গতকাল মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত সাড়ে তিন ঘণ্টার বৈঠকে ১০টি নাম চূড়ান্ত করে তা সিলগালা করে রেখেছে অনুসন্ধান কমিটি। সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি ও আপিল বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। বৈঠকে কমিটির অন্য পাঁচ সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকের পর অনুসন্ধান কমিটির সাচিবিক দায়িত্বে থাকা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, চূড়ান্ত করা ১০টি নাম ২৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেবে অনুসন্ধান কমিটি। এরপর নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের বিষয়ে রাষ্ট্রপতি সিদ্ধান্ত নেবেন।

এবারই প্রথম আইন অনুযায়ী ইসি গঠিত হচ্ছে। গত ২৭ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে আইন পাসের পর ইসি গঠনে যোগ্য ব্যক্তি বাছাইয়ে ৫ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে নাম দেওয়ার অনুরোধ করেছিল। ব্যক্তিপর্যায়েও নাম আহ্বান করা হয়। ১৪ ফেব্রুয়ারি ৩২২ জনের নামের তালিকা প্রকাশ করে কমিটি। এরপরও বিশিষ্টজনদের সঙ্গে বৈঠকে আরও কিছু নামের প্রস্তাব আসে।

তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি, সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, এলডিপি, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগসহ নিবন্ধিত কয়েকটি দল অনুসন্ধান কমিটির কাছে ইসি গঠনে কোনো নামের প্রস্তাব পাঠায়নি।

মোট কতগুলো নাম এসেছিল জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ৩২৯টি নামের প্রস্তাব এসেছিল। এর বাইরেও কিছু এসেছিল। ৫ থেকে ১০ জনের মতো হতে পারে। যেগুলো সময়ের পরে এসেছিল।

■ তালিকায় সামরিক ও বেসামরিক সাবেক আমলা, সাবেক বিচারক ও শিক্ষকের নাম গুরুত্ব পেয়েছে। ■ চূড়ান্ত করা নামগুলো প্রকাশের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি বিশিষ্টজনদের দাবি থাকলেও তা বিবেচনায় নেয়নি কমিটি।

১০ জনের চূড়ান্ত তালিকায় কারা আছেন জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, নামগুলো চূড়ান্ত করার সময় তিনি ছিলেন না। কারণ, তিনি কমিটির সদস্য নন। কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দিয়েছেন।

পরে যোগাযোগ করা হলে অনুসন্ধান কমিটির একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, নাম প্রকাশ করতে চাইছেন না তাঁরা।

অনুসন্ধান কমিটি প্রথমে তিন শতাধিক নাম থেকে কাটছাঁট করে ২০ জনের প্রাথমিক তালিকা করে। এরপর তালিকাটি আরও কাটছাঁট করে ১২ থেকে ১৩ জনের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হয়। সেখান থেকে ১০টি নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে।

এখন রাষ্ট্রপতির কাছে নামগুলো দেওয়ার পর তিনি ১০ জনের মধ্য থেকে ১ জন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও ৪ জন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেবেন।

সংবিধানে বলা আছে, কেবল প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ছাড়া রাষ্ট্রপতি অন্য সব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন।

আইন হওয়ার আগে গত দুটি নির্বাচন কমিশনও অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে হয়েছিল। তবে দুটি কমিশন নিয়েই রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক ছিল। এর মধ্যে কাজী রকিব উদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত কমিশনের অধীনে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দেশে একতরফা জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। তখন বিনা ভোটে সাংসদ হন ১৫৩ জন। এরপর কে এম নূরুল হুদার অধীনে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন নিয়ে দেশ-বিদেশে প্রশ্ন ওঠে। বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অভিযোগ করে আসছে, ৩০ ডিসেম্বর রাতে ভোট হয়েছে। এ নিয়ে ১৪ ফেব্রুয়ারি মেয়াদের শেষ দিনে শেষ সংবাদ সম্মেলনেও প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় বিদায়ী সিইসি কে এম নূরুল হুদাকে।

অনুসন্ধান কমিটির প্রস্তাব প্রকাশের দাবি

এদিকে ইসি গঠনে অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশ করা ১০টি নাম প্রকাশ করার দাবি তুলেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি। এ জন্য রাষ্ট্রপতিকেও চিঠি দিয়েছে দলটি। সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও (জাপা) অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশ করা নামগুলো জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি করেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), সুশাসনের জন্য নাগরিকও (সুজন) একই দাবি করেছিল। এমনকি অনুসন্ধান কমিটির সঙ্গে বিশিষ্ট নাগরিকদের বৈঠকেও এই দাবি তোলা হয়।

জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের গতকাল দুপুরে রাজধানীর বনানীতে দলের কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে বলেন, নিরপেক্ষ লোক দিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন না হলে গণতন্ত্রচর্চা সম্ভব হয় না। আবার ক্ষমতাহীন নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারে না। কারণ, ক্ষমতাহীন নির্বাচন কমিশনকে দলীয় সরকারের মুখাপেক্ষী হতে হয়। তাই ক্ষমতাবান নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের বিকল্প নেই। তিনি অনুসন্ধান কমিটির চূড়ান্ত করা নামগুলো প্রকাশের দাবি জানান।

আর বিশিষ্ট নাগরিকেরা অনুসন্ধান কমিটির সঙ্গে বৈঠকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং ইসিকে সঠিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে পারবেন, এমন ব্যক্তিদের বাছাই করতে হবে। যাঁরা হবেন সৎ ও সাহসী এবং রাজনৈতিক দলের চাপে মাথা নত করবেন না। তাঁরা বলেছিলেন, মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারবেন এবং একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে পারবেন, এ রকম সাহসী লোক ইসিতে দরকার। আগামী নির্বাচন যদি আগের মতো হয়, তবে দেশ একটা বিপদের মধ্যে পড়বে বলেও সতর্ক করেছেন বিশিষ্ট নাগরিকেরা।

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন