default-image

হঠাৎ বাসে আগুন দেওয়ার উদ্দেশ্য কী, সে প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে তিনি বলেন, ‘কোনো কথা নেই বার্তা নেই, হঠাৎ করে বাসে আগুন দিয়ে অগ্নি-সন্ত্রাস কেন? কী স্বার্থে? কিসের জন্য?’
কোনো রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ না করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘নির্বাচন হয়। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার নামে অংশগ্রহণ করে। টাকাপয়সা যা পায়, পকেটে নিয়ে রেখে দেয়। ইলেকশনের দিন ইলেকশনও করে না। এজেন্টও দেয় না। কিছুই করে না। মাঝপথে ইলেকশন বয়কটের নাম দিয়ে বাসে আগুন দিয়ে পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়। এটার উদ্দেশ্যটা কী?’
মুজিব বর্ষ উপলক্ষে সংসদের বিশেষ অধিবেশনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আনা সাধারণ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। পরে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে সংসদের ইতিহাসে এই প্রথম বিশেষ অধিবেশন হলো। গতকাল রাতে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পর সংসদের অধিবেশন কক্ষে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ (১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর সংসদে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য) শোনানো হয়। সাধারণ প্রস্তাব আনার আগে গত সোমবার বিশেষ অধিবেশনের শুরুতে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্মারক বক্তৃতা দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। গতকাল বিশেষ অধিবেশনের সমাপনী দিনে সংসদের ‘প্রেসিডেন্ট বক্সে’ বসে আলোচনা শোনেন তিনি।

এর আগে ৯ নভেম্বর সংসদে বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানাতে প্রস্তাব এনেছিলেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রস্তাবের ওপর সরকার ও বিরোধী দলের মোট ৭৯ জন সদস্য ১৯ ঘণ্টা ৩ মিনিট বক্তব্য দেন। তাঁরা বঙ্গবন্ধুর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক এবং কর্মময় জীবন ও দর্শন নিয়ে আলোচনা করেন।
গতকাল সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠনের প্রেক্ষাপট এবং এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর বক্তৃতায় উঠে আসে সমসাময়িক ঘটনাও।

বিজ্ঞাপন


সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা বলেন, করোনা মোকাবিলা করেও মানুষ এগিয়ে যাচ্ছে, জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি যাতে সচল থাকে, সে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যখন যেটা প্রয়োজন, সরকার তা করছে। করোনার মধ্যেই এল ঘূর্ণিঝড়, বন্যা। এরই মধ্যে হঠাৎ করে বাসে আগুন দিয়ে অগ্নি-সন্ত্রাস।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের মাধ্যমে একটি ব্যবস্থা দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। সেখানেও নির্বাচনের ব্যবস্থা রেখেছিলেন। কিশোরগঞ্জ ও পটুয়াখালীতে ভোট হয়েছিল। কিশোরগঞ্জে একজন স্কুলশিক্ষক বিজয়ী হয়েছিলেন। জনগণের আস্থা ছিল তাঁর ওপর, এ কারণেই তিনি জিতেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর নির্বাচন নিয়ে বারবার কথা উঠেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যারা ক্ষমতায় এসেছিল, তারা প্রহসন করে করে নির্বাচন পদ্ধতি নষ্ট করে দিয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি একটি সিস্টেমে নিয়ে আসতে।’
দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু
বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, এ দেশের মানুষের জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবকিছু উজাড় করে দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন তিনি। কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠন করে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাঁকে হত্যা করা হলো। তাঁর চিন্তার বাস্তবায়ন হলে আজ বাংলাদেশ বিশ্বে উন্নত রাষ্ট্র হতো।
সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেন, দেশের স্বাধীনতা চট করে আসেনি। এটা ছিল বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। যখন তিনি একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তোলার কাজ শুরু করলেন, তখন দেশে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন চক্র প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করল। দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে মানুষ হত্যা করল। সংসদ সদস্যদের হত্যা করা শুরু করল, এমনকি ঈদের নামাজেও হত্যা করা হলো, থানা লুট করা হলো, আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হলো। তখন মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য বিপ্লবের দ্বিতীয় কর্মসূচি ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু বিভিন্ন ধরনের সমালোচনা শুরু হলো।
বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠন নিয়ে ওই সময় বিভিন্ন সভায় বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ভাষণ থেকে উদ্ধৃত করে সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু এমন একটা ব্যবস্থা দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন, যেখানে মানুষ সরাসরি সম্পৃক্ত থাকবে। দেশের উন্নতি হবে। এটাকে তিনি একটি বিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধান সংশোধনের দিন জাতীয় সংসদে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর ভাষণ থেকে বিশেষ বিশেষ অংশ পড়ে শোনান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটানোই ছিল জাতির পিতার একমাত্র লক্ষ্য। তিনি সংবিধান সংশোধন করেছিলেন। ঘরে ঘরে স্বাধীনতার সুফল পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে সেটা করতে দেওয়া হয়নি। একদল তাঁর বিরুদ্ধে নেমে গিয়েছিল। তারা পাকিস্তানি প্রভুদের দাসত্ব ভুলতে পারেনি।


সংবিধান রক্ষায় সচেতন থাকার আহ্বান

গতকালের অধিবেশনের শুরুতে বক্তব্য দেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। স্বাধীন বাংলাদেশে সংবিধান প্রণয়ন এবং বঙ্গবন্ধু দর্শন নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।
১৯৭২ সালের সংবিধানের প্রতিপাদ্য তুলে ধরে স্পিকার বলেন, বঙ্গবন্ধুর দর্শন ধারণ করে এই সংবিধান যেন বাংলার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে, সেই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করতে হবে। সংবিধানকে সুরক্ষিত এবং সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে সদা সচেতন থাকতে হবে। মুজিব বর্ষের অঙ্গীকার হতে হবে, সংবিধানের সুফল বাংলার সব মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া। এই সংবিধান তখনই সার্থক হবে, যখন বাংলার মানুষ ক্ষুধা-দারিদ্র্য-বঞ্চনা ও বৈষম্য থেকে মুক্ত হয়ে উন্নত জীবন পাবে। এই লক্ষ্য অর্জনে নিরলসভাবে কাজ করছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আলোচনায় অন্যান্যের মধ্যে সরকারি দলের সাংসদ মতিয়া চৌধুরী, চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী, কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, আলী আশরাফ, ইমাজ উদ্দীন প্রামাণিক, শফিকুর রহমান, সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ ওয়াসিকা আয়শা খান প্রমুখ অংশ নেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0