ইউবিআর বাংলাদেশ এলায়েন্স ও প্রথম আলোর আয়োজনে ‘যুববান্ধব স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১৫ নভেম্বর ২০২০।
ইউবিআর বাংলাদেশ এলায়েন্স ও প্রথম আলোর আয়োজনে ‘যুববান্ধব স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১৫ নভেম্বর ২০২০।

গোলটেবিলে অংশগ্রহণকারী

সাহান আরা বানু এনডিসি

মহাপরিচালক (গ্রেড-১),পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর।

মো. শামসুল হক

লাইন ডিরেক্টর, এমএনসিএএইচ,স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

মাশফিকা জামান সাতিয়ার

সিনিয়র অ্যাডভাইজার, এসআরএইচআর অ্যান্ড জেন্ডার, ঢাকার নেদারল্যান্ডস দূতাবাস

মোহাম্মদ শরিফ

পরিচালক (মা ও শিশুস্বাস্থ্য),লাইন ডিরেক্টর (এমসিআরএএইচ), পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর

নূর মোহাম্মদ

নির্বাহী পরিচালক, পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (পিএসটিসি)

আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম

স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ, মাতৃ ও কৈশোর স্বাস্থ্যসেবা, ইউনিসেফ

মোহাম্মদ জুবায়ের মিঞা

কর্মসূচি ব্যবস্থাপক, ইউবিআর-২ প্রকল্প, বাপসা

তৌফিক-উল করিম চৌধুরী

প্রজেক্ট ম্যানেজার, ইউবিআর-২,ও হিয়া প্রজেক্ট আরএইচস্টেপ

সূচনা বক্তব্য

আব্দুল কাইয়ুম

সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো

সঞ্চালনা

ফিরোজ চৌধুরী

সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো

আলোচনা

আব্দুল কাইয়ুম

স্বাস্থ্যসেবা বলতে শুধু স্বাস্থ্য নয়, এর সঙ্গে মানসিক, সামাজিক ও অন্য বিষয়গুলো যেন অনুকূল থাকে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যের সংজ্ঞায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এসব বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ এখন শিশু-কিশোর। মূলত এরাই দেশের ভবিষ্যৎ। এদের শারীরিক, মানসিক ও শিক্ষায় পরিপূর্ণ মানুষ করে গড়ে তুলতে হবে। তাহলে এরা দেশের জন্য বিরাট সম্পদ হবে। স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে দরকার মানসম্মত শিক্ষা। স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে দারিদ্র্য যেন বাধা না হয়, সে বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আমাদের তরুণদের সম্ভাবনা বিকশিত করার জন্য স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত জরুরি। আজকের ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল আলোচনায় উপস্থিত বিশেষজ্ঞ আলোচকেরা এসব বিষয়ে আলোচনা করবেন।

বিজ্ঞাপন

নূর মোহাম্মদ

default-image

ইউবিআর একটা অ্যালায়েন্স। এর সঙ্গে বিভিন্ন সংগঠন রয়েছে। ২০১০ সালের শেষের দিকে আমরা বাংলাদেশে কাজ শুরু করি। এর তিনটি পিলার রয়েছে। একটি হলো স্কুল ও স্কুলের বাইরে কিশোর-কিশোরীদের কমপ্রিহেনসিভ সেক্সুয়াল এডুকেশন দেওয়া। দ্বিতীয় কাজটি হলো যুববান্ধব সেবা প্রদান করা। যুবকেরা তাদের চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ভালো পরিবেশে সেবা পেতে চায়। তাই আমাদের অন্যতম কাজ হলো যুববান্ধব সেবা। আমাদের তৃতীয় কাজটি হলো কিশোর-কিশোরীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা। ২০১০ সালের শেষ দিক থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পাঁচটি দেশি সংগঠন ও দুটি আন্তর্জাতিক সংগঠন একসঙ্গে কাজ করেছি। মূল দাতা সংস্থা হিসেবে আমাদের সঙ্গে ছিল কিংডম অব দ্য নেদারল্যান্ডস দূতাবাস। বাংলাদেশের ১২টি উপজেলায় আমরা কাজ করেছি। যেকোনো উদ্যোগ শুরুতে সীমিত পরিসরে করার চেষ্টা করি। এটি পাঁচ বছর চলার পর আমাদের উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান মনে করেছে, আমাদের কাজ ভালো হয়েছে। তাই সবাই মিলে আবার কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

দ্বিতীয় পর্যায়ে আমার একটু বড় পরিসরে কাজ শুরু করলাম। তবে সব সময় বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা পেয়েছি। এটা না পেলে কাজ করতে পারতাম না। আমাদের সব উদ্যোগের নেতৃত্বে থাকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর। আমরা সব সময় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে কাজ করেছি। আমরা যে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছি, এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, এনসিটিবি, মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে কাজ করছি। বাংলাদেশ সরকার যুববান্ধব সেবা দেওয়ার জন্য কাজ করছে। ইতিমধ্যে প্রায় এক হাজার যুববান্ধব কর্নার করা হয়েছে। যারা এ ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে, আমরা তাদের সঙ্গে কাজ করছি।

আপনারা জেনে খুশি হবেন, আমাদের একটি যুববান্ধব কর্নার পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাননীয় মহাপরিচালক ও পরিচালক উদ্বোধন করবেন। তাঁরা দেখবেন কীভাবে ইউবিআরের যুববান্ধব কর্নার পরিচালিত হচ্ছে। দেখার পর হয়তো তাঁরা আমাদের আরও পরামর্শ দিতে পারেন। সংক্ষেপে বলতে চাই, আমরা সীমিত পরিসরে কাজ শুরু করি। যদি আমরা প্রমাণ করতে পারি সঠিকভাবে কাজ এগোচ্ছে, তাহলে সেটা সরকারের কাছে তুলে ধরতে চাই, যেন এটা আরও বেশি করে মূলধারায় আসে। বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন যুববান্ধব সেবা দিচ্ছে। আমরা এ কাজ চালিয়ে যেতে চাই।

মোহাম্মদ শরিফ

default-image

আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। প্রথম দিকে আমরা যখন এ কাজ করি, তখন বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছিল। ২০১৭ সালের আগেই এসব প্রতিষ্ঠান কৈশোরবান্ধব সেবা কর্নারের মাধ্যমে কাজ করে। এর থেকে ধারণা নিয়ে ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর থেকে প্রতি উপজেলায় কমপক্ষে দুটি করে কৈশোর সেবা কর্নার চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

সারা দেশে এখন আমাদের ৯০৩টি কৈশোর সেবাকেন্দ্র আছে। জেলা পর্যায়ে আমাদের মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র আছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র আছে। এখন আমাদের যুববান্ধব সেবা কার্যক্রমে যেতে হবে। ১০ থেকে ১৯ বছর পর্যন্ত কৈশোরবান্ধব সময় বলি। এই সময় কিশোর-কিশোরীরা ভালোও হতে পারে, আবার খারাপও হতে পারে। এ সময় একজন কিশোর লেখাপড়া শিখে সুশিক্ষিত হতে পারে। আবার কেউ মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদে জড়িয়ে যেতে পারে। এ জন্য আমরা বিষয়টাকে অনেক গুরুত্ব দিই। কৈশোরবান্ধব কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে কাজ করে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। আমরা এসব কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। কোভিডের জন্য গত মার্চ মাস থেকে প্রশিক্ষণে আমাদের কিছু ব্যাঘাত ঘটেছে। এখন আমরা আবার প্রশিক্ষণ আরম্ভ করেছি। প্রশিক্ষণ ছাড়া যাঁরা আছেন—উপসহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা—তাঁদেরও আমরা কাজে লাগাতে পারি। লাইন ডিরেক্টর হিসেবে আপনাদের নিশ্চয়তা দিচ্ছি, ওষুধ থেকে আরম্ভ করে যত সরঞ্জাম আছে, যখন যা প্রয়োজন, মন্ত্রণালয় থেকে সবই পেয়েছি।

শিক্ষা অধিদপ্তরের সঙ্গে আমরা কাজ করার চেষ্টা করছি। ইউনিয়ন পর্যায়ে উপসহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা যাঁরা আছেন, তাঁরা যেন সপ্তাহে দুই দিন স্কুলে স্বাস্থ্যশিক্ষা দেন। আমার জানামতে, আমাদের আশপাশের কোনো দেশে বিনা পয়সায় স্যানিটারি ন্যাপকিন দেওয়া হয় না। আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে এটা দিই। আমরা যে স্যানিটারি ন্যাপকিন প্রদান করি, তা অত্যন্ত উন্নত। আমাদের কাছে এটা পর্যাপ্ত আছে। নেদারল্যান্ডস এম্বাসি আমাদের অনেক সহযোগিতা করছে। তারা আরও করবে বলে আশা করি। স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে মানুষ সেবা নিতে আসে। আর আমাদের সেবা দেওয়ার জন্য মানুষকে বোঝাতে হয়। একটা চিকিৎসা আর একটা সেবা। সেবা দেওয়ার এই কঠিন কাজ আমরা সফলতার সঙ্গে করছি।

আমরা মাতৃমৃত্যু হার কমিয়েছি। শিশুমৃত্যু কমানোর প্রায় লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছেছি। প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব যেন বাড়ে, সে জন্য গণমাধ্যমসহ সবাই আমাদের সহযোগিতা করবে বলে আশা করি। আমরা মনে করি, সরকার সঠিক পথে আছে। আমরা স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি। একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কৈশোর-পুষ্টি। এ জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করছি। মেয়েদের আমরা পর্যাপ্ত আয়রন ফলিক অ্যাসিড দিচ্ছি। কিশোর-কিশোরীদের অনেক ধরনের মানসিক সমস্যা আছে। সে জন্যও কাজ করছি। ইউবিআরসহ যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, তাদের অভিজ্ঞতা আমরা কাজে লাগাতে পারব।

বিজ্ঞাপন

আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম

default-image

আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারকে সহযোগিতা করি। ২০১৭ সালে সরকারকে স্ট্র্যাটেজি, অ্যাকশন প্ল্যান প্রভৃতি দিয়ে সহযোগিতা করেছি। স্ট্র্যাটেজিতে বলা আছে কী প্রয়োজন। দেশে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ কিশোর-কিশোরী আছে। এদের নিয়ে কাজ করি। আমরা ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের সেবা দিচ্ছি। আমরা যখন যুববান্ধব সেবা নিয়ে কাজ করব, তখন ২৪ বছর পর্যন্ত এ সেবা দিতে হবে। অ্যাডলসেন্ট মডেল কেমন হবে, এটা কীভাবে কাজ করবে, ট্রেনিং গাইডলাইন কেমন হবে, নেদারল্যান্ডস এম্বাসির সহযোগিতায় আমাদের যে টেকনিক্যাল এজেন্সি আছে, যেমন ইউএনএফপিএ, ডব্লিউএইচও পার্টনার সংস্থার মধ্যে ইউবিআরসহ অনেক ধরনের গাইডলাইন ডেভেলপ করেছে। এসব গাইডলাইন একসঙ্গে করে একটা ন্যাশনাল বেসিক ট্রেনিং গাইডলাইন ডেভেলপ করা হয়েছে। দেশের জন্য যুববান্ধব সেবার চাহিদা অনেক বেড়েছে। আমরা জানি যে ৬০৩টি যুববান্ধব সেবাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আরও প্রায় ৩০০টি প্রক্রিয়াধীন। চাহিদার তুলনায় এটা অনেক কম। দ্বিতীয়ত, প্রথম কাজ হলো মডেল অনুযায়ী বিভিন্ন জায়গায় এটা স্কেলআপ করা। বাংলাদেশে এখনো অনেক কুসংস্কার আছে। আমাদের কিশোর-কিশোরীরা স্বাস্থ্যের চাহিদা বুঝতে পারে না। অনেকে লুকিয়ে রাখে। কিছুদিন আগে কিছু তথ্য নিয়ে আলোচনা করছিলাম, যেসব কেন্দ্র চালু আছে, সেখানে কারা যায়? দেখা গেছে, এসব কেন্দ্রে কিশোরীরা বেশি যাচ্ছে। কিশোরেরা খুব বেশি যাচ্ছে না। এখন চিন্তা করতে হবে, কীভাবে এই সেবাকে সাজাতে হবে। কীভাবে স্কুলও কিশোর-কিশোরী ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। তাহলে হয়তো কিশোর-কিশোরীরা সমানভাবে সেবা নিতে আসবে। এটাকে কীভাবে জোরদার করা যায়, সে জন্য আমরা একটা গবেষণা করেছি।

সম্প্রতি সরকারের কাছে আমরা একটা জেন্ডার ফ্রেন্ডলি মডেল উপস্থাপন করেছি। আমাদের উদ্দেশ্য, কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে সমতা নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৩ সালের তথ্য থেকে ২০১৬ সালের তথ্যে দেখো যাচ্ছে, আত্মহত্যার পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে আমরা অগ্রাধিকারের মধ্যে এনেছি। কিন্তু একটা কেন্দ্রে যদি একজন যুবক মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য যান, তাহলে এখন কেন্দ্রে যাঁরা আছেন, তাঁরা প্রশিক্ষণ ছাড়া এ সেবা দিতে পারবেন না। এই প্রশিক্ষণের জন্য ব্র্যাক ও নেদারল্যান্ডস এম্বাসির সহযোগিতায় একটা গাইডলাইন ডেভেলপ করেছি। হয়তো খুব দ্রুতই এটা প্রশিক্ষণের জন্য অনুমোদন পাবে।

যুবকেন্দ্রে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা বুঝতে পারবেন কীভাবে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে হবে। স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়েও আমাদের কথা বলতে হবে। একজন কিশোর বা কিশোরী যদি কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যায় এবং সে যদি মানসম্মত সেবা না পায়, তাহলে সে আর ওই সেবাকেন্দ্রে যাবে না। কারণ, সে সাধারণত স্বাস্থ্যগত সমস্যা নিয়ে যায় না, যায় বয়ঃসন্ধিকালের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে। এ জন্য আমরা মনে করি, মানসম্মত সেবা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আগে ১৮ বছর পর্যন্ত সেবা দিতাম। এখন আমাদের যুববান্ধব সেবা দিতে হবে। আমার দেখেছি, বিভিন্ন কারণে এ সেবাও গুরুত্বপূর্ণ। কিশোর-কিশোরী সেবা আরও বেশি জরুরি। আমাদের এ সেবা ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত আছে। তাদের প্রশিক্ষণ, বসার জন্য এমন পরিবেশ করা হয়েছে, যেন তারা খোলামেলা আলোচনা করতে পারে। তাদের পুষ্টির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সহিংসতার পরিমাণ আগের থেকে অনেক বেড়েছে। শুধু কোভিডের জন্য সহিংসতা বেড়েছে, তা নয়। সহিংসতা সব সময়েই ছিল। এটি কমাতে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। মহিলা ও শিশু এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এ ক্ষেত্রে আরও জোরদার ভূমিকা পালন করতে হবে। স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে এ ক্ষেত্রে কাজ করতে হবে। কিশোর-কিশোরী ও যুবাদের বিষয়ে এখন থেকে যদি কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারি, তাহলে ভবিষ্যতে অনেক বেশি সুবিধা পাব।

মো. শামসুল হক

default-image

চতুর্থ এইচপিএনএসপি কর্মসূচির মধ্যে কৈশোর স্বাস্থ্যসেবা ছিল অগ্রাধিকারে। এ জন্য প্রশিক্ষক ও সেবাদানকারীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। ২১ জেলায় আমরা পিয়ার এডুকেশনের কার্যক্রম চালু করেছি। এটা এখনো চলমান। এর পাশাপাশি কৈশোর স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ১০ হাজার শিক্ষক, ৪ হাজার ৫০০ স্বাস্থ্যসেবা দানকারী, ৫ হাজার ৩৪৫ জন পেয়ার এডুকেটর আমাদের এই শিক্ষা নিয়েছেন। আমাদের এডোহার্ট নামে একটা প্রকল্প আছে। এ প্রকল্পের আওতায় গাজীপুর, টাঙ্গাইল, খুলনা ও জামালপুরে কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা চালু আছে। কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন–স্বাস্থ্য রক্ষায় সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের ১৫০টি স্কুলে এ কার্যক্রম চলেছে। ১ হাজার ৫০০ স্কুলে আমরা ফার্স্ট এইড বক্স সরবরাহ করেছি। এক হাজার স্কুলে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার জন্য বালতি, মগ, স্যান্ডেল, সাবানসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়েছি। স্কুলে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার জন্য স্কুলের স্টাফ-নার্সদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এসব স্কুলে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে কি না, সে জন্য নিয়মিত তদারকি হচ্ছে। তাঁরা যেন স্বাস্থ্যসেবা চালিয়ে যান, সে জন্য আমরা প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে আলোচনা করি। যে স্কুলের ওয়াশরুম যত ভালো থাকবে, সে স্কুলে শিক্ষার্থীদের সংক্রমণের হার তত কম হবে। প্রাথমিক ও উচ্চবিদ্যালয়—সব ক্ষেত্রে একই অবস্থা হবে। আমরা স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের মোটিভেশনের চেষ্টা করি। সরকার এ কাজগুলা চলমান রেখেছে। এমন নয় যে এটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। ভবিষ্যতে এটা আমরা সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে চাই। এ ক্ষেত্রে ইউনিসেফসহ অনেকে আমাদের সহযোগিতা করে। ইউনিসেফের যুববান্ধব পরিকল্পনার সঙ্গে আমরা যুক্ত আছি।

আগামী দিনে যে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হবে, তখন যুববান্ধব পরিকল্পনা আরও জোরদার করব। আমাদের যে স্বাস্থ্য ও যুববান্ধব সেবাকেন্দ্র চালু আছে, সেখানে কিশোর-কিশোরীরা শারীরিক ও মানসিক—যেকোনো প্রশ্ন যেন করতে পারে, সে বিষয়ে আলোচনা করতে পারে, যৌন নির্যাতন, বিষণ্নতা, নিঃসঙ্গতা, মানসিক চাপ ও হতাশা, বাল্যবিবাহ, সম্পর্কের জটিলতা, যেমন মা-বাবা, বন্ধু, প্রিয়জন বা অন্য যেকোনো সম্পর্ক, এ ছাড়া মনোজগতের সমস্যা, নিরাপদ যৌন আচরণ, এইডস প্রভৃতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা ও অধিকার নিয়েও আলোচনা করা হয়। যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কিশোর-কিশোরীরা সব সময়ই একটা অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে থাকে। কেন যেন তাদের মনে হয়, এটা বলা যাবে না, করা যাবে না, কেউ জানবে না ইত্যাদি। কিন্তু যখন তাদের সামনে এসব বিষয় নিয়ে আসা হয়, তখন তারা সব বিষয় আলোচনা করে। কোনো বিবাহিত নারী যদি আসেন, তাঁর যদি পরিবার পরিকল্পনা সেবার প্রয়োজন হয়, প্রসব–পূর্ব ও পরবর্তী সেবা দিয়ে থাকি। আবার সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা যেমন জ্বর-সর্দি-কাশি, সাধারণ কেটে যাওয়া, এর সঙ্গে টিকা দেওয়া প্রভৃতি সেবাও দিয়ে থাকি। আমরা বলে থাকি, ১৫ বছরের পর থেকে প্রত্যেক মেয়েকে টিকা দিতে হবে। মাসিক শুরুর পর থেকে প্রত্যেক মেয়েকে বিনা মূল্যে আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড দিয়ে থাকি। ভবিষ্যতে আমাদের কার্যক্রমের ব্যাপ্তি আরও বাড়াতে চেষ্টা করব।

তৌফিক-উল করিম চৌধুরী

default-image

২০১০ সাল থেকে আমরা ৬টি সংস্থা ১২টি উপজেলায় যুববান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করছি। ইউবিআর প্রকল্পের তিনটি পিলারের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পিলার হলো যুববান্ধব স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনা। ১২টি উপজেলায় আমাদের যে স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র রয়েছে, এর বাইরেও সরকারের স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র থেকে ৩০টির মতো যুববান্ধব স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র পরিচালনা করছি। এখানে নিজস্ব মডেল প্রয়োগের কথা ভেবেছি। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের অনুমতি নিয়ে ১২টি উপজেলার যুববান্ধব সরকারি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে কর্নার স্থাপন করেছি। এখানে আমরা ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সী যুব ও কিশোর-কিশোরীদরে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা দিই। আমাদের এ কাজ চলমান। সরকারি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রগুলোতে সহযোগিতা দিই। এখানে যেসব স্বাস্থ্যসেবাদানকারী থাকেন, তাঁদের প্রশিক্ষণ দিই।

আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষার ওপর। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ কাজে আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে। কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক প্রক্রিয়াগত বিভিন্ন সমস্যা জানার কৌতূহল থাকে। সাধারণত অনেক প্রশ্নের উত্তর তারা জানতে পারে না। যৌন ও প্রজনন–স্বাস্থ্যবিষয়ক যেসব প্রশ্নের উত্তর তারা জানতে পারে না, সেসব প্রশ্নের উত্তর আমরা দিয়ে থাকি। আমি মনে করি যুববান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে প্রতিবন্ধকতা থেকে সম্ভাবনা বেশি।

১২টি উপজেলায় আমরা কাজ করেছি। সারা দেশের জন্য এটা যথেষ্ট নয়। তবে আমরা যে মডেলটা প্রতিষ্ঠা করেছি এবং এখানে যেভাবে আমাদের সফলতা এসেছে, এ অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারি। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর অবশ্য সারা দেশে অনেকগুলো যুববান্ধব সেবাকেন্দ্র স্থাপন করেছে। এসব কেন্দ্র থেকে অনেক কিশোর-কিশোরী যৌন ও প্রজনন–স্বাস্থ্য শিক্ষা বিষয়ে ধারণা নিচ্ছে। ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই এরা সুশিক্ষিত হয়ে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখবে।

নেদারল্যান্ডস এম্বাসির সহযোগিতায় আমরা যে কেন্দ্রগুলোতে সেবা দিচ্ছি, কখনো যদি আমাদের সেবা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে যেন এটা চালু থাকে, আমরা এই প্রত্যাশা করি। আমাদের কিশোর-কিশোরীদের যুববান্ধব এবং যৌন ও প্রজনন–স্বাস্থ্যসেবা যেন কোনোভাবে ব্যাহত না হয়, এ জন্য আমি বিনীতভাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

বিজ্ঞাপন

মাশফিকা জামান সাতিয়ার

default-image

ইতিমধ্যে আপনারা জেনেছেন, ইউবিআর ২০১০ সালে কাজ শুরু করে ২০১৫ সালে শেষ করে। দ্বিতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৬ সালে। আজ এ জায়গায় এসে দাবি করতে পারি যে আমরা অনেকটাই সফলভাবে কাজ করছি। দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কিশোর-কিশোরী। আমাদের লক্ষ্য হলো, কিশোর–কিশোরীরা যেন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সঠিক তথ্য পায়। কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন–স্বাস্থ্যের সঠিক তথ্য পাওয়া খুব জরুরি। বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক মাধ্যম থেকে শিশুরা তথ্য নিচ্ছে। এটা আসলে ঠিক নয়। ইউবিআরের যুববান্ধব প্রকল্পের মাধ্যমে যুবসমাজ সঠিক তথ্য নিতে পারছে। আমাদের এনজিও ক্লিনিকগুলোতে তারা খুব আগ্রহ নিয়ে সেবা নিতে আসে। তাদের জন্য আমরা পরামর্শ সেবাদানের ব্যবস্থা করেছি। তঁারা প্রথমে ছিলেন পেয়ার এডুকেটর। পরবর্তী সময়ে তাঁরাই পরামর্শ পেয়ে ভালো পরামর্শক হয়েছেন।

যৌন ও প্রজননের বিষয়গুলো নিয়ে দেশে অনেক কুসংস্কার রয়েছে। এটা কাটিয়ে উঠতে ১২টা উপজেলায় যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটা সত্যি প্রশংসার দাবি রাখে। ১২টা উপজেলায় একইভাবে একই মডেলে কাজ করা হয়েছে। ইউনাইট ফর বডি রাইটস সরকারের যে সংস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ করার উদাহরণ তৈরি করেছে, সেটা একটা প্রশংসার বিষয়। আজকের আলোচনায় মোহাম্মদ শরিফ উপস্থিত আছেন। তিনি জানেন এই প্রকল্প কীভাবে কাজ করেছে। দ্বিতীয় ধাপে ইউবিআরের নিজস্ব এনজিও ক্লিনিকের পাশাপাশি সরকারের সহযোগিতায় তাদের ক্লিনিকগুলোতেও সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। এ কাজও সফলভাবে করা গেছে।

যুববান্ধব হলো এমন একটা পরিবেশ, যেখানে যুবকেরা আসতে আগ্রহ বোধ করবেন এবং তাঁরা যে সেবাগুলো নিতে চান, সে সেবাগুলো সেখানে থাকবে। এখান থেকে স্বাস্থ্যসেবা নিতে তাঁরা কোনো সংকোচ বোধ করবেন না। খুব সংবেদনশীলভাবে তাঁদের সেখানে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়। ইউবিআরের ক্লিনিকগুলো আসলেই সে রকম। এখানে কিশোর-কিশোরীরা আসে। তাদের পছন্দমতো এক্সট্রা কারিকুলাম অ্যাকটিভিটিজ করে। তারা একত্র হয়। তারা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। তারা এখান থেকে যেটা শেখে, সেটা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ ক্ষেত্রে আমাদের মডেলটা খুব সফলভাবে কাজ করেছে।

আমাদের প্রতিটা কাজের সঙ্গে সরকার রয়েছে। উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো সমগ্র বাংলাদেশে কাজ করতে পারবে না। আমাদের পরীক্ষিত কাজগুলো সরকারের কাছে দিতে চাই। সরকার যেন এটা চলমান রাখে। এ ক্ষেত্রে সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর কাজ করছে। আমরা সরকারের সঙ্গে অ্যাডোহার্ট নামে একটি প্রকল্প করছি। এ প্রকল্পের মাধ্যমেও কিশোর-কিশোরীরা স্বাস্থ্যসেবা পাবে। এটা সারা দেশেই বিস্তৃত হবে। ইউবিআরের সঙ্গে শুরু থেকেই জড়িত ছিলাম। দেখেছি ইউবিআরের কেন্দ্রগুলোয় অনেক অভিভাবক এসেছেন। তাঁরা স্বীকার করেছেন যে ইউবিআর তরুণ প্রজন্মের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ করেছে। যে তথ্যগুলো অভিভাবকেরা দিতে পারতেন না, সে তথ্যগুলো তাঁরা এখান থেকে পেয়েছেন। এ ধরনের কার্যক্রম তরুণ প্রজন্মের জন্য চলমান থাকা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করি।

মোহাম্মদ জুবায়ের মিঞা

default-image

ইউবিআর তার কর্মএলাকার মধ্যে একটা আন্দোলনের মতো ছিল। আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি সরকারের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করার জন্য। আমরা অনেক যুবা ও শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। সরকার যদি আমাদের কার্যক্রমকে তাদের সঙ্গে যুক্ত করে নেয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় যুবসমাজ খুব ভালো সেবা পাবে বলে আশা করি। সরকারের পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব আছে। এখন আমরা অ্যাডোহার্টের আলোকে কাজ করছি। যুববান্ধব সেবার ক্ষেত্রে সরকার ও সরকারের কর্মীদের যথেষ্ট সদিচ্ছা আছে। জনবল বাড়িয়ে এ সেবা কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে হবে।

সাহান আরা বানু

default-image

অত্যন্ত সময়োপযোগী একটা আলোচনা হচ্ছে। আমাদের সংবিধানের ১৮ ধারায় বাংলাদেশের সব নাগরিকের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির নিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে। সে অনুযায়ী ২০১১ সালের জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ও ২০১২ সালে প্রণীত জনসংখ্যা নীতিতে কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবার ওপার গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ২০৩০ সালের জন্য একটা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে সব কিশোর-কিশোরীর একটা সুন্দর-সুস্থ জীবনের নিশ্চয়তা প্রদানের কথা বলা হয়েছে।

চতুর্থ এইচপিএন সেক্টর প্রোগ্রামে যেটা ২০১৭ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত পরিচালনা করা হবে, সেখানে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের আওতায় এমসিআরএএইচ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতায় এমএনসিএইচের আওতায় কৈশোরবান্ধব কার্যক্রমের ওপর পর্যাপ্ত জোর দেওয়া হয়েছে। পুরো দেশেই এটা পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে যেহেতু আমাদের জনবল–সংকট রয়েছে, সম্পদের সদ্ব্যবহার ও অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয় রয়েছে, সে ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার বিবেচনা করে দুর্গম অঞ্চলে সেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ৯০৩টি অ্যাডলসেন্ট ফ্রেন্ডলি সেন্টার পরিচালিত হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি উপজেলায় দুটি করে কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।

এভাবে বাংলাদেশের সব ইউনিয়ন পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র ও জেলায় মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে এ সেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে আমাদের স্কুলগুলোয় স্বাস্থ্যসচেতনতা ও প্রজনন স্বাস্থ্যের পরামর্শ দেওয়া হয়। কোভিডকালে কিছুটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলেও আমাদের কৈশোরবান্ধব কেন্দ্রগুলো খোলা ছিল। বর্তমানে ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ইউনিয়ন পর্যায়ে একটি করে মডেল ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র করা হয়েছে। এ ছাড়া উপজেলা পর্যায়ে একটি করে ও জেলা পর্যায়ে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট একটি মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়ার জন্য সরকার জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে এবং কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে কৈশোরবান্ধব সেবা নিশ্চিতসহ যারা শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী, তাদেরও সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পোশাকশিল্পের তরুণ-তরুণীদের পরিবার পরিকল্পনা ও পরামর্শসেবা সম্প্রসারণের জন্য স্যাটেলাইট ক্লিনিকের ব্যবস্থা করেছি। ইতিমধ্যে ১০টি পোশাকশিল্পে এ সেবা চালু করেছি। ৩২টি জেলায় অনলাইনের মাধ্যমে সেবা প্রদান করা হচ্ছে। টাঙ্গাইল ও হবিগঞ্জ সম্পূর্ণ অনলাইন সেবার আওতায় আনা হয়েছে। ধীরে ধীরে এ সেবার আওতা বাড়ানো হবে। এর ফলে সবাই সহজে সেবা গ্রহণ করতে পারছে। অনলাইনে তথ্য গ্রহণের মাধ্যমে গাজীপুরের কাপাসিয়াকে মাতৃমৃত্যুমুক্ত কাপাসিয়া মডেল তৈরি করেছি। মুজিব বর্ষ উপলক্ষে আরও ১০০টি কেন্দ্রে এই মডেল সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

কোভিডকালে টেলিমেডিসিন সেবা গুরুত্ব পেয়েছে। আমরা সে বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছি। কিশোর-কিশোরীবান্ধব সেবা দেওয়ার জন্য আমাদের অধিদপ্তরে একটি কল সেন্টার সার্বক্ষণিক কাজ করছে। এর নম্বর হচ্ছে ১৬৭৬৭। তিনটি জিরোতে আমরা আসতে চাই। এর একটি হলো শতভাগ পরিবার পরিকল্পনার সেবা পৌঁছে দিতে চাই। দ্বিতীয় হলো আমরা কোনো মাতৃমৃত্যু চাই না। এ জন্য আমাদের যেসব নবদম্পতি রয়েছেন, তাঁরা যেন পরিবার পরিকল্পনার সঠিক পদ্ধতি ব্যবহার করেন। আমরা নারী ও কিশোরীদের প্রতি কোনো রকম সহিংসতা দেখতে চাই না। এ জন্য আইনের যেন সঠিক প্রয়োগ হয়। আমি বিচারব্যবস্থার সঙ্গে ছিলাম। আমি মনে করি, আইন প্রয়োগের জন্য দরকার সর্বস্তরে সচেতনতা। সরকার সেবা দেওয়ার জন্য অনেক কিছু করছে। কিন্তু যাঁরা সেবা গ্রহণ করবেন, তাঁরা যদি সচেতন না হন, তাহলে কোনো উদ্যোগই ফলপ্রসূ হবে না। সবার ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিত প্রচেষ্টায় সামনে এগিয়ে যাব। তরুণ জনগোষ্ঠীকে সম্পদে পরিণত করব। ২০৪১ সালের মধ্যে একটি সুখী-সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে গড়ে উঠব।

ফিরোজ চৌধুরী

এতক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হলো। আজকের কিশোর-কিশোরীরা আগামী দিনে দেশ পরিচালনা করবে। তাদের জন্য যুববান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। কীভাবে দেশে যুববান্ধব স্বস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ করা যায়, আলোচকেরা সে বিষয়ে সুপারিশ ও পরামর্শ দিয়েছেন। আশা করা যায়, নীতি নির্ধারকেরা এসব বিষয় বিবেচনা করবেন। ভার্চু্যয়াল গোলটেবিল আলোচনায় যুক্ত হওয়ার জন্য প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

আলোচনায় সুপারিশ

  • কিশোরেরা যেন মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদে যুক্ত না হয়, সে জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

  • ৬০৩টি যুববান্ধব সেবাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আরও প্রায় ৩০০টি প্রক্রিয়াধীন। কৈশোরবান্ধব সেবাকেন্দ্র আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

  • পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় যুববান্ধব স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বেশি করে বাজেট বরাদ্দের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

  • স্কুল ও স্কুলের বাইরে সবাইকে যুববান্ধব সেবার আওতায় আনা জরুরি।

  • কিশোর-কিশোরীদের যুববান্ধব এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা যেন কোনোভাবে ব্যাহত না হয়, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

  • সরকার সেবা দেওয়ার জন্য অনেক কিছু করছে। কিন্তু যাঁরা সেবা গ্রহণ করবেন, তাঁরা যদি সচেতন না হন, তাহলে কোনো উদ্যোগ ফলপ্রসূ হবে না।

  • সমগ্র বাংলাদেশে উন্নয়ন সহযোগীরা কাজ করতে পারবে না। ফলপ্রসূ কর্মসূচিগুলো সরকার যেন চলমান রাখে।

মন্তব্য করুন