default-image

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় রোল মডেল হলেও নগরকেন্দ্রিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো কিছুটা পিছিয়ে। এখনই টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে নগরগুলোতে শৃঙ্খলা না ফেরাতে পারলে সামনে বড় দুর্ভোগ অপেক্ষা করছে। তবে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় হলে নগর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও অগ্রগতি সম্ভব।

গতকাল রোববার ‘নগরকেন্দ্রিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকার ও আন্তসংস্থার সমন্বয়’ শীর্ষক ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সিভিল প্রোটেকশন এন্ড হিউম্যানিট্যারিয়ান এইডের (ইকো) সহযোগিতায় বৈঠকটির আয়োজন করে সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশ ও প্রথম আলো

গোলটেবিলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান বলেন, নগর দুর্যোগের পূর্বাভাস থাকে না, এতে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি বেশি হয়। নিয়ন্ত্রণে আনতেও বেগ পেতে হয়। নগর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ এখনো সমন্বিতভাবে দক্ষ হয়ে উঠতে পারেনি। বিশেষ করে ভূমিকম্প মোকাবিলার ক্ষেত্রে খুব বেশি এগোতে পারেনি। সরকারের সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট কমিটি বছরে দুবার এবং কোনো দুর্যোগের পূর্বাভাস থাকলে এর আগে এবং পরে কমিটির সভা করা হয়।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুর্যোগ মন্ত্রণালয় এবং এর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে ২ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার থাকলেও বাংলাদেশে তা ছিল না। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ১০০ কাঠা জমির ওপর ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার নির্মাণের কাজ শুরু হচ্ছে।

ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান আরও বলেন, স্কাউট, গার্লস গাইড, বিএনসিসি, রেড ক্রিসেন্টেরসহ সব ধরনের স্বেচ্ছাসেবক বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশে ৪২ লাখ স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছে।

বিজ্ঞাপন

আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় করা গেলে নগর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ রোল মডেল হবে বলে মনে করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ঢাকা শহরে সরকারের ৪৬টি সংস্থা কাজ করে। কোন সংস্থা কার অধীনে রয়েছে, সেটি বিষয় নয়, সবাইকে নগরবাসীর সেবায় কাজ করতে হবে। অপরিকল্পিত এই শহরকে পরিকল্পিত করতে গেলে জনগণের মানসিকতায়ও বদল আনতে হবে। তিনি বলেন, নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা না থাকলে কোনো ভবনের হোল্ডিং নম্বর দেওয়া হবে না।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, ওয়ার্ড দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি করায় লোকজনকে সচেতন করা যাচ্ছে। ৩৫০ জন স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগে স্থানীয় লোকজনের ভূমিকা বেশি, তাই তাদের সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে সিটি করপোরেশনগুলোকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। দুর্যোগে আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো ফাঁকা জায়গা নেই, এখন থেকে উদ্যোগ না নিলে শহরগুলোতে আর খালি জায়গা পাওয়া যাবে না।

এখনই ঢাকাকে শৃঙ্খলায় না ফেরাতে পারলে সামনে বড় দুর্ভোগ অপেক্ষা করছে বলে মন্তব্য করেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসেন। তিনি বলেন, নগরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগও মোকাবিলা করতে হয়। দুর্যোগে যেসব সংস্থা কাজ করে, তাদের মধ্যে সমন্বয় না হলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন। ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার অবস্থা কী হবে, তা নিয়ে তাঁরা শঙ্কিত। ঢাকার অনেক কিছুই হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। ঢাকার মাটির নিচে কোথায় গ্যাসের লাইন আছে, সেটার কোনো ম্যাপ নেই।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসেন আরও বলেন, ভবিষ্যতে কী ধরনের দুর্যোগ হতে পারে, সেটি মাথায় রেখে ভূগর্ভস্থ গ্যাস, বিদ্যুতের সংযোগ (ইউটিলিটি সার্ভিস) শৃঙ্খলায় আনতে হবে। দুর্যোগের সময় দ্রুত গ্যাস-সংযোগ বন্ধ করতে জোনভিত্তিক ব্যবস্থা করা দরকার।

প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুমের সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে বৈঠক শুরু হয়। বৈঠকে ইউএনডিপির সহকারী আবাসিক প্রতিনিধি আশেকুর রহমান বলেন, নগরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়ে মানবসৃষ্ট দুর্যোগ বেশি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে অনেক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা কম ও জনবলসংকট রয়েছে। কার্যকর নগর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা করতে হলে নগর প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থ ও জনবল দিয়ে শক্তিশালী করতে হবে। পরিকল্পিত ও টেকসই নগরায়ণ নীতিমালা প্রয়োজন। কিন্তু জাতীয় নগরায়ণ নীতিমালার খসড়া হলেও বহু বছরেও তা চূড়ান্ত হয়নি।

বিজ্ঞাপন

রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) প্রকল্পের পরিচালক আশরাফুল ইসলাম বলেন, রাজউক ঢাকার ভূগর্ভস্থ মাটি পরীক্ষা করছে। এটি ‍চূড়ান্ত হলে কোন এলাকা বহুতল ভবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, কোথায় ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে, তা চিহ্নিত করা যাবে। দেশে অনেক মেগা প্রকল্প চলমান। গণপরিসর তৈরি করতে প্রকল্প নেওয়া দরকার।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সিভিল প্রোটেকশন এন্ড হিউম্যানিট্যারিয়ান এইডের (ইকো) প্রোগ্রাম সহকারী মুকিত বিল্লাহ বলেন, দুর্যোগ ঘটার আগেই প্রস্তুতিমূলক কাজ করা গেলে ক্ষতি হ্রাস করা যায়। দুর্যোগ প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশ পিছিয়ে আছে। নগরকেন্দ্রিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বেশ জটিল। একা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে এটি সম্ভব না। আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় থাকলে শহরাঞ্চলে দুর্যোগের প্রস্তুতি আগেই নেওয়া সম্ভব।

ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিলে জানানো হয়, ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন ও অধিক জনসংখ্যার কারণে বিশ্বে সবচেয়ে দুর্যোগপ্রবণ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ স্থানে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট দুর্যোগের অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশ ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে ভৌগোলিক অবস্থান, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ঘনবসতি, দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো, বিল্ডিং কোড না মেনে ভবন নির্মাণ, অসচেতনতা ইত্যাদির কারণে সিটি করপোরেশন এলাকাগুলোর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

আলোচকেরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা প্রকৃতিসৃষ্ট দুর্যোগের ফলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা হয়েছে। এই কাজ আরও সমন্বিত করার সুযোগ আছে। বর্তমানে নগর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার যে পরিকল্পনা, সেগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দ্বারা প্রভাবিত।

নগরকেন্দ্রিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে করোনার মতো মহামারির বিষয়কেও মাথায় রাখার পরামর্শ দেন আলোচকেরা। তাঁরা বলেন, করোনা দুর্যোগের নতুন বাস্তবতা। করোনা শুরুর পর থেকে মৃতদেহ দাফন ও সৎকারের ক্ষেত্রে নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে। ভবিষ্যতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের হিউম্যানিটারিয়ান পরিচালক মোসতাক হোসেন বলেন, ওয়ার্ড দুর্যোগ ব্যবস্থপনা কমিটির সঙ্গে অন্যান্য সংস্থার সমন্বয় করতে পারলে ওয়ার্ড পর্যায়েই দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব। সারা দেশের স্বেচ্ছাসেবকদের তথ্য সম্বলিত একটি ডেটাবেস তৈরি করা হচ্ছে। সাইক্লোন, বন্যার মতো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ রোল মডেল। কিন্তু নগরকেন্দ্রিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় এখনো কিছুটা পিছিয়ে। সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় হলে এই ক্ষেত্রেও অগ্রগতি সম্ভব।

বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

গোলটেবিল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন