>

তোষা পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করে ২০১০ সালে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম ও তাঁর দল। ২০১২ সালে উন্মোচন করেন ছত্রাকের জীবনরহস্য। এবার উন্মোচিত হলো সাদা পাটের জীবনরহস্য। গতকাল পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটে এসব নিয়ে প্রথম আলো র সঙ্গে কথা বলেছেন মাকসুদুল আলম। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ইফতেখার মাহমুদ

প্রশ্ন: দেশি পাটের জীবনরহস্য উন্মোচনের বিষয়টি সম্পর্কে কিছু বলুন।

 উত্তর: এর আগে আমরা তোষা পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করেছিলাম। কারণ, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চাষ হওয়া পাটের সিংহভাগই তোষা পাট।

 প্রশ্ন: কত দিনের মধ্যে আপনারা কৃষকের হাতে পাটের নতুন জাত পৌঁছে দিতে পারবেন?

 উত্তর: এ ধরনের গবেষণার ফলাফল পাওয়ার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্টভাবে সময়সীমা বেঁধে কাজ করা কঠিন। তবে এখন পর্যন্ত যতটুকু অগ্রগতি হয়েছে তাতে আশা করা যায়, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে আমরা নতুন ওই জাত পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করতে পারব। সবকিছু ঠিকঠাকমতো চললে কৃষকের হাতে নতুন জাত পৌঁছে দিতে সর্বোচ্চ চার-পাঁচ বছর লাগতে পারে।

 প্রশ্ন: কিন্তু পাটের এখন দুর্দিন যাচ্ছে। কৃষক এখনই যা উৎপাদন করছেন, তার ন্যাঘ্যমূল্য পাচ্ছেন না।

নতুন জাত চাষের ক্ষেত্রে তাঁরা কি আগ্রহ পাবেন বলে মনে করেন?

 উত্তর: আমাদের কাজ কৃষকের প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে নতুন জাত উদ্ভাবন করা। আমরা দেখেছি, ছত্রাক ও পোকার আক্রমণে কৃষকের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পানির কারণে কৃষক পাট পচাতে পারেন না। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে পাটের চাষ করা যায় না। আমরা এই সমস্যাগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী জাত উদ্ভাবনের চেষ্টা করছি।

একই সঙ্গে আমাদের লক্ষ্য থাকবে পাটের জাতের মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্যগুলো যুক্ত করা, যার চাহিদা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে রয়েছে। যেমন: দেশের বস্ত্রশিল্পে কাপড় তৈরির উপযোগী সুতা পাট থেকে উৎপাদন করা যাচ্ছে না। আমরা চেষ্টা করছি, পাটের আঁশকে আরও সূক্ষ্ম ও শক্ত করা যায় কি না, যা থেকে উন্নতমানের সুতা উৎপাদন করা সম্ভব হবে।

 প্রশ্ন: কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে কি পাটের সেই চাহিদা আছে? চাহিদা তো দিন দিন কমছে।

 উত্তর: চাহিদা কমার বড় কারণ, পাটের ব্যবহার শুধু বস্তা, রশি ও অন্যান্য শৌখিন দ্রব্য প্রস্ত্ততে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু একটি পরিবেশসম্মত কৃষিপণ্য হিসেবে বিশ্বে পাটের বিশাল সম্ভাবনা আছে। বাংলাদেশ সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার নেতৃত্ব দিতে পারে। তবে এ জন্য আমাদের শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদেরও প্রস্ত্ততি নিতে হবে।

 প্রশ্ন: কীভাবে সেই প্রস্ত্ততি নেওয়া সম্ভব? তা কি নেওয়া হচ্ছে?

 উত্তর: পাটের জীবনরহস্য উন্মোচনের পূর্বপ্রস্ত্ততি আমাদের ছিল কি না—এমন প্রশ্ন পাঁচ-ছয় বছর আগে কেউ যদি করত, তাহলে উত্তর নিশ্চয়ই হতো না। কিন্তু আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরা এই কয়েক বছরের মধ্যেই তোষা পাট ও ছত্রাকের জীবনরহস্য উন্মোচন করে দেখিয়ে দিয়েছেন, তা সম্ভব। আমরা এখন একের পর এক কৃতিস্বত্ব (পেটেন্ট) পাওয়ার জন্য আবেদন করছি।

শুরুতে আমরা ভাবতাম যে আমাদের তো কৃতিস্বত্বের আবেদন করার মতো বিশেষজ্ঞ আইনজীবী নেই। আমরা তিনজন তরুণ আইনজীবীকে এ কাজের আইনি পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দিলাম। তাঁরা এখন উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মোট পাঁচটি কৃতিস্বত্বের আবেদন করেছেন। আরও ১১টির প্রস্ত্ততি নিচ্ছেন। ফলে আমরা দেখেছি, চেষ্টা ও দেশপ্রেম নিয়ে কাজ করলে সব সম্ভব। জিনোম গবেষণার ফলাফলকে দেশের শিল্প ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগানোর জন্য প্রস্ত্ততি আমাদের কৃষক, শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের পক্ষে সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীদারির ভিত্তিতে কাজ করলে দ্রুত সফলতা পাওয়া সম্ভব।

 প্রশ্ন: জৈবপ্রযুক্তি ও জিনোম গবেষণার মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার কত বড়? কৃতিস্বত্ব পেলে আমাদের পক্ষে ওই বাজারে কতটুকু কীভাবে যুক্ত হওয়া সম্ভব।

 উত্তর: বৃহত্তর পরিসরে যদি বলি, তাহলে কমপক্ষে এক ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ডলারের বাজার এটি। জিনোম গবেষণার ফলাফলগুলোকে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নিয়ে যেতে পারলে সেটা আরও কয়েক গুণ বাড়বে। নতুন ধরনের এনজাইম তৈরি হচ্ছে।

আমরা যে এনজাইমটির জীবন প্রক্রিয়া জানতে পেরেছি, তা বিশ্বের এনজাইম বাজারের চাহিদার ২০ শতাংশ মেটায়। কৃতিস্বত্ব পেলে কয়েক হাজার কোটি টাকার ওই বাজারে বাংলাদেশ অংশ নিতে পারবে। ছত্রাকের ওপরে যে কৃতিস্বত্বগুলোর জন্য আমরা আবেদন করেছি ও আবেদনের প্রস্ত্ততি নিচ্ছি, তা পেলে আমাদের অর্থনীতির চেহারাই বদলে যাবে। কেননা, ওই বিষয় নিয়ে বিশ্বের যেখানেই যাঁরা গবেষণা করবেন, তাঁদের বাংলাদেশকে কৃতিস্বত্ব বাবদ অর্থ দিতে হবে। ফলে এই গবেষণাগুলোর বহুমুখী অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে।

 প্রশ্ন: কিন্তু জৈবপ্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদিত খাদ্যপণ্য নিয়ে বিশ্বজুড়ে তো অনেক বিতর্ক রয়েছে। এর পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে অনেক ধরনের সমালোচনা আছে। জিনোম গবেষণা এ থেকে কতটুকু মুক্ত?

 উত্তর: মনসান্টোসহ বিশ্বের অনেক বড় বড় কোম্পানির উৎপাদিত পণ্য নিয়ে বিশ্বের অনেক দেশেই আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। জিনোম গবেষণার মাধ্যমে যে ফসল ও পণ্য তৈরি হবে, তাতে আমরা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছি। অর্থাৎ, আমরা জাত উদ্ভাবনের সময় প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম ও বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় রাখি, যাতে ওই জাতটি বেড়ে উঠতে পারে।

 প্রশ্ন: আপনারা একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ওই গবেষণাগুলো করছেন। তারও একটি মেয়াদ আছে। এই গবেষণা ও উদ্যোগগুলোকে টেকসই করতে কী প্রয়োজন?

 উত্তর: আমি মনে করি, আমাদের এই জৈবপ্রযুক্তি গবেষণা কেন্দ্রটিকে একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। লক্ষ্য পূরণের জন্য একে একটি জাতীয় জিনোম গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আমি নিজে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের একটি গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছি। এই কেন্দ্রটি স্থাপনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে অর্থ দেওয়া হয়েছিল, তা আমরা কয়েক বছরের মধ্যেই ফেরত দিয়েছি। আট বছর ধরে ওই কেন্দ্র নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। নিত্যনতুন গবেষণা করছে, গবেষক তৈরি করছে।

বাংলাদেশেও এটি সম্ভব। সরকার আমাদের প্রকল্প বাবদ যে অর্থ দিয়েছে, আমরা খুব অল্প সময়ের মধ্যে নিজেরা উপার্জন করে ফেরত দিতে পারব। আমাদের এই কেন্দ্রের গবেষণার ফলাফল ও দক্ষতাকে কাজে লাগানোর জন্য অনেক ধরনের প্রস্তাব ইতিমধ্যে আমাদের কাছে আসতে শুরু করেছে। ফলে আমরা আত্মবিশ্বাসী এই গবেষণা কেন্দ্রটি আগামী দিনের বাংলাদেশের বিজ্ঞান গবেষণার নতুন পথের নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে। সে ধরনের বিজ্ঞানী আমরা ইতিমধ্যে এখানে তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি।

 প্রশ্ন: এর জন্য কী প্রয়োজন?

 উত্তর: আমাদের এই গবেষণা কেন্দ্রটি নীরবে কাজ করে যাচ্ছে। কোনো একটি ফলাফল পাওয়ার চূড়ান্ত মুহূর্ত এলেই আমরা জাতির সামনে তা তুলে ধরছি। আমাদের এই গবেষণার ফলাফল দেশের সব মানুষের। দেশের সর্বস্তরের সব মানুষ আমাদের যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দিয়েছে, আমরা তা জাতিকে গবেষণার ফলাফলের মাধ্যমে ফেরত দিতে চাই।

আরও পড়ুন :

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0