইট উপলক্ষে বিএনপি-সমর্থিত কিছু উচ্ছৃঙ্খল নেতা-কর্মী ও দুষ্কৃতকারী ধ্বংসাত্মক ও সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য একত্র হয়েছে। পুলিশ সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনজনকে আটক করে হেফাজতে নেয়। অন্যরা পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে একটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। সাক্ষী ফারুক হোসেন ও আবদুল হাইয়ের সামনে আটককৃতদের কাছ থেকে হাঁসুয়া, বিস্ফোরিত ককটেলের দুটি টুকরো, ১৫টি জালের কাঠি উদ্ধার করা হয়।’

এ মামলার বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) যশোরের সভাপতি সালেহা বেগম বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে রাষ্ট্রের যেকোনো নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া ও প্রচারণায় অংশ নেওয়া নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। নির্বাচনের আগে গায়েবি মামলা সাজিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা দেশের প্রচলিত আইনবিরুদ্ধ, যা গণতন্ত্রবিরোধী। সরকারের এ ধরনের কর্তৃত্বপরায়ণতা স্বাধীনতার চেতনাবিরোধীও বটে।

এ ঘটনায় ৩১ ডিসেম্বর রাতে যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, তাঁরা হলেন ঝিকরগাছা পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাসানুল কবির, গদখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শেখ মঈনুল ইসলাম ও ছাত্রদলের পৌর কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক নাঈম হোসেন।

এ মামলার বিষয়ে জানতে যশোরের পুলিশ সুপার প্রলয় কুমার জোয়ারদারের মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ধরেননি। পরে মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।

যশোর জেলা পুলিশের মুখপাত্র ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রূপক কুমার সরকার বলেন, বিএনপির অভিযোগ সত্য নয়। তথ্যপ্রমাণ সাপেক্ষেই মামলা করা হয়েছে। বিদেশে থাকা ব্যক্তিকে কীভাবে আসামি করা হয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো না কোনোভাবে ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত। পরোক্ষভাবে নাশকতার ঘটনায় প্ররোচণা দিতে পারেন।

ঘটনার কথা সাক্ষী জানেন না

এ মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে ঝিকরগাছা উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক ফারুক হোসেন ও স্থানীয় একটি তুলা প্রক্রিয়া কারখানার শ্রমিক আবদুল হাইকে। তাঁরা বলছেন, ওই ঘটনার বিষয়ে কিছুই জানেন না তাঁরা।

ফারুক হোসেন ও আবদুল হাই বলেন, ৩১ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশের এসআই সিরাজুল ইসলাম ফোনে ডেকে নিয়ে সাক্ষী হওয়ার জন্য তাঁদের একটি কাগজে সই নেন। এর বেশি কিছু তাঁরা জানেন না। ঘটনাস্থলেও তাঁরা ছিলেন না।

পায়রাডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশেই মুরগি বেচাকেনার ব্যবসা করেন ফজলুর রহমান। ৩১ ডিসেম্বর রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে তিনি তাঁর দোকানেই ছিলেন। তিনি বলেন, ‘রাত ১২টার মধ্যে কোনো পুলিশকে স্কুলের মাঠে বা আশপাশে আসতে দেখিনি। এমনকি বোমা বিস্ফোরণের মতো কোনো শব্দও শোনা যায়নি।’

বিদ্যালয়ের পাশেই নাজমুল আরাফাতের মুরগির খামার আছে। ককটেল বিস্ফোরণের কথা শোনেননি জানিয়ে বলেন, ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত তিনি খামারেই ছিলেন। স্কুলের মাঠে স্থানীয় যুবকেরা পিকনিকের আয়োজন করেন। পিকনিক শেষে যে যাঁর মতো বাড়ি চলে যান। এ সময়ের মধ্যে পুলিশকে ওই মাঠে যেতে দেখা যায়নি।

বিদ্যালয়ের পাশের বাসিন্দা আবু সাঈদ বলেন, তিনি সেদিন রাতে স্কুলের আশপাশে পুলিশের কারোর আসার খবর জানেন না। তিনিও বোমা বিস্ফোরণের মতো কোনো শব্দ শুনতে পাননি।

এ বিষয়ে মামলার বাদী পুলিশের এসআই সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সাক্ষীদের বিষয়ে সাংবাদিক হয়ে আপনি খোঁজ নেন কেন? তাঁরা ঘটনার বিষয়ে কিছু জানেন কি না, সেটা বিজ্ঞ আদালত দেখবেন। তা ছাড়া ঘটনাস্থল থেকে যাঁদের আটক করা হয়েছে, তাঁদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী অন্যদের আসামি করা হয়েছে।’

পুলিশ নাশকতার ‘নাটক সাজিয়েছে’

ঝিকরগাছা পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ঝিকরগাছা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ইমরান হাসান গতকাল সোমবার ‘প্রেসক্লাব যশোর’ মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পুলিশ নাশকতার নাটক সাজিয়ে গত ৩১ ডিসেম্বর মামলা দিয়ে তাঁর ৩৪ নেতা-কর্মীকে আসামি করেছে। কোনো কারণ ছাড়াই পুলিশ ওই রাতে তিন কর্মীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে।

মামলার আসামি পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী ও পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আরমান হোসেন বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী একরামুল হককে জেতানোর জন্য পুলিশ নাশকতার নাটক সাজিয়ে গায়েবি মামলায় আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে।’

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী একরামুল হক বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে পুলিশ কোনো মামলা করলে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।’

‘ভারতে থেকেও’ আসামি

স্থানীয় বিএনপির নেতারা বলছেন, মামলার এজাহারভুক্ত ৮ নম্বর আসামি পৌর যুবদলের সদস্যসচিব মঈনুল ইসলাম (জনি) গত ২৯ ডিসেম্বর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন। আরেক আসামি মো. আজিম চাকরির কারণে দীর্ঘদিন ধরে নাটোরে।

যশোরের ঝিকরগাছার এই মামলার বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, গায়েবি মামলা তো চলছেই। এটা বন্ধ হয়নি। হয়রানি–নির্যাতন করতে বিএনপির হাজার হাজার নেতা–কর্মীর বিরুদ্ধে এ ধরনের মামলা করে যাচ্ছে পুলিশ।

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন