কৃষিতে গ্রামীণ নারীর অবদান: করোনাকালে চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

অংশগ্রহণকারী

কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ

চেয়ারম্যান, পিকেএসএফ

শামসুল হুদা

নির্বাহী পরিচালক, এএলআরডি

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

প্রধান নির্বাহী, বেলা

সানজিদা আক্তার

চেয়ারপারসন, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সান্ত্বনা খীসা

সেক্রেটারি, সিএইচটি নারী হেডম্যান-কার্বারি নেটওয়ার্ক, রাঙামাটি

শাহ-ই-মবিন জিন্নাহ

নির্বাহী পরিচালক, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (সিডিএ)

আবু সাঈদ খান

সিনিয়র সাংবাদিক

এএনএম ফজলুল হাদি সাব্বির

নির্বাহী প্রধান, বিএফএফ, ফরিদপুর

রওশন জাহান মনি

উপনির্বাহী পরিচালক, এএলআরডি

সূচনা বক্তব্য

আব্দুল কাইয়ুম

সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো

সঞ্চালনা

ফিরোজ চৌধুরী

সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো

বিজ্ঞাপন

আলোচনা

আব্দুল কাইয়ুম

আজকের আলোচনার শিরোনামে কৃষিতে নারীর অবদানের বিষয়টি রয়েছে। এই অবদানকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রাচীনকাল থেকেই পুরুষের পাশাপাশি নারী কৃষিতে অবদান রাখছেন। করোনার সময়ে সেটা আরও বেড়েছে।

নারীরা কৃষিতে অধিকাংশ কাজ করেন। এ খাতে তাঁরা বড় রকমের অবদান রাখেন। কিন্তু জমির মালিকানা সাধারণত থাকে পরিবার প্রধান হিসেবে পুরুষের কাছে। ফলে কৃষির যত সুযোগ-সুবিধা, সব পুরুষই পেয়ে থাকেন। নারী-কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দিলে তাঁরা আরও সামনে আসতে পারবেন। কৃষির অনেক কাজ নারী করার পরও তাঁদেরই আবার পুষ্টিহীনতায় ভুগতে হয়। এ জন্য তাঁদের সন্তানেরা পুষ্টিহীনতায় ভোগে এবং একটা দারিদ্র্যের চক্রে পড়ে যায়। সরকারের খাসজমি বণ্টনের সময় নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন—কীভাবে নারীর আরও বেশি ক্ষমতায়ন হয়, সামনে আসতে পারে। কোভিডের ফলে অনেকে কাজ হারিয়ে গ্রামে গেছেন। ফলে নারীর ওপর আরও বেশি চাপ পড়েছে। ঘরের কাজ, কৃষিকাজ—সবই তাঁকে দেখেতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ আলোচকেরা এসব বিষয় আলোচনা করবেন।

রওশন জাহান মনি

default-image

নারীপ্রধান কৃষিক্ষেত্র নিয়ে আজ কথা বলতে চাই। বিশ্বের একটি পরিসংখ্যান হলো, ৮০ শতাংশ খাদ্য উৎপাদিত হয় পারিবারিক কৃষি থেকে। বাংলাদেশ মূলত ক্ষুদ্র কৃষির দেশ। এখনো ৫০ শতাংশ কৃষি খামার গ্রামীণ নারীর শ্রমে পরিচালিত হয়।

বাংলাদেশ শ্রম জরিপ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে কৃষিতে নারীর সংশ্লিষ্টতা ৬৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭২ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য তাঁরা এখানে আসেননি। বিভিন্ন কারণে ধীরে ধীরে কৃষি অলাভজনক হয়ে উঠছিল। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে পোশাক, নির্মাণশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয়।

কৃষকেরা চাষাবাদ ছেড়ে পেশা পরিবর্তন করতে থাকেন। গ্রামীণ যুবক ও পুরুষ কৃষকেরা অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে চলে যাচ্ছেন। ফলে পরিবারে রেখে যাওয়া বাকি সদস্যদের জীবিকার চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে গেল। এ পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামীণ নারীরা শুধু ফসল কাটার জায়গায় থেমে থাকলেন না, বিভিন্ন রকম চাষাবাদে তাঁরা যুক্ত হলেন। জুম, মৎস্য, জৈব কৃষিসহ নানা ধরনের কৃষির চর্চা তাঁরা করতে শুরু করেছেন। খণ্ডিত জমিতে তাঁদের দ্বারা অনেক বেশি সম্ভব ছিল। একই সঙ্গে তাঁরা জমির স্বাস্থ্য, মাটির স্বাস্থ্য—সেখানেও তাঁরা নজর রেখেছেন।

নারীদের এসব উদ্যোগ নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে সহায়ক হয়েছে। কৃষির ২৩টি কাজের মধ্যে ১৭টি নারীরা করে থাকেন। সেখানে কৃষির প্রায় সব ধরনের কাজ রয়েছে। বয়স্ক ও শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা নারীরা করে থাকেন। যে নারীরা এত কিছু করছেন, তাঁদের অবস্থা কেমন। তাঁদের কি ক্ষমতায়ন হয়েছে? তা হয়নি। অনেক বঞ্চনার মধ্য দিয়েই তাঁরা এগুলো করে যাচ্ছেন। অথচ কৃষক হিসেবে তাঁদের স্বীকৃতি নেই।

কৃষিক্ষেত্রে মূল যেটি ধরা হয়, সেটি হলো কৃষিজমির মালিকানা ও বর্গার ক্ষেত্রে চুক্তি দলিল। এটি আমলে নিয়ে কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বাংলাদেশে অধিকাংশ নারীর এটা নেই। মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ নারীর কৃষিজমিতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এ জন্য নারী কৃষকেরা সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকেন।

নারী কৃষকেরা মূলত খাদ্যশস্য উৎপাদন করছেন, জৈব কৃষি চর্চা করছেন, ফলে মাটির গুণাগুণ এবং ভূমির সঠিক ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিত হচ্ছে। এত কিছুর পরও নারীরা পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন। তারপর এই কোভিড তাঁদের পুষ্টিহীনতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশের গ্রামীণ নারী কৃষকেরা পরিবারের পুষ্টি সরবরাহ করলেও নিজেরাই পুষ্টিহীনতার শিকার। বাংলাদেশে ৫০ শতাংশের বেশি নারীই পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন ফুড সিকিউরিটি নিউট্রিশনাল সার্ভিল্যান্স প্রোগ্রামের (এফএসএনএসপি) এক জরিপে দেখা গেছে, দেশে বয়সের তুলনায় খর্বাকৃতির কিশোরীর হার ৩২ শতাংশ, খর্বাকৃতির নারীর হার ৪২ শতাংশ, খাদ্যে কম পুষ্টি গ্রহণকারী নারীর হার ৬০ শতাংশ। দীর্ঘ মেয়াদে শক্তির ঘাটতি আছে, এমন নারীর হার ২৫ শতাংশ। এত সব প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে এল কোভিড।

করোনা মহামারি গ্রামীণ নারীর অর্থনৈতিক অবস্থা, খাদ্যনিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবাকে আরও বেশি হুমকির মুখে ফেলেছে। প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চলে কোভিড-১৯–এর কারণে নারীরা অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সমস্যায় মানসম্পন্ন সেবা, প্রয়োজনীয় ওষুধ সঠিকভাবে পাচ্ছেন না; সেই সঙ্গে কন্যাশিশুরাও। করোনার প্রভাবে কৃষি এবং অকৃষি খাতে নিয়োজিত নানা বর্ণ ও জাতিসত্তার গ্রামীণ এবং শহরের নারীদের সাময়িক অথবা স্থায়ী বেকারত্ব সৃষ্টি হয়েছে।

গ্রামীণ নারী কৃষক, উপকূলীয় অঞ্চলের দরিদ্র নারী এবং হাওর অঞ্চলের মৎস্যজীবীদের জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিহীন ও প্রান্তিক নারী কৃষক, ক্ষ্রদ্র জাতিগোষ্ঠী ও মৎস্যজীবীদের পৃথক তালিকা তৈরি করে তাঁদের দ্রুত পর্যাপ্ত ত্রাণসহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। আগামী ফসল উৎপাদনের জন্য জামানতবিহীন ঋণসহ সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া জরুরি। ভূমি, কৃষিসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগে সরকার ঘোষিত ত্রাণ ও প্রণোদনা–সহায়তা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি ক্রাশ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। পাহাড়ি দুর্গম জনপদকে বিবেচনায় রেখে সেখানকার কৃষি (জুমচাষ) ও কৃষক পরিবারের জন্য পৃথক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে।

হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলের ফসল এবং মৎস্য উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে সহযোগিতার হাত নিয়ে নিজ দায়িত্বে উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছাতে হবে।

প্রণোদনার অর্থ ছাড়ের জন্য ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা এবং তদারকি জোরদার করা দরকার।

খাসজমি নীতিমালায় বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত নারীর জন্য সক্ষম পুত্রের শর্ত বাতিল করে কৃষিনির্ভর সব ভূমিহীন দরিদ্র নারীকে কৃষি খাসজমিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বেহাত হয়ে যাওয়া খাসজমি পুনরুদ্ধার এবং দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ জোরদার করতে সুনির্দিষ্ট আইন করা জরুরি।

কৃষি নীতিমালা সংশোধন করে নারী কৃষকের সুস্পষ্ট সংজ্ঞায়নের মাধ্যমে স্বীকৃতি প্রদান, সরকারি সেবাসমূহে নারীর অন্তর্ভুক্তি ও প্রাপ্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

নারী কৃষকের ভূমিহীনতা বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় (জামানতবিহীন অথবা সহজ শর্তে) সরকারি ব্যাংক থেকে অর্থায়নের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের নারী কৃষকদের প্রকৃত তালিকা তৈরির উদ্যোগ প্রয়োজন। নারী কৃষকদের জন্য সমবায়ভিত্তিক বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মহাজনি প্রথা ভেঙে সরকারি ব্যাংকগুলোকে সহজ শর্তে অর্থসহায়তা দিতে হবে। কৃষকদের জন্য শস্যবিমা চালু করা আবশ্যক।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

default-image

কোভিডের জন্য নারীরা বেশি সমস্যায় পড়েছেন, এটা ঠিক। কিন্তু কেবল কোভিডের জন্য নারীর সমস্যা বিবেচনা করলে ঠিক হবে না। কোভিডের এই সমস্যা আমাদের বিদ্যমান সমস্যা যে কত গভীর, সেটা বুঝতে সাহায্য করেছে। আমাদের সব সময় দাবি থাকা উচিত ভূমিতে নারীর সমান অধিকারের বিষয়টিতে । যখন আমরা সম্পত্তির কথা বলি, তখন পারিবারিক পর্যায়ের সম্পত্তির কথা বোঝাতে চাই। এটা এ জন্য জরুরি যে বিষয়টা আমাদের মনস্তাত্ত্বিক গঠনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে।

বিধবা নারীকে যখন খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়, তখন দেখা হয় তাঁর একটা পুত্রসন্তান আছে কি না। মেয়েদের সম্পত্তিতে সমানাধিকার দিতে বাধা কোথায়, সেটা বুঝি না। নারী কৃষকদের কোনো সংগঠন নেই। তাঁদের সংগঠন থাকা প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে স্থানীয় সরকার পর্যন্ত নারীদের সংগঠিত করা সম্ভব। যারা ঋণ দেয়, তাদের নীতিমালায় কিছু পরিবর্তন আনা যেতে পারে, যেন নারী কৃষকেরা ঋণ পান। নারী কৃষকেরা নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে ভূমিকা রেখেছেন। নারীর অবদানে নিরাপদ খাদ্যের মডেল গ্রাম করা যায় কি না, এ বিষয়টি ভাবা যেতে পারে। আমরা কৃষিতে নারীর অবদানের কথা বলছি। কিন্তু কৃষিপণ্যের মূল্য যদি নিশ্চিত না হয়, তাহলে নারীদের কৃষিতে ধরে রাখা যাবে না।

আবু সাঈদ খান

default-image

কৃষি সংকটে, সেই সঙ্গে কৃষকও। নারী কৃষক ও শ্রমিকের জন্য সেটা আরও প্রবল। জমিগুলো খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গেছে। বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কাছে জমি রয়েছে, যাঁরা সত্যিকারে কৃষক নন। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের জন্য অনেকে জমিহারা হচ্ছেন। জমি ব্যবহারের নীতি না থাকায় ক্রমেই তা কৃষকদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। যাঁর এক একর জমির দরকার, তিনি ৫ একর জমি নিয়ে বাগানবাড়ি করছেন। এসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে। কোনো পরিবারে একজন নারী হয়তো একখণ্ড জমি দেখাশোনা করেন। এখন চাকরি হারিয়ে কিংবা বিদেশ থেকে সেই পরিবারের অন্য সদস্যরা এসেছেন। তাহলে এবার কী হবে। তখন ভাগাভাগি হবে। জমিটা আরও খণ্ডবিখণ্ড হবে। ঢাকা শহরের ৪০ থেকে ৫০ লাখ লোক গ্রামে ফিরেছেন। নতুন বাস্তবতায় কিছু মানুষ হয়তো শহরে ফিরে এসেছেন। কিন্তু তাঁদের অনেকেই ফিরতে পারবেন না।

কৃষিতে কিছু সমস্যা ছিল, এ সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। রাষ্ট্রের একটা নীতি দরকার। জমির মালিক কে হবেন। মালিক হতে হবে কৃষক। কৃষক জমির মালিক হতে পারছেন না। ধনতান্ত্রিক দেশে, এমনকি জাপানেও কৃষকই কৃষিজমির মালিক। কৃষিজমির ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আইন দরকার। তা না হলে এখানে কৃষি এগোবে না। এখানে সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নারী কৃষকেরা ঋণ পাচ্ছেন না। তাঁরা বাজারে ঢুকতে পারছেন না। নারী কৃষকের সমবায় গঠন করে তাঁরা বাজার করতে পারেন। শহরের বিভিন্ন পাড়া–মহল্লায় নারী কৃষকদের সমবায়ের মাধ্যমে বাজারব্যবস্থায় আসতে হবে। নারী কৃষকেরা রাসায়নিক মুক্ত সবজি উৎপাদন করছেন। এ সবজির চাহিদা রয়েছে। কিন্তু তাঁরা বাজার পাচ্ছেন না। নারী কৃষকের বাজারব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামের প্রায় তিন গুণ দামে ঢাকা শহরে আমাদের সবজি কিনতে হয়। আমার গ্রামে দেখেছি, নারীরা সবজি উৎপাদন করেন। কিন্তু এর ন্যায্যমূল্য তাঁরা পান না। করোনার সময়

আরও কিছু সংকট তৈরি হয়েছে। এ সংকটগুলো আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। গ্রামে করোনা হচ্ছে না, এটা ঠিক নয়। সর্দি–কাশি হচ্ছে; কিন্তু তাঁরা এটাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তাঁদের চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। গ্রামের অনেক মেয়েশিশু বিশেষ করে মেয়েরা স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে। নারী কৃষকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। নারী কৃষকের স্বাস্থ্য এবং তাঁর সন্তানের লেখাপড়া নিশ্চিত করতে হবে। জমি বণ্টন নীতিতে নারীর অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সমবায় সমিতির মাধ্যমে নারীদের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব । নারী কৃষককে সমান মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা এখন সময়ের দাবি।

সান্ত্বনা খীসা

default-image

আমি রাঙামাটি জেলার একজন গ্রামীণ নারী। আমিও কৃষিকাজ করি। ঘরের কাজ, আবার মাঠে ধান বোনা থেকে শুরু করে জুমচাষ পর্যন্ত—সবই নারীরা করেন। কিন্তু তাঁরা স্বীকৃতি পান না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে আমরা ঘরে-বাইরে যে কাজ করি, তার কোনো আর্থিক মূল্য নেই। তাই পুরুষেরা এসব কাজের কোনো মূল্যায়ন করেন না। স্বীকৃতিও দেন না। নারীরা অনেক মনোযোগের সঙ্গে কাজ করেন। কিন্তু মজুরি হিসেবে পুরুষকে যদি দেওয়া হয় ৩৫০ টাকা, তাহলে নারীকে দেওয়া হয় ২০০ টাকা। পুরুষের সমান কাজ করলেও মজুরির ক্ষেত্রে বৈষম্য করা হয়। পার্বত্য অঞ্চলে নারীরা পুষ্টির অভাবে ভোগেন। অথচ আমাদের এখানে সবচেয়ে ভালো টাটকা শাকসবজি, ফলমূল পাওয়া যায়। এখানের নারীদের সচেতনতার অভাব। কীভাবে রান্না করলে খাবারে পুষ্টি থাকে, গ্রামের নারীরা সেটা জানেন না। সরকারি ও বেসরকারিভাবে তাঁদের সচেতন করার কোনো উদ্যোগ নেই। উত্তরাধিকারসূত্রে নারীরা তেমন সম্পত্তি পান না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁদের নামে সম্পত্তি থাকে না। এ জন্য তাঁরা ব্যাংক থেকে ঋণও নিতে পারেন না। কারণ, ঋণ নিতে গেলে জমির দলিল চাওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে পুরুষেরা যে সুযোগ-সুবিধা পান, নারীরা সেটা পান না। আমরা যে ফসল ও সবজি উৎপাদন করি, তার সঠিক বাজারমূল্য পাই না। আবার আমরা সেটা নিজেদের ইচ্ছেমতো বাজারজাত করতে পারি না।

কোনোকালে আমাদের নারীরা অনেক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। এ সময় বাজারে যেতে হলে একটা মোটরসাইকেল বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা রিজার্ভ করতে হয়। খরচ অনেক বেশি পড়ে যায়। এ জন্য উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করা চরম সমস্যা। করোনাকালে পুরুষের আয় ছিল না। তাঁরা ঘরে ছিলেন। বিভিন্ন মানসিক অস্থিরতায় নারীদের ওপর নির্যাতন করেছেন। বিভিন্নভাবে নারীদের বঞ্চনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

বিজ্ঞাপন

সানজিদা আক্তার

default-image

স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সামাজিকতা—প্রায় সবদিক থেকে সব খাতেই করোনা মানুষের জন্য বিপন্নতা এনেছে। যখন কোনো দুর্যোগ হয়, তখন নারীদেরই বেশি দুর্ভোগে পড়তে হয়। পুরুষেরা যখন চাকরি হারাচ্ছেন, তখন সন্তানের চাওয়া-পাওয়া, সংসারের দায়দায়িত্ব—সব নারীর ওপরই পড়ছে। করোনা দারিদ্র্যকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে গেছে। করোনার জন্য নারীর প্রতি বৈষম্য আরও বেড়েছে। নারী আগের চেয়ে আরও কম মজুরি পাচ্ছেন। আমরা নারীদের কাছে জানতে চেয়েছি, তাঁরা এই দুঃসময়ে কীভাবে চলবেন। তাঁরা বলেছেন, কোনো উপায় নেই। ঘরের ডিম, বাড়ির শাকসবজি, গাছপালা, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল—এসবের মাধ্যমে সংসার চালাচ্ছেন। ফলে করোনার সময় তাঁদের সামান্যতম সঞ্চয়টুকুও হাতছাড়া হয়ে গেছে। এভাবে করোনাকালে তাঁদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা ভেঙে পড়েছে। এ সময় তাঁদের জন্য কী কী সেবা ছিল, সেই সেবা তাঁরা কতটুকু পেয়েছেন? একটি ছিল তথ্যসেবা, আরেকটি ছিল সেবা—যেমন বীজ দেওয়া, প্রশিক্ষণ দেওয়া ইত্যাদি। আরেকটি ছিল অর্থনৈতিক সহায়তা। একটা তথ্যসেবা হয়তো সরকারি অফিসে এসে পৌঁছেছে। সেই সেবা দিনাজপুরের একটি প্রান্তিক গ্রামে হয়তো খুব সামান্যই পৌঁছেছে। তথ্য, সেবা, অর্থনৈতিক সহায়তা—সব ক্ষেত্রে একই অবস্থা হয়েছে। সেবাদানকারীর কাছে প্রশ্ন করা হয়েছিল, যে সেবাগুলো ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের পাওয়ার কথা ছিল, তাঁরা পেয়েছেন কি না। সেবাদানকারীরা অনেক সময় বলেছেন, সেবা তাঁদের কাছে পৌঁছেছে।

দিনাজপুরের একটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পাড়ায় হয়তো ৩০টি পরিবার আছে। তাদের কাছে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনারা চাল কিংবা মোবাইলে টাকা পেয়েছেন কি না। দেখা গেছে, ৩০টি পরিবারের মধ্যে একটি পরিবার পেয়েছে। অন্যরা পায়নি। সরকারি খাতায় টিক দেওয়া হয়েছে যে তারা পেয়েছে। অতএব এই করোনাকালে সেবার যে উদ্দেশ্য ছিল, তা সঠিকভাবে পূরণ হয়নি। এ ক্ষেত্রে যাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁরা অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতিসহ বিভিন্ন বিষয়কে দায়ী করেছেন।

দরিদ্র নারী কৃষকদের কাছে প্রায় কোনো তথ্য থাকে না। অভাবের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে মূল্যায়ন না হওয়া ইত্যাদিকে তাঁরা নিয়তি হিসেবে ধরে নিয়েছেন। নারী কৃষক-শ্রমিকদের সংঘবদ্ধ করে এ অবস্থা থেকে উত্তরণের চেষ্টা করতে হবে। করোনা শেষ হয়েও শেষ হবে না। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকবে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বুঝতে পারছি। প্রান্তিক নারী কৃষকের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে।

এএনএম ফজলুল হাদি সাব্বির

default-image

একটা কথা বলা হয়, কৃষির ২২টি কাজের মধ্যে ১৭টি নারী করে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে ১৭টি নয়, কৃষির সব কটি কাজেই নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে। নারী কৃষক ও প্রান্তিক চাষিরা অধিকাংশই জমির মালিক নন। তাঁরা বর্গা চাষ করেন। এক বছরের জন্য জমির মালিককে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে জমি চাষ করেন। বর্গাচাষিদের ব্যাংকঋণ গ্রহণের সুযোগ নেই। সরকারি ও বেসরকারিভাবে তাঁরা কোনো সুযোগ-সুবিধা পান না। পিকেএসএফ বর্গাচাষিদের সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে। তারা বর্গাচাষিদেরও ঋণ দেয়। ফসল তুলে তাঁরা টাকা ফেরত দেন। কিন্তু সারা দেশে এ সুযোগ নেই।

অধিকাংশ প্রান্তিক কৃষক গ্রামের মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিচ্ছেন। সুদ দিতে দিতে তাঁরা আর আসল টাকা শোধ করতে পারেন না। নারী ও প্রান্তিক কৃষকেরা যেন ব্যাংক থেকে ঋণ পান, সরকারি সুযোগ-সুবিধা পান, সেই উদ্যোগ নিতে হবে। নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের প্রায় সব সময় পুষ্টির অভাব থাকে। কারণ, তাঁরা তাঁদের উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে মহাজনের টাকা শোধ করেন। পুষ্টিকর খাবার কিনে খাওয়ার মতো অর্থ তাঁদের থাকে না। একজন জেলে ভালো মাছটা খেতে পারেন না। বিক্রি করে তাঁদের সংসার চালাতে হয়। তাঁরা যেন তাঁদের উৎপাদিত ফসলের একটা অংশ ভোগ করতে পারেন। তাঁদের সহজ শর্তে ঋণ দিতে হবে। তাঁদের স্বাস্থ্যের বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

শাহ-ই-মবিন জিন্নাহ

default-image

ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আমরা দেখি, নারীরা প্রায় সব সময় নির্যাতিত হয়ে আসছেন। করোনার আগেও তাঁরা নির্যাতিত হয়েছেন। করোনার মধ্যেও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। করোনা শেষ হয়ে গেলেও এই অবস্থার খুব বেশি পরিবর্তন হবে না। সাত থেকে আট বছরের কন্যাশিশুরাও অত্যাচারের শিকার হচ্ছে। এগুলো এক দিনে সমাধান হবে না। এর জন্য জাতীয়ভাবে আইন, নীতিমালা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। আপাতত আমি মনে করি, দ্রুত টাস্কফোর্স করা উচিত। অবিলম্বে একটা ক্র্যাশ কর্মসূচি করা প্রয়োজন। আন্তমন্ত্রণালয় একত্র হয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের যে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়, এর মধ্যে গ্রামীণ উন্নয়ন, কৃষি উন্নয়ন ও নারীদের বিষয়গুলো নিয়ে আসা জরুরি। নারীর প্রতি যে বৈষম্য করা হয়, তার জন্যও আলাদাভাবে টাস্কফোর্স থাকা উচিত। নারী কৃষকের জন্য মানবাধিকারের দৃষ্টিতে পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। এতে একদিকে বৈষম্য নিরসন হবে, অন্যদিকে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। এ জন্য যা যা করণীয়, সেসব কাজ করতে হবে।

কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ

default-image

আমাদের সংবিধান অনুসারে প্রজাতন্ত্রের সবাই মালিক। কয়েক দিন আগে আমাদের প্রধানমন্ত্রী লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, তৃণমূলে যারা আছে, তারা সবাই রাষ্ট্রের মালিক। বঙ্গবন্ধুও এটা বলতেন। মানুষের মননে ঢোকানো দরকার যে সবাই মালিক। আমরা অনেক প্রকল্প করি। প্রকল্প খুব ভালো হয়। কিন্তু মানুষের অগ্রগতি হয় না। প্রকল্প থেকে বেরিয়ে এসে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচিতে যেতে হবে। মালিকানা সবার প্রয়োজন। সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। কিন্তু আমরা তো সারা দেশে কাজ করি না। ঋণের বিষয়টি আমরা সমাধান করেছি। আমরা নারী-পুরুষ সবাইকে জমি চাষের জন্য ঋণ দিই।

ফসলের দাম না পাওয়া; এটা শুধু আজকের সমস্যা নয়। ষাটের দশক থেকে আজ পর্যন্ত নারী-পুরুষ সবার জন্য বাজারজাতকরণের সমস্যা রয়েছে। এর সমাধান পাওয়া যায়নি। কারণ, দাম বেঁধে দেওয়া হয় না। নজরদারি কে করবে। আমরা পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশন থেকে তিন জায়গায় বাজারজাতকরণের ব্যবস্থাটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি। আমরা নারী ও পুরুষদের আলাদাভাবে সংগঠিত করছি। তাঁরা সংগঠিতভাবে এ ক্ষেত্রে কাজ করবেন। ফসল তোলার পরই তাঁরা বিক্রি করে ফেলেন। এটা বন্ধ করার জন্য আমরা দুটি কাজ করছি—তাঁদের জন্য গুদাম করে দিচ্ছি, আর এ সময় কৃষকের জন্য খুব সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করছি। ইতিমধ্যে আমরা সবজি ও ফল প্রক্রিয়াজাত করার জন্য উদ্যোগ সৃষ্টি করছি। এরই মধ্যে সারা দেশে আমরা ৩০ লাখ উদ্যোগ সৃষ্টি করেছি। আমরা দেখি কী করা হয়েছে, আর কী করা যেতে পারে। ব্যাংক তো কৃষকদের ঋণ দেবে না। ব্যাংকের লাগবে জামানত। অধিকাংশ কৃষকের জামানত নেই।

১৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী ১ লাখ কোটি টাকার বেশি প্রণোদনা ঘোষণা করলেন। এর মধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকা কৃষকের জন্য। ২০ হাজার কোটি টাকা অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য। দুই মাস আগে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ৬ হাজার কোটি টাকা মাঝারি ও ১৪ হাজার কোটি টাকা অতি ক্ষুদ্র এবং ক্ষুদ্রশিল্পের জন্য। কিন্তু সিদ্ধান্ত হয়নি, ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র কে কতটা পাবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি হলো প্রাতিষ্ঠানিক শিল্প। কিন্তু সারা দেশে প্রায় এক কোটি অতি ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান আছে। সেখানে নারীরা কৃষি ও কৃষির বাইরে কাজ করেন।

প্রণোদনার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর খুব দূরদর্শী পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ১৩ এপ্রিলের পর প্রায় সাত মাসের বেশি হলো, এখনো তারা ঋণ পায়নি। বড় শিল্পগুলো অবশ্য পেয়ে গেছে। ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্ররা পায়নি। এর সঙ্গে প্রায় আড়াই থেকে তিন কোটি মানুষ জড়িত। করোনায় এদের নারী-পুরুষ সবার জীবনে চরম বিপর্যয় এসেছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এরা ঘুরে না দাঁড়ালে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াবে না। নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে এটা নিয়ে বারবার কথা হয়। কিন্তু তেমন অগ্রগতি হয় না।

কৃষিঋণের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তবে গত বছরের তুলনায় এবার বেশি কৃষিঋণ দেওয়া হয়েছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের কাজ হচ্ছে। এখানে নারীদের অন্তর্ভুক্ত নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে তাঁরা পিছিয়ে থাকবেন। আবার নতুন করে বৈষম্য সৃষ্টি হবে। নারীদের মজুরির ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকমের বৈষম্য আছে। মজুরি বৈষম্য কমানোর জন্য চেষ্টা করতে হবে। তবে নারীরা পুরুষের তুলনায় গড়ে ৮০ শতাংশের কম মজুরি পান। মানবিক হতে হলে সমান কাজের জন্য সমান হতে হবে। আমি বাংলাদেশের সব প্রান্তে গিয়েছি। সবার সঙ্গে কথা বলেছি। এটা ঠিক নয় যে নারীদের উৎপাদনশীলতা কম, বরং বেশি। নারীরা ব্যাংক থেকে সহজে ঋণ পায় না। কিন্তু এনজিওগুলো নারীর মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করে। নারীপ্রধান পরিবারের জন্য সহজ শর্তে আমাদের আলাদা ঋণের ব্যবস্থা আছে। আমরা চেষ্টা করছি সমস্যাগুলোর সমাধান করা। আমাদের কাজের মধ্য দিয়ে নারী-পুরুষ সবাইকে সমমর্যাদায় নিয়ে আসতে চাই।

শামসুল হুদা

default-image

পিকেএসএফের চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমানসহ প্রত্যেকে অত্যন্ত মূল্যবান আলোচনা করেছেন। আজকের আলোচনার উপস্থাপনায় যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, এগুলো আমাদের নিজস্ব কোনো তথ্য নয়। এসব তথ্য সরকারি গবেষণা, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্র, জতিসংঘ ও জতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা থেকে নেওয়া হয়েছে। বিশ্বের একটি হিসাব হলো পারিবারিক কৃষি থেকে খাদ্যচাহিদার ৮০ শতাংশ আসে। বাংলাদেশে এর পরিমাণ বেশি ছাড়া কম হবে না। পারিবারিক কৃষি বলতে ছোট কৃষক পরিবার যেখানে নারীকে বাদ দিয়ে কোনো পরিবার হয় না। কৃষিসহ পরিবারের সব কষ্টসাধ্য কাজ নারী করেন। বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি হলেন নারী। তাঁরা শুধু কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখেননি, আমাদের অর্থনীতির যে মেরুদণ্ড সেই মেরুদণ্ডকেই বাঁচিয়ে রেখেছেন। সিডর, আইলার মতো দুর্যোগের কৃষি অর্থনীতি টিকে থাকার পেছনে প্রধান ভূমিকা নারীদের।

কিন্তু এসব বিষয় আমরা শুধু আলোচনা অনুষ্ঠানে আলোচনা করি। এর জন্য আইন ও নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, যেন তাঁদের অধিকার ও স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। সে কাজটা হয় না। এসব আলোচনা মাঠপর্যায় পর্যন্ত পৌঁছায় না। । এর জন্য এককভাবে কেউ দায়ী নয়। এর জন্য সংশ্লিষ্ট সবার ভূমিকা আছে। সে দায়িত্বটা পালন করা উচিত। অনেক সময় প্রশাসনের অনেকে মনে করতে পারেন, আমরা তাদের প্রতিপক্ষ হয়ে কথা বলি। আমরা প্রতিপক্ষ হয়ে কথা বলি না। আমরা শুধু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণের জন্য তাদের অধিকারের কথা বলি। কোথায় কী সমস্যা ও ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করি। প্রশাসন যেন তাদের নীতিমালায় এ বিষয়টি আনতে পারে। জুমচাষি, মৎস্যজীবীসহ বিভিন্ন পেশার শ্রমিক নারী আমাদের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছেন। সমাজ ও পরিবার গঠনে ভূমিকা রাখছেন। এই নারীদের জন্য আলাদা ব্যাংক করতে হবে। এই ব্যাংক গ্রামে গিয়ে তাদের ঋণ দেবে। মোবাইল ব্যাংকিং হবে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু তাঁর দূরদর্শী চিন্তা থেকে সমবায়ের কথা বলেছিলেন, সেটা এখন বাস্তবায়নের সময় এসেছে। আইনের জটিলতা কমিয়ে সমবায়ীদের নিয়ন্ত্রণে সমবায় করা এখন সময়ের দাবি। সমবায় চেতনাকে যদি আমরা সম্প্রসারিত করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশে নারী ও ক্ষুদ্র কৃষক, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, বর্গাচাষিসহ বিভিন্ন ধরনের সমবায় গড়ে উঠবে।

নারীদের সমস্যগুলো আলাদাভাবে চিহ্নিত করে আমাদের নীতি ও কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু আইন ও নীতি করলেই হবে না, সারা বছর এর বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জনগণ, স্থানীয় সরকার ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিসহ সবার অংশগ্রহণ থাকতে হবে।

ফিরোজ চৌধুরী

আজকের ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিলে চমৎকার আলোচনা হয়েছে। আশা করা যায়, গোলটেবিল থেকে প্রাপ্ত সুপারিশ নীতিনির্ধারকেরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

আলোচনার সুপারিশ

  • নারী কৃষকের সংজ্ঞায়নের মাধ্যমে স্বীকৃতি প্রদান ও সরকারি সেবায় নারীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

  • সমবায় চেতনাকে সম্প্রসারিত করতে হবে। এতে নারী, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্রজাতিগোষ্ঠী, বর্গাচাষিসহ বিভিন্ন ধরনের সমবায় গড়ে উঠবে।

  • খাসজমি নীতিমালায় বিধবা ও স্বামীবিচ্ছিন্ন নারীর জন্য সক্ষম পুত্রের শর্ত বাতিল করে কৃষিনির্ভর সব ভূমিহীন দরিদ্র নারীকে কৃষি খাসজমিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

  • নারী কৃষকের স্বাস্থ্য ও তাঁর সন্তানের লেখাপড়া নিশ্চিত করতে হবে।

  • নারীদের সমস্যগুলো আলাদাভাবে চিহ্নিত করে নীতি ও কাঠামোতে পরিবর্তন আনা দরকার। শুধু আইন ও নীতি করলেই হবে না, সারা বছর এর বাস্তবায়ন করতে হবে।

  • গ্রামীণ নারী কৃষক, উপকূলীয় অঞ্চলের দরিদ্র নারী এবং হাওর অঞ্চলের মৎস্যজীবীদের জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে।

  • নারী কৃষকদের কোনো সংগঠন নেই, তাঁদের সংগঠন থাকা প্রয়োজন।

  • গ্রামীণ নারী কৃষক, উপকূলীয় অঞ্চলের দরিদ্র নারী এবং হাওর অঞ্চলের মৎস্যজীবীদের জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0