বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আলোচনা

তাসমিয়া তাবাসসুম রহমান

default-image

ব্র্যাক সংলাপে সবাইকে স্বাগত জানাই। আজ যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে, তা হচ্ছে: ১. খুচরা ব্যবসায় দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা, ২. কর্মক্ষেত্রে নারী অন্তর্ভুক্তিকরণের বর্তমান অবস্থা ও প্রয়োজনীয়তা, এবং ৩. কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তিকরণ।

জয়দীপ সিনহা রায়

default-image

ব্র্যাক দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি (এসডিপি) শোভন কর্মসংস্থান উন্নয়নের মাধ্যমে খুচরা খাতকে এগিয়ে নিতে ২০২০ সালে ‘প্রাইড’-এর কাজ শুরু করে। এই প্রকল্পের অধীনে আমরা বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড স্বীকৃত দেশের প্রথম খুচরা বিক্রয়ের মডিউল তৈরি করেছি। খুচরা বিক্রয়ের জন্য আমরা প্রান্তিক যুবকদের প্রশিক্ষণ দিই। আমরা বেসরকারি খাতের সঙ্গে অংশীদারি গড়ে তুলতে কাজ করছি, যাতে নবীন কর্মীরা কর্মসংস্থানের সুযোগ পান।

আমরা এ পর্যন্ত ৮৭৭ জন তরুণ–তরুণীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এর মধ্যে যাঁরা প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন, তাঁদের মধ্যে ৫৪ শতাংশের কর্মসংস্থান হয়েছে। ২০২৩ সালের মধ্যে আমরা ৫ হাজার ২০০ যুবককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি, যাঁদের মধ্যে থাকবে ৬০ শতাংশ নারী এবং ৭ শতাংশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। এই প্রকল্পে অর্থায়ন করছে আইকিআ ফাউন্ডেশন এবং উবিএস অপটিমাস ফাউন্ডেশন।

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর

default-image

খুচরা খাতে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। পরোক্ষভাবে অন্তত তিন গুণ কর্মসংস্থান হয়েছে। সেন্টার অব এক্সিলেন্স ফর লেদার স্কিল (কোয়েল) বাংলাদেশ লিমিটেড করার সময়ে এর শিল্পভিত্তিক প্রয়োজনীয়তা ছিল। ২০০৭ সালের দিকে রপ্তানিমুখী জুতার কারখানাগুলো অনেক ক্রয়াদেশ (অর্ডার) পাচ্ছিল। তখন হঠাৎ করে সক্ষমতা বাড়াতে নতুন কারখানা হওয়ার পরপর একই কর্মী এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তরিত হচ্ছিলেন। আমরা কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতাম। প্রশিক্ষণ দেওয়া এসব কর্মী অন্য জায়গায় যেতেন। সেখানে নতুন কর্মী আসার নতুন পথ তৈরি না করি, তাহলে প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে পড়তে পারি। সে জন্য দক্ষ কর্মী ও মিড লেভেল ম্যানেজার তৈরির জন্য কোয়েল হয়েছে।

অ্যাপেক্সের উদ্যোগে আমরা কারখানায় কিছু পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে প্রশিক্ষণ শুরু করি। সেটা একসময় বেড়ে একটা পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয়। এখানে গত ১৪ বছরে আমরা প্রায় ২২ হাজার মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি, যাঁদের ৯৭ শতাংশ বিভিন্ন শিল্পে যুক্ত হয়েছে। তাঁরা শুধু জুতাশিল্পে নয়, পোশাকশিল্পসহ স্থানীয় অনেক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। কিন্তু এখানে এখন প্রশিক্ষণের ধরনের প্রয়োজনীয়তা বদলে যাচ্ছে। আমরা দেখলাম, অনেক তরুণ কারখানায় কাজ করতে ইচ্ছুক নন, তাঁরা খুচরা খাতে আসতে চান।

ভারতে জিডিপির ১০ শতাংশ আসে খুচরা খাত থেকে। সে দেশে খুচরা খাতে ৮ শতাংশ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়। কর্মসংস্থান, বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই), অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তি—এ চার জায়গায় খুচরা খাত কাজ করে। এটা শুধু পণ্য বিক্রি করার জায়গা নয়।

