বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এর আগে চার ধাপে ২ হাজার ৮৪২টি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনে ভোটের আগে-পরে ব্যাপক সহিংসতা হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে সহিংসতায় সারা দেশে এ পর্যন্ত প্রাণহানি হয়েছে ৮৬ জনের। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে দ্বিতীয় ধাপে। ওই ধাপের নির্বাচন ঘিরে ৩০ জন নিহত হন। তবে শুধু ভোটের দিন দ্বিতীয় ধাপে সংঘাতে জড়িয়ে ছয়জন, তৃতীয় ধাপে সাতজন, চতুর্থ ধাপে তিনজন নিহত হন। বেশির ভাগ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ও দলের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের প্রত্যক্ষদর্শী, স্বজন, নির্বাচনী কর্মকর্তা, পুলিশের বরাত দিয়ে পাঠানো খবর:

বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বালিয়াদীঘি ইউপি নির্বাচনে ভোট গণনাকে কেন্দ্র করে নৌকার প্রার্থী ইউনুছ আলী ফকিরের সমর্থকেরা পুলিশ, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও বিজিবির ওপর হামলা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া হয়েছে। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে কালাইহাটা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কয়েক দফা গুলি ছুড়েছেন। এতে কয়েকজন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মারা গেছেন কালাইহাটা গ্রামের কুলসুম বেগম (৩৫), আবদুর রশিদ (৬০), খোরশেদ আলী (৭০) ও আলমগীর (৪০)। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আলী হায়দার চৌধুরী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

গাবতলীর ইউএনও রওনক জাহান প্রথম আলোকে বলেন, ওই কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ শেষ হলেও নৌকার প্রার্থীর সমর্থকেরা ভোট গণনায় বাধা দেন। অন্য কেন্দ্রের ভোট গণনা শেষে তাঁরা ভোটের ফলাফল ঘোষণা করতে বলেন। এতে আপত্তি জানালে নৌকার প্রার্থী ইউনুছ আলী ফকিরের সমর্থকেরা ভোটকেন্দ্রে হামলা চালান। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ বাধে। নৌকার কর্মী-সমর্থকেরা ইউএনওর গাড়ি ছাড়াও পুলিশ ও বিজিবির মোট চারটি গাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করেন। হামলায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বে থাকা শাজাহানপুরের ইউএনও আসিফ আহমেদ ছাড়াও বিজিবি-পুলিশের চার সদস্য আহত হয়েছেন। ইউএনও আরও বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গুলি ছুড়তে বাধ্য হয়েছে।

এ ছাড়া একই উপজেলার রামেশ্বরপুর ইউনিয়নে সদস্য প্রার্থী ফেরদৌস রহমানের সমর্থকদের হামলায় জাকির হোসেন (৩০) নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। দুপুরে জাইগুলি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। জাকির একই গ্রামের বাসিন্দা। হামলার আগে তিনি জাইগুলি উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে ভোটের চিত্র লাইভ করেছিলেন। ওই প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ সাইদুল ইসলামের সমর্থক অভিযোগে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়।

default-image

চাঁদপুরের কচুয়া ও হাইমচরে ছুরিকাঘাতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন কচুয়ার সাচার ইউনিয়নে ও অপরজন হাইমচরের নীলকমল ইউনিয়নে। একটি ঘটনায় বেলা সাড়ে তিনটায় সাচার নয়াকান্দি এলাকায় সদস্য প্রার্থী জাকির হোসেনের সমর্থক শরীফ হোসেনকে (১৮) দুর্বৃত্তরা ছুরিকাঘাত করলে আহত হন তিনি। উদ্ধার করে ঢাকায় হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। দ্বিতীয় ঘটনায় নীলকমল ইউনিয়নের বাহেরচরে বেলা তিনটায় নৌকার চেয়ারম্যান প্রার্থী সালাউদ্দিন সরদারের সমর্থক এক যুবককে (২৮) ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। তাঁর পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গাইবান্ধার সাঘাটার জুম্মাবাড়ি ইউনিয়নের জুম্মাবাড়ি আদর্শ কলেজ কেন্দ্রের পাশে বিকেলে আবু তাহের (৪০) নামের একজনকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। তিনি এ ইউনিয়নের মামুদপুর গ্রামের ওমর আলীর ছেলে ও সদস্য প্রার্থী আইজল মিয়ার সমর্থক। হত্যাকাণ্ডের আগে আবু তাহেরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী রাসেল আহমেদের (পাখা) কর্মী-সমর্থকদের কথা-কাটাকাটি হয়।

মানিকগঞ্জের দৌলতপুরের বাচামারা ইউনিয়নে সদস্য প্রার্থী সারোয়ার হোসেন ও ওয়াজেদ সরকারের সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার মধ্যে পড়ে অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন একজন নারী ভোটার। দুপুরে বাচামারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে এ পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। মৃত সুমেলা খাতুন (৫০) চর ডালুটিয়া গ্রামের মো. মাহাতাব আলীর স্ত্রী।

চট্টগ্রামের আনোয়ারার চাতরী ইউনিয়নের একটি ভোটকেন্দ্রের পাশে দুপুরে সদস্য প্রার্থী রঘুনাথ সরকার ও নাজিম উদ্দীনের কর্মী-সমর্থকদের সংঘর্ষে অংকুর দত্ত (৩০) নামের এক যুবক নিহত হন। সিংহরা গ্রামের নেপাল দত্তের ছেলে তিনি।

ঝিনাইদহের শৈলকুপার সারুটিয়া ইউনিয়নে গত ৩১ ডিসেম্বর নির্বাচন নিয়ে সংঘর্ষের এক ঘটনায় আহত অখিল সরকার (৫৫) নামের এক ব্যক্তি দুপুরে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তিনি সারুটিয়া ইউনিয়নের কিত্তিনগর গ্রামের নিরাপদ সরকারের ছেলে। অখিল এ ইউনিয়নে নৌকার চেয়ারম্যান প্রার্থী মাহমুদুল হাসানের ও দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী জুলফিকার কায়সারের সমর্থকদের মধ্যকার সংঘর্ষে আহত হয়েছিলেন।

প্রার্থী ও সমর্থকদের দায়ী করল ইসি

নির্বাচনে প্রাণহানির ঘটনার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকদের দায়ী করলেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব হুমায়ুন কবীর খোন্দকার। ভোট গ্রহণ শেষে রাজধানীতে নির্বাচন ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকেরা এর দায় নেবেন। আমরা বলছি না, দায় নির্বাচন কমিশনের না। (তবে) দায় যাবে প্রার্থী ও তাঁর সমর্থকের ওপরে।’

কেন্দ্রে ঢুকে নৌকায় গণহারে সিল, জাল ভোট, কারাদণ্ড

দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোটকেন্দ্রে নৌকা প্রতীকে গণহারে সিল মারা ও জোর করে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পক্ষে ভোট আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কেন্দ্রগুলোর একটি রাজশাহীর পুঠিয়ার বানেশ্বর ইউনিয়নের দীঘলকান্দি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র। এ কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। বাতিল করা হয়েছে কেন্দ্রটির সব ভোট। এ ছাড়া হাতিনাদা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নৌকা প্রতীকে ভোট দিতে জোর করায় এক এজেন্টকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পাঁচ দিনের কারাদণ্ড, ১০০ টাকা জরিমানা করেছেন।

একই অভিযোগে মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের গালা ইউনিয়নে ছাত্রলীগের ১০ নেতা-কর্মীকে সাত দিন করে কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার মজলিশপুর ইউপি নির্বাচনে আনন্দপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে জাল ভোট দেওয়ায় এক তরুণকে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও দুই হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। যশোরের কেশবপুরের নতুন মূলগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নৌকার পক্ষে জোর করে এক হাজার ব্যালটে সিল মারা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে সেখানে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়।

default-image

ভোটকেন্দ্রে আগুন, সাংবাদিকদের অবরুদ্ধ করে ককটেল হামলা ও গুলি

শরীয়তপুরের নড়িয়ার ভোজেশ্বর ইউপি নির্বাচনে দুপুরে দুলুখণ্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন দুর্বৃত্তরা। এ সময় সাংবাদিকদের অবরুদ্ধ করে ককটেলের বিস্ফোরণ ও গুলি ছুড়ে কেন্দ্র দখল করা হয়। সেই সঙ্গে যমুনা টেলিভিশনের প্রতিবেদক কাজী মনিরুজ্জামান, কালের কণ্ঠ পত্রিকার প্রতিনিধি শরীফুল ইসলাম, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা জাকারিয়া মাসুদের মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ সময় নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকারী ১০ জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। চেয়ারম্যান প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন ব্যাপারীর সমর্থকেরা এ হামলা চালান বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আবদুল ওয়াদুদ বলেন, ‘দুপুরের দিকে পুলিশ ও আনসার সদস্যরা খাবার খাচ্ছিলেন। দুইটার দিকে কেন্দ্রে ককটেল হামলা ও গুলি করে কেন্দ্র দখল করে সন্ত্রাসীরা। তারা ভোটের বাক্স ও ব্যবহৃত-অব্যবহৃত ব্যালট ছিনতাই করে নেওয়ার পর কেন্দ্রে আগুন লাগিয়ে দেয়। পরে বিজিবি সদস্যরা আমাদের উদ্ধার করে উপজেলা সদরে পৌঁছে দেন।’

পুলিশের ওপর হামলা, দুই পরিদর্শকসহ আহত ৩

জামালপুরের বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় সকাল থেকে ভালোই ভোট হচ্ছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে নৌকা প্রার্থীদের কর্মীরা বিভিন্ন কেন্দ্র দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থকদের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ ঘটেছে। একটি কেন্দ্রে নৌকায় জোর করে সিল মারার খবরে বিদ্রোহী প্রার্থীর বিক্ষুব্ধ সমর্থকেরা হামলা চালিয়ে পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। এ ঘটনায় দুই পুলিশ পরিদর্শকসহ তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন।

সিলেটে ২ রিটার্নিং কর্মকর্তা আটক, ২ ইউপিতে নির্বাচন স্থগিত

সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় দুই রিটার্নিং কর্মকর্তা সালমান সাকিব ও আরিফুল হককে সিল মারা ব্যালট পেপারসহ আটক করেছে পুলিশ ও জেলা প্রশাসন। বেলা তিনটার দিকে উপজেলার কাজলসার ইউনিয়নের মরিচা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে থেকে তাঁদের আটক করা হয়। এ ঘটনায় এ ইউপির নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সিল মারা ব্যালট ও সিলবিহীন ব্যালটসহ দুই রিটার্নিং কর্মকর্তাকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে সিলেটের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ফয়সল কাদের জানান, সুলতানপুর ইউপিতেও নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। এখানকার একটি কেন্দ্রে বেলা তিনটার দিকে ব্যালট বাক্স ছিনতাই করে পুকুরে ফেলে দিয়েছিল কিছু উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি।

আরও সহিংসতা

দিনভর গোলাগুলি, যানবাহন ভাঙচুর, এজেন্ট বের করে দেওয়া ও মারামারিতে শেষ হয়েছে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর সাতটি ইউপির নির্বাচন। ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার আগে থেকেই আহ্লা করলডাঙা ইউনিয়নের দক্ষিণ করলডাঙা প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে মারামারি হয়। এ সময় চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. মোহরম আলীসহ দুজন আহত হন। দিনভর এ রকম সহিংসতার ঘটনায় ২০ জনের মতো আহত হয়েছেন।

এ ছাড়া কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের সাতবাড়িয়া ইউপি নির্বাচনে বিকেলে আওয়ামী লীগ ও বিদ্রোহী স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থীর অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় তিনজন গুলিবিদ্ধ হন। গুলি লাগে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শারমিন রীমার মাইক্রোবাসেও। এতে মাইক্রোবাসের পেছনের কাচ ভেঙে যায়। র‌্যাব, অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন