ভয়ের সংস্কৃতির শিকড়-সন্ধান

বইয়ের প্রচ্ছদ
বইয়ের প্রচ্ছদ

ভয়ের সংস্কৃতি: বাংলাদেশে আতঙ্ক ও সন্ত্রাসের রাজনৈতিক অর্থনীতি
আলী রীয়াজ, ২০১৪, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা।

সাবিন মাহমুদ, পাকিস্তানের একজন মানবাধিকারকর্মী। করাচির প্রাণকেন্দ্রে নিজ ক্যাফে ‘দ্য সেকেন্ড ফ্লোরের’ সামনে গত এপ্রিলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। সমমনা কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, গায়ক আর মুক্তমনাদের মিলনমেলা হয়ে উঠেছিল দ্য সেকেন্ড ফ্লোর। বেলুচিস্তানে বছরের পর বছরজুড়ে বেলুচদের ওপর চলা নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়াই তাঁর অপরাধ। বেলুচিস্তান নিয়ে এক সেমিনারে অংশ নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। এর আগে লাহোরের প্রখ্যাত লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সে এ রকম একটি সেমিনার বাতিল করতে হয়েছিল সরকারের চোখরাঙানির কারণে। করাচির সেমিনারকে ঘিরেও সরকারের কাছ থেকে হুমকি রয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কোনো বাধা মানেননি তিনি।

সাবিনের স্মরণে দ্য ফ্রাইডে টাইমস-এ অসাধারণ এক শোকগাথা লেখেন পাকিস্তানি কবি ও সাহিত্যিক সালমান তারিক কোরেশি। লেখার ইতি টানেন এভাবে: ‘তাঁকে মারা হয়েছে কারণ মুক্তচিন্তা বেশ ছোঁয়াচে। এর দ্রুত বিস্তার রোধে যেসব জায়গায় এর জন্ম, সেখানেই এর বিনাশ জরুরি। তাঁর হত্যাকাণ্ড বাকিদের জন্য এক সতর্কবার্তা।’১

 সাবিনের মতো একদল মানুষের স্বাধীন চিন্তা আর কাজের রাশ টেনে ধরার জন্য তাদের ভেতর ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে আতঙ্ক। আর এভাবেই স্বচ্ছতা, অবাধ তথ্যপ্রবাহ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে আতঙ্ক আর ভয় হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের শক্তিশালী অস্ত্র।
২.
ভয় ও আতঙ্কের এই সংস্কৃতি বাংলাদেশেও বিরাজমান। প্রথমা থেকে প্রকাশিত আলী রীয়াজের ভয়ের সংস্কৃতি: বাংলাদেশে আতঙ্ক ও সন্ত্রাসের রাজনৈতিক অর্থনীতি বইটিতে বাংলাদেশে ভয়ের সংস্কৃতির শেকড়-সন্ধান আর এর ব্যাপকতা বোঝার এক প্রয়াস। সমাজে বিদ্যমান নানা চাপান-উতোর, জাতীয় সমস্যা, সাম্প্রতিক সহিংস রাজনীতি, রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান এবং কীভাবে ভয়ের সংস্কৃতি আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনকে প্রভাবিত করছে, তা বুঝতে হলে এই বইয়ের পাতা ওল্টাতেই হবে।

আলী রীয়াজ মনে করেন, ‘ভয়ের সংস্কৃতি উপস্থিত সর্বত্র এবং তা সম্পর্ককে ভাগ করে দিচ্ছে পদসোপান অনুযায়ী: প্রবল ও অধস্তন; পেট্রন ও ক্লায়েন্ট—এভাবে। এই সম্পর্ক কেবল গোষ্ঠীগতই নয় ব্যক্তিতে ব্যক্তিতেও উপস্থিত। বাংলাদেশের যেকোনো স্থানে জবরদস্তির যে উপস্থিতি আমরা দেখতে পাই, মানুষ হিসেবে মানুষের ন্যূনতম সম্মান যে কোনোখানেই কেউ কাউকে দিতে নারাজ, তা-ও আসলে সৃষ্টি অন্যকে ভীত করে নিজের কাজ আদায়ের মানসিকতা থেকে’ (পৃষ্ঠা-১৫)।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ শুরুর দিকে ভয়ের সংস্কৃতি এবং এর নানা দিক ব্যাখ্যা করেছেন। যে সমাজে এই ভয়ের সংস্কৃতি বিদ্যমান, সেখানে সহিংসতা আর বলপ্রয়োগ সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠী আর মানুষের মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করে। ভয়ের সংস্কৃতির উদ্দেশ্য হচ্ছে ভিন্নমতকে স্তব্ধ করে দেওয়া। গ্রামসিকে উদ্ধৃত করে রীয়াজ বলছেন, ‘একটি গোষ্ঠী আরেকটি গোষ্ঠীর ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করতে চাইলে প্রথমেই আদর্শিক আধিপত্য স্থাপন করতে হবে। আর আদর্শিক কর্তৃত্ব স্থাপন করতে হলে একটি গোষ্ঠী যে আরেকটি গোষ্ঠীর চেয়ে নৈতিক ও বস্তুগত দিক দিয়ে শ্রেয় তা প্রমাণ করতে হবে’ (পৃষ্ঠা-২৩)।

আর সমাজের ক্ষমতাবান ও আধিপত্যকামী গোষ্ঠী নিজের মতাদর্শকে প্রধান করে তোলার জন্য সমাজে বিরাজমান অন্যান্য মতাদর্শকে কোণঠাসা করে একেবারে পেছনের দিকে ঠেলে দেয়। কাজেই ক্ষমতার মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে প্রান্তিকতার। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের মতে, সংস্কৃতির ক্রিয়াশীলতার মধ্যে একটি প্রান্তিকতা আছে। প্রতিটি সংস্কৃতির রক্ষক বা মোড়ল থাকে। এই মোড়লেরা সংস্কৃতির সংজ্ঞা ও কার্যক্রম নির্ধারণ করে দেন। আর সংজ্ঞার মাধ্যমে তৈরি ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে সাংস্কৃতিক মতাদর্শ। আর এই ব্যাখ্যা হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যা, কেন্দ্রের ব্যাখ্যা। সমাজে ক্ষমতাসীনদের এই ব্যাখ্যা ও মতাদর্শের বিপরীতে অবস্থান নেওয়ায় ব্যাখ্যা ও মতাদর্শের ঠাঁই হয় প্রান্তিক অবস্থানে। আর সমাজ গঠনে অসমভাবে ছড়ানো আছে প্রান্তিকতার অবস্থান ও বিভিন্ন মুহূর্ত। আর এটিই কেন্দ্রের সঙ্গে প্রান্তিকতার সম্পর্ক নির্ধারণ করছে।২

রীয়াজ এরপর পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ভয়ের সংস্কৃতির রাজনৈতিক অর্থনীতির দিকে। রীয়াজের পর্যবেক্ষণ, একদল মানুষ বা একটি সুসংগঠিত শক্তির প্রতিনিধিত্বকারী শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতায় থাকার জন্য নিজেদের মতো করে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করেছে। আর বিভিন্ন সরকারের শাসনামলে ভয়, সহিংসতা ও বলপ্রয়োগের উপস্থিতি ছিল।

বাংলাদেশে আইনের শাসনের অভাব আর আমলাতন্ত্রের স্বাধীনতা কীভাবে বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন কায়েম করেছে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রীয়াজ তুলে ধরেন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের পর্যবেক্ষণ: ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঐতিহ্যে আইনের শাসন নেই। ব্রিটিশ শাসনের প্রথম ১০০ বছরে আইন ছিল প্রশাসনিক ফরমান, ডিক্রি, অনুশাসন। ১৯১৯ অ্যাক্ট থেকে ১৯৩৫ অ্যাক্ট পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ে জনগণের ভোটাধিকার ছিল সীমিত, এই ভোটাধিকার বৃদ্ধির জন্য জনগণকে প্রচণ্ড লড়াই করতে হয়েছে। ১৯৩৫ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত কেন্দ্রের এবং প্রদেশের সরকারগুলো আইন বিভাগীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের গুরুত্ববহ সদস্য ছিল সরকারি কর্মকর্তাই এবং সরকার মনোনীত। পাকিস্তান আমলে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে আইনের শাসন কার্যকর ছিল না। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভবের পর প্রাথমিক পর্যায়ে আইনের শাসন সংকুচিত ছিল। জিয়াউর রহমান কালপর্বে বিকেন্দ্রীকরণের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দেশ শাসনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রপতি, সেনাবাহিনী, আমলাতন্ত্র থেকে রিক্রুট করা মনোনীত মন্ত্রী এবং বাছাই করা “জনপ্রতিনিধি”র মন্ত্রীর ছিল করায়ত্ত। জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসন থেকে বেসামরিক শাসনে প্রত্যাবর্তনের পশ্চাত্পটে ছিল ব্যর্থ একটি সামরিক অভ্যুত্থান, অভ্যুত্থান-পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের বৈঠক এবং বৈঠক-পরবর্তীতে লাইসেন্সের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের কার্যক্রমের বৈধতা দেওয়া এবং এই প্রক্রিয়ায় তার বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনা। এরশাদ আমলে এই প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায় লাভ করেছিল। এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় দেশ শাসনে আইনের শাসন নেই, এই আইন জনগণ তৈরি করেনি বরং তৈরি হয়েছে জনগণের জন্য: ফলে তৈরি হয়েছে দ্বিবিধ মন, একটি বেসামরিক/সামরিক রাষ্ট্র পরিচালকদের জন্য, অপরটি জনসাধারণের জন্য; একটি আমলাতন্ত্রের জন্য অপরটি ক্ষমতাসীনদের জন্য; একটি পার্টির জন্য অপরটি পার্টি-বহির্ভূত জনসাধারণের জন্য। এই প্রক্রিয়া বাংলাদেশ রাষ্ট্রে আইনের শাসনের ঐতিহ্য তৈরি করেনি বরং তৈরি করেছে কর্তৃত্ববাদী শাসনের ঐতিহ্য। অন্য পক্ষে এই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যে সংস্কৃতিতে ঐতিহাসিক চূড়ান্ততা হচ্ছে কর্তৃত্ববাদ। এই কর্তৃত্ববাদ ব্যবহার করেছে উদারনৈতিকতা, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, আইনের শাসন (শেখ মুজিবের মুজিববাদ, জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্র, এরশাদের উন্নয়নের রাজনীতি, খালেদা জিয়ার ব্যক্তিক কাল্ট) অলজ্জিতভাবে আইনবহির্ভূত প্রভুত্বের রাজনীতি বিস্তারের জন্য (পৃষ্ঠা-৪৪)।’

স্বাধীনতার পরপরই যে সরকার ক্ষমতায় এল, তা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দলীয় কর্মীদের ক্ষেত্রবিশেষে বাড়াবাড়ি, দুর্নীতি সামাল দিতে ব্যর্থ হলো। শাসকশ্রেণি জনগণের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপনের জন্য সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হলো রাষ্ট্রের ওপর। শিল্পকারখানা, সমাজতন্ত্র আর অর্থনীতিতে জাতীয়করণ করা হলো নামে। আর ঠিক এ রকম অবস্থায় জনগণের মধ্যে আদর্শিক আবেদন কমে যাওয়ায় শাসকশ্রেণি সমাজে বিরাজমান অন্য আদর্শগুলোর ওপর নিজের আধিপত্য বিস্তারে নির্ভর করল বলপ্রয়োগের ওপর। রাষ্ট্রের বিভিন্ন বাহিনীকে এ জন্য ব্যবহার করা হলো। ৭ মার্চ ১৯৭২-এ জাতীয় রক্ষীবাহিনী অধ্যাদেশ ১৯৭২ নামে রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে গড়ে তোলা হলো রক্ষীবাহিনী নামে সম্পূর্ণ নতুন এক নিপীড়ক বাহিনী।৩

১৯৭৫ থেকে ১৯৯০-এর সময়টিতে বাংলাদেশ ‘ইন্টারমিডিয়েট স্টেট’ থেকে ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ স্টেট’-এ পরিণত হয়। সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের হাতে ছিল রাষ্ট্রের সম্পদ পুনর্বণ্টনের ভার। পঁচাত্তর-পরবর্তী দুটি সামরিক সরকারের সময় নিপীড়ন, রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা আর সংবিধানকে ইচ্ছেমাফিক ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এর বাইরে এ সময় ধর্মকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে নিয়ে আসা হয়। বিরোধী মতাদর্শ দমনে রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে বলপ্রয়োগের সংস্কৃতি এ সময় আরও কদর্য ও হিংস্র রূপ লাভ করে। পঁচাত্তরের ঠিক পরবর্তী বছরগুলোতে সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থান ও পাল্টা-অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে সে সময়কার শাসকশ্রেণি সামরিক বাহিনীগুলোতে ‘শৃঙ্খলা’ ফিরিয়ে আনার অজুহাতে সেখানে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে লোক দেখানো বিচারের নামে ভিন্নমতাদর্শীদের মৃত্যুদণ্ড দেয়। এর ভেতর কেবল ১৯৭৭ সালের ৯ অক্টোবর থেকে পরবর্তী দুই মাসের মধ্যে ১ হাজার ১৪৩ জনকে ফাঁসি দেওয়া হয়। আর কয়েক শ জনকে ১০ বছরমেয়াদি কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ভাষায় এসব ‘বিচার’ বিচার ছিল না। এসব করা হয়েছিল সে সময়কার শাসকশ্রেণির প্রতিহিংসা মেটানোর জন্য।৪

 ১৯৯১ সালে নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে। নতুন প্রজন্মের একদল পুঁজিপতির আবির্ভাব ঘটে আর সম্ভাবনা তৈরি হয় মতৈক্যের ভিত্তিতে শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার, যেখানে আইনের শাসন নিশ্চিত হবে। কিন্তু ক্ষুদ্র স্বার্থ আর শাসক পরিবারগুলোর মধ্যে বৈরী প্রতিযোগিতা সেই সম্ভাবনায় পানি ঢেলে দেয়। আর তখন থেকেই শাসকগোষ্ঠী নির্ভরশীল হয়ে পড়ে নিপীড়ক প্রতিষ্ঠান আর নানা কালো আইনের ওপর।

৩.

শাসকগোষ্ঠীর জন্য হুমকিস্বরূপ স্বাধীন মতকে বাধা দিতে কীভাবে এই ভয়ের সংস্কৃতি ব্যবহার করা হচ্ছে, তা-ও আলী রীয়াজ বিশদ আলোচনা করেন এ বইয়ে। রীয়াজ অসংখ্য উদাহরণ দিয়ে দেখান কীভাবে বিভিন্ন সময়ে শাসক দল আর রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো জনগণের মতামতকে প্রভাবিত করার জন্য সহিংসতায় কর্তৃত্ব স্থাপনের প্রতিযোগিতায় নেমেছিল।

পত্রিকা প্রতিবেদন আর পরিসংখ্যান দিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, এই গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সমাজে একটি আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করছে, যেখানে মানুষ অসহায়, আতঙ্কিত এবং সহজে বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। আতঙ্কিত মানুষ সাধারণত অন্যায়কে উপেক্ষা করে এবং কখনো এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে না। এই ভীতিকর পরিবেশ প্রচলিত ব্যবস্থাকে বজায় রাখতে বেশ কাজ করে। আর আতঙ্কিত সমাজে প্রতিবাদকারী মানুষের সংখ্যাও বেশ কমে যায়। আর জনগণের সামনে ক্ষমতা প্রদর্শন করতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও বেছে নেয় সহিংস পথ।

 অতীতে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি আর সরকারের কার্যক্রমের দিকে তাকালেই এর সত্যতা মেলে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ৮৮ জন, যাঁদের ভেতর ১২ জন পরে মুক্তি পান, গুম ও গুপ্তহত্যার শিকার হন। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতন ও কারা হেফাজতে মারা যান ৭৩ জন।৫ বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটকে ৫ জানুয়ারির রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে বাধা দেওয়ায় যে সহিংস অবরোধ শুরু হয়, তাতে আসকের হিসাব (জানুয়ারি-এপ্রিল) মতে ৬১৩টি ঘটনায় প্রাণ হারান ১২৫ জন (অবরোধে নিহত হন ৭৮ জন) আর আহত হন ৩৩৭০ জন।৬ আর সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান হতাহতের যে হিসাব (৫ জানুয়ারি-২৪ ফেব্রুয়ারি) দেন, সেখানে দেখা যায়, ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মারা যান ১১৯ জন, এঁদের মধ্যে বিএনপি-জামায়াত জোটের অবরোধের বলি হন ৬১ জন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মারা যান ৩৭ জন।৭

৪.

রীয়াজ মনে করেন, ভয়ের সংস্কৃতি একটি ‘সামাজিক প্রপঞ্চ’, যার স্বরূপ উন্মোচিত হয় ‘অনুশীলন (বা প্র্যাকটিস)’ এবং ‘আলোচনা (বা ডিসকোর্স)’-এর ভেতর দিয়ে। বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি টেনে আনেন ফরাসি দার্শনিক এতিয়েন বালিবারকে। বালিবারকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন: ‘বর্ণবাদের প্র্যাকটিসগুলো হলো সহিংসতা, ঘৃণা, অসহিষ্ণুতা, মানহানি, শোষণ। আর তার পাশাপাশি আছে ডিসকোর্স, যেগুলো অন্যকে আলাদা বলে ক্রমাগতভাবে চিহ্নিত করতে তত্পর। গায়ের রং, নাম, ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে একধরনের স্টেরিওটাইপ বা ছাঁচে ফেলা ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করে; অন্যকে সেভাবেই প্রতিনিধিত্ব করে (পৃষ্ঠা-৬৫)।’ বাংলাদেশে বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সম্পর্কে প্রচলিত ডিসকোর্সের দিকে তাকালেই এই বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায়। এ দেশের আদিবাসীদের ব্যাপারে এ ধরনের ডিসকোর্সগুলো বেশ চোখে পড়ার মতো।

‘আদিবাসীদের সাংবিধানিক অস্বীকৃতির সাথে আছে সমাজে তাদের সমান বলে স্বীকার না করে নেওয়ার প্রবণতা। আমাদের এখানে আমরা নিজেদের বাঙালি/বাংলাদেশী নামে পরিচয় দিই আর অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের চিহ্নিত করি “উপজাতি” হিসেবে, তাদেরকে বুঝিয়ে দেওয়া যে তাদের মর্যাদা জাতির সমান নয়। কিন্তু এই চিহ্নিতকরণ কতটা যুক্তিসংগত? নৃবিজ্ঞানী প্রশান্ত ত্রিপুরার মতে, নৃবিজ্ঞানে “উপজাতি” বলতে এমন একটি জনগোষ্ঠীকে বোঝায়, যাদের সমাজব্যবস্থা জ্ঞাতি সম্পর্কের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং যেখানে রাষ্ট্রের উপাদানসমূহ অনুপস্থিত। এই অর্থে তথাকথিত “উপজাতি”দের সে নামে ডাকার কোনো যৌক্তিকতা বর্তমানে নেই, কারণ তারা কেউই রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার বাইরে স্বাধীন গোষ্ঠীভিত্তিক সমাজ হিসেবে বাস করে না।’৮

আলী রীয়াজের পর্যবেক্ষণ, ‘সরকারি ও বেসরকারি উভয় অংশ থেকে, “উপজাতিদের জাতীয় জীবনের মূলধারায় সম্পৃক্তকরণের” জন্য যে চেষ্টা ও আহ্বান থাকে, তাতে চিহ্নিত হয় “মূলধারা” ও “প্রান্তিক” অবস্থানের বিষয়টি (পৃষ্ঠা-৬৬)।’

নৃবিজ্ঞানীর বয়ানে রীয়াজ তুলে ধরেন কীভাবে আদিবাসীদের নিজ ভূমিতে দৈনন্দিন নানা আচরণের মধ্য দিয়ে অসম্মানজনক জীবনযাপনের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘চাঁদের গাড়ি’ নামে যে বিশেষ ধরনের যান রয়েছে, তার সামনের সারির আসনগুলোয় আদিবাসীদের বসার অধিকার নেই। এমনকি যাত্রী না থাকলেও আদিবাসীদের পাড়াপ্রধান অথবা মৌজাপ্রধানদের পাদানিতে ঝুলে গন্তব্যে যেতে হয়। আর নৃবিজ্ঞানীর নিজস্ব বর্ণনায় পাহাড়িদের অবমাননার কদর্য রূপটি উঠে আসে, ‘আর হেল্পারদের ভাষা ব্যবহারের রীতি বুঝতে পারলে, মনের সকল তত্ত্ব জানা যায়। পাহাড়িদের জন্য প্রথম, এবং শেষ, সম্বোধন হচ্ছে “তুই” আর অপাহাড়িদের জন্য সম্বোধন হচ্ছে “আপনি” আর আপনার [কাছের মানুষ] লোক হলে বড়জোর “তুমি”।...এ হচ্ছে পাহাড়ে বিদ্যমান পাহাড়ি-সম্পর্কিত বাঙালি মনস্তত্ত্ব।’৯

আদিবাসীদের নিজ জমি থেকে উত্খাত করার জন্য সেখানে ঘটানো হচ্ছে সহিংসতা। আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা কাপেং ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ভূমিকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৫৩টি পরিবার আক্রান্ত হয়েছে এবং বসতবাড়ি পুড়েছে ৫৮টি। আর সহিংসতার ঘটনায় হতাহত মানুষের সংখ্যা ১২৬। কাপেং ফাউন্ডেশনের দাবি অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে ৩ হাজার ৯১১ একর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ভূমি বেদখল হয়ে গেছে। এর মধ্যে বান্দরবানের লামা উপজেলায় এক প্রভাবশালী গোষ্ঠী প্রায় ১৭৫ একর আদিবাসীদের জমি জোর করে দখল করে নেয় আর উচ্ছেদ করে ৭৪টি আদিবাসী পরিবারকে।১০

আলী রীয়াজের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, আদিবাসীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ভয়ের সংস্কৃতির তিনটি মাত্রা রযেছে: প্রথমত, সংবিধানে তাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। দ্বিতীয়ত, তাদের নিজস্ব স্বকীয়তা ও বৈশিষ্ট্য নিশ্চিহ্ন করার জন্য সংস্কৃতির বস্তুগত ভিত্তি ধ্বংস করা। তৃতীয়ত, চিরস্থায়ী আধিপত্য বজায় রাখার জন্য তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ন্ত্রণ করা (পৃষ্ঠা-৭৩)।

বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আদিবাসীদের কোনো অস্তিত্ব নেই। সেখানে তাদের বদলে রয়েছে ‘ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী’। আদিবাসী সাঁওতালদের ভূমির লড়াই আর বঞ্চনার ইতিহাস নিয়ে আরণ্যক নাট্যদলের এক অসাধারণ নাটক রাঢ়াঙ, যার মানে দূর থেকে ভেসে আসা মাদলের ধ্বনিতে জেগে ওঠার আহ্বান। মামুনুর রশীদের রচনা ও নির্দেশনায় নাটকটিতে দেখা যায় মহাজনের শঠতা আর ঋণের চক্রে পড়ে জমি হারাতে বসা একদল সাঁওতাল ছুটে আসে ঢাকার এক নামকরা উকিলের কাছে। সাঁওতালরা জমির মাপজোখ বোঝে না আর জমির নথিপত্র রাখার ব্যাপারটাও জানে না। উকিল সাহেব তাদের অভয় দেন আইএলও কনভেনশনের ১৬৯ ধারার কথা বলে, যেখানে আদিবাসী হিসেবে সাঁওতালদের নিজ ভূমির ওপর অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।১১

কিন্তু সংবিধান যেখানে আদিবাসীদের অস্তিত্বই স্বীকার করে না সেখানে নিজ ভূমির ওপর তাদের অধিকার নিশ্চিত হবে কীভাবে? আর নিজস্ব ভূমিতে গড়ে ওঠা জীবনধারা ও সংস্কৃতিও বিপন্ন হয়ে পড়ে যখন তারা নিজের ভূমির ওপর অধিকার হারায়। অন্যদিকে, তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটি ঘটছে সংখ্যাগুরুর ভাষা দিয়ে তাদের মাতৃভাষা প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে। আলী রীয়াজের ভাষায়, ‘আদিবাসী ভাষাকে প্রবল জনগোষ্ঠীর ভাষা দিয়ে পরাজিত করার ফলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও জীবনই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে প্রবল জনগোষ্ঠীর দ্বারা (পৃষ্ঠা-৮৬)।’

৬.

একটি গোষ্ঠীর অপর গোষ্ঠীর ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চাইলে সমাজে একধরনের অসম সম্পর্কের দরকার। সম্পদের ওপর অসম অধিকার, আদর্শিক আধিপত্য আর সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহের মাধ্যমে সমাজে অসম সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। সম্পদের ওপর অসম অধিকার সমাজের ভেতর সামাজিক অবস্থানের এক পদসোপান তৈরি করে। যার সম্পদ যত বেশি, সমাজে তার অবস্থান তত উঁচুতে। লিঙ্গজ সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। প্রচলিত আইন পারিবারিক সম্পত্তিতে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত না করায় সমাজে নারীর অবস্থান একটু নিচের দিকেই।

সমাজে বিভিন্ন সময়ে যেসব আদর্শের প্রাবল্য দেখা যায়, তার কারণেও সম্পর্কে অসমতা সৃষ্টি হয়। দুটি উপায়ে ভাবাদর্শ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর প্রাধান্য স্থাপন করে। ‘প্রথমত, একটি নির্দিষ্ট ধরনের ডিসকোর্স তৈরি ও তা বহাল রাখার মাধ্যমে; দ্বিতীয়ত, ওই ডিসকোর্সের স্বীকৃতি ও অনুমোদনের ব্যবস্থা করে (পৃষ্ঠা-৮৯)।’

আমাদের সমাজে ‘নারী আর পুরুষ সমান নয়’, ‘পুরুষ স্বভাবতই আক্রমণকারী’, ‘মহিলাদের কাজ এটা, ওটা তাদের কাজ নয়’—এ ধরনের ডিসকোর্সের গ্রহণযোগ্যতা লিঙ্গজ অসমতা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। অসম সম্পর্ক তৈরিতে রাষ্ট্রেরও দায় আছে। রীয়াজ আরও আলোচনা করেন, কীভাবে রাষ্ট্র বৈষম্যমূলক আর সাংঘর্ষিক আইন তৈরির মাধ্যমে এই অসম সম্পর্ক তৈরি করছে। রীয়াজের পর্যবেক্ষণ—সমাজে অসম সম্পর্ক বজায় রাখার অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে বলপ্রয়োগ, সহিংসতা ও আতঙ্ক।

হিন্দুরা কীভাবে রাজনৈতিক সংকটের বড় শিকার হচ্ছে, তা-ও উঠে আসে রীয়াজের বইয়ে। বারবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আঘাত একটি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে আর বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। এ ধরনের আক্রমণ তাদের আতঙ্কিত করে তুলেছে আর তাদের ভেতর গভীর অনিশ্চয়তার বোধ তৈরি করেছে। এই অনিশ্চয়তা বোধ তাদের নিজ ভূমিতে পরবাসী করেছে। রীয়াজ আদমশুমারি আর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বিশ্লেষণ করে দেখান যে, কীভাবে ১৯৯১ থেকে ২০০১-এর সময়ের সরকারি হিসাব থেকে এক উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জনগোষ্ঠী বাদ পড়ে গেছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা না হলে তাকে সব সরকারই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত হিসেবে চালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু উল্লিখিত সময়ে বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা না ঘটলেও হিন্দুদের ব্যাপক হারে দেশত্যাগ এই দৃষ্টান্তকে ঠুনকো প্রমাণ করেছে বলে মনে করেন রীয়াজ। তিনি প্রথম আলোর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়েছে ২০০১ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে হিন্দু জনসংখ্যা নয় লাখ কমে গেছে। এ জন্য হিন্দুদের মোট প্রজনন হার তুলনামূলকভাবে কম বলে দাবি করা হলেও প্রতিবেদক নিজস্ব অনুসন্ধানে জেনেছেন এর প্রধান কারণ দেশত্যাগ, যার মূলে রয়েছে সমাজে বিরাজমান ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ।১২ এ ছাড়া বৈষম্যমূলক আইন আর পক্ষপাতমূলক সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্র এই সংস্কৃতির বিকাশে সাহায্য করেছে।

২০১৩ সালের ৫ জানুয়ারি-উত্তর সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পর দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আক্রান্ত জায়গাগুলো ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছিল। দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ের গড়েয়া ও কর্নিয়া জায়গা দুটি এর ভেতর ছিল। বসতবাড়ি, বাজার, মন্দির কোনোটিই সাম্প্রদায়িক আক্রমণের ছোবল থেকে বাদ যায়নি। একজন আক্রান্ত গ্রামবাসী আফসোস করে বলছিলেন, ‘৭১, ৯৬, ২০০৮, এমনকি বাবরি মসজিদ ভাঙার জের ধরে সারা দেশে হিন্দুদের ওপর সহিংসতা চললেও তার ঢেউ কর্নিয়াতে পড়েনি। তবে এবার সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। বেছে বেছে হিন্দুদের ঘরবাড়ি ও সম্পত্তির ওপর আক্রমণ করা হয়েছে।’ পাশের একটি গুদামঘরের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানালেন ওই ঘরেই লুট করা সামগ্রী আর মালামাল জমা করা হয়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এতটাই খারাপের দিকে গিয়েছিল কর্নিয়ায়।

দিনাজপুরের গড়েয়ায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার রূপ ছিল সবচেয়ে বীভত্স। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা কাউকেই করুণা দেখায়নি দাঙ্গাবাজরা। টিনের তৈরি ঘরবাড়ি ও দোকানে এমন তাণ্ডব চালানো হয়েছিল, দেখে মনে হয় যেন টর্নেডো বয়ে গেছে পুরো গ্রামের ওপর দিয়ে। সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধা সুমি বেওয়া কেঁদে কেঁদে বর্ণনা দিচ্ছিলেন কীভাবে আক্রমণকারীরা তাঁর কান ছিঁড়ে দুল নিয়ে গেছে। সুমি বেওয়া অভিযোগ করেন, ‘ওরা দলবেঁধে এসে আমাদের পেটাতে শুরু করে। চলে যাবার সময় বলে যায় ওরা আমাদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলবে, আমরা যেন এ দেশ ছেড়ে চলে যাই। এ দেশ নাকি আমাদের নয়।’১৩

৭.

ফতোয়া আর সালিস কীভাবে স্থানীয় ও তার ক্ষুদ্র গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় জীবনে স্থান করে নিচ্ছে, তার বিশদ বর্ণনা আছে ‘ফতোয়া আর সালিসের রাজনীতি’ অধ্যায়ে। একটি নির্দিষ্ট আদর্শ যখন সমাজে আধিপত্য বিস্তার করতে চায়, তার ভাবানুসারীরা নতুন কাঠামো তৈরি করে একধরনের ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে বশে আনতে চায়। শুরুর দিকে ফতোয়ার পরিধি এলাকা পর্যায়ে ব্যক্তির ওপর সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে তা বড় হতে হতে সংগঠন, বিশেষ করে উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের কাজকর্মকেও এর আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করে। এমনকি প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি এই নতুন বিধান রাষ্ট্রের সমর্থনে জায়গা করে নিয়েছে সংবিধানে। রীয়াজ বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরকে উদ্ধৃত করে এই নতুন বিধানকে অভিহিত করেন ‘জীবনযাপন আর জগত্সংসার সম্বন্ধে দৃষ্টিভঙ্গি’। ধর্মকে কেন্দ্র করে একধরনের ব্যাখ্যা এ ‘দৃষ্টিভঙ্গি’র মূল ভিত্তি। আর এই ‘দৃষ্টিভঙ্গি’ হচ্ছে একধরনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা নমনীয় ও সহনশীল নয়। ‘আতঙ্ক’ ও ‘সন্ত্রাস’ তৈরি আর বিস্তারই হচ্ছে এ রাজনীতির মূল ইন্ধন।

উপসংহারে রীয়াজ ভয়ের সংস্কৃতির পরিণতি নিয়ে আলোচনা করেন। যে সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি প্রবল, সেখানে রাষ্ট্র কর্তৃত্বপরায়ণ রূপ নেয়। আরেকটি পরিণতি হচ্ছে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র, যেখানে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক ভয় মানুষকে রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকতে বাধ্য করে। ভয়ের সংস্কৃতি মানুষকে হতাশ ও আশাহীন করে তোলে। এ অবস্থায় অনেকে চরম মতাদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়ে। পৃথিবীজুড়ে চরমপন্থার রাজনীতির বিকাশ এই কারণে ঘটছে বলে মনে করেন রীয়াজ।

৮.

এ বছরের বর্ষবরণে অসংখ্য লোকের ভিড়ে একদল নারীর লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা মনে আছে। পয়লা বৈশাখের মতো সর্বজনীন উত্সবে নারীর অংশগ্রহণ রুখতে আর সহনশীল ও উদার বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে। মানুষকে আতঙ্কিত করতেই এই পরিকল্পিত সহিংসতা। আচিন ভানায়েককে উদ্ধৃত করে রীয়াজ বলছেন, ‘সহিংসতা হলো এক নাটক। নাটক এই অর্থে যে তা অন্যদের সামনে বা জ্ঞাতসারে এটি ঘটানো হচ্ছে, যাতে করে এর প্রভাব অন্যদের ওপরও পড়ে। যার ওপর প্রত্যক্ষ সহিংসতা চালানো হলো না, তাকেও জানানো হলো তারও এই পরিণতি হতে পারে (পৃষ্ঠা-১৩)।’

আতঙ্কবাজরা যখন আমাদের স্বাধীন মতপ্রকাশের আকাশটাকে কালো মেঘে ঢেকে দিচ্ছে, তখন তার আড়ালে থাকা আশার সূর্যটার কথা জানান দিতে ভোলেননি রীয়াজ। রীয়াজের মতে, ব্যক্তির কাছেই রয়েছে এই অশুভ শক্তিকে মোকাবিলা করার অস্ত্র। ব্যক্তিকে বশ্যতার বদলে প্রতিরোধ করতে হবে, সহ্য করার বদলে প্রতিবাদ করতে হবে এবং চুপচাপ থাকার বদলে সরব হতে হবে। প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের পথে যাত্রা শুরুর আগে রীয়াজ আমাদের কবিগুরুর সেই অমোঘ বাণীর কথা মনে করিয়ে দেন: ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।’

টীকা

১.         সালমান তারিক কোরেশির শোকগাথা পড়তে দেখুন ‘She Was Killed Because of Poetry’, Salman Tarik Kureshi, The Friday Times, 01 May, 2015.http://www.thefridaytimes.com/tft/she-was-killed-because-of-poetry/

২.         বিস্তারিত জানতে দেখুন ‘প্রান্তিকতা, সংস্কৃতি ও মতাদর্শ’, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, সমাজ নিরীক্ষণ, সংখ্যা ৪৬, নভেম্বর ১৯৯২।

৩.        বিস্তারিত জানতে পড়ুন Inconvenient Truths About Bangladeshi Politics, Ali Riaz, 2012, Prothoma Prokashan, Dhaka.

৪.         প্রহসনের এসব বিচার আর এর শিকার হতভাগ্য মানুষের পরিসংখ্যান দেওয়া আছে এই বইয়ে—Bangladesh : A Legacy of Blood, Anthony Mascarenhas, 1986, Hodder and Stoughton Educational, London.

৫.         ২০১৪ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণ জানতে পড়ুন ‘বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০১৪: আইন ও সালিশ কেন্দ্র-এর পর্যালোচনা’, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৫।http://www.askbd.org/ask/2014/12/31/human-rights-situation-2014-asks-observation/

৬.        তিন মাসের রাজনৈতিক সহিংসতায় হতাহতদের পরিসংখ্যান জানতে দেখুন

            http://www.askbd.org/ask/2015/05/05/political-violence-january-april-2015/

৭.         ডেভিড বার্গম্যানের পরিসংখ্যান জানতে দেখুন ‘Political Crisis 2015---Analysis of Deaths’, David Bergman, 25 February, 2015.

            http://bangladeshpolitico.blogspot.com/2015/01/political-crisis-2015-analysis-of-deaths.html

৮.        আরও জানতে পড়ুন ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি: দেড় দশকের কীর্তন’, নাসিরউদ্দিন রহমান, দৈনিক ভোরের কাগজ, ২০ মার্চ ২০১৩।

            http://www.bhorerkagoj.net/content/2013/03/20/23.jpg

৯.         বিস্তারিত জানতে দেখুন ‘সংস্কৃতি, প্রান্তিকতা ও আত্মপরিচয়ের সংকট: বাংলাদেশে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী’, প্রশান্ত ত্রিপুরা, সমাজ নিরীক্ষণ, সংখ্যা ৪৬, নভেম্বর ১৯৯২।

১০.       বিস্তারিত জানতে পড়ুন, ‘‘Human Rights Report 2014 on Indigenous Peoples in Bangladesh’, Kapaeeng Foundation, 2015, Dhaka.

১১. আইএলওর ধারাটি পড়তে দেখুন http://www.ilo.org/dyn/normlex/en/f?p= NORMLEXPUB:12100:0::NO::P12100_ILO_CODE:C169

১২.       বিস্তারিত জানতে পড়ুন, ‘১০ বছরে ৯ লাখ হিন্দু কমেছে’, শিশির মোড়ল, প্রথম আলো ২২ সেপ্টেম্বর ২০১২।

১৩.      বিস্তারিত জানতে দেখুন ‘Snap Shots of Ruined Villages’, Rezaul Hoque, January 22, 2014. https://rezaulhoque.wordpress.com/2014/01/22/snap-shots-of-ruined-villages/