ব্র্যাকের প্রতিবেদনে একটি শক্তিশালী ফলাফল আছে। সেখানে বলা হয়েছে, ৮২ শতাংশ খুচরা খাত কর্মীদের সঙ্গে কোনো চাকরির চুক্তিপত্র করে না। আমরা এ কক্ষের কেউ ওই ৮২ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করি না। এ ৮২ শতাংশকে বাদ দিয়ে কোনো কিছু টেকসই করা সম্ভব নয়।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা তরুণদের মধ্যে ১২ থেকে ১৪ শতাংশ বেকার। তাঁরা সহজে ফ্লোর, কৃষি পর্যায়ের কাজ করবেন না। কিন্তু মীনাবাজার, ইউনিমার্ট বা অ্যাপেক্সের মতো প্রতিষ্ঠানে হয়তো চাকরির চিন্তা করবেন। তাঁদের জন্য খুচরা খাত একটি ভালো জায়গা। কিন্তু পরিবার থেকে বিসিএস, ব্যাংক অফিসে চাকরির কথা বলা। খুচরা খাতে যে ক্যারিয়ার গড়া যায়—এ মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

তামারা আবেদ

default-image

আড়ংয়ের কর্মীদের আমরা একটা প্রশিক্ষণ দিই। ব্র্যাকের প্রশিক্ষণ পাওয়া কর্মী নিয়োগ দিয়ে আমরা দেখেছি তাঁরা আরেকটু বেশি আত্মবিশ্বাসী হন। কারণ, তাঁরা প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ পাওয়ার ফলে এটাকে একটা ক্যারিয়ার ও খাত হিসেবে দেখেন। এখানে অনেক কিছু জানার ও শেখার আছে বলে তাঁরা মনে করেন। অনেকগুলো বিষয় প্রশিক্ষণের সময় শিখে আসার ফলে নতুন বিষয়গুলো তাঁরা খুব দ্রুত শিখতে পারেন। এ ক্ষেত্রে তাঁদের অন্য রকম একটা আত্মবিশ্বাস থাকে।

দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণটি অনেক দীর্ঘ। এটা একদিকে ভালো। কারণ, এতে আত্মবিশ্বাস বাড়ছে। কিন্তু এটা আমাদের অনেক সময় নিয়ে নিচ্ছে। এত দীর্ঘ সময় প্রশিক্ষণের প্রয়োজন আছে কি না—সে বিষয়ে আমরা সরকারের সঙ্গে আলাপ করতে পারি। এ প্রশিক্ষণটি আরেকটু স্বল্প সময়ের করা যেতে পারে।

আড়ং শুরু থেকেই নারী বিক্রয় সহযোগী নিয়ে কাজ করছে। ১৯৭৮ সালে আড়ংয়ের যাত্রা শুরুর সময়ে সব বিক্রয় সহযোগী ছিলেন নারী। এখন আমাদের প্রায় ৯০০ বিক্রয় প্রতিনিধি আছেন, যাঁদের ৬০ শতাংশ নারী। চাকরিতে প্রবেশের আগে বিক্রয় প্রশিক্ষণ খুব জরুরি। প্রশিক্ষিত কর্মী পাওয়া আমাদের সময় ও সম্পদ বাঁচাচ্ছে। ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে নারী কর্মী অনেক বেশি আন্তরিক৷ পণ্য সম্পর্কে ধারণার দিক থেকে আমাদের অভিজ্ঞতা ইলেকট্রনিকস খাত থেকে ভিন্ন। আমাদের পণ্যের ক্ষেত্রে নারীদের জ্ঞান অনেক বেশি। সম্ভবত কারণ, আমরা শিশু ও নারীদের জন্য অনেক পণ্য বিক্রি করি। ভারী কার্টন ওঠানোর ক্ষেত্রে ছেলেরা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এ ক্ষেত্রে মেয়েরা করেন না বা মানা করেন—এ রকম নয়। তার হয়তো মাঝেমধ্যে একটু সাহায্য প্রয়োজন হয়। আমাদের নারী কর্মীরা আড়ংয়ের অভিজ্ঞতায় বড় পার্থক্য এনেছেন। শুধু পুরুষ কর্মী নিয়ে আমি আড়ংয়ের চিন্তা করতে পারি না। সে জন্য নিয়োগকারী হিসেবে আমাদেরও নারী ও পুরুষের জন্য যথাযথ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আমরা আমাদের কর্মীদের রাতের বেলা পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করি। এটা অনেক খুচরা খাতের জন্য সহজ কাজ নয়। এ ক্ষেত্রে আমরা অন্তত সিএনজিওয়ালার সঙ্গে চুক্তি করতে পারি। যেন ওই একই ব্যক্তি নারী কর্মীকে বাসায় পৌঁছে দেন।

যৌন হয়রানি রোধে আড়ংয়ের নীতিমালা রয়েছে। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মাতৃত্বকালীন নীতিমালাও রয়েছে। ওয়াশরুমের একটা সমস্যা রয়েছে। আমাদের নিজস্ব আউটলেটে নিজস্ব ওয়াশরুম আছে। শপিং মল, মার্কেটগুলোতে ওয়াশরুম থাকা প্রয়োজন। শুধু নারীদের জন্য নয়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষের জন্যও যথাযথ ওয়াশরুম থাকা দরকার।

