উপজেলা সমবায় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নাচোলে মোট ৩১টি মৎস্যজীবী সমিতি রয়েছে। এ ছাড়া মৎস্যচাষি সমবায় সমিতি, সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতিসহ বিভিন্ন ধরনের আরও ৩৪১টি সমিতি আছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নাচোলে মৎস্যজীবী সমিতির চেয়ে পুকুরের সংখ্যা বেশি। ফলে মৎস্যজীবী সমিতির বাইরে অন্য সমিতিগুলো এমনকি অন্য উপজেলার সমিতিগুলোও এখানে পুকুর ইজারা নেয়। এ সুযোগে পুরো উপজেলায় সরকারি পুকুর ঘিরে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।

সমিতি কেনাবেচা ও সাবলিজ–বাণিজ্য

উপজেলার কসবা ইউনিয়নের সতীপুকুর ইজারা পেয়েছে গোমাস্তাপুর উপজেলার আলীনগর মৎস্যজীবী সমিতি। এ পুকুরে মাছ চাষ করছেন উপজেলা চেয়ারম্যানের ভাগনে আখতারুল আলম। পার্শ্ববর্তী ‘চাতরা’ পুকুরটি ইজারা পেয়েছে ফতেপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি। তবে পুকুরটিও আখতারুলের দখলে। আখতারুল স্থানীয় বাসিন্দা মাইজুল ইসলামকে তিন বছরের জন্য আড়াই লাখ টাকায় সাবলিজ দিয়েছেন।

আখতারুল কীভাবে ‘চাতরা’ পুকুর ইজারা পেলেন—জানতে চাইলে ফতেপুর মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি ফজলুর রহমান বলেন, তাঁরা টাকার বিনিময়ে আখতারুলকে তাঁদের সমিতির কাগজপত্র ব্যবহার করতে দিয়েছেন।

আখতারুল অবশ্য বলেন, তিনি আলীনগর মৎস্যজীবী সমিতির কাগজপত্র দিয়ে শুধু সতীপুকুরে মাছ চাষ করছেন।

কসবা ইউনিয়নের রানীদিঘি পুকুরপারে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের বসবাস। রানীদিঘি পুকুরটিতে দীর্ঘদিন এই সম্প্রদায়ের লোকজনই মাছ চাষ করত। কিন্তু এটিতে এখন মৎস্য চাষ করছেন উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল কাদেরের আত্মীয় মিজানুর রহমান। মিজানুর বলেন, তিনি বালিকাপাড়া গাভি পালন সমবায় সমিতির কাগজপত্র ব্যবহার করে পুকুরটি ইজারা নিয়েছেন।

মিজানুরের দখলে এলাইপুরের করমজান পুকুরটিও। এলাইপুরের বাসিন্দা আইস আলী মিজানুরের কাছ থেকে করমজান পুকুর ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকায় সাবলিজ নিয়েছেন। মিজানুর বলেন, তিনি ভোলাহাট উপজেলার একটি সমিতির নাম দিয়ে পুকুরটি ইজারা নিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কসবা ইউনিয়নের এলাইপুর মৌজায় ১৯টি পুকুর আছে। এসব পুকুর উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল কাদেরের ভাগনে আখতারুল, ফুফাতো ভাই ইউপি সদস্য মাজিবুল হক ও মিজানুর বিভিন্ন সমিতির নাম ব্যবহার করে ইজারা নিয়ে সাবলিজের বাণিজ্য করছেন। এলাইপুর গ্রামের বাসিন্দা হায়াত আলী বলেন, ৫০ হাজার টাকায় ইজারা নিয়ে এসব পুকুর তিন লাখ টাকায় বিক্রি (সাবলিজ) হয়। বাড়ির পাশে পুকুর, কিন্তু আমরা ইজারা পাই না।’

উপজেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সদস্য ও নাচোল সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম বলেন, উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের উপজেলার ছোট-বড় সব সরকারি পুকুর ইজারায় হস্তক্ষেপ করেন। তিনি তাঁর লোকজনকে দিয়ে পুকুর ইজারা নিয়ে আবার সাবলিজ দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা বাণিজ্য করেন। এটা নাচোলের সবাই জানে।’

উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের নাচোল উপজেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির উপদেষ্টা। আব্দুল কাদের মুঠোফোনে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘পুকুর ইজারায় আমি সম্পৃক্ত নই। ইউএনও পুকুর ইজারা দেন, ইজারায় কী হয়, না হয়, তিনি বলতে পারবেন।’

নাচোলে সরকারি পুকুরগুলোর ইজারায় বিশৃঙ্খলার কথা স্বীকার করেন উপজেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শরিফ আহম্মেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সমিতিগুলোতে শৃঙ্খলা ফেরানো বড় ফ্যাক্টর। তবে ১৪২৯ সনে পুকুর ইজারায় অনেকটাই শৃঙ্খলা ফিরেছে। প্রথম ধাপে ২১টি ইজারা দেওয়া হয়েছে।

উপজেলার ৩১টি মৎস্যজীবী সমিতির মধ্যে উপজেলা চেয়ারম্যান তাঁর আত্মীয়স্বজনদের নামে ১৩টি মৎস্যজীবী সমিতির নিবন্ধন নিয়েছেন। অন্যদিকে নাচোল পৌরসভার কাউন্সিলর আকবর আলী তাঁর আত্মীয়স্বজনকে দিয়ে দখলে রেখেছেন ১২টি মৎস্যজীবী সমিতি। এতে করে প্রকৃত মৎস্যজীবীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।

জেলা সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি সেলিনা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, নীতিমালা অনুসরণ করে যারা জলমহাল বন্দোবস্ত পাওয়ার যোগ্য, তাদেরই দেওয়া উচিত। (শেষ)

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন