পাঠক, দেখুন, দেশের জনগণের টাকায় কীভাবে যত্রতত্র ও অপ্রয়োজনে হাজার হাজার সেতু নির্মাণ করা হয়েছে এবং লুটপাট ও অপচয় করা হয়েছে কোটি কোটি টাকা। দেখুন, কীভাবে আমাদের মন্ত্রী, সাংসদ, রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা আর ঠিকাদারেরা মিলে জমি, নদী—সব ধ্বংস করে দেশকেও ধ্বংসের পথে নিয়ে গেছেন।

অথচ যোগাযোগব্যবস্থার দিক থেকে পশ্চাৎপদ এ দেশে একটি সেতু বা একটি রাস্তার জন্য জনগণকে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হয়। কখনো কখনো তাদের আন্দোলন-সংগ্রামও করতে হয় একটি সেতু বা রাস্তার জন্য। এ রকম বাস্তবতায়, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় সারা দেশে অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে পৌনে তিন হাজার সেতু। হাজার কোটি ব্যয়ে নির্মিত এসব সেতু মানুষের কোনো কাজে লাগছে না। কারণ, এসব সেতুর কোনো সংযোগ সড়ক নেই। কোথাও কোথাও ফসলি জমির মাঝে নির্মাণ করা হয়েছে সেতু। এমনও আছে, আশপাশে রাস্তা নেই, কিন্তু পাশাপাশি দুটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এসব সেতু নির্মাণের প্রকল্প কীভাবে গ্রহণ করা হলো?

সারা দেশে সরকারি বিপুল অর্থের অপচয়, বহুপক্ষীয় দুর্নীতি এবং জনদুর্ভোগ সৃষ্টির সবচেয়ে খারাপ উদাহরণ সৃষ্টি করা এসব কাজ হয়েছে বিগত সরকারগুলোর আমলে।

আমরা জানি, স্থানীয় বা জাতীয়—যেকোনো নির্বাচনে আমাদের রাজনীতিকেরা ভোট বৈতরণী পার হতে নানা উন্নয়নকাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন। প্রতিশ্রুত এ উন্নয়নের তালিকায় রাস্তা বা সেতুর স্থান থাকে সবার ওপরে। কারণ, এগুলোকে তাঁরা তাঁদের কথিত উন্নয়নের বিজ্ঞাপন হিসেবে ব্যবহার করেন। কিন্তু প্রথম আলো র অনুসন্ধানে দেশব্যাপী অব্যবহৃত পড়ে থাকা পৌনে তিন হাজার ছোট-বড় সেতু এবং বছরের পর বছর ধরে অসমাপ্ত পড়ে থাকা আরও কয়েক শ সেতুর যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। এগুলো নির্মাণের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি দেখে মনে হয় না, কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পালন করতে এসব নির্মাণ করা হয়েছে। সরকারি অর্থ লুটপাট করা ছাড়া আর কোনো যুক্তি খঁুজে পাওয়া যায় না এসব সেতু নির্মাণের পেছনে। এভাবে আমাদের রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা আর ঠিকাদারেরা মিলে লুটপাট ও অপচয় করেছেন রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বিপুল অর্থ।

গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের এসব কাজের বড় অংশ বাস্তবায়ন করে থাকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। ফলে সরকারের এ বিভাগের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপও সবচেয়ে বেশি থাকে। সে জন্য দেখা যায়, রাজনৈতিক সরকারগুলো স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে এবং ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক বা মহাসচিবকেই এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি—এডিপিভুক্ত অনেকগুলো গুচ্ছ প্রকল্পের অন্যতম হচ্ছে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পল্লী অঞ্চলের সড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ প্রকল্প। পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন খাতের এ ধরনের প্রকল্প থেকে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় মূলত দলীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দাবি বা ইচ্ছা অনুযায়ী। এ কারণে এসব প্রকল্পে কোন কোন জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতু নির্মাণ করা হবে, তা পরিকল্পনা কমিশনের কোনো দলিলে খঁুজে পাওয়া যায় না। যাঁর তদবিরের ক্ষমতা বেশি, তাঁর নির্বাচনী এলাকার সড়ক-সেতুই হয়ে যায় জনগুরুত্বপূর্ণ। আর এই সুবাদে দলীয় মন্ত্রী, সাংসদ আর নেতা-পাতিনেতাদের লুটপাটের মহা সুযোগ তৈরি হয়।

এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণ, অর্থ বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন নীতিমালায় বলা আছে, প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানীয় সাংসদদের পরামর্শ নিতে হবে। যেসব জায়গায় সরকারি দলের সাংসদ নেই, সেসব ক্ষেত্রে জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেভাবে যেখানে স্থান নির্বাচন করেছে, সেখানেই সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় লুটপাটের উদ্দেশ্যেই এ ধরনের নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। আর রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় এলজিইডিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করে রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাট ও অপচয়ের সুযোগ করে দিয়েছে।

 তথ্যমতে, ১৯৯৩ সালের তৎকালীন বিএনপি সরকারের সময় এ ধরনের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়, যা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও চালু ছিল। এরপর বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এসে আবার তোড়জোড় করে একই কাজ শুরু করে।

এলাকায় প্রচার আছে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কথিত জেলা মন্ত্রী বা নেতাদের ‘পার্সেন্টেজ’ (নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা ঘুষ) দিয়েই ঠিকাদারেরা এসব কাজ পেয়েছে। শুধু রাজনৈতিক নেতারাই নন, এসব নির্মাণকাজ বাস্তবায়নকারী সংশ্লিষ্ট দপ্তরের লোকজনও লুটপাটের ভাগ পেয়েছেন; তাঁদের ‘পার্সেন্টেজ’ দিয়েই বিল ছাড়াতে হয় বলে অভিযোগ আছে। এভাবে অপ্রয়োজনীয় ও অপরিকল্পিতভাবে দশ-বিশটা নয়, শত শত নয়, হাজার হাজার সেতু নির্মাণের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তাতে এটা স্পষ্ট, জনগণের অর্থের বহুপক্ষীয় লুটপাটই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।

প্রশ্ন হচ্ছে, এ অনিয়ম, বিপুল অপচয়, দুর্নীতির দায় কে নেবে? এর জন্য কি শুধু রাজনীতিবিদেরাই দায়ী? এলজিইডি বা অন্য যেসব সংস্থা এ ধরনের সেতু তৈরি করেছে, তাদের কি কোনো দায় নেই? এসব সংস্থায় এত বড় বড় কর্মকর্তা ও প্রকৌশলী রয়েছেন কেন? তাঁদের দায়দায়িত্ব কী? তাঁরা কি জবাবদিহির বাইরে থাকবেন?

আমাদের মনে সাধারণ প্রশ্ন, যেখানে রাস্তা নেই, সেখানে কীভাবে সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়, টাকা যায়? সেতু এবং রাস্তার কাজ সমন্বিত না হয়ে আলাদাভাবে বাস্তবায়নের নীতি কেন? একই কাজে বারবার অর্থ ব্যয় করে লুটপাটের সুযোগ সৃষ্টিই কি মূল উদ্দেশ্য? বছরের পর বছর ধরে অপচয়, লুটপাটের সুযোগ আর জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী এ নীতিমালাই বা বদল হয় না কেন? এলজিইডি বা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে এখনো এ নীতিমালা বদলের উদ্যোগ নেওয়া হলো না কেন? সেতু নির্মাণের পর রাস্তা হবে—এসব অবাস্তব ভাবনার পেছনে উদ্দেশ্য কী? বছরের পর বছর এতগুলো সেতু কী করে অসমাপ্ত পড়ে থাকে?

এলজিইডির পাশাপাশি এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণের আরেকটি বড় প্রতিষ্ঠান সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। সওজের তত্ত্বাবধানে হওয়া সারা দেশে প্রায় ৮০টি সেতুর নির্মাণকাজ চলছে বছরের পর বছর। কবে কাজ শেষ হবে, কেউ জানে না। এ সেতুগুলো নির্মিত হচ্ছে আরেক অবাস্তব প্রক্রিয়ায়। প্রথম ধাপে পিলার নির্মাণ করা হয়। তারপর ওপরের অংশের জন্য দরপত্র ডাকা হয়। এখানেও সংযোগ সড়কের খবর নেই। সংযোগ সড়ক আলাদা প্রকল্প হিসেবে রাখা হয়েছে। আবার এগুলোর অধিকাংশের কার্যাদেশ দেওয়ার পর সেতুর দৈর্ঘ্য বাড়ানো হয়। বাড়তি টাকা বরাদ্দ করা হয়। কোনো কোনো সেতুর ক্ষেত্রে এটা একাধিকবার ঘটেছে। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর ঠিকাদারির অসমাপ্ত চার সেতু এর বড় প্রমাণ। এটা দুর্নীতি, টাকা লুট করার আরেক কৌশল।

প্রশ্ন হলো, পিলার, পাটাতন, সংযোগ সড়ক ভাগ ভাগ করে করার কারণ কী? একসঙ্গে সমন্বিতভাবে হবে না কেন? এতে টাকা সাশ্রয়ের কোনো সুযোগ কি আছে? বাস্তবে তো আমরা দেখছি, এটা টাকা লুটপাটের একটা কারখানা।

এখন এসব সমাপ্ত-অসমাপ্ত সেতুগুলোর কী হবে? কে বা কারা এসবের দায় নেবেন? এভাবে রাজনৈতিক সরকারগুলো হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি করে দেশকে ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে গেছে। জনসাধারণের দুর্দশা বাড়িয়েছে। এই রাজনীতিবিদেরাই আবার প্রস্ত্ততি নিচ্ছেন। তাঁরা সংলাপ করবেন। নির্বাচনে যাবেন। আবার একই ধারায় দেশের টাকা লুটপাট হবে। আবার তাঁদের কাছ থেকেই আমরা সততা, নিষ্ঠা, দেশের ভবিষ্যতের কথা শুনতে পাব। এ প্রক্রিয়া কি চলতেই থাকবে?

ইতিমধ্যে আমরা জানতে পেরেছি, প্রায় সোয়া দুই হাজার সেতুর সংযোগ সড়ক বানাতে নতুন করে আবার কয়েক শ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। এই শত শত কোটি টাকা ব্যয় করার আগে আমরা চাই সেতু-সড়ক নির্মাণ নীতিমালার বদল। আমরা আশা করব, সেতু নিয়ে এই মহা দুর্নীতির তদন্ত হবে। রাষ্ট্রের এই বিপুল অর্থ কীভাবে অপচয় হয়েছে, কারা করেছে, জনগণকে জানানো হবে।

আরও পড়ুন :

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0