মুর্তজা জামান

default-image

আগে আমাদের কাছে আসা তরুণেরা ‘স্টপ গ্যাপ’ হিসেবে কাজ নেওয়ার জন্য আসতেন। বিশ্ববিদ্যালয় পাস করে ভালো কাজ পাওয়ার আগপর্যন্ত আমাদের এখানে চাকরি নিতেন। তাঁদের চাকরি নিয়ে কোনো আকাঙ্ক্ষা ছিল না, আমাদের সঙ্গে তাঁদের ক্যারিয়ার হতে পারে বলে তাঁরা বিশ্বাস করতেন না। আমরা এ সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হতাম। এ জায়গায় প্রশিক্ষণ প্রকল্পগুলো আমাদের অনেক সহায়তা করছে। এগিয়ে দিচ্ছে।

এ খাতে আগে একেবারে অদক্ষ মানুষ আসতেন। আমাদের সাধারণ শিক্ষা অতটা কর্মমুখী নয়। প্রকল্পগুলো এ ক্ষেত্রে অনেক সহযোগিতা করছে। আমরা এখন আমাদের মতো করে একটু বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দিলেই যথেষ্ট হয়।

মেয়েদের ক্ষেত্রে আমাদের এখানে কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। সে ক্ষেত্রে এ সংখ্যা আরও বাড়ানো আমার কাছে চ্যালেঞ্জ মনে হয়। তাঁদের নিরাপত্তার দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। কাজ শেষে তাঁরা রাত ১০টার সময় বের হন। এ ক্ষেত্রে যাতায়াতব্যবস্থা খুব ভালো নয়। তাঁরা অনেক ক্ষেত্রে ভালো থাকার জায়গা পান না। একা নারীদের কেউ বাসা ভাড়া দিতে চান না। খুব জীর্ণ পরিবেশে তাঁদের থাকতে হয়। অনেকগুলো মেয়ে একসঙ্গে থাকা নিয়েও ট্যাবু আছে। পর্যাপ্ত নারী হোস্টেল নেই। তাই কর্মজীবী নারী হোস্টেল নিয়ে উদ্যোগ নেওয়ার জায়গাও আছে। একটা স্টার্টআপ কোম্পানি নারীদের নিয়ে কাজ করছিল। এগুলো আরেকটু সুবিধাজনক ও সাশ্রয়ী করা গেলে, তা নারীদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা যদি কোনো কিছুর জন্য অর্থ ব্যয় না করি, তবে সেটা নিজের মনে করি না। সেটা কীভাবে টেকসই হতে পারে? যাঁরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, তাঁদের অল্প পরিমাণ হলেও ফি নির্ধারণ কর দরকার। টাকা দেওয়ার কারণে সে ভাববে, ‘আমি যেহেতু টাকা দিয়েছি, তাই এ প্রশিক্ষণটি আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’

মোশাররফ হোসেন মজুমদার

default-image

এ প্রকল্প থেকে সিলেটে আমরা ১১ জন কর্মী নিয়োগ দিয়েছি। কুমিল্লা, সিলেট ও সুনামগঞ্জে আমাদের আউটলেট রয়েছে। এর মাঝে আমরা শুধু সিলেটেই আপনাদের কার্যক্রম পেয়েছি। আশা করছি সামনের দিনে এ কার্যক্রমের আওতা বাড়ানো হবে। যার মাধ্যমে আমরা উপকৃত হব।

অফিসের কাজে নারী কর্মী পাওয়া যায়। কিন্তু বিক্রয়কর্মী হিসেবে নারী কর্মী পাওয়া কঠিন। আগে আমাদের এসব কর্মীকে প্রশিক্ষণ দিতে হতো। এখন এসডিপি প্রকল্প থেকে প্রশিক্ষিত নারী কর্মী পেয়ে যাই। তাই বলা যায়, এটা খুব ভালো উদ্যোগ। সিলেটে সাধারণত রাতে বিক্রি বেশি হয়। ঢাকায় বেশি বিক্রি হয় বিকেলে। ঈদের মৌসুমে রাত তিনটা পর্যন্তও আউটলেট খোলা রাখতে হয়। নারীদের জন্য বিষয়টি একটু কঠিন। ঢাকায় আবাসনের অনেক ব্যবস্থা আছে। ঢাকার বাইরের আউটলেটগুলোতে স্থানীয় লোকবল পাওয়া যায়, কিন্তু দূরবর্তী এলাকা থেকে কেউ সেখানে কাজ করতে আগ্রহ দেখায় না। ছোট শহরে দক্ষ কর্মী পেতে হলে তাদের বাড়তি সুবিধা দিতে হয়। হয়তো বাসার ব্যবস্থা করে দিতে হয়। এটা আমাদের জন্য একটা বাধা। ঢাকায় শিক্ষার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ আছে। ঢাকার বাইরের কর্মীরা এ সুবিধা পাচ্ছে না। এ বিষয়ে আরও নজর দিতে হবে।

মাসুদুল হক

default-image

শুরুতে কর্মী নেওয়ার সময় খুব অল্প কয়েকজন দক্ষ কর্মী আসতেন। বেশির ভাগই আসতেন অদক্ষ কর্মী। ব্র্যাকের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যোগাযোগ করার পর এখন দক্ষ কর্মী পাচ্ছি। প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের নিজেদের পরিশ্রম করতে হচ্ছে না। এরপরেও আমাদের কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। প্রশিক্ষণগুলো এলাকাভিত্তিক হয়ে যাচ্ছে। খুচরা খাতে খখণ্ডকালীন চাকরি ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা হয়ে থাকে। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় গুরুত্ব দিতে চাইলে খণ্ডকালীন চাকরিটি তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। আবার চাকরিতে গুরুত্ব দিলে পড়াশোনা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমরা এগিয়ে এসে ৬ ঘণ্টা চাকরির সুযোগ দিতে পারলে বিষয়টি তাঁদের জন্য সহজ হতো।

ব্র্যাক ঢাকায় শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এসব প্রশিক্ষণের কারণে পরবর্তী সময়ে তিনি চাইলে একজন উদ্যোক্তা হতে পারছেন। তবে এখানে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ আছে। আবদুল্লাহপুরে ব্র্যাকের একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে। আবদুল্লাহপুর, টঙ্গী ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষ এখানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। তাঁরা উত্তরার বাইরে চাকরি করতে চান না। বিষয়টি দেখা প্রয়োজন। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে থাকার ব্যবস্থা করা গেলে সারা দেশ থেকে তরুণেরা প্রশিক্ষণ নিতে পারতেন। খুচরা খাতে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে।

নুরে আলম শিমু

default-image

প্রযুক্তিগত খুচরা খাত অন্যান্য খুচরা খাত থেকে বেশ আলাদা। এখানে একজন কর্মী নিয়োগের পর পণ্যগুলো সম্পর্কে ধারণা অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। প্রথম থেকে আমাদের খণ্ডকালীন ও পূর্ণকালীন নারী কর্মী ছিলেন। আমাদের ক্রেতারা পণ্যের অনেক প্রযুক্তিগত দিক জানতে চান। পুরুষ কর্মীরা প্রযুক্তিগত নতুন বিষয়গুলো আগ্রহ নিয়ে শিখে নেন এবং তা ধরে রাখেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, নারী কর্মীদের ক্ষেত্রে এ আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম। প্রযুক্তিগত জ্ঞানের ক্ষেত্রে নারী কর্মীরা পিছিয়ে থাকেন। সে জন্য কয়েক বছর যাবৎ সরাসরি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে নারী নিয়োগে অগ্রাধিকার কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু আমাদের হেড অফিসে অনেক নারী কর্মী রয়েছেন। আমাদের কাস্টমার কেয়ারের পুরো দলটিই নারী। হিসাব শাখা, গ্রাফিক ডিজাইন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিভাগের বেশির ভাগই নারী।

নারী কর্মীদের ক্ষেত্রে আমাদের আরেকটা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। অনেক জায়গায় নারীদের জন্য আলাদা ফ্রেশরুমের ব্যবস্থা থাকে না, পুরুষের সঙ্গে নারীদের ফ্রেশরুম ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয়, যা অনেক ক্ষেত্রেই নারীদের জন্য উপযোগী নয়। এ কারণে রাস্তার পাশে লাগোয়া আউটলেটে প্রথম দিকে আমরা নারী কর্মী নিয়োগই করতে পারিনি। এটাও একটা চ্যালেঞ্জ।

এম এম ফেরদৌস

default-image

খুচরা খাতের কলেবর এখন বেশি। আমরা নারী কর্মী নিয়োগ দিতে চাইছি, কিন্তু পাচ্ছি না। এই মুহূর্তে সারা দেশে আমাদের ৯২টি শোরুম রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় রয়েছে ১৮টি। আমাদের নীতিমালায় পরিচ্ছন্ন ওয়াশরুমের বিষয় প্রথম অগ্রাধিকার পায়। যদিও একই ওয়াশরুম নারী ও পুরুষ কর্মীদের ব্যবহার করতে হয়। কারণ, আমাদের ৪১১ জন বিক্রয় সহযোগীর মধ্যে মাত্র ১১ জন নারী কর্মী।

নারী কর্মী না পাওয়ার একটা কারণ হলো প্রযুক্তিগত জ্ঞানের ঘাটতি। ইলেকট্রনিক পণ্যের ক্ষেত্রে মৌলিক কিছু বিষয় জানা লাগবেই। স্নাতক পাস করেননি, এমন কর্মীর পক্ষে এগুলো আত্মস্থ করা কঠিন হয়। একটি শোরুমে চারজনের মধ্যে অন্তত তিনজন যদি ঠিকভাবে পণ্যের প্রযুক্তিগত দিকগুলো জানেন, তাহলে প্রতিষ্ঠান চালানো সম্ভব। এ কারণে আমরা স্নাতক পাস কর্মীদের বেশি গুরুত্ব দিই। আবার এসব সেলস অফিসার পরবর্তী সময়ে সহকারী ব্যবস্থাপক ও ব্যবস্থাপক হবেন। এ জন্য একটা ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রয়োজন। আবার সব কর্মী ঢাকা ও প্রধান শাখায় কাজ করতে চায়। সবাই কাজ করতে আগ্রহী, কিন্তু বিপণনে মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ কাজ করতে চায়।

শাহিন খান

default-image

আমরা চাই শিল্প হিসেবে খুচরা খাতে আরও বেশি মেয়েরা কাজ করতে আসুক। খুচরা খাতে ৮ শতাংশ নারী কর্মী আছেন। মীনাবাজারে নারী কর্মীর হার ১৭ শতাংশ। আমাদের তৈরি পোশাক খাতসহ অন্যান্য খাতে মেয়েরা অনেক পরিশ্রমের কাজ করছেন। কিন্তু এ খাতে একটু পড়াশোনারও প্রয়োজন আছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের, বিশেষ করে সুপার মার্কেটে চ্যালেঞ্জটা কেমন? আমরা যেসব পণ্য বিক্রি করি, আমাদের কর্মীর বড় অংশই সেসবের ভোক্তা নন। তাঁরা শ্যাম্পু চেনেন কিন্তু চুলের জন্য একই রকম আরও অনেক পণ্য আছে, যা তাঁরা জানেন না। এ জ্ঞানগুলো দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়।

রাতের বেলা বাড়ি ফেরার সময় নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সব প্রতিষ্ঠানের জন্য পরিবহনের ব্যবস্থা করা সমসময় সম্ভব হয়না। এটা তো সার্বিকভাবে একটা সামাজিক সমস্যা। চাইলেই একটা শিল্প এটাকে পরিবর্তন করে ফেলতে পারবে না। এ জন্য গোটা সমাজেরই পরিবর্তন প্রয়োজন। আমি জানি না, আপনাদের প্রশিক্ষণে জেন্ডার সমস্যাগুলো কতটুকু নির্দেশ করা হয়। এ বিষয়ে আরেকটু নজর দিলে ভালো হয়। লম্বা সময় ধরে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সেখানে কারা কোন শিল্পে কাজ করতে চান, সে অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে চ্যালেঞ্জগুলো কমে আসবে।

আমাদের নীতিমালা অনুযায়ী আমরা নারীদের এ চাকরিতে আসতে উৎসাহিত করি। ২০০৯ সাল থেকেই আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র ছিল। যেখানে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া শেষে কর্মীদের আউটলেটে যুক্ত করা হতো। একটা দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। সে ক্ষেত্রে এ খাতে মেয়েদের বাদ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমার মনে হয় সবাই এখানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে। আমাদের শিল্পে দেখা যায়, প্রতি মাসে একটা বিশালসংখ্যক কর্মী চলে যান। ফলে আবার নতুন নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দিতে তাঁদের আউটলেটে যুক্ত করতে হচ্ছে। মাঠপর্যায় থেকে ছেলেমেয়েদের তাঁদের আগ্রহ অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। প্রযুক্তি, সুপার মার্কেটসহ খুচরা খাতে নানা ধরন ও ভালো লাগার বিষয় অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে ভালো হবে। তখন নিয়োগকর্তাদের বিনিয়োগ করতে কোনো অসুবিধা হবে না। কারণ, এ ক্ষেত্রে লম্বা সময় সেবা পাওয়া যাবে।

সোহেল তানভীর খান

default-image

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষদের নিয়ে আমাদের পথচলা বেশ ফলপ্রসূ। তাঁদের নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা অনেক ভালো। শুরুতে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনায় অনেকেই হতাশার মনোভাব পোষণ করতেন। আমরা ক্রেতাদের সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিই। আমরা ভাবছিলাম, ক্রেতারা এসব কর্মীকে কীভাবে মেনে নেবেন, কী প্রতিক্রিয়া করবেন? কিন্তু তাঁদের নিয়োগ দেওয়ার পর দেখলাম, তাঁরা অনেক বেশি নিবেদিত, কাজে মনোযোগী। তাঁরা প্রকৃতপক্ষে অন্যদের চেয়ে ভালো করছিলেন। যেসব আউটলেটে তাঁদের দেওয়া হচ্ছে, সেখানে ক্রেতারা তাঁদের খুব ভালোভাবে গ্রহণ করছেন। কিছু ক্ষেত্রে ক্রেতা এসে তাঁদের না দেখলে অসন্তুষ্ট হচ্ছেন। আমরা যখন জানাই যে আজ তাঁর বন্ধ ছিল। তখন ক্রেতা বলছেন, তাহলে তো আজ আমি আসতাম না। কারণ, তাঁরা তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে চান। ফলে এটা খুবই ফলপ্রসূ ছিল।

আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম অনেক চ্যালেঞ্জ হবে। কিন্তু এটা সে রকম ছিল না। এখন আমরা ১০ শতাংশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কোটা রেখেছি। ১০ শতাংশ আমরা নেব। একই সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। এখন ৩৪ জন প্রতিবন্ধী বা ভিন্নভাবে সক্ষম কর্মী আমাদের সঙ্গে কাজ করছেন। তাঁরা সবাই প্রিমিয়াম আউটলেটে কাজ করছেন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষকে যেখানে নিয়োগ দিচ্ছি, সেখানে তাঁদের সঙ্গে আমরা একজন ‘বাডি’ দিচ্ছি। তাঁরা পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার আগপর্যন্ত যারা তাদের ছায়া দেবে। এটা আমাদের খুব ভালো ফল দিচ্ছে। আমরা প্রায় পাঁচ বছর ধরে ওদের সঙ্গে কাজ করছি। আমরা তাঁদের নিয়ে খুবই সন্তুষ্ট।

সাইফ ইসলাম

default-image

আইএলও বাংলাদেশের সঙ্গে অনেক কোম্পানি, শিল্প সংস্থাসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় যুক্ত আছে। এর উদ্দেশ্য হলো তরুণদের কর্মসংস্থান ও তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি করতে অংশীদারদের একসঙ্গে নিয়ে আসা। সম্প্রতি জেনারেশন আনলিমিটেডের কাজ এগিয়ে নিতে ইয়ুথ অ্যাকশন টিম গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখেছি। আলোচনায় খুচরা খাতে তরুণদের মনোভাবের বিষয়টি এসেছে৷ যখন আমাদের কার্যকর ইয়ুথ অ্যাকশন টিম থাকবে, তখন আমরা সারা দেশে তরুণদের কাছে খুচরা খাত তুলে ধরতে পারব। আইএলও তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য কৌশল তৈরিতে সরকারের সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা করছে।

বাংলাদেশে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান কৌশল নেই। আইএলওর তরুণদের জন্য নীতিমালা রয়েছে। আমরা বেসরকারি খাতগুলোকে একসঙ্গে নিয়ে আলোচনায় বসার ব্যবস্থা করতে পারব। যারা ইউনিলিভারের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করার চিন্তাও করতে পারে না, তাদের কাছে বাজার চাহিদার ওপর ভিত্তি করে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি কীভাবে নিয়ে যাব? সে জন্য আমাদের অন্যান্য কোম্পানি ও সংস্থার সঙ্গে অংশীদারি প্রয়োজন, যেন তরুণদের কর্মসংস্থান ও তরুণ উদ্যোক্তা নিয়ে কাজে সমন্বয় ও সমন্বিত প্রচেষ্টা থাকে। এ ক্ষেত্রে জেনারেশন আনলিমিটেড সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারবে।

আজিজা আহমেদ

default-image

বিবিডিএনের কাজ হচ্ছে চাকরিপ্রার্থীর সঙ্গে চাকরিদাতার সাক্ষাৎ করিয়ে দেওয়া। সব ধরনের প্রতিষ্ঠান ও খাত থেকেই ভিন্নভাবে সক্ষম বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছে। বড় পরিসরে তাদের নিয়োগ দিতে হলে সে পরিবেশ তৈরি করা খুব দরকার। এ জন্য সামগ্রিক ব্যবস্থার ওপরে কাজ করতে হয়। ব্যক্তি হিসেবে আমরা নিজেরাও সব কাজ করতে পারি না বা করি না। আমাদের পছন্দ, স্বাচ্ছন্দ্য ও সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করি। ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষের ক্ষেত্রেও তাই। অনেক সময় আমাদের কাছে অনুরোধ আসে, ‘আমাদের দুজন মূকবধির মানুষ দিন। তাদের নিয়োগ দিতে চাই।’ কিন্তু নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে আপনি তাদের অক্ষমতা পছন্দ করতে পারেন না। আপনাকে তাদের দক্ষতা পছন্দ করতে হবে। এ জায়গায় আমরা আপনাদের সঙ্গে কাজ করতে চাই। শুধু ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষ নিয়োগের ক্ষেত্রে নয়, সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। এসব বিষয়ে আমরা সহায়ক ভূমিকা পালন করব।

রুবায়েত সারওয়ার

default-image

আমাদের ভিত্তি জরিপে দেখেছি খুচরা খাতের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই নতুন। তবে এ খাত ক্রমবর্ধমান। সে জন্য এখানে অনেক পরিবর্তন ও পরিবর্ধন ঘটছে। কিন্তু এ খাতে মাত্র ৮ শতাংশ নারীর কর্মসংস্থান আমাদের আশ্চর্য করেছে। জরিপে কেবল সুপার মার্কেট ও বড় দোকান নয়, সামগ্রিকভাবে এ খাত দেখা হয়েছে। এখন এগুলো পরিবর্তনে কোন জায়গায় প্রথমে জোর দেব? যৌক্তিকভাবে এখানে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এসেছে। কারণ, ওপরের দিকে পরিবর্তন আনতে না পারলে পরিবর্তন আসবে না। কিন্তু আমাদের জরিপে প্রশিক্ষণে বিনিয়োগের প্রতি এসব বড় প্রতিষ্ঠানের অনীহার বিষয়টি এসেছে।

প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আসবাব, ইলেকট্রনিকস, মুঠোফোন ও অ্যাকসেসরিজ খাত রয়েছে। এসব জায়গায় অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রবণতা বেশি। কারণ, এসব খাতে বিক্রয়কর্মীরা প্রশিক্ষিত না হলে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন না। প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করতে চায় কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ৪৪ দশমিক ৩ শতাংশ না-বোধক উত্তর দিয়েছে। তারা বলছে, আমি প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর কর্মীরা ভালো সুযোগ পেয়ে অন্য জায়গায় চলে যাবে। প্রশিক্ষিত লোকবলের জোগান বাড়াতে দাতা, প্রকল্প ও ব্র্যাকের মতো প্রতিষ্ঠানে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

নিহাদ কবির

default-image

আপনারা এ খাতে নারী এবং ভিন্নভাবে সক্ষম বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কথা বলেছেন। ভবনে ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষের প্রবেশগম্যতা লাগবে, সেটা ভবন তৈরির সময় আমাদের স্থপতিরা চিন্তাই করেন না। কারও বাড়ি তৈরির ক্ষেত্রেও এ চিন্তা করেন না। অথচ বাড়িতে অনেক বয়স্ক মানুষ থাকেন। অনেকগুলো জায়গায় তাঁদের প্রবেশগম্যতা নেই।

ক্রেতা হিসেবে বলব, খুচরা খাতে অবশ্যই প্রশিক্ষণের প্রয়োজন আছে। কয়েক দিন আগে এ রুমে একটি অনুষ্ঠিত সেমিনারে এসেছে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ স্নাতক পাস বেকার রয়েছেন। তাঁদের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অনুপ্রেরণা। বিএসএসে চাকরি না পেলে তাঁরা বাসায় বসে থাকবেন, তবু কিছু করবেন না। খুচরা খাত যে অগ্রাধিকার খাত হওয়া উচিত। আলাদা খাত হিসেবে এ খাতের সরকার থেকে এখনো বোধ হয় সে রকম স্বীকৃতি নেই। আনুষ্ঠানিকভাবে এ খাতে ৬০ লাখ মানুষ কাজ করেন। অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে এ সংখ্যা আরও বেশি হবে।

নীতিমালার দিক থেকে ৩৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণের বিষয়টি এসেছে। কোন খাতের জন্য কী পরিমাণ সময় প্রশিক্ষণের জন্য সর্বোত্তম, এ নিয়ে এখানে কি কোনো গবেষণা আছে? সব খাতে ৩৬০ ঘণ্টা বা ১৪ দিনের ক্লাসরুম প্রশিক্ষণ প্রয়োজন আছে কি না—আমি জানি না। কোনো খাতে আরও বেশি, কোনো খাতে আরও কম লাগতে পারে। কর্মক্ষেত্রে, বিশেষ করে নারী ও ভিন্নভাবে সক্ষমদের সুবিধার কথা এসেছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের শ্রম আইনে কিছু শর্ত আছে। সেগুলো প্রয়োগ করা যায় কি না বা আরও সংশোধন করা যায় কি না—নীতিমালার দিক থেকে সেটা দেখা যেতে পারে।

