default-image

দেশে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। অনেকে উচ্চ রক্তচাপে ভুগলেও স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করায় তা জানেনও না। তাই ত্রিশোর্ধ্ব সবার উচিত বছরে অন্তত একবার পরীক্ষা করা। নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত এই রোগের প্রভাব মানুষের মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে পায়ের পাতা পর্যন্ত বিস্তৃত। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, হৃদ্‌রোগ, কিডনির জটিলতাসহ নানা রোগেরও কারণ এটি। অথচ একটু সচেতন থাকলে, শরীরচর্চা ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করলে রোগটি সহজেই নিয়ন্ত্রণ করে দীর্ঘদিন সুস্থভাবে বাঁচা সম্ভব।

বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস উপলক্ষে গতকাল শনিবার দুপুরে এক ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের আলোচনায় এসব বিষয় উঠে এসেছে। দেশের প্রথম সারির ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড ও প্রথম আলো যৌথভাবে এই গোলটেবিলের আয়োজন করে।

বিজ্ঞাপন

বৈঠকে বাংলাদেশ কার্ডিয়াক সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক এ এ সাফি মজুমদার বলেন, শুধু উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা নিয়ে রোগীরা খুব একটা চিকিৎসকের কাছে যান না। আর যখন চিকিৎসকের কাছে যান, তখন অবস্থা অনেক খারাপ থাকে, তখন রোগটি নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। অথচ শুরুতে রোগটি নির্ণয় করতে পারলে রোগ নিয়ন্ত্রণ অনেক সহজ হয়ে যেত। মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে পায়ের পাতা পর্যন্ত এই রোগের নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে উল্লেখ করে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক এই পরিচালক আরও বলেন, শরীরচর্চাকে জীবনযাত্রার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। রোগীটি সম্পর্কে সচেতন করতে গণমাধ্যমকেও দায়িত্ব নিতে হবে।

বিশ্বে মোট মৃত্যুর ৩ ভাগের ১ ভাগ হৃদ্‌রোগের কারণে হয় বলে বৈঠকে জানান জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক আফজালুর রহমান। তিনি বলেন, হৃদ্‌রোগে মৃত্যুর ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে দায় উচ্চ রক্তচাপের। অন্যদিকে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পেছনে ৫৪ শতাংশ ক্ষেত্রে বড় কারণ উচ্চ রক্তচাপ। তিনি বলেন, চারজন পুরুষের মধ্যে একজন ও পাঁচজন নারীর মধ্যে একজন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। গ্রামের চেয়ে শহরে উচ্চ রক্তচাপের রোগী বেশি। তবে গ্রামের রোগীদের ৩ ভাগের ২ ভাগ উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে সচেতন নন। এ ছাড়া গ্রামে আক্রান্তদের ৩ ভাগের ১ ভাগ কোনো চিকিৎসাও নেন না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদ্‌রোগ বিভাগের চেয়ারম্যান সৈয়দ আলী আহসান বলেন, উচ্চ রক্তচাপ হালকা, মাঝারি বা গুরুতর মাত্রার হতে পারে। মাঝারি ও গুরুতর মাত্রার উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করতে হবে। তবে কারও মধ্যে হালকা মাত্রার উচ্চ রক্তচাপ থাকলে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে, নিয়মিত হেঁটে এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

বিজ্ঞাপন

বৈঠকে যুক্ত ছিলেন ইউনাইটেড হাসপাতালের হৃদ্‌রোগ বিভাগের চিফ কনসালট্যান্ট এন এ এম মোমেনুজ্জামান। তিনি বলেন, উচ্চ রক্তচাপ বড় ও মধ্যম আকারের রক্তনালিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। শুধু উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি ২০-২৫ শতাংশ কমানো যায়।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক মীর জামাল উদ্দিন বলেন, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের ২০-২৫ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। কিন্তু তাঁদের মধ্যে কতজন জানেন না তাঁরা এই রোগে আক্রান্ত, সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একবার উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ খাওয়া শুরু করলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া হঠাৎ বন্ধ করা যাবে না।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম। তিনি চর্বিযুক্ত খাবার ও ধূমপান পরিহার করার পরামর্শ দেন। শিশুরা যেন সব সময় কম্পিউটার বা ল্যাপটপ নিয়ে বসে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

উচ্চ রক্তচাপ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি ৫০ শতাংশ বাড়ায় বলে জানান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদ্‌রোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে রোগী মারা যান। যাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের এক-তৃতীয়াংশ হয়তো পুরোপুরি সুস্থ হন, দুই-তৃতীয়াংশই পুরোপুরি সুস্থ হন না। উচ্চ রক্তচাপের যেসব রোগী নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে চান না, তাঁদের উদ্দেশে তিনি বলেন, নিয়মিত খাবার খাওয়ার মতো উচ্চ রক্তচাপকেও জীবনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে এবং নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হবে।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ইউনিট প্রধান সাবিনা হাসেম উচ্চ রক্তচাপকে একটি দুষ্টচক্র হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ডায়াবেটিস যাঁদের আছে, তাঁদের উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে। আবার যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাঁরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। রক্তচাপ বেশি থাকলে তা কিডনিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, আবার কিডনির সমস্যার কারণেও উচ্চ রক্তপাতের সূত্রপাত হতে পারে—এটি একটি দুষ্টচক্র।

অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে তা মা ও গর্ভের শিশু—উভয়ের জন্যই সমস্যার কারণ হতে পারে, এমনকি শিশুর মৃত্যুও হতে পারে বলে জানান ইউনাইটেড হাসপাতালের হৃদ্‌রোগ বিভাগের কনসালট্যান্ট ফাতেমা বেগম। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় সব ওষুধ খাওয়া যায় না উল্লেখ করে তিনি এই সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ গ্রহণের পরামর্শ দেন।

‘রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন, দীর্ঘ দিন বাঁচুন’ শিরোনামে গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

মন্তব্য পড়ুন 0