>১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতার নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যায় ৩৪ বছর পর। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অবমুক্ত করা নথিপত্র ঘেঁটে মিজানুর রহমান খান তৈরি করেন আট পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদন ‘১৯৭৫ নভেম্বর: মার্কিন দলিল’। এটি প্রথম আলোতে ছাপা হয় ২০০৯ সালের ৩ থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত।
default-image

৩৪ বছর পর ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম জেল হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে নতুন তথ্য জানা গেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অবমুক্ত করা একটি গোপন তারবার্তা থেকে ইঙ্গিত মিলছে যে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত খুনি চক্রের আশঙ্কা ছিল, খন্দকার মোশতাক আহমদকে হত্যা করা হতে পারে। আর সে ক্ষেত্রে এর বদলা নিতে জেল হত্যাকাণ্ড ঘটানো হবে। কিন্তু মোশতাক অক্ষত থাকলেও জেলহত্যার ঘটনা ঘটে। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের মধ্যে এক বা একাধিক মেজরের হুকুমে জেলহত্যা ঘটেছিল।
ঢাকায় নিযুক্ত তত্কালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজিন বোস্টার ১০ নভেম্বর ১৯৭৫ মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে ওই তথ্য জানিয়েছিলেন। ১৯৭৫ ঢাকা-০৫৪৭০ ক্রমিকের ওই তারবার্তাটি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ২০০৩ সালের ৩ নভেম্বর অবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ দলিল থেকে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, ৭ নভেম্বরকে সিপাহি-জনতার বিপ্লব হিসেবে গণ্য করে এর একটি রাজনৈতিক রূপ দেওয়া হলেও মার্কিন রাষ্ট্রদূত বোস্টারই তা সমর্থন করেননি। বরং তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। অথচ বোস্টারকে ব্যাপকভাবে আগস্ট অভ্যুত্থানকারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে ধারণা করা হয়ে থাকে। বোস্টার লিখেছেন, ‘পঁচাত্তরের নভেম্বরের ঘটনায় ভারতের হাত থাকার কোনো প্রমাণ আমরা পাইনি। খালেদ মোশাররফকে ভারতপন্থী মনে করেই বিদ্রোহী সাধারণ সৈনিকেরা জিয়াউর রহমানের দিকে ঝুঁকেছিলেন।’

রাষ্ট্রদূত বোস্টার বাংলাদেশের ইতিহাসের রক্তক্ষয়ী নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের ঘটনাবলির চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। বিশ্ব এ সময় বাংলাদেশ তিনটি সরকারের পালাবদল প্রত্যক্ষ করেছিল। বোস্টারের ভাষায়, এ সরকারগুলো আমেরিকাবিরোধী ছিল না। তারা ছিল না ভারত কিংবা সোভিয়েতপন্থী।

বোস্টার লিখেছেন, ‘এক বা একাধিক মেজরের নির্দেশে ৩ নভেম্বর জেল হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল বলে স্পষ্টত প্রতীয়মান হয়।’

বোস্টার তাঁর দীর্ঘ বিশ্লেষণ শুরু করেন এভাবে, ‘চিফ অব দ্য আর্মি জেনারেল স্টাফ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ পদোন্নতি না পেয়ে ব্যর্থতায় বিষণ্ন ছিলেন। ১৫ আগস্ট মুজিবকে হত্যার পর খালেদের কিছু সহকর্মীর পদোন্নতি হলেও তাঁর হয়নি বরং মেজররা সন্দেহভাজন যেসব কর্মকর্তার তালিকা তৈরি করেছিলেন, এর মধ্যে খালেদ মোশাররফের নামটিও ছিল। আমরা এটা নিশ্চিতভাবে জানি না যে মোশাররফ সংঘাতের রূপকার ছিলেন কি না। যদিও অনেকে তেমনটা মনে করেন। একটি ভালো সূত্র আমাদের জানিয়েছিল, মোশতাক সরকারে মেজরদের বিশেষ ভূমিকা পালনকে যাঁরা সুনজরে দেখেননি, খালেদ মোশাররফ তেমন কিছু অধীনস্তদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। মেজরদের বিশেষ ভূমিকার কারণে যেসব বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, তার মধ্যে কিছু সামরিক কর্মকর্তাদের হয়রানি অন্যতম। এই সূত্র আরও জানিয়েছে, খালেদ মোশাররফের অন্যতম লক্ষ্য ছিল, তেমন কোনো রক্তপাত ছাড়াই পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। তার অধীনস্থদেরও পরিকল্পনা ছিল সেটাই। যদিও তিনি সন্দেহাতীতভাবে নিজের ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ সম্পর্কেও মনোযোগী ছিলেন।’

৩ নভেম্বরের অবস্থা সম্পর্কে কর্নেল (অব.) শাফায়াত জামিল ১৯৯৮ সালে লিখেছেন, ৩ নভেম্বর ভোর থেকে শুরু হয় ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের সঙ্গে টেলিফোনে আমাদের বাগ্যুদ্ধ। আমাদের দিকে খালেদ মোশাররফ, ওদিকে রশিদ, জেনারেল ওসমানী ও সর্বোপরি খন্দকার মোশতাক।’ (ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর, সাহিত্য প্রকাশ, পৃ.১৩৫)

বোস্টার লিখেছেন, ‘খালেদ মোশাররফ ও তাঁর মিত্ররা সোমবার (নভেম্বর ৩) খুব সকালে সেনানিবাস ও ঢাকা নগরের বেশির ভাগ জায়গার নিয়ন্ত্রণ তুলে নেন। এবং মোস্তাক সরকারের বিরুদ্ধে নিজেদের সামরিক শক্তি প্রদর্শনে ঢাকার আকাশে মিগ যুদ্ধবিমান ও সশস্ত্র হেলিকপ্টার চক্কর দেয়। এর আরেকটি লক্ষ্য ছিল মোস্তাক সরকারের অনুগত ট্যাঙ্ক বাহিনীকে ভয় দেখানো। এই প্রেক্ষাপটে খালেদ মোশাররফ মোশতাকের কাছে চারটি শর্ত দিলেন। প্রথমত, মোশাররফ চিফ অব স্টাফ হিসেবে ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বী মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের স্থলাভিষিক্ত হবেন, দ্বিতীয়ত, মেজরদের সেনাবাহিনীর নিয়মিত শৃঙ্খলার মধ্যে আসতে হবে, তৃতীয়ত, সরকারের প্রতি অনুগত ট্যাঙ্ক বাহিনীকে নিরস্ত্র করতে হবে। এবং চতুর্থত, মোশতাক স্বপদে বহাল থাকবেন। খালেদের পক্ষে এসব দাবির দৃশত বড় লক্ষ্য ছিল রক্তপাত এড়ানো, যা কি না ভারতের হস্তক্ষেপ ডেকে আনতে পারত। মোশতাক দিনভর আলোচনা শেষে শেষ পর্যন্ত খালেদের এসব দাবি মেনে নিলেন। তবে মোশতাক তাঁকে রাষ্ট্রপতি বানানোর জন্য কৃতজ্ঞ মেজর ও তাঁর কিছু সহকর্মীর জন্য বাংলাদেশ ত্যাগের ব্যবস্থাও সেরে নেন। মোশাররফের সঙ্গে এ ধরনের আপসে পৌঁছানোর আগে মোশতাক সরকার কুমিল্লা থেকে সেনাবাহিনীর সাহায্য আশা করেছিল। কিন্তু কুমিল্লার অধিনায়ক তখন এই যুক্তিতে মোশতাকের নির্দেশনা নাকচ করলেন যে শুধু সেনাবাহিনী প্রধান কিংবা চিফ অব জেনারেল স্টাফের নির্দেশ ছাড়া তাঁরা কোনো অভিযানে যেতে পারেন না। সেনাপ্রধান জিয়া তখন অন্তরিন আর চিফ অব জেনারেল স্টাফ ছিলেন মোশাররফ।

বোস্টার এ পর্যায়ে আরেকটি রক্তপাত অর্থাৎ​ জেল হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে লিখেছেন, ‘আমাদের এটা বিশ্বাস করার সংগত কারণ ছিল যে খন্দকার মোশতাককে হত্যার চেষ্টা করা হলে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে একটি কন্টিনজেন্সি প্ল্যান ছিল। নিহত ব্যক্তিরা মোশতাকের সাবেক সহকর্মী এবং এখন তাঁর রাজনৈতিক শত্রুতে পরিণত হয়েছেন। বোস্টারের বর্ণনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনসুর আলী, সাবেক উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও ভারতপ্রেমিক তাজউদ্দীন আহমদ এবং সাবেক শিল্পমন্ত্রী কামারুজ্জামানকে ঢাকা কারাগারে ৩ নভেম্বর খুব সকালে হত্যা করা হয়।

বোস্টার এরপর মেজরদের দেশত্যাগে খালেদ মোশাররফদের সম্মতি সম্পর্কে মন্তব্য করেন। তাঁর কথায়, ‘ওই দিন (৩ নভেম্বর) শেষ বিকেলে মেজরদের দেশত্যাগে মোশাররফের সম্মতি রহস্যাবৃত বলে মনে হয়। অবশ্য একটি পক্ষের ভাষ্য, জেল হত্যাকাণ্ডের ঘটনা মোশাররফ তখনো জানতেন না। অনেক পর্যবেক্ষক অবশ্য উল্লেখ করেন, জেল হত্যাকাণ্ড ঘটনানোর একটি প্রভাব হলো, সরকারের ভেতরে কোনো ভারতপন্থী নেতৃত্বকে অপসারিত করা।’

কর্নেল শাফায়াত জামিল তাঁর বইয়ের ১৩৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘তাঁরা বিষয়টি জানতেন না। জানলে এভাবে খুনিদের নিরাপদে চলে দেওয়া হতো না।’

বোস্টার লিখেছেন, ‘মেজরদের দেশত্যাগের ফলে বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতির কিছুটা অবসান ঘটে। মঙ্গল ও বুধবার মোশতাক ও মোশাররফের মধ্যে সমঝোতা চলছিল। এর ফল হিসেবে মঙ্গলবার রাতে চিফ অব স্টাফ হিসেবে মোশাররফের অভিষেক ঘটে এবং বৃহস্পতিবার খুব সকালে মোশতাক পদত্যাগ করেন। একই সঙ্গে ঘোষণা আসে, অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হবেন। সায়েম ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। এবং তাত্ক্ষণিক সংসদ বিলুপ্ত করেন।’

জিয়া জনপ্রিয়: বোস্টার লিখেছেন, ‘কিন্তু এটা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট যে মোশাররফের ক্ষমতা গ্রহণ সেনাবাহিনীতে ছিল অপ্রীতিকর। কারণ জেনারেল জিয়া স্পষ্টতই সেনাবাহিনীতে তাঁর চেয়ে অনেক বেশি জনপ্রিয় ছিলেন। এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো, সত্যতা থাকুক আর না-ই থাকুক, মোশাররফকে ব্যাপকভাবে ভারতীয় নীতির একজন চালিকা হিসেবে দেখা হতো। সেনাবাহিনীর মধ্যে এই যে ধারণা তা আরও অতিরঞ্জিত হয় ৪ নভেম্বর (মঙ্গলবার) যখন মুজিবপন্থীদের মিছিল বের হয় এবং পরদিন জেল হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে হরতাল ডাকা হয়। শুক্রবার খুব সকালের দিকে সেনাবাহিনীর নিম্নপদের সদস্যরা বিদ্রোহ শুরু করেন। তাঁরা দ্রুততার সঙ্গে মোশাররফের সমর্থকদের উত্খাত করেন। এবং সব রকমের বিবরণ থেকে জানা যায়, তাঁরা এ সময় মোশাররফকে হত্যাও করেন। সারা রাত ধরে শহর জেগে থাকে গুলির শব্দে। এটা চলে শুক্রবার সারা দিন। মোশাররফের অপসারণের পর অধিকাংশ গোলাগুলির ঘটনা ছিল উল্লাসসূচক। একটি কর্তৃপক্ষীয় সূত্র আমাদের বলেছে, মোশাররফকে উত্খাতের ঘটনায় প্রায় ৩০ জন খুনের শিকার হয়। অবশ্য অন্য সূত্রগুলো এই সংখ্যা কয়েক শ বলেছে।’

বোস্টার এরপর মন্তব্য করেন, ‘সেনাবাহিনীর নিম্নপদে সফল বিদ্রোহের ঘটনা এখন একটি নতুন সমস্যার জন্ম দিয়েছে। শৃঙ্খলা বাহিনীর লোকেরা চরম বিশৃঙ্খলামূলক কাজে জড়িয়ে পড়েছে। যেসব সেনা কর্মকর্তার প্রতি তাদের রাগ পুঞ্জীভূত ছিল, অনেকেই তার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। এমনকি তারা তাদের ভবিষ্যৎ​ ভালো-মন্দ থাকার প্রশ্নে এখন সেনা নেতৃত্বের কাছে দাবিদাওয়া তুলতে শুরু করেছে। গোটা সপ্তাহজুড়ে এ কথাই জানা গেছে, প্রতিশোধপরায়ণ সিপাহিদের ভয়ে বিপুলসংখ্যক সামরিক কর্মকর্তা পালিয়ে গেছেন কিংবা সেনানিবাস থেকে নিজেদের আড়াল করে রাখছেন। আমরা শুনতে পাচ্ছি বহু সেনা কর্মকর্তা ও তাঁদের স্ত্রীরা নিহত হয়েছেন।’

মোশতাকের না: ওই তারবার্তা থেকে আরও দেখা যাচ্ছে, ৭ নভেম্বরের পর জেনারেল জিয়া খন্দকার মোশতাককে রাষ্ট্রপতি পদ গ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বোস্টার লিখেছেন, ‘শুক্রবার সকালে জেনারেল জিয়া, মোশতাক এবং অন্যান্য প্রধান ব্যক্তিদের একটি বৈঠক হয়। এ বৈঠকেই মোশাররফ-পরবর্তী সরকারের চেহারা স্পষ্ট হয়। রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাব মোশতাক ফিরিয়ে দেন। তিনি যুক্তি দেন, পরিস্থিতি এখনো বিস্ফোরণোন্মুখ। দেশে এখন দরকার একজন অরাজনৈতিক ও অবিতর্কিত রাষ্ট্রপতি। এ প্রেক্ষাপটে বিচারপতি সায়েমকে রাষ্ট্রপতির পদে রাখা হয়। পরে তাঁকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। খালেদ মোশাররফকে হত্যার পর এবং সায়েমের শপথ গ্রহণের আগ পর্যন্ত এই দায়িত্ব জেনারেল জিয়া পালন করেছিলেন। আমাদের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল, বিচারপতি সায়েমের রাষ্ট্রপতি হওয়ার বিষয়টি সামরিক বাহিনী এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে পূর্ণ সমর্থন লাভ করেছে। এর ফলে দেশের স্থিতিশীলতা পুনরুজ্জীবনের পথ সুগম হয়েছে। ১০ নভেম্বর সোমবার সকাল পর্যন্ত পরিস্থিতি দৃশ্যত অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছিল। রোববার আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল শুরু হলো। কিন্তু সাধারণভাবে একটা অশান্তি বজায় ছিল। কারণ, তখনো খবর আসছিল, সামরিক বাহিনীর মধ্যে খুনখারাবি চলছে। অন্যদিকে সীমান্তে ভারতীয় অভিযানের আশঙ্কা। সব মিলিয়ে বলা যায়, একটি অব্যাহত উত্তেজনা ও অনিশ্চিত অবস্থা।’

তিন সিদ্ধান্ত: বোস্টার এতক্ষণ অনেকটাই ঘটনার বিশ্লেষণ দিচ্ছিলেন। তারবার্তাটির শেষে তিনি স্পষ্ট অভিমত দেন। বোস্টার লিখেছেন, ‘এতক্ষণ ধরে যে আলোচনা করা হলো তা থেকে তিনটি সিদ্ধান্তে পৌঁছা যায়। প্রথমত, অভ্যুত্থান এবং পাল্টা অভ্যুত্থানের প্রধান অংশগ্রহণকারীরা ছিলেন অরাজনৈতিক। কিছুটা ব্যতিক্রম ছিলেন শুধু খালেদ মোশাররফ। তাঁর একটু বাড়তি অসুবিধা ছিল যে তাঁকে ভারতপন্থী বলে মনে করা হতো। সেনাবাহিনীর যে অংশটি খন্দকার মোশতাকসহ মেজরদের উত্খাত করল, তাদের কিন্তু প্রাথমিক ক্ষোভের কারণ ছিল আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত মেজররাই। ৭ নভেম্বরে পাল্টা অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটিয়েছিল সেনাবাহিনীর নিচের পদের লোকেরা। যারা খালেদ মোশাররফের চেয়ে জিয়াকেই বেশি পছন্দ করছিল। কারণ, তারা মোশাররফের আনুগত্য কোথায় নিহিত, তা নিয়ে সন্দিহান ছিল।’

বন্য উল্লাস: এ কথার পর মার্কিন রাষ্ট্রদূত বোস্টার একটি মন্তব্য করেন। আর তা হলো ‘গত সপ্তাহে বাংলাদেশে আমরা যতগুলো সরকার দেখেছি, চরিত্রগতভাবে তার কোনোটিই আমেরিকাবিরোধী, ভারতপন্থী কিংবা সোভিয়েতপন্থী ছিল না। দ্বিতীয় হলো, আমাদের কাছে এমন কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই যে এ সপ্তাহের ঘটনাবলিতে ভারত দায়ী ছিল। তৃতীয়ত, এসব ঘটনাবলি এটাই নিশ্চিত করছে যে এই বাংলাদেশের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সমাজের নিম্নতম স্তর পর্যন্ত ভারতবিরোধী মনোভাব কত শক্তিশালী ও পরিব্যপ্ত। যদিও মোশাররফ যে ভারতপন্থী ছিলেন সে বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো প্রমাণ নেই এবং কারও মতে তিনি তা ছিলেনও না। কিন্তু তাঁকে ব্যাপকভাবে সেভাবেই দেখা হয়েছিল। এবং তাঁকে উত্খাতের ঘটনায় যে বন্য উল্লাস এখানে হয়েছে, তাতে ভারতবিরোধী মনমানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

আরও পড়ুন :

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0