default-image
default-image

পাকিস্তানিদের কোনো ধারণাই ছিল না যে গ্রেপ্তার করতে গেলে মুজিব কী করবেন। তিনি কি স্বাধীনতাসংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে গা ঢাকা দেবেন? নাকি তিনি তাঁর বাড়িতেই প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন; যেমনটি তিনি তাঁর জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন? মুজিবের স্বেচ্ছায় গ্রেপ্তারবরণ তাদের জন্য বেশ স্বস্তির কারণই হয়েছিল। তাঁকে আটক করার জন্য প্রেরিত দলটি তাদের সফল হওয়ার বার্তা দ্রুতই সেনা সদর দপ্তরে বেতারযোগে পাঠিয়ে দেয়। তাতে বলা হয়, ‘মস্ত বাঘ খাঁচায় বন্দী’ (বিগ বার্ড ইন দ্য কেইজ)। ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিক নিজ কানে এই বার্তা শুনেছিলেন। অল্প পরেই তিনি যা দেখেন, তার বিবরণ দিয়েছেন এভাবে, ‘সাদা শার্ট পরা বড় বাঘটিকে সেনাবাহিনীর একটি জিপে করে সেনানিবাসে নিয়ে আসা হয় নিরাপদ হেফাজতে রাখার জন্য।’ মুজিব সারা রাত আদমজী হাইস্কুলে থাকেন এবং পরদিন তাঁকে ফ্ল্যাগ স্টাফ হাউসে নেওয়া হয়। তিন দিন পর তাঁকে উড়িয়ে নেওয়া হয় করাচি।

পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের নিশ্ছিদ্র নিয়ন্ত্রণের মধ্যে মুজিবকে আনার পরই কেবল ১০ এপ্রিল তাঁকে আটক করার খবরটি প্রচার করা হয়। এ খবরের সঙ্গে একটি ছবিও প্রকাশ করা হয়, যাতে দেখা যায় যে তিনি করাচি বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে অপেক্ষারত আছেন পরবর্তী গন্তব্যে যাওয়ার জন্য। ঢাকায় কোনো কমান্ডো-জাতীয় অভিযানে তাঁকে মুক্ত করে ফেলা কিংবা পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়ার সময় মুজিবকে বহনকারী উড়োজাহাজটি ভারতীয় বিমানবাহিনী কর্তৃক বাধা দিয়ে তা ভারতের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া—পাকিস্তান সরকার দৃশ্যত এ রকম কোনো ঝুঁকি নিতেই চায়নি। সে কারণেই তাঁর গ্রেপ্তারের খবরটি দেরিতে প্রচার করা হয়।

করাচিতে অবতরণের পর মুজিবকে অনতিবিলম্বে পাঞ্জাবের লায়ালপুর (এখন ফয়সালাবাদ) জেলখানায় নিয়ে রাখা হয়। সেখানকার ছোট্ট সেলে বাইরের জগতের সঙ্গে মুজিবের যোগাযোগের মাধ্যম ছিল লোহার ছোট্ট জাফরি। গরম ছিল অসহনীয়। একটা বৈদ্যুতিক পাখা দেওয়া হয়েছিল, যা কেবল ‍শুষ্ক গরম বাতাসই দিত। এটা ছিল তাঁর বন্দিজীবনের নিকৃষ্টতম কারাবাসের অভিজ্ঞতা। তবে তা কারাপ্রকোষ্ঠে গ্রীষ্মকালের মাসগুলো আবদ্ধ থাকার শারীরিক যন্ত্রণার জন্য নয়, বরং সারা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একেবারে নিঃসঙ্গ থাকার জন্য। কোনো সংবাদপত্র, কোনো বই বা কোনো রেডিও তাঁকে দেওয়া হয়নি। তাঁর জন্য খাবার নিয়ে আসা কারারক্ষীদের ওপর কঠোর নির্দেশনা ছিল কোনো রকম কথা না বলার। তাঁর পরিবারের কোনো সংবাদ তিনি জানতে পারেননি। তাঁকে কোনো দর্শনার্থী অনুমোদন করা হয়নি। এমনকি তাঁকে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুমতিও দেওয়া হয়নি। তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় মানসিক নির্যাতন ছিল তাঁর অনুপস্থিতিতে স্বাধীনতাসংগ্রাম কীভাবে চলছিল, সে সম্পর্কে কোনো কিছু জানতে না পারা।

নিজের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে মুজিবের কোনো মোহ ছিল না। গ্রেপ্তারের আগ মুহূর্তে তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন যে কীভাবে পাকিস্তানি সেনারা ঢাকা লুণ্ঠন ও হাজার হাজার নিরীহ নাগরিককে হত্যা করায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। তাঁর পক্ষে এটা আশা করার কোনো কারণই ছিল না যে তিনি তাদের মতো পরিণতি এড়াতে পারবেন। কিন্তু মুজিবকে কোনো আয়োজন ছাড়াই হত্যা করার কোনো ইচ্ছা ইয়াহিয়ার ছিল না। এক রাতের সেনা অভিযানেই তো তিনি অসংখ্য বাঙালি নিধন করেছেন। তাঁর মাথায় মুজিবকে বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মারার চিন্তা ছিল। আর তাই সেনা সামরিক আদালতে যখন তাঁকে হাজির করা হবে, তখন যেন তিনি সুস্থ শরীরে থাকেন, সেটা নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। সে কারণেই জেলখানায় মুজিবকে শারীরিকভাবে কোনো রকম অযত্ন করা হয়নি। লায়ালপুর জেলখানার প্রকোষ্ঠে অবরুদ্ধ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর খাবার রান্না করার জন্য একজন বাঙালি পাচক নিয়োগ করা হয়। পাইপ খাওয়ার জন্য তাঁর পছন্দের ব্র্যান্ডের তামাকও সরবরাহ করা হয়। নিয়মিত দেখাশোনার জন্য একজন চিকিৎসকেরও ব্যবস্থা করা হয়।

লন্ডনের দ্য ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস পত্রিকায় [১৯৭১ সালের] ১৯ জুলাই প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায় যে ইয়াহিয়া ‘খুব দ্রুত’ মুজিবের বিচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি আভাস দেন যে একটি সামরিক ট্রাইব্যুনালে গোপনে মুজিবের বিচার হবে। মুজিবের বিরুদ্ধে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগের কথা উল্লেখ করেননি। তবে এটা বলেন যে তাঁর বিরুদ্ধে এমনও অভিযোগ আছে, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং তা পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর অনুমোদন সাপেক্ষ। মুজিবের পক্ষে লড়ার জন্য একজন আইনজীবীরও অনুমোদন দেওয়া হয়, এই শর্তে যে তাঁকে অবশ্যই পাকিস্তানি হতে হবে।

স্পষ্টতই ইয়াহিয়া চাইছিলেন, যেকোনো মূল্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মতো চরম ব্যর্থতা এড়াতে। সেই মামলায় একজন ব্রিটিশ ব্যারিস্টার মুজিবের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। বাদীপক্ষের সাক্ষীদের তীব্র জেরায় জর্জরিত করে তিনি মুজিবের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ খর্ব করে দিয়েছিলেন। মুজিবের বিচার তাই গোপনে আয়োজন করা হয়, যেখানে কোনো পর্যবেক্ষক বা সাংবাদিককে উপস্থিত থাকার সুযোগ দেওয়া হয়নি। ইয়াহিয়া মনে করছিলেন যে এই বিচারের মধ্য দিয়ে তিনি পাকিস্তানিদের এই বলে তুষ্ট করতে পারবেন যে মুজিবের যথাযথ বিচার হয়েছে আর তাঁকে যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তা ছিল তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিপরীতে যথাযথ।

জেলখানাসংলগ্ন একটি লাল দেয়ালের ভবনে এক সামরিক আদালতে ১১ আগস্ট মুজিবের গোপন বিচারকাজ শুরু হয়। বিচারকাজ পরিচালনাকারী ছিলেন একজন ব্রিগেডিয়ার। অন্য বিচারিক সদস্যরা ছিলেন দুজন সেনা কর্মকর্তা, একজন নৌ–কর্মকর্তা এবং পাঞ্জাবের একজন জেলা বিচারক। তাঁদের সামনে মুজিবের বিরুদ্ধে ১২টি অপরাধের অভিযোগ উপস্থাপন করা হয়, যেগুলোর মধ্যে ৬টি ছিল গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ ছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বাধানোর অভিযোগটি।

>পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের নিশ্ছিদ্র নিয়ন্ত্রণের মধ্যে মুজিবকে আনার পরই কেবল ১০ এপ্রিল তাঁকে আটক করার খবরটি প্রচার করা হয়। এ খবরের সঙ্গে একটি ছবিও প্রকাশ করা হয়, যাতে দেখা যায় যে তিনি করাচি বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে অপেক্ষারত আছেন পরবর্তী গন্তব্যে যাওয়ার জন্য। ঢাকায় কোনো কমান্ডো-জাতীয় অভিযানে তাঁকে মুক্ত করে ফেলা কিংবা পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়ার সময় মুজিবকে বহনকারী উড়োজাহাজটি ভারতীয় বিমানবাহিনী কর্তৃক বাধা দিয়ে তা ভারতের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া—পাকিস্তান সরকার দৃশ্যত এ রকম কোনো ঝুঁকি নিতেই চায়নি। সে কারণেই তাঁর গ্রেপ্তারের খবরটি দেরিতে প্রচার করা হয়।

শেখ মুজিবকে তাঁর নিজের পছন্দমতো একজন আইনজীবী বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। মুজিব প্রথমে ড. কামাল হোসেনকে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে এটা সম্ভব না। তখন মুজিব সিন্ধি আইনজীবী এ কে ব্রোহীকে বেছে নেন। এই মেধাবী আইনজীবী ছিলেন পাকিস্তানের অন্যতম সেরা সংবিধান বিশেষজ্ঞ।

তবে আদালতকক্ষে ২৬ মার্চ প্রচারিত ইয়াহিয়ার ভাষণের টেপ শোনার পর মুজিব বিচার–প্রক্রিয়ায় অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ওই ভাষণে ইয়াহিয়া মুজিবের অসহযোগ আন্দোলনকে ‘একটি রাষ্ট্রদ্রোহ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। মুজিব ব্রোহীকেও ছেড়ে দেন। ব্রোহী অবশ্য আদালতের অনুরোধে মুজিবের হয়ে শেষ পর্যন্ত হাজিরা দিয়ে গিয়েছিলেন।

এই বিচার–প্রক্রিয়া যে তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানোর একটা প্রাথমিক তামাশা, মুজিব তা বুঝতে পেরেছিলেন। আর তাই যখন একের পর এক সাক্ষীকে আদালতে আনা হচ্ছিল, তিনি নির্বিকার বসে ছিলেন। তাঁরা সেই সাক্ষ্য দিচ্ছিলেন, যার মাধ্যমে পাকিস্তানের অখণ্ডতা বিনাশের ষড়যন্ত্রে মুজিবের জড়িত থাকা নিশ্চিত করা যায়। আদালতে ১০৫ জন সাক্ষীর তালিকা পেশ করা হয়েছিল, যদিও তার প্রায় অর্ধেক হাজির করা গিয়েছিল। যাঁরা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, তাঁরা প্রায় সবাই সেনা বা পুলিশি হেফাজতে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন। ব্রোহী আদালতে আবেদন জানিয়েছিলেন সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য যেন কর্নেলিয়াস, পীরজাদা এবং এম এম আহমদকে হাজির করা হয় । তাঁরা তিনজন সেনা অভিযানের আগে সমঝোতা আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন। তবে আদালত ব্রোহীর আবেদন অগ্রাহ্য করেন।

দুনিয়াজুড়েই মুজিবের গোপন বিচার নিয়ে মানবিক উদ্বেগ দেখা দেয়। জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট বিচার শুরু হওয়ার আগের দিন তাঁর মুখপাত্রের মাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মুজিবকে ‘রাজনৈতিক ভিন্নমতের জন্য বন্দী’ বলে ঘোষণা করে। ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টস ‍মুজিবের বিচারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কয়েকটি পশ্চিমা দেশ মুজিবকে বন্দী করে রাখার নিন্দা জানায় এবং দ্রুত বিচারের মাধ্যমে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া থেকে বিরত থাকতে চাপ প্রয়োগ করে। মুজিবের সঙ্গে যে আচরণ করা হচ্ছিল, তার ব্যাপক নিন্দাবাদ হয়তো ইয়াহিয়া অবজ্ঞা করতে পারতেন। তবে তাঁর জন্য চিন্তার বিষয় ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব। পাকিস্তান আমেরিকার আর্থিক ও সামরিক সাহায্যের ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল ছিল। আর যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতার নীতি গ্রহণ করেছিল। পাকিস্তান বিভাজিত হলে এই অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য পাল্টে যাবে, যা তার কাছে কাম্য ছিল না। তবে আমেরিকানরা এটা ভেবেও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল যে গোপন বিচারের মাধ্যমে মুজিবের ফাঁসি হলে পরিস্থিতি এতটাই অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠবে, তখন আর [পূর্ব পাকিস্তানের] স্বাধীনতা ছাড়া কোনো ধরনের সমঝোতায় পৌঁছানো যাবে না। সম্ভবত এ বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের ওপর তার প্রভাব কাজে লাগাতে শুরু করে এবং সেপ্টেম্বরে ‍যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ড স্টেট ডিপার্টমেন্টকে জানান যে ‘তাঁকে (মুজিব) ফাঁসিতে ঝোলানো হবে না, আমরা ব্যক্তিগতভাবে সে নিশ্চয়তা পেয়েছি।’

মুজিবকে যেন ফাঁসিতে ঝোলানো না হয়, ইয়াহিয়ার কাছ থেকে সেই প্রতিশ্রুতি আদায়ের জন্য চাপ প্রয়োগের পাশাপাশি আমেরিকানরা পাকিস্তান ও প্রবাসে বাংলাদেশ সরকারে থাকা আমেরিকাপন্থীদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে একটা কিছু নিষ্পত্তির জন্যও তৎপর হয়ে ওঠে। এ জন্য কলকাতায় আমেরিকান কনস্যুলেটের একজন কর্মকর্তা জর্জ গ্রিফিথকে দায়িত্ব দেওয়া হয় বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। আমেরিকানদের কাছে এটা কোনো গোপন বিষয় ছিল না যে মোশতাক আদর্শগত ও ব্যক্তিগতভাবে তাজউদ্দীনের বিরোধী ছিলেন। সে কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে একটা সমঝোতার বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল। মোশতাক নিজের এ অবস্থানের সপক্ষে যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলেন এই বলে যে তাঁর কাছে মুজিবের পরিণতিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। লন্ডনের নেতৃস্থানীয় আইনজীবী শন ম্যাকব্রাইড মুজিবের জীবন রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক রেডক্রসের কাছে আবেদন জানানোর প্রস্তাব করেছিলেন। ব্যারিস্টার আমীর–উল ইসলাম যখন এ কথা মোশতাককে জানান, তখন মোশতাক তাঁকে বলেছিলেন, ‘আপনাকে ঠিক করতে হবে আপনি স্বাধীনতা চান, নাকি শেখ মুজিবকে চান। আপনি দুটি একসঙ্গে পাবেন না।’

আওয়ামী লীগের একজন এমএনএ জহিরুদ্দীন কাইউমের মাধ্যমে কলকাতায় আমেরিকান দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ চলছিল সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দীন আহমদের কোনো রকম অনুমতি ছাড়াই। তবে সব মার্কিন কর্মকর্তাই ভারতীয় গোয়েন্দাদের নজরদারিতে ছিলেন। আর ভারতীয়রা সন্দেহ করছিল যে এসব যোগাযোগের উদ্দেশ্য আওয়ামী লীগের মধ্যে ফাটল ধরানো ও ভারতকে বিব্রত করা। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আসন্ন সম্মেলনে যোগ দিতে মোশতাকের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে নিউইয়র্ক যাওয়া স্থির হয়েছিল। ভারতীয়রা তখন আশঙ্কা করে যে সেখানে গিয়ে মোশতাক হয়তো পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন এবং একটা সমঝোতার ঘোষণা দিয়ে বসবেন। এ রকম কিছু এড়ানোর জন্য [ইন্দিরা গান্ধীর উপদেষ্টা] ডি পি ধর মোশতাককে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়ে সেখানে আবদুস সামাদ আজাদকে নিয়োগ করার পরামর্শ দেন। যদিও আওয়ামী লীগে জ্যেষ্ঠতার বিবেচনায় সামাদকে এত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া মানানসই ছিল না। ডি পি ধরের কাছে সামাদের নাম প্রস্তাব করেছিলেন নিখিল চক্রবর্তী, যিনি ছিলেন মস্কোপন্থী সাময়িকী মেইনস্ট্রিম–এর সম্পাদক ও প্রকাশক।

default-image

তাজউদ্দীন অবশ্য এ রকম কোনো পদক্ষেপ নিতে দ্বিধান্বিত ছিলেন। কেননা, এতে করে আওয়ামী লীগের মধ্যকার দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসত। তবে তিনি এটা নিশ্চিত করেন যে সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে মোশতাক নিউইয়র্কে যাবেন না। তাঁর বদলে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী এই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। ডিসেম্বর স্বাধীনতার পর তাজউদ্দীন ঢাকায় ফেরার পরই কেবল মোশতাককে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। মোশতাক তাজউদ্দীনের ওপর ক্ষোভ পুষে রাখেন এবং পরবর্তীকালে মুজিবকে সম্ভবত এটা বোঝাতে সক্ষম হন যে মুজিবনগর সরকারে থাকা আওয়ামী লীগের অন্য যেকোনো নেতার চেয়ে তিনিই মুজিবের পরিণতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং তাঁর জীবন রক্ষায় তিনি তাঁর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন।

সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসম্যান ফেরিলিংহাউজেন ইয়াহিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মুজিবের বিচারের বিষয়ে তাঁদের উদ্বেগের কথা অবহিত করেন। ইয়াহিয়া স্বীকার করেছেন যে মুজিবের বিচার নিয়ে বিদেশের কিছু মহলের কাছে তাঁকে সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আইন ও নির্বাহী বিভাগ দুটির যুগপৎ চাপে তিনি প্রথমবারের মতো মুজিবের বিষয়ে তাঁর অবস্থান নমনীয় হওয়ার আভাস দেন। অক্টোবর মাসে তিনি দুটি বিদেশি পত্রিকার প্রতিনিধিকে সাক্ষাৎকার দেন। ১৯ অক্টোবর ফ্রান্সের লে মঁদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় প্রথম সাক্ষাৎকার। এতে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে পাকিস্তানের ঐক্য রক্ষায় তাঁর ও মুজিবের মধ্যে আলোচনা চলার গুজবটি কতখানি সত্যি। ইয়াহিয়া জবাবে বলেছিলেন যে যতক্ষণ পর্যন্ত আদালত একজন বিদ্রোহীকে নির্দোষ ঘোষণা না করছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারেন না।

দ্বিতীয় সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন নিউজউইক–এর আরনাওদ দে বোচগ্রেভ। সাময়িকীটির ৮ নভেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি ইংরেজিতে হওয়ায় অনেক বেশি পঠিত হয়। এটি পাকিস্তানেও সহজলভ্য ছিল। সেখানে মুজিব প্রসঙ্গে ইয়াহিয়া বলেছিলেন, ‘বিচারের রায় ঘোষণার পর কী করা হবে, তা পুরোপুরি রাষ্ট্রপ্রধানের এখতিয়ার। এটি ভীষণ গুরুদায়িত্ব। তবে যদি জাতি তাঁর মুক্তি দাবি করে, আমি তা করব।’

সরকারের মালিকানাধীন দ্য পাকিস্তান টাইমস ইয়াহিয়ার এই মন্তব্যকে এভাবে ব্যাখ্যা করে যে ইয়াহিয়া মুজিবের মুক্তির সপক্ষে কিছু বলছেন না, বরং এটা বোঝাচ্ছেন যে মুজিবের ভবিষ্যৎ একমাত্র পাকিস্তানেরই বিষয়, যেখানে বিদেশিদের কিছু বলার বা করার নেই।

তবে ইয়াহিয়ার মন্তব্যে উৎসাহিত হয়ে ৪০ জনের বেশি বিশিষ্ট পাকিস্তানি ব্যক্তিত্ব একটি যৌথ বিবৃতি প্রদান করে অবিলম্বে মুজিবকে মুক্তিদানের আহ্বান জানান। এই বিবৃতিদাতাদের মধ্যে ছিলেন আসগর খান (তারিখ-ই-ইসলাম) এবং উর্দু কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এর সবই ছিল ইতিবাচক অগ্রগতি। ‘ছয় মাসে আগেও পশ্চিম পাকিস্তানে যা ছিল অচিন্তনীয়, আজ তাই গ্রহণযোগ্য হতে চলেছে। পাকিস্তান সরকার হয়তো শেখ মুজিবের সঙ্গে সমঝোতা করে টিকে যেতে পারে, যদি তিনি ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান সমর্থন করতে সম্মত হন।’ [দ্য আমেরিকান পেপারস: সেক্রেটস অ্যান্ড কনফিডেনশিয়াল ইন্ডিয়া-পাকিস্তান-বাংলাদেশ ডকুমেন্টস ১৯৬৫-১৯৭৩, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, করাচি, ১৯৯১ পৃ-৭০৯]

এরপর ইয়াহিয়া জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা ও সময়সীমা প্রণয়ন করেন। ১৮ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে তিনি যে ভাষণ দেবেন, তাতে তিনি নতুন সংবিধানের অধীনে পূর্ব পাকিস্তানে ‘যুক্তরাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা’ দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরবেন বলেও ঠিক করেন। তাঁর পরিকল্পনায় আরও ছিল ২৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকা ও পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বেসামরিক সরকারের পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ। তিনি আরও বলেন, ‘যদি সেই বেসামরিক সরকার মুজিব বা অন্য কারও মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে চায়, তাহলে সেটা হবে বেসামরিক সরকারের বিষয়ে, যা নিয়ে আমার কিছু করণীয় নেই।’ ইয়াহিয়া মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে এ সময়কালে ভারতের যেকোনো রকম উসকানির মুখে পাকিস্তান সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করবে। কিন্তু ভারত যদি বোকার মতো পাকিস্তানকে সামরিক অভিযানের জন্য খোঁচায়, তাহলে এর প্রথম শিকার হবেন মুজিব। ইয়াহিয়ার এই প্রচ্ছন্ন হুমকি বিরাট আশঙ্কার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছিল দুই সপ্তাহ পর, যখন পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে পুরোদস্তুর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে আর ঠিক পরদিনই গোপন সামরিক আদালত মুজিবের বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে। সেদিন আদালতে একমাত্র বেসামরিক বিচারক অনুপস্থিত ছিলেন তাঁর পিতার মৃত্যুর কারণে। বাকিদের সর্বসম্মত রায়ে মুজিবকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেওয়া হয়। মুজিব শান্তভাবেই এই রায় শোনেন এবং মানসিকভাবে নিজেকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত করেন। বলা হয়ে থাকে যে সামরিক জান্তার কাছে তাঁর একমাত্র অনুরোধ ছিল মরদেহটি যেন স্বদেশে ফেরত পাঠানো হয় কবর দেওয়ার জন্য।

মুজিবের অবশ্য কোনোভাবেই জানার উপায় ছিল না যে আমেরিকানদের কাছে ইয়াহিয়া এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি এই দণ্ডাদেশ কার্যকর করবেন না। তবে সব সময় এ সম্ভাবনাটা ছিল যে ইয়াহিয়া যেকোনো একটা ছলনায় এই প্রতিশ্রুতির ব্যত্যয় ঘটাবেন, বিশেষত যখন পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে।

বিচার সম্পন্ন হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে মুজিবকে এক রাতে লায়ালপুর জেলখানা থেকে হেলিকপ্টারে করে মিয়ানওয়ালি জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে একটা মহিলা ওয়ার্ডে রাখা হয়, যা তাঁর জন্য আগেই খালি করা হয়েছিল। জেলখানার অন্য বন্দীদের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে মুজিব এখন তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন। মুজিবের সেল থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে কজন বন্দী ছিলেন। এক সকালে তাঁরা তাঁদের হাতের কাছে যা ছিল, তাই মুজিবের উদ্দেশে ছুড়ে মারতে থাকেন। সম্ভবত তাঁরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন এ জন্য যে একজন বিশ্বাসঘাতককে তাঁদের জেলখানায় আনা হয়েছে। যুদ্ধের সময় অপরাধীদের মধ্যেও দেশপ্রেম চাগিয়ে ওঠে! কারারক্ষীরা ফাঁকা গুলি ছুড়ে তাদের নিবৃত্ত করে। এমনকি তাঁদের শান্ত করার জন্য জেল সুপার এমনও বলেন যে মুজিবকে দ্রুত ফাঁসি দেওয়ার জন্য মিয়ানওয়ালি জেলে আনা হয়েছে।

এই ঘটনা প্রসঙ্গে ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে ডেভিড ফ্রস্টকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে মুজিব বলেন যে ‘তাঁরা’ মানে ইয়াহিয়ার লোকজন ‘ওই দিন সকালে কয়েকজন বন্দীকে জড়ো করেছিলেন আমার ওপর হামলা চালিয়ে আমাকে মেরে ফেলার জন্য।’ পরে রাত তিনটার দিকে জেলার ‘আমাকে জেলখানার বাইরে নিয়ে যান এবং দুদিন তাঁর বাংলোতে রাখেন কোনো সেনা প্রহরা ছাড়াই। দুদিন পর তিনি আমাকে সেখান থেকে নিয়ে যান আরেকটা জনবিচ্ছিন্ন জায়গায় একটা কলোনিতে। সেখানে তিনি আমাকে চার, পাঁচ বা ছয় দিন রেখেছিলেন।’ মুজিব ভেবেছিলেন যে জেলার এ রকম করছেন কারণ ‘তিনি আমাকে পছন্দ করতে শুরু করেছিলেন, আমি তাই ভেবেছি।’

মিয়ানওয়ালি জেলখানায় স্বল্পকালীন অবস্থান ও সেখানকার ঘটনাপরম্পরা সম্পর্কে মুজিবের স্মৃতিচারণা অনেকটা ঝাপসা বা অস্পষ্ট। মনে হয়, তিনি ওই সময়কালে এতটাই ধন্দে ছিলেন যে ঘটনার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরে এসে ভালোমতো কিছু মনে করতে পারছিলেন না। তাই ডেভিড ফ্রস্টকে ঠিকমতো বলতে পারছিলেন না যে তিনি চার, পাঁচ নাকি ছয় দিন ছিলেন। মনে হয় তাত্ক্ষণিকভাবে তাঁকে তাঁর সেলেই ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সে সময় কয়েকজন ভারতীয় যুদ্ধবন্দীকে সেখানে আনা হয় অন্তরীণ রাখার জন্য। তাঁদের আটজনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল উঠানে একটা গর্ত খুঁড়তে, যা মুজিব নিজের সেল থেকে দেখতে পান। তিনি ভেবেছিলেন যে সম্ভবত তাঁর কবর খোঁড়া হচ্ছে। ‘ঠিক আছে, আমি তৈরি,’ এমনটাই মনে মনে তিনি বলেছিলেন। তবে কারা কর্মকর্তারা তাঁকে উদ্বিগ্ন না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা একটা ব্যবস্থা করে রাখছি যেন এখানে বোমা নিক্ষেপ করা হলে আপনি একটা নিরাপদ আশ্রয় নিতে পারেন।’

এর কয়েক দিনের মধ্যেই ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্বে (ঢাকায়) আত্মসমর্পণ করে। তার পরদিন ইন্দিরা যে একতরফা যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন, ইয়াহিয়া তা মেনে নেন।

অনুবাদ: আসজাদুল কিবরিয়া
সূত্র:
শেখ মুজিব: ট্রায়াম্ফ অ্যান্ড ট্র্যাজেডি, ইউপিএল, ২০২০
এস এ করিম: বাংলাদেশ সরকারের প্রথম পররাষ্ট্রসচিব 

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে গত বছর ‘ঐ মহামানব আসে’ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছিল প্রথম আলো। ক্রোড়পত্রের সেই লেখাগুলো পাঠকের সামনে তুলে ধরা হলো।

বিজ্ঞাপন
বিশেষ সংখ্যা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন