default-image

ক-তে ক্রিকেট, ক-তে কীর্তি, ক-তে কলঙ্ক। দেশীয় ক্রীড়াঙ্গনের সালতামামির প্রথমেই ক্রিকেট এসে পড়ল বলে দোষ নেবেন না। সেই ১৯৯৭ আইসিসি ট্রফি ক্রিকেট বিজয়ের পর থেকেই তো ক্রিকেট ৫৬ হাজার বর্গমাইলের গাঙ্গেয় বদ্বীপটির একটি ব্র্যান্ড। মাতৃভাষা রক্ষার সংগ্রামের স্রোতোধারায় মুক্তিযুদ্ধের রক্তে কেনা স্বাধীনতা, ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়ন আর ক্রিকেট—বহির্বিশ্বে এই ত্রিভুজ-বেষ্টনীতেই ঔজ্জ্বল্য পায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি।

ইংরেজিতে ১৩ সংখ্যাটি নাকি অপয়া। তো একবিংশ শতকের ত্রয়োদশ বর্ষটিতে বাংলাদেশের ক্রিকেট একটু কলঙ্ক গায়ে মাখলেও এটিকে অপয়া অপবাদ দেওয়া যাবে না। বছরের বেশির ভাগজুড়েই মাঠের ক্রিকেট ছিল আমাদের অহংকার। বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা প্রতিনিয়তই নিজেদের অতিক্রম করে যাওয়ার চেষ্টাটা দেখিয়ে গেছেন। শুরু হয়েছিল মার্চ মাসে শ্রীলঙ্কা সফর দিয়ে। প্রতিবারের মতো নিজেদের মাটিতে শ্রীলঙ্কা ধবলধোলাই করতে পারেনি বাংলাদেশকে। বরং গলে প্রথম টেস্টে বাংলাদেশ নিজেদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান করে ড্র করতে বাধ্য করেছে তাদের। অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমের ব্যাট থেকে বাংলাদেশ পেয়েছে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি। দশ রানের জন্য ডাবল সেঞ্চুরি করতে পারেননি আশরাফুল। পরের টেস্টটা হেরে সিরিজ খুইয়ে এলেও ওয়ানডে সিরিজে আবার শ্রীলঙ্কাকে জিততে দেয়নি বাংলাদেশ। একটি ম্যাচ জিতে ড্র করা গেছে ওয়ানডে সিরিজ। পারফরম্যান্সে উন্নতির এই লেখচিত্র দৃশ্যমান হওয়ার কথা ছিল পিঠোপিঠি জিম্বাবুয়ে সফরেও। অপ্রত্যাশিতভাবে সেখানে হারতে হয়েছে প্রথম টেস্টে, যদিও প্রতিশোধ নেওয়া গেছে দ্বিতীয় টেস্টেই। কিন্তু এর পরই যে ওয়ানডে সিরিজটা আরও অপ্রত্যাশিত হতাশায় ডোবাল। ওয়ানডে সিরিজে পরাজয়, সঙ্গে যুগল আঘাত হয়ে এল অধিনায়ক মুশফিকের অধিনায়কত্ব ছাড়ার ঘোষণা। ক্রিকেট বোর্ড তাঁকে পদত্যাগ করতে দেয়নি। পরে এই মুশফিকই অধিনায়কত্ব চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছেন, নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে টেস্ট ও ওয়ানডে সিরিজে গড়েছেন নতুন ইতিহাস। দুটি টেস্টই আমরা নিউজিল্যান্ডের মতো শক্তিকে কোণঠাসা করে ড্র করেছি। প্রকৃত সত্যটা হলো দুই টেস্টেই জিততেও পারত বাংলাদেশ। এই সিরিজেই বাংলাদেশ পেয়েছে আরও দুই নতুন ক্রিকেট নায়ককে। একজন সোহাগ গাজী, ইতিহাসের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে যিনি একই টেস্টে বোলিংয়ে হ্যাটট্রিকের সঙ্গে ব্যাটিংয়ে করেছেন সেঞ্চুরি। আরেকজন পরপর দুই টেস্টে সেঞ্চুরি করা মুমিনুল হক। নমাস-ছমাস পর টেস্ট খেলে যেকোনো দেশের পক্ষেই ক্রমোন্নতির লেখচিত্র ফুটিয়ে তোলা দুরূহ। কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেট-বিশ্বকে বিস্ময়াবিষ্ট করে সেটি দেখাচ্ছে। এটিই বড় আশার জায়গা। টেস্টের পর ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশ তো উপহার দিয়েছে আরও বিস্ময়। ২০১০ সালের মতো আবারও ওয়ানডে সিরিজে নিউজিল্যান্ডকে ধবলধোলাই। সেবার ছিল চার ম্যাচের সিরিজ, এবার তিন ম্যাচের। কিন্তু এবার অনেক প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিল কিউইরা, বাংলাদেশে আসার পথে শ্রীলঙ্কায় করে এসেছিল কন্ডিশনিং ক্যাম্প। চেয়েছিল পুরোনো জ্বালাটা ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু হায়, আবারও তারা বাংলাদেশের বিষমাখা তিরে বিদ্ধ।