প্রশিক্ষণ দিলে কর্মী চলে যাবেন, এর মানে এ নয় যে আমরা প্রশিক্ষণ ছাড়াই কাজ চালাতে থাকব। প্রশিক্ষণ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি বা তার কম। তাঁদের মধ্যে কি এ ঢাকামুখী প্রবণতা অতটা আছে, যতটা স্নাতক পাসদের মধ্যে বেশি। আপনাদের ইলেকট্রনিকস খাতে তো দেখলাম বেশির ভাগই স্নাতক পাস। অন্যান্য খাতের ক্ষেত্রে এ প্রবণতা ততটা বোধ হয় নেই। আপনারা সবাই বড় খুচরা ব্যবসায়ী। মানুষের সঙ্গে আপনাদের অনেক যোগাযোগ রয়েছে। সেখানে প্রচারণার অংশ হিসেবে কর্মপরিবেশে নারীর প্রতি শ্রদ্ধা। শিশু ও নারীর প্রতি কোনো সহিংসতা না, কর্মপরিবেশে কারও প্রতিই সহিংসতা না, ক্রেতার প্রতি সম্মান—এ বার্তাগুলো দেওয়া যায় কি না? এ বার্তাগুলোর মাধ্যমে যেন এ খাতের প্রতি সম্মান বাড়াতে পারি। নীতিনির্ধারণী ও অ্যাডভোকেসি পর্যায়ে কিছু করার সুযোগ থাকলে সে ক্ষেত্রে এমসিসিআই আছে।

মারিয়া হক

default-image

বছর দশেক আগে যখন কোনো খুচরা দোকানে গেলে একেক দিন একেকজন বিক্রয়কর্মী দেখতাম। এখন ইউনিমার্ট বা স্বপ্নে গেলে একই বিক্রয়কর্মী দেখি। তার মানে হলো খুচরা খাত স্থিতিশীল হচ্ছে। আগে এ খাতে ‘স্টপ গ্যাপ’ হিসেবে মানুষ যোগ দিতেন। কিছুদিন চাকরি করে এ খাতে আর থাকব না—এ মনোভাব নিয়ে শিক্ষার্থীরা এ খাতে যোগ দিতেন। এটাকে আলাদা খাত হিসেবে গণ্য করার এটাই সঠিক সময়। যেখানে মানুষ একটি ক্যারিয়ার দেখবেন। অনেকে বিক্রয় সহযোগী থেকে পদোন্নতি পান। যখনই এখানে ক্যারিয়ার দেখব, তখনই অনুপ্রাণিত হব।

বনানীতে একটি বিউটি পারলারে ৩৬ জন নারী কাজ করেন। পারলারের মালিক তাঁদের থাকার জন্য হোস্টেলের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এ রকম ছোট প্রতিষ্ঠান যদি থাকার জায়গা ঠিক করে দিতে পারে, তাহলে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোও দিতে পারবে। নারীরা পারবেন না—এ মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা আস্থা রাখলে সবাই পারবেন। ভিন্ন লিঙ্গের মানুষদের অন্তর্ভুক্ত করতে যায় কি না—তা ভেবে দেখা দরকার।

সুপারিশ

  • খুচরা খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে উপযুক্ত নীতিমালা ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

  • খুচরা খাতে তরুণদের আগ্রহ ও ভালো লাগার বিষয়ে চিহ্নিত করে সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার।

  • খুচরা খাতের বহুমুখিতা মাথায় রেখে প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি করা প্রয়োজন

  • ক্রমবর্ধমান খাত হিসেবে এ খাতে পুরুষ ও নারীর পাশাপাশি ভিন্নভাবে সক্ষম ও ভিন্ন লিঙ্গের মানুষের অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন।

  • বিপণিবিতানগুলোতে নারীদের জন্য আলাদা শৌচাগারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

  • খুচরা খাতের প্রশিক্ষণের সময় যৌক্তিকভাবে আরও কমিয়ে আনা যেতে পারে।

  • রাতের বেলা নারী বিক্রয়কর্মীদের জন্য পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার

  • খুচরা খাতে যুক্ত নারীদের নিরাপদ হোস্টেল ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিতে হবে।

  • কর্মসংস্থান, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে খুচরা খাতকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত
    করতে হবে।

  • সরকারি চাকরির বাইরে এ খাতের নতুন সম্ভাবনার কথা তরুণ-তরুণীদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

গোলটেবিল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন