জোটের চলমান আন্দোলনে সহিংসতার দায় যাতে এককভাবে দলের ওপর না আসে, সে জন্য মাঠে কিছুটা ‘সাবধানি’ বা ‘হিসাবি’ অবস্থান নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এ কারণে এবারের আন্দোলনে দলের নেতা-কর্মীদের বিএনপির অবস্থান দেখে মাঠে নামার পরামর্শ দেওয়া হয় বলে জামায়াতের দলীয় সূত্র জানিয়েছে। অনেকের মতে, সে জন্যই তাদের তৎপরতা ২০১৩ সালের মতো ‘সর্বাত্মক’ নয়।
দলটির উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, অতীতে সহিংসতার জন্য দেশি ও আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়ার কথা মনে রেখে এবারের আন্দোলনে মাঠে ‘হিসাবি’ অবস্থান নেওয়া হয়। এ কৌশলের অংশ হিসেবেই দলের নেতা-কর্মীরা বিএনপির সঙ্গে মাঠে তৎপর থাকলেও চলমান আন্দোলনে আগের মতো গা লাগাচ্ছেন না।
২০১৩ সালে দলের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতার একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ফাঁসির রায় ও একজনের সাজা কার্যকরের পর জামায়াত-শিবির সারা দেশে হরতালের কর্মসূচি দিয়ে সহিংসতা চালায়। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ দলীয় নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের ব্যাপক প্রাণহানি এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়। এতে দলটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে।
ওই সূত্র জানায়, ৫ জানুয়ারি ‘একতরফা’ সংসদ নির্বাচনের বার্ষিকী থেকে নতুন করে আন্দোলন শুরুর পর এবার মাঠে ‘সাবধানী’ ভূমিকায় থাকার সিদ্ধান্ত নেন জামায়াতের নীতিনির্ধারকেরা। এ জন্য দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকও করা হয়। সেই বৈঠকের সিদ্ধান্তের আলোকে দলের মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের আগে বিএনপির অবস্থান দেখে তারপর মাঠে নামতে কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা পাঠানো হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান ‘গা বাঁচিয়ে আন্দোলনের’ তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা যা করি, আন্তরিকতার সঙ্গে করি। হাফডান বা লোক দেখানোর কাজ আমাদের নেই।’
নতুন নির্বাচনের জন্য সংলাপ ও সমঝোতার দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের টানা অবরোধ-হরতাল চলছে গত ৬ জানুয়ারি থেকে। দেড় মাসের টানা আন্দোলনের এ পর্যায়ে এসে দলটির নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, এই ‘সাবধানী’ অবস্থান তেমন কাজে আসেনি। এটি আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীরও দৃষ্টি কুড়াতে সমর্থ হয়নি; বরং এই ‘সাবধানী’ ভূমিকাকে সন্দেহের চোখে দেখছেন বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা। আবার ‘সাবধানী’ অবস্থানের কারণে সরকারের কাছ থেকে কোনো রকম ছাড় পাওয়া গেছে, তা-ও না।
জামায়াতের নেতাদের মূল্যায়ন হচ্ছে, দেড় মাসের আন্দোলনে বিএনপির চেয়ে সারা দেশে জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা বেশি গুম-খুন ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এতে অনেকটা নীরবে দলের শক্তি ক্ষয় হচ্ছে। এ কারণে দলের নেতা-কর্মীদের একটি অংশ, বিশেষ করে ছাত্রশিবিরের কাছে কেন্দ্রের ‘সাবধানী’ অবস্থানের নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে ভালো গুরুত্ব পায়নি। এ অবস্থায় কেন্দ্রের নির্দেশনা উপেক্ষা করে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীদের একটি অংশ কর্মসূচিতে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে।
জামায়াতের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানায়, বিএনপি বা সরকারের প্রতিক্রিয়ার চেয়ে দলের নীতিনির্ধারকেরা বেশি চিন্তিত জামায়াত সম্পর্কে আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী মহলের নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস সম্পাদকীয় লিখে এবং ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে। এক বছর আগে, অর্থাৎ গত বছরের ৫ জানুয়ারির ‘একতরফা’ নির্বাচনের পরপরই ইউরোপীয় পার্লামেন্ট বিএনপিকে জামায়াত ও হেফাজতে ইসলাম থেকে দূরত্ব বজায় রাখার প্রস্তাব করেছিল।
জামায়াত আইসিজির এ বক্তব্যকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ ও ‘দুঃখজনক’ বলে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। কিন্তু বিএনপি এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। দলটির স্থায়ী কমিটি ও দলীয় চেয়ারপারসনের তিন সদস্যের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা জানান, বিষয়টি নিয়ে তাঁদের মধ্যে নতুন কোনো ভাবনা নেই। তাঁরা এও বলেন, এ বক্তব্য আওয়ামী লীগের।
নিউইয়র্ক টাইমস ও আইসিজির বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে জামায়াতের নেতা মুজিবুর রহমান বলেন, ‘যারা জামায়াতের আদর্শিক রাজনীতিকে পছন্দ করে না, তারাই বিভিন্নভাবে বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে বলছে। কিন্তু বিএনপি জামায়াতকে ছেড়ে দিচ্ছে বলে আমার মনে হয়নি।’
জামায়াতের দায়িত্বশীল দুজন নেতা জানান, বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক টেনে নেওয়া নিয়ে দলের ভেতরে নানা ধরনের মূল্যায়ন আছে। দলের নেতা-কর্মীদের বড় একটি অংশ মনে করছে, জামায়াতের ওপর যে দুর্যোগ চলছে, তা বিএনপির সঙ্গে থাকা এবং দলের নীতিনির্ধারকদের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে। এখন বিএনপি যদি জামায়াতকে ছেড়েও দেয়, তাতে দলটির খুব লাভ-ক্ষতি নেই। তবে বৈরী পরিস্থিতির কারণেই এসব মূল্যায়ন সামনে আনা হচ্ছে না।
২০-দলীয় জোটের একাধিক শরিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা প্রথম আলোকে বলেন, সরকার জামায়াতকে একটি সহিংস দল হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলের একটি অংশকে বোঝাতে সমর্থ হয়েছে। যেহেতু দেশি ও আন্তর্জাতিকভাবে জামায়াত-বিএনপি সম্পর্ক একটি নেতিবাচক অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, সে ক্ষেত্রে বিএনপি সলাপরামর্শের ভিত্তিতে জামায়াতকে দূরে রাখার একটা কৌশল নিতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২০ দলের একজন শীর্ষ নেতা ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, জামায়াত গণতান্ত্রিক পথে আছে। এর পরও পৃথিবীর ভুল ভাঙতে আমি জোটের প্রধান হলে জামায়াতকে আপাতত তালাকই দিতাম।’ অবশ্য জোটের আরেক শরিক দল ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামী মনে করেন, আপাতত এ কৌশল নেওয়া হলে জোটে আস্থাহীনতা দেখা দেবে।
জোটের নেতাদের একটি অংশের মত হচ্ছে, সরকার তার রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে শুরু থেকেই জামায়াতকে বিএনপির কাছ থেকে ছোটাতে চাইছে। বিষয়টি এখন অনেকটাই প্রকাশ্য। এ অবস্থায় জোটের অন্যতম শক্তি হিসেবে জামায়াতকে ছেড়ে দেওয়া হবে সরকারের কাছে রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ।

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন