>
default-image

তারুণ্য মানে দুর্বার সাহস। নিজেকে পেরিয়ে অন্যের জন্য আত্মত্যাগ। কারণ ‘এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্য’। অধিকার আদায় আর মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তরুণদের আত্মত্যাগ কে আর দেখেছে বাংলাদেশের মতো? এ দেশের ইতিহাসের প্রতিটি ধাপ তরুণদের রক্তে স্নাত। ইতিহাসের এই তরুণ নায়কেরা রচনা করেছেন আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পথ, দিয়েছেন সামনে যাওয়ার অন্তহীন প্রেরণা

default-image

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির বিকেলবেলা। পাকিস্তান সরকারের জারি করা ১৪৪ ধারা ভেঙে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনের রাস্তায় বেরিয়ে এল ছাত্রদের একটি স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল। মিছিলের গন্তব্য পূর্ব বাংলা আইন পরিষদ, অর্থাৎ এখন যেখানে জগন্নাথ হল, সেদিকে। মিছিলকারীদের দাবি, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। হঠাৎ করেই মিছিলে শুরু হলো পুলিশের লাঠিচার্জ ও গুলি। গুলিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হলেন তিনজন। আরও কয়েকজনের সঙ্গে গুলিবিদ্ধ হলেন আবদুস সালাম। তখন সালামের বয়স আর কত হবে? ২৩, ২৪, ২৫ কিংবা ২৭। কবিরা যে বয়সটাকে বলেন মিছিলে যাওয়ার অথবা যুদ্ধে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়, ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে হয়তো সেই সময়টাই পার করছিলেন পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত আবদুস সালাম। মিছিলে গিয়েছিলেন তিনি। যুদ্ধও করেছিলেন বটে, তবে সেটা অন্য রকম যুদ্ধ। একটা যুদ্ধ ছিল হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে জীবনে ফিরে আসার যুদ্ধ, বেঁচে থাকার যুদ্ধ; অন্যটা ছিল হয়তো জীবনযাপনের যুদ্ধ, জীবনে টিকে থাকার যুদ্ধ।
পূর্ব পাকিস্তান সরকারের ডিরেক্টরেট অব ইন্ডাস্ট্রিজ বিভাগের একজন পিয়ন অবদুস সালাম আর কত বেতনই বা পেতেন তখন। সেই টাকায় নিজের ঢাকায় থাকার খরচ মিটিয়ে গ্রামের বাড়িতে বাবাকেও নিশ্চয়ই কিছু টাকা পাঠাতে হতো সালামের। ঢাকায় ৩৬-বি নীলক্ষেত ব্যারাকে বাস করলেও গ্রামের ছেলেটির মন হয়তো পড়ে থাকত ফেনীর দাগনভূঞায়, নিজের জন্মস্থান লক্ষ্মণপুর গ্রামে, যে গ্রামটি পরবর্তী সময়ে আমরা দেখব, পরিচিতি পাচ্ছে আবদুস সালামের নামে।
এখন যেটি সরকারিভাবে সালামনগর, সেই লক্ষ্মণপুরের ধূলি-মাটি-কাদায় বেড়ে ওঠা, কৃষিজীবী মোহাম্মদ ফাজিল মিয়া আর দৌলতের নেছার কোল আলো করে আসা প্রথম সন্তান আবদুস সালাম। বাবা কৃষক হলেও ছেলেকে পড়ালেখা করতে গ্রামের মাতু ভূঁইয়া করিমউল্লাহ উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছিলেন। সেখান থেকে সালাম ভর্তি হন আতাতুর্ক উচ্চবিদ্যালয়ে। তবে পড়াশোনা বেশি দূর চালিয়ে নিতে পারেননি তিনি। সংসারে নিত্য

default-image

অভাব, এক বছর জমিতে ফসল ফলে তো অন্য বছর পাহাড়ি ঢলে ফসল ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সংসারও তো ছোট নয়, সালামের পর আরও পাঁচ সন্তানের মুখে অন্ন জোগাতে হিমশিম খেতে হয় ফাজিল মিয়ার। সালামের জ্যাঠাতো ভাই ঢাকায় চাকরি করেন। তাঁকে দেখে রোজগারের ইচ্ছা জাগে সালামের। ক্লাস নাইনেই পড়াশোনার ইতি ঘটে তাঁর, ম্যাট্রিক ফাইনাল আর দেওয়া হয় না। লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে জ্যাঠাতো ভাইয়ের হাত ধরেই ঢাকায় পাড়ি জমান আবদুস সালাম। তারপর এই চাকরি পাওয়া। সকাল-বিকেল অফিস করা। তবে সময় কাটাতে মাঝেমধ্যেই অফিস থেকে ফিরতি পথে পল্টন ময়দানে চক্কর দেন সালাম। প্রায়ই সেখানে সমাবেশ থাকে, মঞ্চে গরম-গরম বক্তৃতা শোনা যায়। আবার যেদিন সভা থাকে না, সেদিন হয়তো খোলা মাঠে বসে বিনে পয়সার বাতাসের সঙ্গে এক পয়সার বাদাম কিনে খান সালাম। তারপর হাঁটতে হাঁটতে নীলক্ষেতে। সেদিনটা স্পষ্টই মনে আছে সালামের, ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি। পল্টন ময়দানে অনেক মানুষ। চারপাশে লাগানো পোস্টার আর মঞ্চের ব্যানার পড়ে সালাম বুঝতে পারেন, পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল খাজা নাজিমুদ্দীন আসছেন ভাষণ দিতে।
‘উনি কইলাম বাঙালি, ঢাকার নবাব বংশের মানুষ।’ ফিসফিস করে বললেন সালামের পাশে বসে থাকা একজন। সালাম একটু নড়েচড়ে বসেন। মাথায় কালো জিন্নাহ টুপি আর নবাবি শেরওয়ানি পরা খাজা নাজিমুদ্দীন মঞ্চে ওঠেন। কিন্তু লম্বা-চওড়া দেহ, ফরসা চেহারা, নাকের নিচে চিকন গোঁফের খাজা নাজিমুদ্দীনকে কেন যেন বাঙালি মনে হয় না সালামের।

‘ভাইয়োঁ ঔর বহিনোঁ’ বলে খাঁটি উদুর্তে বক্তৃতা শুরু করেন খাজা নাজিমুদ্দীন। সেই বক্তৃতার কিছু সালাম বুঝতে পারেন, কিছু বোঝেন না। টানা একঘেয়ে বক্তৃতার একপর্যায়ে হঠাৎ সমাবেশের মানুষজনের কী যেন হয়, তারা আর স্থির থাকে না। যারা বসে ছিল তারা দাঁড়িয়ে যায়, যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারা চঞ্চল হয়ে ওঠে। সালাম ভালো করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাঁর পাশের লোকটা আকাশের দিকে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ওঠে, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। পুরো সভা ঘিরেই তখন একসঙ্গে শত কণ্ঠে একই স্লোগান ওঠে। যেন শত শত ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে পল্টনের সমাবেশে। সালাম দেখেন, কখন যেন তাঁর হাতও উঠে গেছে ঊর্ধ্বে, তাঁর গলায়ও ধ্বনিত হচ্ছে একই স্লোগান, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। খাজা নাজিমুদ্দীনের বক্তৃতা ততক্ষণে থেমে গেছে। কোন ফাঁকে খালি হয়ে গেছে মঞ্চ। পুরো সমাবেশস্থলে বিশৃঙ্খলা।

সালাম পল্টন থেকে নীলক্ষেতের দিকে হাঁটতে থাকেন। আরও অনেক মানুষ হাঁটছে তাঁর পাশে পাশে। সেসব মানুষের চোখে-মুখে রাগ, ক্ষোভ। সালাম তাদের কথা থেকে বুঝতে পারেন, এর আগেও নাকি জিন্নাহ সাহেব উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন আর তখন ছাত্ররা এর প্রতিবাদ জানিয়েছিল।

নীলক্ষেতে থাকেন বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ঘটনার আঁচই পান আবদুস সালাম। দেখেন ছাত্ররা বিক্ষোভ করছে। ছাত্ররা ধর্মঘট ডেকে অচল করে দিচ্ছে এলাকা। হাতে প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুন নিয়ে ছাত্রদের বড় বড় মিছিল বের হচ্ছে। সালাম অফিস থেকে আসা-যাওয়ার পথে মাঝেমধ্যে এসব মিছিলে ঢুকে যান, মিশে যান ছাত্রদের সঙ্গে। তাঁর হয়তো মনে হয়, চাকরি করতে ঢাকায় না এলে তিনি হয়তো এত দিনে কলেজ পাস দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হতেন। হয়তো এদের মতোই বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়তেন।

একুশে ফেব্রুয়ারির বিকেলবেলা ছাত্রদের জমায়েতে অফিসফেরত আবদুস সালাম মিশে গিয়েছিলেন। তাঁর মুষ্টিবদ্ধ হাত উঠে গিয়েছিল আকাশের দিকে, আর হয়তো জীবনে শেষবারের মতোই তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল প্রাণের স্লোগান, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’।

হাসপাতালের বিছানায় কয়েক দিন ধরে অচেতন পড়ে থাকা সালামের বিছানার পাশে একরাশ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর বাবা ফাজিল মিয়া। দু-একবার কান পেতে শুনতে চাইছিলেন ছেলে কিছু বলে কি না? তাঁর মধ্যে প্রাণের কোনো সাড়া পাওয়া যায় কি না? ফাজিল মিয়া ছেলের সংজ্ঞাহীন চেহারার ওপর ঝুঁকে পড়েন। সালামের ফরসা মুখটা আরও ফ্যাকাশে দেখায়, ছোটবেলায় পড়ে গিয়ে একবার কপাল কেটে গিয়েছিল সালামের, ফাজিল মিয়া ছেলের কপালের সেই কাটা দাগটায় হাত রাখেন।

কত লোক যে সালামকে দেখতে আসে। নামকরা মানুষজন যেমন আসে, তেমনি সালামের সমবয়সী ছাত্ররাও আসে। ছেলের বিছানার পাশে কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা ফাজিল মিয়াকে সালাম দেয় তারা, সালামের শরীর-স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেয়। ফাজিল মিয়া ভাবেন, কী এমন করেছে তাঁর এই ছেলে? পুলিশের গুলি খেয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর দিন গুনছে। কিন্তু সবাই তো বলছে, তাঁর ছেলে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য পুলিশের গুলির সামনে বুক পেতে দিয়েছে। মায়ের ভাষার সম্মান রাখার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছে।

হয়তো সত্যিই এর মাজেজা আছে। ফাজিল মিয়ার চোখ থেকে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে।

দেড় মাস সংজ্ঞাহীন বিছানায় পড়ে থেকে ৫ এপ্রিল ১৯৫২ সালে মারা যান আবদুস সালাম। আজিমপুর গোরস্থানে দাফন করা হয় তাঁকে।

ভাষা আন্দোলনে অনবদ্য ভূমিকা রাখায় বাংলাদেশ সরকার ২০০০ সালে মরণোত্তর একুশে পদক দেয় তাঁকে।

ফেনী স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তন করে ‘ভাষাশহীদ সালাম স্টেডিয়াম’ রাখা হয়।

দাগনভূঞা উপজেলা মিলনায়তনকে ২০০৭ সালে ভাষাশহীদ সালাম মিলনায়তন করা হয়।

তাঁর নিজ গ্রাম লক্ষ্মণপুরের নাম পরিবর্তন করে ‘সালামনগর’ রাখা হয়।

এসবের কিছুই হয়তো আবদুস সালাম জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারেননি। আসলে কোনো কিছুর আশায় তো নয়, বরং বুকের ওপর হাত রেখে এই মানুষেরা নিজেদের কাজ করে গিয়েছিলেন। নিজেদের রক্তে ফুটিয়ে তুলেছিলেন আরেক রকম রক্ত ফুল। মৃত্যুভয় মানেননি তাঁরা, মানেননি কোনো বাধা। তাঁদের মহান দানে, তাঁদের অসীম ত্যাগে মাতৃভাষা পেয়েছে সম্মান।

আবদুস সালামরা যুগে যুগে আসেন আর নিজেদের উৎসর্গ করে অনেকের জন্য ফুটিয়ে যান ভালোবাসার ফুল।

শাহ্‌নাজ মুন্নী: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন