>

অনুদ্বৈপায়নেরা ইতিহাসের আকাশ ফুঁড়ে জ্বলতে থাকা জাজ্বল্যমান নক্ষত্র। নক্ষত্র জ্বলতে থাকে অনির্বাণ, গন্তব্য নির্দেশ করে। আমাদেরই দায় সেই নক্ষত্র চিনে নেওয়া, তার ইশারায় পথ খুঁজে নেওয়া

default-image

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক জগন্নাথ হল প্রাঙ্গণে যে স্থানটিতে এখন ১৯৮৫ সালের ভয়াল কালরাতের স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অক্টোবর স্মৃতি ভবন, সেখানে একসময় ছিল শহীদ অনুদ্বৈপায়ন হল। এক শোকের স্মৃতি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে আরেক শোকস্মৃতির ভগ্নস্তূপে। কোনো শোকই পরিমাপযোগ্য নয়, তবু যে শোকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কোনো জাতির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা আর সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জনের ইতিহাস, সে শোক যেন সব বর্তমান আড়াল করে দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের অহংকারের সাক্ষ্য হয়ে। অনেক অনেক কাল ধরে দেশ-জাতির ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে অনন্তের পথে।
বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের সেই ভয়াল ক্রান্তিকালের প্রাথমিক লগ্নে যাঁরা বলি হয়েছেন, সেই সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জনের যূপকাষ্ঠে, নানা বেশে মুখোশে ঘাতকেরা বারবার অস্বীকার করতে চেয়েছে তাঁদের অবদান। আত্মপরিচয়ের শিকড় বিচ্ছিন্ন করে দিতে মুছে ফেলতে চেয়েছে তাঁদের নাম-নিশানা। কিন্তু ইতিহাসের বড় শিক্ষা, ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। যে রক্তক্ষয়ী আত্মদানের ভিত্তিভূমিতে দাঁড়িয়ে একটি জাতির অবিচল যাত্রা, তাঁদের শিকড়বিচ্ছিন্ন করা কখনোই সহজ নয়।
|অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য। বাবা দিগেন্দ্রচন্দ্র ভট্টাচার্য, মা রাজলক্ষ্মী ভট্টাচার্য। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে জ্যেষ্ঠ সন্তান অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য।

হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার করগাঁও ইউনিয়নের জন্তরী গ্রামের মোটামুটি মধ্যবিত্ত স্কুলশিক্ষক দিগেন্দ্র চন্দ্র ভট্টাচার্য। একই সঙ্গে আয়ুর্বেদ চিকিৎসকও ছিলেন তিনি। ১৯৪৫ সালের ৩১ জানুয়ারি অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের জন্ম। ১৯৫৬ সালে নবীগঞ্জ যোগল কিশোর হাইস্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন। কৈশোর থেকেই সর্বত্র অপরিমেয় মেধার স্বাক্ষর রাখা অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য ১৯৬১ সালে প্রথম শ্রেণিতে গণিত ও সংস্কৃত বিষয়ে লেটার নম্বর পেয়ে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৬৩ সালে এসসি কলেজ থেকে মেধাতালিকায় বিশেষ স্থান অর্জন করে আইএসসি পাস করেন। ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে। সেখানেও অমিত মেধার স্বাক্ষর রেখে প্রথম শ্রেণিতে তৃতীয় স্থান অধিকার করে বিএসসি সম্মান ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৬৬ সালে। ১৯৬৭ সালে ফলিত পদার্থবিজ্ঞান শাখায় প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান পেয়ে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। ফলিত পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য ১৯৬৮ সালের ১৪ মার্চ একই বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। নিয়োগ পান জগন্নাথ হলের আবাসিক শিক্ষক হিসেবে। ছাত্রজীবনের কৃতিত্ব আর পেশাগত জীবনের দক্ষতার কারণে তিনি কলম্বো প্ল্যানের অধীনে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পেয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তাঁর লন্ডন যাওয়ার ফ্লাইট নির্ধারিত ছিল।

default-image

যুদ্ধ চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কাজে যোগ দেওয়ার জন্য নোটিশ পাঠায় তাঁর স্থায়ী ঠিকানায়। ১৯৭১ সালের আগস্ট তৎকালীন রেজিস্টার নোট দেন, ২৫ মার্চ কালরাতেই নিহত হয়েছেন অধ্যাপক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য। তারপরও সেপ্টেম্বরে এক চিঠিতে তাঁর বাড়ির ঠিকানায় কাজে যোগদান না করার কারণে জানানো হয়, কাজে যোগ না দেওয়ার জন্য তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ফলিত পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান প্রফেসর এস এম ফজলুর রহমান ১৯৭১ সালে ১৬ অক্টোবর এক চিঠিতে উপাচার্যকে জানান, তাঁর প্রিয় সহকর্মী ছাত্র অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য নিহত হয়েছেন।
১৯৭২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি চিঠি অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের বাবার কাছে আসে। তাতে মুক্তিযুদ্ধের শহীদ পরিবার হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে সংশ্লিষ্ট মহকুমা প্রশাসকের কাছ থেকে দুই হাজার টাকার চেক উত্তোলনের জন্য বলা হয়। নানা মাধ্যম থেকে তাঁর মৃত্যুর খবর শোনা সত্ত্বেও এত দিন ধরে বাড়িতে আসা চাকরিতে যোগদানের পত্র, বরখাস্তের পত্র ইত্যাদি নানাবিধ কারণে পরিবারের মনে ক্ষীণ আশা ছিল, হয়তো তিনি বেঁচে আছেন, হয়তো উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডন পৌঁছে গেছেন। এই চিঠির মধ্য দিয়ে তাঁদের সব প্রত্যাশার পরিসমাপ্তি ঘটে। তাঁর বাবা পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করে রমনা থানা থেকে ছেলের মৃত্যুসনদ গ্রহণ করেছিলেন।
২৫ মার্চের গণহত্যার প্রথম পর্ব শুরু হয়েছিল ধর্মীয় সংখ্যালঘু ছাত্রদের আবাসিক হল জগন্নাথ হল থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য আবাসিক হলসহ রাজারবাগ পুলিশ লাইনস ছিল প্রথম টার্গেট। অপারেশন সার্চলাইটের সেই ভয়াবহ কালরাত ভোর হওয়ার আগেই পাকিস্তানিদের হাতে নিহত হয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য। তাঁর শেষশয্যা হয়েছিল জগন্নাথ হল প্রাঙ্গণের গণকবরে।
অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য চালচলন-বেশভূষায় ছিলেন সাদাসিধে। তাঁর সহপাঠী কানু বণিক, মকসুদ আলী, কৃষ্ণ দেবনাথ প্রমুখ জানান, বেশ অগোছালো এলোমেলো চলাফেরা ছিল তাঁর। শার্টের পকেট মাখামাখি থাকত কালিতে, খেয়ালই করতেন না। কিন্তু তুখোড় মেধায় প্রায়ই তর্ক চালাতেন শিক্ষকদের সঙ্গে। শিক্ষকেরা অসীম মমতায় গ্রহণ করতেন তাঁর এই মেধাদীপ্ত ঔদ্ধত্য।
গ্রামে বসবাসকালে আর দশটা সংস্কারাচ্ছন্ন ব্রাহ্মণ ছেলের মতোই আচরণ ছিল তাঁর। মুসলিম সহপাঠীদের ছুঁয়ে দেওয়া পানি খেতেন না তিনি, এড়িয়ে চলতেন ছোঁয়াছুঁয়ি, মেশামেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন দেখে চমকে যান তাঁর সহপাঠীরা। তাঁর সহপাঠী আলাউদ্দিন আহমেদ স্মরণ করেন সেই মানবিক মধুর স্মৃতি। অনুদ্বৈপায়ন তাঁকে বলেছিলেন, ‘আগে ছিলাম হিন্দু ব্রাহ্মণ, এখন হয়েছি মানুষ।’

শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্য কেবল পেশাগত সাফল্য হয়ে থাকেনি অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের কাছে। কলম্বো প্ল্যানের বৃত্তি নিয়ে লন্ডনে পিএইচডি করতে যাওয়ার প্রস্তুতিকল্পে ২০ মার্চ ১৯৭১ শেষবারের মতো বাড়ি এসেছিলেন তিনি। রাজনৈতিকভাবে দেশ তখন উত্তাল। গণবিস্ফোরণের চাপা আগুনের আঁচে থমথমে চারদিক। আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায় বিপর্যস্ত জনজীবন। ২৪ মার্চ সকালে সবার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় মা রাজলক্ষ্মী দেবী বারবার ঢাকায় ফিরতে নিষেধ করছিলেন তাঁকে, দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায়। নিষেধ অগ্রাহ্য করে ছুটে এসেছিলেন ঢাকায়। হয়তো উচ্চশিক্ষার অদম্য হাতছানি ছিল, সঙ্গে ছিল হাউস টিউটর হিসেবে হলের ছাত্রদের নিরাপত্তার ভাবনাটিও।

২৫ মার্চ সকালে ঢাকায় জগন্নাথ হলে ব্যাচেলর রুমে তাঁর আবাসে ফিরলে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন বন্ধু নির্মল মণ্ডল। সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে যান বন্ধুবান্ধব-সহকর্মীদের কাছে বিদায় নিতে। ক্লাব থেকে ফেরার পথে গিয়েছিলেন সহকর্মী শিক্ষক জালালুর রহমানের বাসায়। সেখানে বলছিলেন, কেন যেন আজ তাঁর হলে ফিরে যেত ভয় করছে। অধ্যাপক জালালুর রহমান পরবর্তী সময়ে অনেকবার তাঁর স্মৃতিচারণে বেদনায় ভেঙে পড়েছেন, দগ্ধ হয়েছেন অনুশোচনায়। যদি তিনি অনুদ্বৈপায়নের এই অজানা শঙ্কাকে গুরুত্ব দিয়ে তাঁকে নিজের বাসায় রাতটা রেখে দিতেন, তবে হয়তো বেঁচে যেতেন তিনি। বেঁচে যেতেন জাতির মেধাবী সন্তান অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য।

অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের অন্তিম সময়টুকু খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন কেউ কেউ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল সার্ভেন্টস কোয়ার্টার-সংলগ্ন ম্যানহোলে ১৯ ঘণ্টা আত্মগোপন করে ছিলেন জগন্নাথ হলের সাধারণ সম্পাদক পরিমল গুহ। তিনি বলেন, ‘আমাদের হলে পাক বাহিনী আক্রমণ করে রাত সাড়ে ১২টায়।...সেদিন আমরা রাইফেলের গুলি শুনিনি, শুনেছিলাম মেশিনগান, মর্টার শেলিং ও মাঝেমধ্যে ট্যাংকের প্রচণ্ড শব্দ।...আমি দেখলাম তারা প্রতিটি রুম তন্নতন্ন করে খুঁজছে।’ ২৬ মার্চ সকালের কথা বলেন পরিমল গুহ। তিনি তখনো ম্যানহোলে। দেখলেন, ‘মাঠের গর্তে আর গর্তের পাড়ে পাড়ে রইল অগণিত প্রাণের নিষ্প্রাণ দেহ। হঠাৎ এই মৃতদেহের স্তূপ থেকে একজন লোক ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে পালাল। আমি স্পষ্ট দেখলাম সেই ভাগ্যবান ব্যক্তি কালীরঞ্জন শীল।’ তিনি বলেন, ‘শহরে নানা রকম জল্পনাকল্পনার মধ্যে সারাটা দিন মিটিং প্যারেড মিছিল করে রাত ১১টার দিকে হলে ফিরলাম।...হঠাৎ মাথার কাছাকাছি বোমার বিকট শব্দে ঘুমে ভেঙে গেল, সজাগ হয়েই শুনি চতুর্দিকে শুধু ঘর্ঘর ঘর্ঘর শব্দ।...রাতের তাণ্ডবলীলা শেষ হলে ভোরে সৈন্যরা তন্নতন্ন করে খুঁজতে থাকে জীবিত ব্যক্তিদের। এ সময় বন্দী হন অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য।’

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, ‘অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছিল তা স্বচক্ষে দেখেছেন পরিমল গুহ, শোভা পাল ও বইবিক্রেতা ইদু মিয়া।...হাত দুটি পেছন মোড়া করে বেঁধে উবু করে বসিয়ে তাঁর সর্বাঙ্গে রাইফেলের বাঁট ও বুট দিয়ে আঘাত করতে করতে তাঁর বোধশক্তি রহিত করে দিয়েছিল। তাঁর পরনে ছিল শুধু একটি অন্তর্বাস।...তিনি যত চিৎকার করছিলেন, নরপশুদের অত্যাচারের মাত্রা তত বৃদ্ধি পাচ্ছিল।’

প্রখ্যাত অধ্যাপক অজয় রায়ের ছাত্র ছিলেন অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত স্মৃতি ১৯৭১-এ তিনি ‘আমার ছাত্র’ শিরোনামে অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের শেষ সময়ের হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের কর্মচারী কেশবচন্দ্র পালের স্ত্রী শোভা পাল খুব কাছ থেকে অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের হত্যাযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেন। তিনি জানান, ২৫ মার্চ পুরো রাত হত্যাযজ্ঞ শেষে ২৬ মার্চ খুব ভোরে অন্ধকারে কজন পাক সেনা তাঁকে বেঁধে নিয়ে এসে সংসদ ভবনের সামনে ফাঁকা স্থানে উবু করে বসিয়ে রাখে। তাঁর পরনে কেবল অন্তর্বাস। চোখ দুটি রক্তলাল। সর্বাঙ্গে প্রহারের চিহ্ন। দিগ্ভ্রান্ত তিনি বিড়বিড় করছিলেন। একটু পর আরও কয়েকজনের সঙ্গে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

জগন্নাথ হলে গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী মরার ভান করে বেঁচে যাওয়া কালীরঞ্জন শীল বলেন, হানাদার বাহিনী বুলডোজার দিয়ে গর্ত খুঁড়ে প্রখ্যাত দার্শনিক গোবিন্দচন্দ্র দেব ও অনুদ্বৈপায়নসহ অসংখ্য ছাত্র-কর্মচারীর মৃতদেহ মাটিতে চাপা দিয়ে রেখে চলে যায়। এভাবেই ইতি ঘটে বাংলার এক মেধাবী তরুণের সম্ভাবনাময় জীবনের।

স্বাধীনতার পর জগন্নাথ হলের সংসদ ভবনটির নাম রাখা হয়েছিল অনুদ্বৈপায়ন ভবন। ১৯৮৫ সালে ভবনটি হঠাৎ ভেঙে পড়ায় অনেক ছাত্রের অকালমৃত্যু হয়। তাঁদের স্মরণে সেখানে তৈরি হয় ‘অক্টোবর স্মৃতি হল’। মুছে যায় অনুদ্বৈপায়নের নাম। বর্তমানে জগন্নাথ হলে একটি পাঠকক্ষ রয়েছে ‘অনুদ্বৈপায়ন স্মৃতি পাঠকক্ষ’ নামে। স্বাধীনতার পর নবীগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে তাঁর গ্রাম জন্তরী পর্যন্ত রাস্তাটির নাম রাখা হয় ‘শহীদ অনুদ্বৈপায়ন সড়ক’ নামে। কালের গর্ভে সেই নামটি হারিয়ে গেছে কলেজ রোড নামের আড়ালে। নামাঙ্কিত ফলকটি পরিণত হয়েছে ধ্বংসাবশেষে।

২০০০ সালে নবীগঞ্জ গণপাঠাগারের উদ্যোগে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রয়াত হাবিবুর রহমান, বীর মুক্তিযোদ্ধা সদ্যপ্রয়াত মাহবুবুর রব সাদী ও মদন মোহন কলেজের অধ্যক্ষ আবুল ফতেহ ফাত্তাহর সহযোগিতায় উজ্জ্বল দাশের সম্পাদনায় তাঁর স্মৃতিতে প্রকাশিত হয়, মৃত্যুঞ্জয়ী প্রজ্ঞাবান নামে একটি সংকলন। ১৯৯২ সালে তাঁকে নিয়ে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাঁর একমাত্র ছোট বোন প্রীতিলতা ছাড়া পরিবারের সবাই ১৯৮০-এর দশকে দেশ ছেড়ে গেছেন চিরতরে। এলাকার বর্তমান প্রজন্মের প্রায় কেউ তাঁর নাম পর্যন্ত জানেন না। এ ইতিহাসের এক নির্মম সত্য। জাতির যেসব মেধাবী সন্তানের রক্তে ভেজা এ মাটি, তাঁদের স্মৃতি রক্ষার্থে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।

অনুদ্বৈপায়নেরা ইতিহাসের আকাশ ফুঁড়ে জ্বলতে থাকা জাজ্বল্যমান নক্ষত্র। নক্ষত্র জ্বলতে থাকে অনির্বাণ, গন্তব্য নির্দেশ করে। আমাদেরই দায় সেই নক্ষত্র চিনে নেওয়া, তার ইশারায় পথ খুঁজে নেওয়া।জানিয়ে যাওয়া প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

রুমা মোদক: লেখক ও নাট্যশিল্পী

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0