default-image

শামীমা গ্রামীণ চেকের জ্যেষ্ঠ ফ্যাশন ডিজাইনার। শামীমার আক্ষেপ, কোনো জায়গায় গেলে সবাই পরিচয় দেয় অ্যাসিডদগ্ধ শামীমা হিসেবে। কেউ বলে না ডিজাইনার শামীমা। ১৯৯৬ সালের কিশোরী বয়সে অ্যাসিড আক্রমণের সেই ঘটনা তিনি এখন আর মনে রাখতে চান না।

শামীমার প্রথম স্বপ্ন ছিল শুধু ডিজাইনার হওয়া। আর এখন স্বপ্ন দেখেন বিশ্বসেরা ডিজাইনার হওয়ার। এ স্বপ্ন পূরণে নিজেকে প্রস্তুত করতে যা করা প্রয়োজন, তা–ই করছেন বলে মুঠোফোনে শামীমা জানালেন।

শামীমা অবলীলায় বললেন, তাঁর চোখে স্বপ্ন এঁকে দিয়েছে প্রথম আলো। তিনি ২০০৪ সালে গ্রামেই গড়ে তুলেছিলেন ঐক্য নারীকল্যাণ সংস্থা। বোরকায় মুখ ঢেকে ঘরের বাইরে যেতেন শামীমা।

২০০৫ সালে প্রথম আলোর প্রতিনিধির চোখ এড়াতে পারেননি শামীমা। বছরটির ২৭ জুন প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে শামীমা প্রথম ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার স্বপ্নের কথা বললেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

আমাদের মনে আছে, দেশে ২০০০ সাল থেকে অ্যাসিড-সন্ত্রাস ভয়াবহ আকার ধারণ করে। প্রথম আলো সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি অ্যাসিডদগ্ধ মেয়ে ও নারীদের পুনর্বাসন করতে চায়। প্রথম আলোর সাংবাদিকদের এক দিনের বেতন ৩২ হাজার টাকা দিয়ে ২০০০ সালের ১৯ এপ্রিল অ্যাসিডদগ্ধ নারীদের জন্য প্রথম আলো সহায়ক তহবিলের যাত্রা শুরু। তহবিলের প্রথম উপদেষ্টা কমিটিতে ছিলেন জওসন এ রহমান, ডা. সামন্তলাল সেন, মুহাম্মদ আজিজ খান, তাজিন আহমেদ, ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর, মতিউর রহমান, ডা. দীপু মনি, রানু হাফিজ, ইলিয়াস কাঞ্চন, কুমার বিশ্বজিৎ ও শমী কায়সার। পরে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হন কানিজ আলমাস খান, আসিফ আকবর ও রূপালী চৌধুরী।

প্রথম থেকেই সহায়ক তহবিলটি চলছে প্রথম আলোর পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীর আর্থিক সহযোগিতায়। ২০০৯ সালে প্রথম আলো ট্রাস্ট গঠন করা হলে তহবিল ব্যবস্থাপনার দায়িত্বটি চলে যায় এই ট্রাস্টের হাতে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যবসায়ী, স্কুলের শিক্ষার্থীদের জমানো টিফিনের টাকা, এমনকি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের বেতনের টাকাও এ তহবিলে যোগ হয়। অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার নারীদের পড়াশোনা, পুনর্বাসন, চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা দিয়ে তাঁদের জমি, ঘর, দোকান, গবাদিপশু, ট্রলার দেওয়ার মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা হয় এই তহবিলের মাধ্যমে। এই তহবিল থেকে শামীমার মতো এ পর্যন্ত সহযোগিতা পেয়েছেন ৪৫৬ জন নারী। ৪৫৬ জনের মধ্যে ৩০২ জনকে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। প্রথম আলো ট্রাস্টের অধীনে ‘আর একটি মুখও যেন অ্যাসিডে ঝলসে না যায়’ অঙ্গীকার নিয়ে অ্যাসিড-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে প্রথম আলো

অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় শামীমা অ্যাসিডদগ্ধ হয়েছিলেন। ডিজাইনার হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে দীর্ঘ বিরতির পর শামীমা আবার পড়াশোনা শুরু করলেন। ঢাকার শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজিতে ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে মাস্টার্স পর্যন্ত পড়াশোনায় সহযোগিতা করে প্রথম আলো। আর ইউনিভার্সিটিতে শামীমা বৃত্তিও পেয়েছিলেন। ঝিনাইদহের মোসাম্মাত শামীমা এখন প্রতি মাসে প্রায় ৩০টি করে পোশাকের নকশা করছেন।

২০০১ সালে পিরোজপুরের মণিকা হালদার অ্যাসিডদগ্ধ হন। ঘটনার পর তাঁর পরিবারকে বাড়িঘর ছেড়ে বরিশালে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়। মণিকা বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংকে কর্মরত। পিরোজপুরে স্বরূপকাঠি শাখায় ক্যাশ অ্যান্ড ক্লায়েন্ট সার্ভিস অফিসার হিসেবে কর্মরত। বিয়ে করেছেন। বর্তমানে দুই সন্তান নিয়ে সুখে আছেন বলে জানালেন।

মণিকা যখন অ্যাসিডদগ্ধ হন, তখন তিনি এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। বললেন, ‘প্রথম আলোর সহায়তার কথা তো বলতেই হবে। আমার পড়াশোনার খরচের পাশাপাশি আমার পরিবারকে তিনটি গাভি কিনে দিয়েছিল। আর প্রথম আলোর সম্পাদক স্যার একবার বরিশাল এলেন, প্রথম আলোর প্রতিনিধির মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে পরিচিত হই। একটি জীবনবৃত্তান্ত দিয়েছিলাম তাঁর হাতে। এরপর ২০১১ সালে ব্র্যাক ব্যাংকে আমার চাকরি হয়।’

অ্যাসিডদগ্ধদের সহায়তায় প্রথম আলোর পাঠক, সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তি, সংস্থা এগিয়ে আসতে থাকে। গোলটেবিল বৈঠক, মানববন্ধন, অ্যাসিডের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে পুরুষ সমাবেশসহ নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রথম আলো একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলে। ২০০২ সালে প্রথম আলো ও ‘ঢাকা শেরাটন’–এর (হোটেলটির নাম পরিবর্তন হয়েছে) যৌথ উদ্যোগে অ্যাসিডদগ্ধ ব্যক্তিদের জন্য তহবিল সংগ্রহে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় ক্রিকেট দলের স্বাক্ষরিত ব্যাট ও দেশের প্রথিতযশা চিত্রকরদের শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর পর নিলামে তোলা হলে নিলাম থেকে মোট ৬ লাখ ৩১ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয়। একই অনুষ্ঠানে কণ্ঠশিল্পী শাকিলা জাফর তাঁর একটি সোনার হারই এই তহবিলে দান করেছিলেন।

অ্যাসিডদগ্ধ নারীদের সহায়তায় ভারতের ফ্যাশন ডিজাইনার অগ্নিমিত্রা পালের নকশা করা পোশাক নিয়ে ঢাকায় ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’ শিরোনামে শোতে দেশের মডেলদের পাশাপাশি অংশ নেন কলকাতার ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, লকেট চ্যাটার্জি ও পাউলি দাম। দেশ টিভি আয়োজিত ফ্যাশন শো শেষে নিলামে শাড়ি ও পোশাক বিক্রি করে ৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা তুলে দেওয়া হয় প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের হাতে। এভাবে একসময় সরকারও সমস্যাটি সমাধানে এগিয়ে আসে। ২০০২ সালে অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ ও অ্যাসিড অপরাধ দমন আইন নামে দুটি আইন প্রণীত হয়। এত সব কর্মযজ্ঞের ফলে দেশে অ্যাসিড-সন্ত্রাস কমতে শুরু করে।

১৯৯৯ সাল থেকে বেসরকারি সংগঠন অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশন (এএসএফ) অ্যাসিডদগ্ধ ব্যক্তিদের চিকিৎসা সহায়তার পাশাপাশি বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে। সংগঠনের দেওয়া হিসাব বলছে, ২০০২ সালে ৪৯৬ জন অ্যাসিডদগ্ধ হন। আর চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত দগ্ধ হয়েছেন ৯ জন।

অ্যাসিড-সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য হংকংয়ের ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব প্রথম আলোকে দ্য গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড অ্যাওয়ার্ড-২০১০ প্রদান করে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0