default-image
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভোট কাল বুধবার। ভোট কেমন হবে, সেটাই এখন প্রধান আলোচনা। এ নিয়ে মেয়র পদপ্রার্থী কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। বিএনপির শাহাদাত হোসেনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মহিউদ্দিনগাজী ফিরোজ

প্রথম আলো: ভোটের পরিবেশ নিয়ে আপনি কি সন্তুষ্ট?

শাহাদাত হোসেন: একদম সন্তুষ্ট না। কষ্ট করে ভোটের একটা ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে। উৎসাহ তৈরি হয়েছে, মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাবে। কিন্তু গত সাত দিনের ঘটনায় সব পরিবেশ ধ্বংস করে ফেলেছে। অতি উৎসাহী কিছু পুলিশ কর্মকর্তা, আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা বিএনপির নেতা–কর্মীদের ধমক দিচ্ছে। ঘর থেকে বের করে দিচ্ছে। নিরপরাধ লোককেও গ্রেপ্তার করছে। এমনকি গণসংযোগ থেকে নেতা–কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে আটটি মামলা হয়েছে। রোববার পর্যন্ত ৪০ জনের বেশি নেতা–কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন। নির্বাচনটি নির্যাতনে পরিণত হয়েছে।

গণগ্রেপ্তারের ঘটনা দেখা যায়নি। আওয়ামী লীগ ও পুলিশ প্রশাসন বলছে, নির্বাচনকেন্দ্রিক কেউ গ্রেপ্তার হচ্ছে না, মামলার আসামিরা গ্রেপ্তার হচ্ছে। আপনি কী বলবেন?

শাহাদাত হোসেন: বিএনপির নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে হওয়া সব রাজনৈতিক মামলা। অস্ত্র, ছিনতাই, চাঁদাবাজি মামলা আসামি কেউ নেই। সাজানো, গায়েবি মামলায় নেতা-কর্মীদের জড়ানো হচ্ছে। নেতা–কর্মীদের ভোটকেন্দ্র থেকে দূরে রাখতে গায়েবি মামলাগুলো করছে। তারা অস্ত্রবাজ, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসীদের দেখে না। বিএনপি নেতা–কর্মীদের দমন–পীড়নে ব্যস্ত। নির্বাচন কমিশন (ইসি) কথা দিয়েছিল, নির্বাচনকালীন করা মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হবে না। তারা সেই কথা রাখেনি।

বিজ্ঞাপন

এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের দিন কী পরিকল্পনা করছেন?

শাহাদাত হোসেন: ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য নির্বাচন করতে এসেছি। লাখ লাখ ভোটার প্রস্তুত রয়েছেন ভোট দেওয়ার জন্য। সন্ত্রাসী, বহিরাগতদের গ্রেপ্তার করুক। জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া কাউকে ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে দেবে না, এ নিশ্চিত করুক। ইভিএম ও পোলিং এজেন্টদের সুরক্ষা দিক। এমন পরিবেশ তৈরি করা গেলে নারী ও তরুণ ভোটাররা নিরাপদে আসতে পারবেন।

ইভিএম নিয়ে সন্তুষ্ট আছেন?

শাহাদাত হোসেন: ইভিএম হোক আর ব্যালটে হোক—প্রশ্নটা নৈতিকতার। অতীতে ব্যালটে হয়েছে। নৈতিকভাবে যদি চায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন তাহলে সব ব্যবস্থায় সম্ভব। সেটাই দেখা যাচ্ছে না। এ সরকারের আমলে সুষ্ঠু ভোটের কোনো নজির তো নেই।

এ নির্বাচন নিয়ে বিএনপির কেন্দ্রের মনোযোগ একটু কম মনে হচ্ছে?

শাহাদাত হোসেন: তা হবে কেন? কেন্দ্রের অনেকেই এসেছে প্রচারে।

আগের সিটি নির্বাচনে বিএনপি–সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে হেফাজতে ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যে প্রচারে ছিল, এবার নেই কেন?

শাহাদাত হোসেন: তারা তো নির্বাচনগুলোতে অংশগ্রহণ করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। যাহোক, হয়তো ভোট দেবে। সক্রিয় অংশগ্রহণ করছে না। ভোট দেওয়ার অধিকার সবার আছে, তারাও নিশ্চয়ই দেবে।

প্রচলিত আছে, বিরোধী দল থেকে মেয়র নির্বাচিত হলে উন্নয়ন হবে না। ভোটাররা কেন আপনাকে বেছে নেবে?

শাহাদাত হোসেন: এটা ঠিক নয়। প্রয়াত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী বিএনপির আমলে মেয়র ছিলেন, তাঁকে সরকার অনেক সহায়তা করেছে। ভালো পরিকল্পনা নিলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। পুরো করোনাকালে মানুষকে চিকিৎসা দিয়েছি। প্রথমে মাস্ক বিতরণ কর্মসূচি শুরু করি ২০ মার্চ থেকে। স্বাস্থ্যসেবায় আলাদা গুরুত্ব থাকবে। বিশেষ হাসপাতাল ঢাকায় ১০টি আছে, চট্টগ্রামে নেই। দুই থেকে তিনটি হাসপাতাল দরকার। ক্যানসার, কোভিড-১৯ ও ট্রমা হাসপাতাল খুবই জরুরি। সব মিলিয়ে ভোটাররা একজন যোগ্য, দক্ষ মানুষ হিসেবে সমর্থন দেবে।

বিজ্ঞাপন

সরকারি দলের বাইরে থেকে নির্বাচিত হয়ে ইশতেহার বাস্তবায়ন কি সম্ভব?

শাহাদাত হোসেন: অবশ্যই সম্ভব। পর্যটনশিল্পে বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু নেতিবাচক প্রচারের কারণে এটি পিছিয়ে যাচ্ছে। আমাদের কক্সবাজার, বান্দরবান, ফয়’স লেক, রাঙামাটি, ইকোপার্ক আছে। ভৌগোলিকভাবে চট্টগ্রাম পাহাড় সমুদ্রবেষ্টিত। এখানে সবুজ নগর করা ব্যাপার না। পর্যটনশিল্পের বিকাশ অসম্ভব নয়। পর্যটনকে সম্পদ হিসেবে রেখে জিডিপিতে অবদান রাখতে পারি।

আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থীকে নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

শাহাদাত হোসেন: তিনি একজন মার্জিত ভদ্রলোক।

নির্বাচনে সংঘাতের শঙ্কা কেন করছেন?

শাহাদাত হোসেন: আগের নির্বাচনে তারা সহিংস কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে, এটি অন্যতম কারণ। তাদের অতীত ইতিহাস আছে। ২০১৫ সালের সিটি, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনসহ বিভিন্ন নির্বাচনে বহিরাগতদের এনেছে তারা। ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে দেয়নি প্রতিটি নির্বাচনে। এমনকি চট্টগ্রামের উপনির্বাচনেও বাইরের একজন সাংসদ এসেছেন।

এবার ২৩ দিনে পুলিশ মাত্র সাতটি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করেছে। অবৈধ অস্ত্র কি নেই চট্টগ্রামে। হাজার হাজার অস্ত্র। প্রকৃত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করছে না। কারাগার থেকে বের হয়ে অনেক সন্ত্রাসী এখন মাঠে রয়েছে।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কক্সবাজার ও সাতকানিয়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে জামায়াত–শিবিরসহ বহিরাগতরা জড়ো হচ্ছে।

শাহাদাত হোসেন: জামায়াত–শিবিরের একটা লোকও নেই। সরকারের এই নির্বাচনে তাদের সমর্থন নেই। দলের নির্দেশ ছাড়া জামায়াত–শিবিরের কর্মীরা মাঠে নামে না। মিছিলে তারা কেউ নেই, জনসংযোগে নেই; বরং আওয়ামী লীগ মতবিনিময় সভা করেছে রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফেনী ও কক্সবাজারের বাসিন্দাদের সঙ্গে। এক এমপির ছেলে মতবিনিময় সভায় বলেছেন, তাঁরা কেন্দ্র পাহারা দিয়ে রাখবেন। জেলার লোকজন নগরে কেন্দ্র পাহারা দেবে, এটি কীভাবে সম্ভব। বহিরাগত এনে জড়ো করে রাখা হচ্ছে, যাতে ভোটাররা কেন্দ্রে ঢুকতে না পারেন। ভোট ডাকাতি তাদের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।

নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেবেন কি না?

শাহাদাত হোসেন: নির্বাচন যদি জনগণ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীদের দৃষ্টিতে সুষ্ঠু হয়; কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু নির্বাচনের যে পরিবেশ তারা করেছে, তাতের সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। তারা পরিবেশ নির্বাচনের উপযোগী করতে পারেনি। এখন পর্যন্ত এলাকায় এলাকায় তল্লাশি চলছে। আমাদের নেতা–কর্মীদের ঘরে থাকতে দিচ্ছে না। অথচ তাদের দলের সন্ত্রাসীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে অস্ত্র নিয়ে। অতি উৎসাহী কিছু পুলিশ কর্মকর্তার কাছে জিম্মি হয়ে আছি।

বিভিন্ন নির্বাচনে ভোট চলাকালে বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপির প্রার্থী। এ নির্বাচনে এমন কিছু ঘটবে কি না?

শাহাদাত হোসেন: আমি একজন রাজনীতিবিদ। আমার সংস্কৃতিতে এটি নেই। আমি শেষ পর্যন্ত দেখে ছাড়ব। গণতান্ত্রিকভাবে একটি নির্বাচন মানুষ আশা করে। ভোট মানুষের মৌলিক অধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার, সাংবিধানিক অধিকার। আমরা গণতান্ত্রিক দল। জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য আমাদের সামনের সারিতে থাকতে হবে। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে ভোটের জন্য। ভোটারের অংশগ্রহণ ও উৎসবমুখর পরিবেশ ফিরিয়ে দিতে হবে। এটা আমাদের দায়িত্ব।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

শাহাদাত হোসেন: প্রথম আলোকেও ধন্যবাদ।

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন