default-image

সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতাদের চোখ এখন দলের মহানগর কমিটির দিকে। চার বছরের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে চলছে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ। সিটি নির্বাচনের পরই মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের কথা দলের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে জানানো হয়েছিল। পরবর্তী নেতৃত্ব কাদের হাতে যাচ্ছে, নেতা-কর্মীদের আলোচনায় ঘুরেফিরে এ বিষয়টি প্রধান্য পাচ্ছে।

বিভেদ-বিভক্তির কারণে চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি গঠনের বিষয়টি সব সময়ই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আলোচিত। চট্টগ্রাম নগর কমিটির নেতা নির্বাচন নিয়ে এখন দুটি বিষয় আলোচিত হচ্ছে। বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন কি একই পদে থাকছেন? চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন কি বড় পদ পাচ্ছেন? সদ্য নির্বাচিত মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী কি নগরের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন? এর সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন বড় হয়ে উঠেছে কমিটিতে প্রয়াত মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারীদের কর্তৃত্ব থাকবে নাকি বিপরীত ধারা শক্তিশালী হবে। বর্তমান কমিটির ছয় সহসভাপতিই এবার সভাপতি পদের দাবিদার।

দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহানগরগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামেই দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল হচ্ছে না। সর্বশেষ ২০১৩ সালের নভেম্বরে মহিউদ্দিন চৌধুরীকে সভাপতি এবং আ জ ম নাছির উদ্দীনকে সাধারণ সম্পাদক করে তিন বছর মেয়াদি কমিটি গঠিত হয়েছিল। ২০১৭ সালে মহিউদ্দিন চৌধুরী মারা যাওয়ার প্রথম সহসভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক জহুর আহমদ চৌধুরীর ছেলে। দলের একটা অংশ মনে করেন, তিনি ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হয়ে দলে নিজের শক্ত অবস্থান সৃষ্টি করতে পারেননি। বয়সের কারণেও তিনি সব সময় সক্রিয় থাকতে পারেন না। ফলে চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের রাজনীতি অনেকটাই আ জ ম নাছিরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরে প্রথমে থানা-ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটি গঠনের জন্য সম্মেলন হবে। এরপর চট্টগ্রাম মহানগরের কমিটি হবে। ছয় মাসের মধ্যেই সব হয়ে যাবে। নেতা নির্বাচনের বিষয়ে তিনি বলেন, এটা কাউন্সিলররাই ঠিক করবেন। আগে থেকে ধারণা করার সুযোগ নেই।

বিজ্ঞাপন

সহসভাপতিদের দৌড়

বর্তমান মহানগর কমিটির সহসভাপতিদের মধ্য থেকে একজনকে সভাপতি করার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। এর মধ্যে সিটি করপোরেশনের সদ্য বিদায়ী প্রশাসক খোরশেদ আলমের নাম বেশি আসছে। তিনি মহিউদ্দিন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগে বিভক্তির রাজনীতির কারণে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত রেজাউল করিমকে মেয়র পদে দলের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসক হিসেবে খোরশেদ আলমের কাজে সন্তুষ্ট দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। এ জন্য তাঁকে সভাপতি করার সম্ভাবনা দেখছেন কেউ কেউ।

তবে স্থানীয় আওয়ামী লীগের একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, একসময় বাকশালে চলে গিয়েছিলেন, এটা খোরশেদ আলমের একটা দুর্বল দিক।

খোরশেদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, দল যখন যে দায়িত্ব দিয়েছে, তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। ভবিষ্যতে দল যেখানে দায়িত্ব দেবে, সেই দায়িত্বও মন-প্রাণ দিয়ে পালন করবেন।

মহিউদ্দিন চৌধুরী ও আ জ ম নাছিরের বাইরে নিজ নিজ সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে চট্টগ্রাম নগর কমিটির সহসভাপতির দায়িত্বে থাকা সাবেক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম (বিএসসি) ও আফসারুল আমিনের। তবে স্থানীয় রাজনীতিতে আগের মতো প্রভাব এখন আর তাঁদের নেই। এরপরও নগর কমিটির সভাপতি হিসেবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এই দুই জ্যেষ্ঠ নেতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে পারেন বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতাদের আনেকে।

আরেক সহসভাপতি ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরীর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। তিনি সিটি নির্বাচনে রেজাউল করিম চৌধুরীর প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট ছিলেন। চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির সভাপতিসহ আইন অঙ্গনে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। আরেক সহসভাপতি আলতাফ হোসেনও সভাপতি পদের দাবিদার। তাঁরা দুজনই মহিউদ্দিন পক্ষের লোক হিসেবে পরিচিত।

জটিল সমীকরণ

খোরশেদ আলম কিংবা প্রয়াত মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারীদের কেউ সভাপতি হলে আ জ ম নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রেখে দেওয়া হতে পারে—দলে এমন আলোচনা আছে। স্থানীয় নেতাদের কেউ কেউ মনে করছেন, এর মাধ্যমে দলে বিরাজমান দুই ধারার ভারসাম্য রক্ষা হবে।

তবে রেজাউল করিমের মেয়র হওয়ার মধ্য দিয়ে এই সমীকরণ কিছুটা জটিল হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতারা। কারণ, এখন রেজাউল ও নগর ভবনকেন্দ্রিক রাজনীতির গুরুত্ব বাড়বে। এ ক্ষেত্রে নতুন মেয়রও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন।

এর বাইরে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান জহিরুল আলম কিংবা সাবেক চেয়ারম্যান আবদুছ সালামও বড় পদের দাবিদার হয়ে উঠতে পারেন। জহিরুল আলম বর্তমান কমিটির সহসভাপতি এবং ছালাম কোষাধ্যক্ষ।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, মহিউদ্দিন চৌধুরী জীবিত থাকা অবস্থায় সভাপতি পদে তাঁকে বিবেচনায় নিয়ে অন্য পদ নিয়ে ভাবতে হতো। এখন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদ দুটোই উন্মুক্ত। প্রতিদ্বন্দ্বী অনেক, আছে বিভক্তি। সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে রেজাউল করিমকে বেছে নেওয়া ছিল বড় চমক। নগর কমিটি নির্বাচনেও এমন চমক থাকবে না, সে নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন