default-image

স্বাভাবিক সময়েই নারী কৃষিশ্রমিক পুরুষের তুলনায় অর্ধেক মজুরি পান। করোনাকালে সুযোগ পেয়ে নারী শ্রমিকদের আরও কম টাকায় খাটিয়ে নিচ্ছেন ভূমিমালিকেরা। অন্যদিকে নারী কৃষকের বেশির ভাগেরই ভূমির ওপর মালিকানা না থাকায় করোনাকালে সরকারি প্রণোদনা সুবিধা পাচ্ছেন না। মহামারি সময়ের শিক্ষা নিয়ে কৃষি খাতে বৈষম্য কমাতে নারীদের জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে বলেছেন ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিলে অংশ নেওয়া আলোচকেরা।

১৫ অক্টোবর আর্ন্তজাতিক গ্রামীণ নারী দিবস–২০২০ উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিলের আয়োজন করে বেসরকারি সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) এবং প্রথম আলো। ‘কৃষিতে গ্রামীণ নারীর অবদান: করোনাকালে চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক আলোচনায় আলোচকেরা বলেন, করোনাকালে প্রান্তিক নারী চাষিরা অনেক বেশি সংকটের মুখে পড়েছেন।

বিজ্ঞাপন
নারী কৃষকের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৭৩ শতাংশ হলেও স্বীকৃতি নেই। ৯৫ শতাংশ নারী কৃষকের ভূমির মালিকানা নেই।

আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে এএলআরডির উপনির্বাহী পরিচালক রওশন জাহান মনি জানান, করোনাকালে অঘোষিত লকডাউনের সময় কৃষকেরা উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ মূল্য পাননি। কোথাও কোথাও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করা হলেও সরকারের প্রণোদনা অনেক নারী কৃষকের কাছে পৌঁছায়নি। মাত্র ৪–৫ শতাংশ নারী কৃষকের ভূমির ওপর মালিকানা রয়েছে। ফলে কৃষিঋণ থেকেও তাঁরা বঞ্চিত হন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষ কৃষিতে যুক্ত। কৃষি এখন শুধু ধান, গম, সবজি নয়। কৃষি সম্প্রসারিত হয়েছে মাছ চাষ, গবাদিপশু পালন ইত্যাদিতে। আর এ কাজের বেশির ভাগ করেন নারীরা। তাঁদের অংশগ্রহণ ৭২ দশমিক ৬ শতাংশ। তিনি বলেন, মানবকেন্দ্রিক উন্নয়নের কথা ভাবতে গেলে ভূমির ওপর নারী–পুরুষের সমান মালিকানা দরকার। তিনি আরও বলেন, কৃষিপণ্যের যথাযথ মূল্য পেতে কৃষকদের সংগঠিত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ফসল তোলার পরপরই তা যেন বিক্রি করে ফেলা না হয়, এ জন্য গুদাম নির্মাণ ও সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। করোনাকালে কৃষি প্রণোদনার ৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকা কৃষকদের হাতে পৌঁছেছে বলে জানান তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, গ্রামীণ নারীরা দেশের কৃষি অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। নারী কৃষকদের টেকসই করতে তাঁদের সমস্যাগুলো আলাদাভাবে চিহ্নিত করে তা সমাধানে নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। নারী কৃষকদের জন্য আলাদা কৃষি ব্যাংক করতে হবে।

পরিবেশবাদী সংগঠন বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, শুধু কোভিডের কারণে সৃষ্ট সমস্যাগুলোর সমাধান চাওয়া ঠিক হবে না। ভূমিতে সম–অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারলে কৃষিতে নারীর স্বীকৃতি আদায় সম্ভব হবে। খাসজমি নীতিমালায় বিধবা ও স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটা নারীর জন্য সাবালক পুত্রের শর্ত বাতিল করতে হবে। নারী কৃষকদের সংগঠন থাকাও জরুরি।

মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রাঙামাটির সিএইচটি নারী হেডম্যান কার্বারি নেটওয়ার্কের সেক্রেটারি শান্তনা খীসা বলেন, পার্বত্য এলাকায় নারীরা পুরুষের সমান দক্ষতায় কাজ করলেও মজুরি বৈষম্যের শিকার হন। পুরুষ কৃষি শ্রমিক দিনে ৩৫০ টাকা পেলে নারী পান ২০০ টাকা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারপারসন ও সহযোগী অধ্যাপক সানজিদা আক্তার দিনাজপুরে নারী কৃষক–শ্রমিকদের ওপর তাঁর পরিচালিত গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলেন, কাজ হারিয়ে গ্রামের পরিবারের পুরুষটি নগদ অর্থের আশায় কাজ খুঁজতে শহরে গেছেন। আর কৃষিকাজের ভার নারীর ওপর পড়েছে। অথচ কৃষিতে নারী তথ্য, বীজ ও অর্থনৈতিক সেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ ছাড়া অনেক ভূমিমালিক কাজ না থাকার সুযোগ নিয়ে স্বাভাবিকের চেয়েও কম মজুরিতে নারীদের কাজে নিচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, নারী কৃষকদের ভূমির মালিকানা দেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যবস্থার নিশ্চয়তাও দিতে হবে। নারী কৃষকদের পণ্য বিপণনে সমবায় পদ্ধতি নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।

আলোচনায় কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (সিডিএ) নির্বাহী পরিচালক শাহ–ই–মবিন জিন্নাহ বলেন, নারী কৃষকদের সহায়তা দিতে জাতীয় পর্যায়ে টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।

ফরিদপুরের সংগঠন বিএফএফের নির্বাহী প্রধান এ এন এম ফজলুল হাদি সাব্বির বলেন, একজন কৃষককে যেন ফসল উৎপাদনের পরপরই ঋণ পরিশোধে বা অন্য প্রয়োজনে বিক্রি করে না দিতে হয়, সে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

অনুষ্ঠানটির সূচনা বক্তব্যে প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, কৃষিতে নারীর সংকট মোকাবিলার একমাত্র সমাধান হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

মন্তব্য পড়ুন 0