default-image

জীবন বিপন্ন, হাসপাতালে না গেলেই নয়। হাসপাতালে পৌঁছালেও রোগমুক্তির পর বাড়ি ফেরা অনিশ্চিত। বাড়তি খরচ অ্যাম্বুলেন্সে। পথে পথে শঙ্কা। গতকাল রোববার রাজধানীর তিনটি বিশেষায়িত হাসপাতাল ঘুরে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এমনই চিত্র পাওয়া গেছে।
অবরোধ-হরতালে এমন চিত্র কেবল রাজধানীতে নয়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও রোগীর সংখ্যা কমেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে দেশের ৪২০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগী ভর্তি হয়েছিলেন ২ লাখ ৪ হাজার ৩৩৮ জন। এ বছরের জানুয়ারিতে এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৪ হাজার ৩২২ জন। রোগীর সংখ্যা কমেছে ৮০ হাজারের বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, রোগী কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হরতাল-অবরোধ। তাঁরা বলছেন, সাধারণ অসুখ-বিসুখ নিয়ে লোকজন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। হরতাল-অবরোধে নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা থেকে অনেকেই বাড়ি থেকে বের হচ্ছেন না। শরীরে রোগ পুষে রাখছেন।
অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৪ সালের জানুয়ারির তুলনায় গত মাসে জেলা হাসপাতাল ও সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও রোগী কিছুটা কমেছে।
জানা গেছে, হরতাল-অবরোধ থাকায় শনিবারে হাসপাতালে রোগী উপচে পড়ছেন। রোগীরা ঢাকায় আসার জন্য বেছে নিচ্ছেন বৃহস্পতিবার রাত ও শুক্রবার। আবার চিকিৎসকেরাও রোগীদের ছাড়ছেন বৃহস্পতিবার; শুক্রবার হরতাল না থাকায় রোগীদের যাতায়াতে সুবিধা হবে এই ভেবে।
গতকাল জাতীয় হৃদ্রোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে সোহেল মিয়া নামের এ ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয়। নীলফামারীর জলঢাকা থেকে তিনি আট বছরের মেয়ে সুমাইয়াকে নিয়ে এসেছেন। শিশুটি হৃদ্রোগের মারাত্মক সমস্যায় ভুগছে। গতকাল শিশু ওয়ার্ডে সুমাইয়া প্রায় অচেতন অবস্থায় পড়েছিল। সোহেল মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি কৃষিকাজ করি। আমার দুটি বাচ্চাই অসুস্থ। না এলেই নয়। ৩০ হাজার টাকা গুছিয়ে রওনা দিয়েছি। বাস নেই। শুধু অ্যাম্বুলেন্স ভাড়াই গেছে ১৭ হাজার টাকা।’
হাসপাতালটির মহিলা ও শিশু ওয়ার্ডে গতকাল ছিল উপচে পড়া ভিড়। ওয়ার্ডের ভেতরে রোগী, দুটি ওয়ার্ডের মাঝখানে করিডরে রোগী, বারান্দায় রোগী; এমনকি দুটি বিছানার মাঝখানের মেঝেতেও রোগীদের থাকার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বলেন, তীব্র শীত ও প্রচণ্ড গরমে হৃদ্রোগীর সংখ্যা বাড়ে। যাতায়াতের অসুবিধার জন্য ১০১ শয্যার একটি ওয়ার্ডে এমনকি ২২০ থেকে ২৪০ জন পর্যন্ত রোগীর থাকার ব্যবস্থা করতে হয়েছে তাঁদের।
জাতীয় কিডনি ও ইউরোলজি হাসপাতাল থেকে বের হচ্ছিলেন নাসরিন আক্তার। গত বুধবার রাত তিনটায় তাঁর ভাই মুসা করিম অসুস্থ হয়ে পড়েন। বৃহস্পতিবার যশোর থেকে অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করে রওনা দিতে দিতে দুপুর গড়িয়ে যায়। মহাসড়কে প্রচণ্ড যানজটের কারণে তাঁরা শুক্রবার সকালে এসে হাসপাতালে পৌঁছান। দুই দিনের ছুটি, চিকিৎসকের স্বল্পতা থাকতে পারে—এই আশঙ্কায় রোগীকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যান। বৃহস্পতিবার রাতে এসে পৌঁছালে ঝামেলায় পড়তে হতো না বলে মন্তব্য করলেন নাসরিন।
একই হাসপাতালে নবম শ্রেণির ছাত্র বাহাদুর এসেছে গতকাল বিক্রমপুর থেকে। তার দুটি কিডনিই নষ্ট। বাহাদুরের মা জানালেন সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ভেঙে ভেঙে হাসপাতালে এসেছেন।
অ্যাম্বুলেন্সে বেশি ভাড়া দিয়েও রোগীরা স্বচ্ছন্দে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারছেন না। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) শফিকুল ইসলাম জানান, গত ২৬ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজশাহীর কাশিয়াডাঙ্গা মোড়ের কাছে দুর্বৃত্তরা অ্যাম্বুলেন্স লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ে। ওই সময় অ্যাম্বুলেন্সে দুজন গুরুতর অসুস্থ রোগী ছিলেন।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন দুই রোগীর স্বজন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর স্বামী-পুত্র দুজনেই গুরুতর মানসিক রোগে ভুগছেন। গ্রামবাসী চাঁদা তুলে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে ও তাঁর স্বজনদের ঢাকায় মানসিক হাসপাতালে পাঠান। রাস্তায় পুলিশ অ্যাম্বুলেন্স থামিয়েছিল। শিকলে বাঁধা বাবা-ছেলেকে দেখে ছেড়ে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন