সন্ধ্যা ছয়টার দিকে আমিনবাজার সেতুর কাছে দীর্ঘ যানজট। মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাট থেকে ছেড়ে আসা বিআরটিসির গাড়ির চালক ইয়াসিন যাত্রীদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘সবাই জানালাগুলো আটকান। একটা পেট্রলবোমা মারলেই হইছে।’ যাত্রীরা সবাই বিনা বাক্যে বাসের সব জানালা বন্ধ করে দিলেন।
এর আগে সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যানবাহন চলাচল ও মানুষের যাতায়াতের দৃশ্য দেখে একবারও মনে হয়নি, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের ডাকে অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচি চলছে। সকাল থেকেই ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে কিছুক্ষণ পর পর দূরপাল্লার ও স্বল্পদূরত্বের বাস ছেড়ে যাচ্ছিল। তবে দূরপাল্লার যাত্রীদের তুলনায় স্বল্পদূরত্বের যাত্রীদের সংখ্যা ছিল বেশি।
হরতাল-অবরোধে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পরিস্থিতি দেখার জন্য এই প্রতিবেদক পাটুরিয়া ঘাটে যাওয়ার উদ্দেশে স্থানীয় পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন। বাসে দেখা গেল, কয়েকজন যাত্রী সামনের আসনগুলোতে বসার জন্য তর্কাতর্কি করছেন। কেউ পেছনের আসনে বসতে চান না। বাসচালকের সহকারী মোস্তফা জানালেন, হরতাল-অবরোধের প্রথম দিকে যাত্রী একটু কম হলেও এখন যাত্রীর অভাব হয় না। কিন্তু প্রতিদিনই একই সমস্যা, বাসের প্রথম অর্ধেক আসনের পর আর কেউ বসতে চান না। পেট্রলবোমার আতঙ্কে সবাই সামনের দিকে বসতে চান, যাতে বাসে আগুন লাগলে বা পেট্রলবোমা মারলে যেন দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারেন।
কথা হয় বাসযাত্রী মিজানুর রহমানের সঙ্গে। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, যাবেন মানিকগঞ্জ। জানালেন, অফিসের কাজে তাঁকে প্রায়ই মানিকগঞ্জ যেতে হয়। রাস্তাঘাটে ভয় লাগে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘প্রথম প্রথম ভয় লাগত। এখন গা-সওয়া হয়ে গেছে। আর পরিস্থিতিও তো ভালো হয়ে যাচ্ছে।’ আরেক যাত্রী হাসিনুর রহমান যাবেন মানিকগঞ্জের উথুলী বাসস্ট্যান্ড। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হাসিনুর নিয়মতি ঢাকা থেকে মালামাল কিনে মানিকগঞ্জে যান। তিনিও জানালেন, পরিস্থিতি এখন অনেকটাই ভালো হয়ে গেছে। এখন আর ভয়-ডর লাগে না।
গাবতলী থেকে পাটুরিয়া ঘাটের দূরত্ব ৯০ কিলোমিটার। যাত্রাপথে স্বাভাবিক দিনগুলোর মতোই বিভিন্ন এলাকায় যাত্রী ওঠা-নামা
করে প্রায় আড়াই ঘণ্টায় বেলা ১১টার দিকে বাসটি পাটুরিয়া ঘাটে পৌঁছায়। এ সময় মহাসড়কে দূরপাল্লার বিলাসবহুল বাস, লোকাল বাস ও অন্যান্য যানবাহনের চলাচল ছিল স্বাভাবিক।
বেলা তিনটা নাগাদ পাটুরিয়া থেকে ঢাকামুখী বাসগুলোর কর্মচারীদের মধ্যে তৎপরতা দেখা যায়। যাত্রী নিয়ে ঢাকায় ফেরার জন্য তাঁরা হাঁকডাক শুরু করেন।
ঢাকায় ফেরার পথে কথা হয় বাসযাত্রী মরিয়মের সঙ্গে। সঙ্গে বোন রত্না ও দেড় বছরের মেয়ে শাকিলা। গুলিস্তানে যাবেন। জানালেন, সন্ধ্যার পর বাসে উঠতে ভয় লাগে। বাধ্য হয়ে উঠেছেন। আমিনবাজার সেতুর ওপর যানজটে আটকে থাকা বাসের সারি দেখিয়ে বললেন, বাস চললে সমস্যা নেই। দাঁড়ায় থাকলেই যত ভয়, কখন কেডা কোনদিকে বোমা মারে।
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ ফার্মগেটের কাছে এই প্রতিবেদক যখন বাস থেকে নামেন, তখন ফার্মগেট থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত যানজটে আটকে পড়া যানবাহনের দীর্ঘ সারি।

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন