সেতু তৈরি হয়ে আছে কিন্তু ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ২০০৮ সালে এমন সেতুর সংখ্যা ছিল পৌনে তিন হাজার। আর কাজ ঝুলে ছিল ৬০–৭০টি সেতুর। সড়ক যোগাযোগ সরকারের অগ্রাধিকারে থাকলেও এটা ছিল বাস্তবতা। সারা দেশের এমন সব সেতুর ওপর বেশ কিছু প্রতিবেদন নিয়ে বিশেষ মলাট আয়োজন করে প্রথম আলো। ২০০৮ সালের ১৮ মে প্রকাশিত হয় প্রথম মলাট আয়োজন। পরেও গুরুত্বপূর্ণ একক বিষয় নিয়ে দিনের মূল পত্রিকার ওপরে একাধিক প্রতিবেদনের সমন্বয়ে প্রথম আলো মলাট প্রকাশ করা অব্যাহত রাখে। 

 সওজের ৬০-৭০টি সেতুর নির্মাণকাজ ঝুলে আছে বছরের পর বছর

default-image

সড়ক নির্মাণ অগ্রাধিকারে থাকলেও তা না করে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় যত্রতত্র নির্মাণ করা প্রায় পৌনে তিন হাজার ছোট-বড় সেতু বছরের পর বছর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। সারা দেশে এসব সেতু নির্মাণে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ব্যয় হওয়া প্রায় এক হাজার কোটি টাকা এখন অপচয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আবার সারা দেশে বছরের পর বছর অর্ধনির্মিত অবস্থায় পড়ে আছে বিপুলসংখ্যক সেতু। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর—সওজের অধীনে এ রকম ৬০ থেকে ৭০টি সেতু ৫-১০ বছর ধরে নির্মাণাধীন আছে। এর মধ্যে ‘বঙ্গবীর’খ্যাত কাদের সিদ্দিকী একাই আটকে রেখেছেন চারটি সেতুর কাজ। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর—এলজিইডির অধীনেও এমন ঝুলে থাকা সেতু আছে। তবে এর সঠিক সংখ্যা প্রতিষ্ঠানটির কাছে চেয়ে পাওয়া যায়নি। অপচয়, দুর্নীতির বাইরেও এসব সেতুর কারণে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষকে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির (কাবিটা) খাদ্যশস্যের মাধ্যমে সংযোগ সড়ক এবং খাদ্যশস্য বিক্রি করে সেতু নির্মাণ করার কথা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় তড়িঘড়ি সেতু তৈরির ব্যবস্থা নেওয়া হলেও কোনো বরাদ্দ না দেওয়ায় আর সড়ক নির্মাণ করা হয়নি।

এলজিইডি সূত্র জানায়, এই বিপুলসংখ্যক সেতুর বেশির ভাগ বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে নির্মাণ করা হয়।আওয়ামী লীগ ও বিএনপির আগের সরকারের মেয়াদেও এ ধরনের কিছু সেতু নির্মাণ করা হয়। এলজিইডির হিসাব অনুযায়ী, দেশের ৬২টি জেলায় সড়কের সঙ্গে সংযোগ নেই এমন ২ হাজার ৭২৮টি সেতু আছে। এর মধ্যে এলজিইডির নিজস্ব তত্ত্বাবধানে ৫৮ জেলায় নির্মাণ করা হয়েছে ২ হাজার ২৯৯টি ছোট-বড় সেতু।

কিন্তু এ সেতুগুলো নির্মাণে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তার কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব এলজিইডির কাছে নেই। তবে খরচের অঙ্কটা অন্তত হাজার কোটি টাকা বলে প্রতিষ্ঠানটির উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে। বাকি সেতুগুলো নির্মিত হয়েছে জেলা পরিষদ, বিলুপ্ত থানা কাউন্সিল এবং ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে।

সেতুগুলো নির্মাণে যথাযথ পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে এসব সেতু নির্মাণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট রাজনীতিক, ঠিকাদার এবং ক্ষেত্রবিশেষে বাস্তবায়নকারী সংস্থার কর্তৃত্বধারী ব্যক্তিরা নিজেরা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে যত্রতত্র এ রকম সেতু নির্মাণ করেছেন বলে অভিযোগ আছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের নীতিমালায় প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানীয় সাংসদদের পরামর্শ নেওয়া এবং যেসব জায়গায় সরকারি দলের সাংসদ ছিলেন না, সেসব ক্ষেত্রে বিলুপ্ত জেলা মন্ত্রীর অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেভাবে যেখানে স্থান নির্বাচন করেছেন, সেখানেই সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এই রাজনৈতিক চাপ এতই প্রবল ছিল যে নীতিমালায় সংযোগ সড়ক নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও তা মানা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে সড়কের জন্য দেওয়া বরাদ্দ ব্যয় করতে হয়েছে সেতুর জন্য। ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের কোটি কোটি টাকা খরচ করে নির্মাণ করা সড়কহীন এসব সেতু জনগণের কোনো কাজে আসছে না।

সূত্র জানায়, রাজনৈতিক প্রভাবে অনেক সাংসদ, নেতা, স্থানীয় চেয়ারম্যান নিজের এলাকায় এমন সেতু করিয়ে নিয়েছেন। দলীয় ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিয়ে এবং তাঁদের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে তাঁরা আর খোঁজ নেননি এই সেতু ব্যবহার হয় কি না। আবার ভোলা জেলায় বিএনপি-জামায়াতের দেড় শ নেতা-কর্মীর বাড়ির সামনে সরকারি টাকায় সেতু করা হয়েছে বলে এলজিইডির স্থানীয় কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন।

ঢাকায় এলজিইডির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা) মো. নূরুল ইসলাম বলেন, এলজিইডি তাদের বরাদ্দ করা অর্থে ঠিকাদারদের মাধ্যমে সেতুর কাজ শেষ করে। কিন্তু ২০০৬ সালে এসে তখনকার সরকার কাবিখা ও কাবিটা কার্যক্রমের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেয়নি। ফলে এই বিপুলপরিমাণ সেতুর সংযোগ সড়কের কাজ করা যায়নি।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ ২০০২ সালে জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পসহ বেশ কিছু গুচ্ছ প্রকল্প নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। গবেষণায় তিনি দেখান, এ প্রকল্পগুলোই হচ্ছে প্রকল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক পছন্দের উদাহরণ। এ ধরনের প্রকল্পকে পল্লী উন্নয়নে সরকারের প্রতিশ্রুতি পূরণ বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে এগুলো জনতুষ্টিমূলক। এখানে বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের সাংসদদের অনুরোধের প্রকল্পই নেওয়া হয়ে থাকে। গবেষণায় তিনি বলেছেন, পুরোনো সেতু সংস্কার বা মেরামত নয়; বরং নতুন সেতু বা রাস্তা বানাতেই মন্ত্রী, সাংসদ বা প্রভাবশালী নেতাদের আগ্রহ বেশি দেখা যায়। এ কারণে নতুন নতুন সেতু বা রাস্তা হয়, আর পুরোনোগুলো পড়ে থাকে। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, মূলত তিনটি বড় গুচ্ছ প্রকল্পের আওতায় বেশির ভাগ সেতু ও সংযোগ সড়ক তৈরি হয়। সুনির্দিষ্ট সেতু ও রাস্তার নাম থাকে না বলে এখানে কোনো অগ্রাধিকার থাকে না। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তদবির করে নিজেদের স্বার্থের সেতু বা রাস্তা প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে নেন। এতে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনার শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে যায়।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, মূলত মন্ত্রী, সাংসদ ও সরকারি দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতার চাহিদা অনুযায়ী এ প্রকল্প বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি—এডিপিতে রাখা হয়ে থাকে। কোন এলাকায় বাস্তবায়িত হবে, তা নির্দিষ্ট না থাকায় এসব প্রকল্পের মাধ্যমে পছন্দ অনুযায়ী রাজনৈতিক বিবেচনায় অর্থ বিতরণ করা সম্ভব। এসব প্রকল্পেই দুর্নীতি ঘটে বেশি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জান এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, এভাবে সেতু নির্মাণ হচ্ছে ক্ষমতার অপব্যবহারের নগ্ন উদাহরণ। রাজনৈতিক বিবেচনায় ক্ষমতাসীনেরা নিজ স্বার্থে এসব কাজ হাতে নিয়ে থাকেন। জনস্বার্থের কথা বলা হলেও এর সঙ্গে মূলত জড়িত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থ। এখানে বেসরকারি ঠিকাদারদের পারস্পরিক যোগসাজশ থাকে। সরকারের ক্রয়নীতির অস্বচ্ছতার জন্য এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সুযোগও তৈরি হয়। কী বিবেচনায় এসব সেতু নির্মাণ শুরু হয়েছিল, তা যেহেতু জনগণকে জানানো হয় না, সে কারণেই এসব অপচয়ের কোনো জবাবদিহি তৈরি হয় না।

সেতু আছে সড়ক নেই: এলজিইডির সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা যায়, সারা দেশে সংযোগ সড়কহীন সেতু-কালভার্টের মধ্যে ৭৫০টি ঢাকা বিভাগে। এ ছাড়া রাজশাহী বিভাগে ৬০০, খুলনা বিভাগে ২০০, চট্টগ্রাম বিভাগে ৬৪৬, বরিশাল বিভাগে ৩৩৬ এবং সিলেট বিভাগে ১৯৬টি সংযোগ সড়কহীন সেতু আছে। জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি—২১০টি সংযোগ সড়কহীন সেতু আছে কুমিল্লায়। আর সিরাজগঞ্জে ১৯১, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৭৪ এবং বরিশাল জেলায় ১০৩টি এমন সেতু আছে; যেগুলো জনগণের কোনো কাজে আসছে না।

অসমাপ্ত যত সেতু: সারা দেশে এলজিইডির অনেক সেতু বছরের পর বছর অর্ধনির্মিত অবস্থায় পড়ে আছে। তবে এ রকম সেতুর নির্দিষ্ট কোনো হিসাব এলজিইডির কাছে নেই। সওজের অধীনে ৬০ থেকে ৭০টি সেতুর কাজ অসমাপ্ত পড়ে আছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। তবে উভয় কর্তৃপক্ষই বলছে, নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ার কারণেই সারা দেশে অসমাপ্ত সেতুগুলোর কাজ শেষ করা যাচ্ছে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, এ সেতুগুলোর নির্মাণকাজ ঝুলিয়ে রেখে দৈর্ঘ্য বাড়ানো হয়েছে এবং দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত বরাদ্দ।

এলজিইডির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা) মো. নূরুল ইসলাম বলেন, অসমাপ্ত সেতুগুলোর কাজ শেষ করার বিষয়টি তাঁদের নজরে আছে। তাঁরা ঠিকাদারদের সঙ্গে কথা বলে, অনুরোধ করে নানাভাবে কাজগুলো শেষ করার চেষ্টা করছেন।

সওজের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পরিকল্পনা, নজরদারি ও মূল্যায়ন) নবীনূর ইসলাম খান বলেন, সওজের নিয়ন্ত্রণে থাকা সেতুগুলো যথাসময়েই শেষ করা হয়েছে। তার পরও ৬০-৭০টি সেতুর কাজ বাকি আছে। এগুলোর তালিকা করে অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। আগামী দুই বছরের মধ্যেই অসমাপ্ত সেতুগুলোর কাজ শেষ হয়ে যাবে।

অনেক ঠিকাদার পলাতক: এলজিইডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, জরুরি অবস্থা জারির পর অনেক ঠিকাদারেরই কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে চলছে। ঠিকাদারদের জামানতের টাকা বাজেয়াপ্ত করার হুমকি দিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না। কিন্তু কেন নির্ধারিত সময়ে কাজগুলো শেষ হলো না—এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) সাঈদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, অনেকে আগের দরপত্রের কাজ করতে না চাওয়ায় বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।

নিয়ম অনুযায়ী কাজ শেষ হওয়ার পর পুরো বিল পরিশোধের কথা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ঠিকাদারেরা কাজ শেষ না করে বিল তুলে নিয়ে গেছেন। এলজিইডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঠিকাদারেরা তখন বিল তুলে নিতেন। এখন আর এমন হচ্ছে না।

আরও পড়ুন :

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0