কয়েকটি শারদ গোধূলি আর সন্ধ্যায় রচিত হয়েছে এই গৌরব-আখ্যান। তবে এরই আগে আসা গ্রীষ্মটা আমাদের দহন করেছে তীব্রভাবে। বিপিএলে বাংলাদেশের কয়েকজন ক্রিকেটার একটি অসাধু চক্রে ঢুকে স্পট ফিক্সিং করেছেন। আইসিসির দুর্নীতি দমনবিরোধী ইউনিটের কাছে গড়গড় করে পাপের ফিরিস্তি দিয়ে আমাদের এক ক্রিকেট নায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল জানিয়ে দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা নিষ্পাপ ছিলেন না। নাম করেছেন নন্দিত কজন সাবেক ক্রিকেটারেরও। ১৩ আগস্ট ঢাকায় এসে সেই সত্য-বোমাটিরই বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন আইসিসির প্রধান নির্বাহী ডেভ রিচার্ডসন। আমাদের বিশ্বাস ও ভালোবাসা খুন হয়েছে এই তথাকথিত ক্রিকেট-নায়কদের হাতে! বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের দুর্নীতির প্রতি শূন্য সহনশীলতার নীতিটি প্রশংসাযোগ্য। কিন্তু কদিন পর এই বোর্ডেরই নির্বাচনে দেখানো নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের নমুনাটা অগ্রহণযোগ্য। ক্রিকেট উন্নয়নের জন্য দরকার বিকেন্দ্রীকরণ অথচ প্রকারান্তরে সরকার মনোনীত অস্থায়ী কমিটি নির্বাচনকে প্রভাবিত করে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করেছে রাজধানীতে। ‘হাততোলা’ গণতন্ত্রে বিসিবির প্রথম নির্বাচিত সভাপতি হয়েছেন নাজমুল হাসান।

ক্রীড়াঙ্গনে এ রকম নিয়ন্ত্রিত গণতান্ত্রিক নির্বাচন দেখেছে অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন ও হকি ফেডারেশন। এই নির্বাচনজাত ঝামেলায় জেরবার দেশের হকি। ওয়ার্ল্ড হকি লিগের প্রথম পর্বে দুর্দান্ত সাফল্য দেখিয়েও বিশ্বকাপে খেলার সুযোগটা হয়েছে পদদলিত। প্রত্যাশার বেলুন ফুলিয়ে এশিয়া কাপে গিয়ে বাংলাদেশ এঁকেছে ব্যর্থতার চকখড়ি।

 টেস্ট স্ট্যাটাস ক্রিকেটকে দিয়েছে আর্থিক সচ্ছলতা। আর্থিক সচ্ছলতা খুব দরকার ফুটবল ফেডারেশনেও। কাজী সালাউদ্দিন সংশপ্তক হয়ে লড়ছেন। কিন্তু কোটি কোটি টাকা কোথায় পাবেন তিনি! তার পরও ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে খেলার লক্ষ্য বেঁধে দুজন ডাচ কোচ এনেছেন উচ্চ বেতনে। এঁদের মাসিক বেতন ২০,০০০ মার্কিন ডলার জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কয়েক মাসের বেতন বকেয়া। পরিকল্পনা থাকলেও এগোনো যাচ্ছে না। ঘরোয়া ফুটবল একটু আশার সঞ্চার করলেও আন্তর্জাতিক ফুটবল শেষ পর্যন্ত হতাশারই বৃত্তান্ত। যেমন আট দেশের সাফ ফুটবলে এবার গ্রুপ-পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ আরেকটা সাফল্য দেখেছে সিদ্দিকুর রহমানের সৌজন্যে। বিশ্বের গলফ মানচিত্রে বাংলাদেশের এই যোদ্ধা একাই বইছেন জাতীয় পতাকা। এ বছরই গলফের দ্বিতীয় পেশাদার শিরোপা জিতেছেন। প্রথমবারের মতো খেলেছেন গলফের বিশ্বকাপে। এ দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আলোর বৃত্তের বাইরে থাকা এক রাজকুমার যেন সিদ্দিকুর।

এই লেখা যখন শেষ করছি, তখন শীতে জবুথবু হয়েও সিলেট মেতেছে জাতীয় ক্রিকেটারদের নিয়ে বিজয় দিবস টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট টুর্নামেন্টে। এই টুর্নামেন্ট আগামী বছর এ দেশে অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রস্তুতি। ২০১৪ সাল বাংলাদেশে আনছে অনেকগুলো ক্রীড়া উৎসব। এই জানুয়ারিতেই শ্রীলঙ্কার পূর্ণাঙ্গ সফর, গায়ে গায়েই এশিয়া কাপ ক্রিকেট ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। কিন্তু ২০১৩ যে রাজনৈতিক আঁধার ঘনিয়েছে এ দেশের আকাশে, তাতে ঢাকা পড়ে যাবে না তো সব উৎসব? খেলার মাঠটা চিরদিনই রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের জাতীয় অনৈক্যে সেতুবন্ধ ঘটিয়েছে। আমরা শুধু সেই ঐক্য আর শুভবোধের আশা নিয়েই তাই বিদায় জানাতে পারি ২০১৩ সালটাকে।

 পবিত্র কুন্ডু: সাংবাদিক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0