সম্মেলনের পর প্রায় আট মাস পার হলেও বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের নতুন কমিটি হয়নি। কাউন্সিলে হই-হট্টগোলের মধ্যে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হলেও অচলাবস্থা কাটেনি। দৃশ্যমান দলীয় কার্যক্রম না থাকা এবং পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়ায় নেতা-কর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।
জেলা আওয়ামী লীগের আগের কমিটির যুগ্ম সম্পাদক আবদুল মোতালেব মৃধা বলেন, ‘সম্মেলনের আট মাস পরেও কমিটি না হওয়াটা দুঃখজনক। নেতা-কর্মীরা ঝিমিয়ে পড়েছেন। নতুন কমিটিতে পদপ্রত্যাশী তরুণেরাও হতাশ।’
দলীয় সূত্র জানায়, গত বছরের ১৫ নভেম্বর বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে দলের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু প্রধান অতিথি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ ও সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বিশেষ অতিথি ছিলেন।
সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে স্থানীয় বঙ্গবন্ধু স্মৃতি কমপ্লেক্সে কাউন্সিল অধিবেশন বসে। এতে সাংসদ ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু সভাপতি পদে এবং সাধারণ সম্পাদক পদে জেলা পরিষদের প্রশাসক জাহাঙ্গীর কবির ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম সরোয়ারের নাম প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু গোলাম সরোয়ারের প্রার্থিতা নিয়ে হট্টগোল বাধে। এ সময় কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে গোলাম সরোয়ারের নাম সমর্থনকারী পৌর আওয়ামী লীগের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেনকে মারধর করা হয়। তুমুল হট্টগোলের মধ্যে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ সভাপতি পদে ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এবং সাধারণ সম্পাদক পদে জাহাঙ্গীর কবিরের নাম জানিয়ে সম্মেলনস্থল ত্যাগ করেন। এঁরা আগেও এই পদে ছিলেন।
ওই দিন বিকেলেই গোলাম সরোয়ারের নাম প্রস্তাবকারী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক জিয়াউদ্দিন মোল্লার বাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়।
সাবেক কমিটির কয়েকজন নেতা পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, সেদিন কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল তা এখানকার আধিপত্যবাদী রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ। ২৪ বছর ধরে দলে এই কর্তৃত্ববাদী শাসন চলছে।
দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাউন্সিলে গোলাম সরোয়ারের নাম প্রস্তাবকারী নেতার বাড়ি ও সমর্থনকারীর ওপর হামলার ঘটনায় সাধারণ কাউন্সিলর, দলীয় নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। হতবাক হয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতারাও।
জানতে চাইল গোলাম সরোয়ার প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের কোনো কমিটি নেই। কাউন্সিল অধিবেশনে কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে অনাকাঙ্ক্ষিত সন্ত্রাসী ঘটনার পর জেলা কমিটি ঝুলে আছে। নতুন কমিটি না হওয়া পর্যন্ত সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সাংসদ ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু ও জাহাঙ্গীর কবির আপাতত দায়িত্ব পালন করছেন। কাউন্সিল অধিবেশনে কেন্দ্রীয় একজন নেতা তো সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম বলে গেছেন—এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘মূলত ওই রকম একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য একজন কেন্দ্রীয় নেতা মৌখিকভাবে তাঁদের দুজনের নাম বলে গেছেন। কিন্তু এর কোনো কার্যকারিতা নেই।’
যোগাযোগ করা হলে ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু বলেন, ‘আমরা পূর্ণাঙ্গ কমিটি কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে জমা দিয়েছি। তবে তা এখনো অনুমোদন হয়নি।’ এত দিনেও কমিটি অনুমোদন না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা কেন্দ্রীয় নেতাদের বিষয়।’ তিনি বলেন, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ দুটি কাউন্সিল অধিবেশনে ঘোষণা করা হয়েছে। তাই পুরোনো কমিটি দিয়েই বর্তমানে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চলছে।
জাহাঙ্গীর কবির প্রথম আলোকে প্রায় একই কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আশা করি কেন্দ্রীয় কমিটির আগামী মাসের সভায় বরগুনার কমিটি অনুমোদন হয়ে যাবে।’
দলীয় কয়েকজন নেতা জানান, জেলা কমিটি ছাড়াও পাথরঘাটা ও বামনা উপজেলায় এক বছর আগে সম্মেলন হলেও নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। বেতাগী উপজেলায় সম্মেলন হওয়ার পর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ ঘোষণা হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি এক বছরেও। আমতলী উপজেলায় প্রায় দুই বছর আগে সম্মেলন হলেও সাধারণ সম্পাদক বহিষ্কার হওয়ায় সেখানেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরও বরগুনায় আওয়ামী লীগ এত নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েনি বলে মন্তব্য করেন ওই নেতারা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0