>

কল্পনা চাকমা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, নিপীড়িত শ্রেণি ও জনমানুষের মুক্তি ছাড়া আলাদাভাবে নারীমুক্তি সম্ভব নয়। তাই তিনি জুম্ম জাতির স্বাধিকার ও মুক্তির স্বপ্ন দেখতেন। সে জন্য স্বাধিকার আন্দোলনে নারীদেরও এগিয়ে আসার জন্য বারবার আহ্বান জানাতেন

default-image

কল্পনা চাকমার জন্ম ১ মে ১৯৭৬। বাবা গুণরঞ্জন চাকমা ও মা বাঁধুনি চাকমার পাঁচ সন্তানের মধ্যে কল্পনা সবচেয়ে ছোট। রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার নিউ লাল্যাঘোনা গ্রামে শ্রমঘনিষ্ঠ এক পরিবারে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। শৈশব থেকেই চরম দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, নারী-পুরুষের ভেদাভেদ ও জাতিগত নিপীড়ন-নির্যাতন দেখে দেখে বড় হয়েছেন তিনি।
১৯৯১ সালে কল্পনা চাকমা বাঘাইছড়ি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে বাঘাইছড়ি উপজেলার কাচালং ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। বিএ পড়ার সময়, ১৯৯৬ সালের ১১ জুন রাতে, মাত্র ২০ বছর বয়সে নিজ বাড়ি নিউ লাল্যাঘোনা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় সদস্য দ্বারা অপহৃত হয়েছেন বলে তাঁর পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করে আসছেন।
কল্পনা অপহরণ মামলায় কেবল তদন্তেই ২০ বছর কেটে গেল! গত ২০ বছরে ৩৯ জন তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত করেছেন! কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, অনেক তদন্ত-পুনঃ তদন্তের পর সম্প্রতি তৃতীয়বারের মতো মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়। এই চূড়ান্ত প্রতিবেদনেও আগের প্রতিবেদনগুলোর পুনরাবৃত্তি করে বলা হয়েছে, কল্পনা চাকমাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি এবং অদূর ভবিষ্যতেও উদ্ধার করার সম্ভাবনা ক্ষীণ। অথচ কল্পনা চাকমা যে অপহৃত হয়েছেন, প্রতিবেদনগুলোতে তদন্ত কর্মকর্তারা তা সত্য বলে মেনেছেন।
পার্বত্য অঞ্চলের প্রত্যন্ত কোণে বেড়ে ওঠা ‘কল্পনা’ নামের মেয়েটি ছোটকালে ছিলেন অন্তর্মুখী ও শান্ত। কিন্তু চরম দারিদ্র্যের কশাঘাত, লিঙ্গীয় বৈষম্য, নারীর প্রতি ধর্মীয় অবজ্ঞা, জাতিগত নিপীড়ন-নির্যাতন—এসব কখনো তাঁর চোখ এড়িয়ে যায়নি। তাই হিল উইমেন্স ফেডারেশনকে অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলার মঞ্চ হিসেবে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি রুখে দাঁড়ানোর মন্ত্র শিখে গেলেন। শৈশবে বাবা হারানো মেয়ে কল্পনাকে চরম আর্থিক কষ্টের মধ্যে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়েছিল। এসএসসি পড়ার সময়ই কল্পনা টিউশনি করে নিজের হাতখরচ জোগাড় করতেন, যাতে বড় ভাইদের ওপর তাঁর নির্ভরশীলতা কমে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সে সময়কার একমাত্র নারী সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সঙ্গে কল্পনা চাকমা জড়িয়ে পড়েন এসএসসি পাস করার পর। সাংগঠনিক কাজে সফর করতে থাকেন পাহাড়ের আনাচ-কানাচে। নিজের খেয়ে বনের মেষ তাড়ানোর এ কাজের জন্য মা বাঁধুনি চাকমার বকুনিও খেয়েছেন কল্পনা। তবে বড় ভাই কালিন্দী কুমার চাকমার ছিল অকুণ্ঠ সমর্থন।

কল্পনা চাকমা নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন। সেখানে টুকে রাখতেন নিজের চিন্তা, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন গুণীজনের স্মরণীয় ও প্রেরণামূলক বক্তব্যগুলোও লিখে রাখতেন। পাশে তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে লেখা থাকত নিজের অভিমত।

default-image

লিঙ্গীয় বৈষম্যসহ সব ধরনের সামাজিক নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন কল্পনা। তাই খুব কম সময়ের মধ্যে তিনি পাহাড়ে নির্যাতিত নারীদের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মুখপাত্র হয়ে ওঠেন। প্রতিবাদী স্বভাবের কারণেই কল্পনা চাকমা খুব সহজে শোষক ও নিপীড়কগোষ্ঠীর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। তবে তাদের চোখরাঙানিতে তিনি হতোদ্যম হয়ে পড়েননি। তার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় কল্পনাকে অপহরণের প্রায় তিন মাস আগে। লাল্যাঘোনা গ্রামে ১৯৯৬ সালের ১৯ মার্চ রাতে পাহাড়িদের কয়েকটি বাড়িতে দুষ্কৃতকারীরা আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। এর প্রতিবাদ মিছিলে কল্পনা নেতৃত্ব দেন। এ নিয়ে স্থানীয় কজইছড়ি ক্যাম্পের এক কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়।
কল্পনা চাকমা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, নিপীড়িত শ্রেণি ও জনমানুষের মুক্তি ছাড়া আলাদাভাবে নারীমুক্তি সম্ভব নয়। তাই তিনি জুম্ম জাতির স্বাধিকার ও মুক্তির স্বপ্ন দেখতেন। সে জন্য স্বাধিকার আন্দোলনে নারীদেরও এগিয়ে আসার জন্য বারবার আহ্বান জানাতেন।
কল্পনা চাকমা হিল উইমেন্স ফেডারেশনকে শুধু রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেননি, সমাজে পুরুষ আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার একটি মঞ্চ হিসেবেও দেখেছেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে সমাজে পিছিয়ে পড়া অংশ হিসেবে নারী সচেতনতার ওপর জোর দিতেন। সমাজ ও ধর্মে নারীদের প্রতি যে বৈষম্যমূলক ধারণা ও রীতি রয়েছে, সেগুলো সংস্কারেরও দাবি তুলেছিলেন কল্পনা চাকমা। তাঁর সেসব দাবি ২০ বছর পর এখন পাহাড়ি নারীরা একটু একটু করে তুলতে শুরু করেছেন। সমাজ ও জাতি নিয়ে কল্পনার চিন্তা, চেতনা ও দূরদর্শিতা ছিল অত্যন্ত প্রখর। পাহাড়ে স্বাধিকার অর্জনের মধ্য দিয়ে নারীর মুক্তি অর্জন ছিল তাঁর স্বপ্ন।
শহুরে মানুষজন শিক্ষা সপ্তাহের খবর কতটুকু রাখেন, জানি না। কিন্তু ১৯৯৪ সালেই সেই প্রত্যন্ত এলাকায় কল্পনা চাকমা শিক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষে বিশাল আয়োজন করে তাতে বক্তব্য দিতেন।
রাজনৈতিক অধিকার ও নারী অধিকারের জন্য কল্পনা চাকমা যে সময়ে আন্দোলন করেছেন, সে সময়টা এখনকার মতো সহজ ও মসৃণ ছিল না। স্থানীয় প্রশাসন ও নিপীড়কগোষ্ঠীর বাধা তো ছিলই, একই সঙ্গে তাঁকে পেরিয়ে আসতে হয়েছে পারিবারিক ও সামাজিক বাধাও। কল্পনার রাজনৈতিক সক্রিয়তা নিয়ে প্রতিবেশীরা বিরূপ মন্তব্য করতে ছাড়েননি। কিন্তু কল্পনার লক্ষ্য ছিল সেসব বাধা উপেক্ষা করে নারীমুক্তির সীমানায় পৌঁছানো। তিনি প্রচুর পড়ার চেষ্টা করতেন। কখনো কখনো কাচালং কলেজের শিক্ষক ও অগ্রজদের কাছে গিয়ে পরামর্শও নিতেন। রাজনৈতিক সহকর্মীদের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের আনাচ-কানাচে সাংগঠনিক সফর করে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য এভাবেই তিনি নিজেকে ধীরে ধীরে গড়ে তুলছিলেন। সে সময়ে মোবাইল নেটওয়ার্ক ছিল না। নিয়মিত চিঠি লিখে কল্পনা তাঁর সহযোদ্ধাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতেন।
কল্পনা চাকমা রাজনৈতিকভাবে কতটা সক্রিয় ও দৃঢ়চেতা ছিলেন, সহযোদ্ধাদের লেখা তাঁর চিঠিতে তা ধরা পড়ে। সহযোদ্ধা রূপক চাকমাকে লেখা এক চিঠিতে কল্পনা লিখেছিলেন, ‘ভেবেছি, পরীক্ষায় পাস না করা পর্যন্ত সংগ্রাম স্থগিত রাখব, কিন্তু নেহাত অন্যায় আমার সামনে ঘটে যাচ্ছে কিছুতেই সহ্য করতে পারি নাই। প্রতিবাদ করতে হয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। আরেক সহযোদ্ধাকে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কী ভাবছি? উত্তরে আমি বলব, সেটা সময়েই জবাব দেবে। কেননা যেটা স্থির করা হয়, সময়ের প্রয়োজনে অনেক কিছু পরিবর্তন ঘটতে পারে।’ একটি প্রশ্নের জবাবে কল্পনা লিখেছিলেন, ‘অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আমি ভূমিকা রাখতে পারি কি না? যতদূর সম্ভব অবশ্যই থাকবে। অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ১ বছর যাবৎ আন্দোলন করে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছি এবং সবাইকে অগ্রণী ভূমিকা পালনের জন্যও জনসমাবেশের ডাক দিয়েছি।’ আন্দোলনে নারীদের ভূমিকার প্রশ্নে কল্পনার বক্তব্য ছিল, ‘পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের ভূমিকাও থাকতে হবে। বিশেষ করে নারী নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ ইত্যাদির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে এবং প্রত্যেককে স্বাবলম্বী হতে হবে।’ (কল্পনা চাকমার ডায়েরি, ২০০১)

কল্পনা চাকমা তাঁর প্রাণপ্রিয় সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশনকে কোন উচ্চতায় দেখতে চাইতেন, তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মী কবিতা চাকমাকে লেখা এক চিঠি থেকে তার ধারণা পাওয়া যায়। কল্পনা লিখেছিলেন, ১৯৯৪ সালের বেইজিংয়ের চতুর্থ নারী সম্মেলনে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁরা (প্রতিনিধিরা) যেন পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৩টি জাতিসত্তার ঐতিহ্য, সংস্কৃতির বিষয়গুলো তুলে ধরেন। এ জন্য প্রয়োজনে স্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করে মতামত নেওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। বেইজিং সম্মেলনের জন্য হিল উইমেন্স ফেডারেশনের পক্ষ থেকে একটি ‘ওয়ালম্যাট’ তৈরি হচ্ছিল। কথা ছিল, পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী হাত তাঁতে বোনা সে ওয়ালম্যাটে থাকবে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানচিত্রসহ একটি স্লোগান। তিনি অভিমত দিয়েছিলেন স্লোগানটি হবে, ‘বাঁচার জন্য চাই স্বায়ত্তশাসন’।

কল্পনা চাকমা যেন একটি জ্বলন্ত মশালের নাম, যে মশালের আলো পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে এখনো রাজনৈতিক প্রজ্ঞার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। খাগড়াছড়ির ধুধুকছড়া থেকে বান্দরবানের ঘুনধুম, বাঘাইছড়ির সাজেক থেকে রাঙামাটির ঘিলাছড়ি কল্পনার চেতনা এখনো জীবন্ত। শৈশবের অন্তর্মুখী ও শান্ত স্বভাবের গ্রাম্য মেয়েটিই ধীরে ধীরে পার্বত্য চট্টগ্রামের আলোকবর্তিকা হয়ে উঠেছেন। পাহাড়ে যেখানেই অন্যায় সংঘটিত হতো, কল্পনা সেখানে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। কল্পনার সেই তেজস্বী চেতনা আজকের দিনের পাহাড়ি নারীদের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছে। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও অন্যায়, অবিচার, জুলুম ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে পাহাড়ের নারীরা একজোট হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন।

রাতের আঁধারে কল্পনাকে অপহরণ করে তুলে নিয়ে তাঁর প্রতিবাদী কণ্ঠকে রোধ করতে চেয়েছিল অশুভ শক্তি। কিন্তু আজ তা হাজারো কণ্ঠের প্রতিধ্বনি হয়ে পাহাড়ে পাহাড়ে অনুরণিত হচ্ছে। যত দিন কাচালং-মাইনি-চেঙ্গি-কর্ণফুলী নদীর অস্তিত্ব থাকবে, তত দিন কল্পনা চাকমার চেতনা পাহাড়ে বহমান থাকবে।

ইলিরা দেওয়ান: কল্পনা চাকমার সহযোদ্ধা; হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0