default-image

দেখে মনে হয় বাচ্চা ছেলে; যেন এখনো কৈশোর পেরোয়নি। তড়বড় করে কথা বলার কথা। কিন্তু না, সে এমন গম্ভীর, যা এই বয়সী ছেলেমেয়েকে ঠিক মানায় না।

সে কম্পিউটার প্রোগ্রামার তাসমীম রেজা। ঢাকার নটর ডেম কলেজে একাদশ শ্রেণির ছাত্র। গাণিতিক সমস্যা বোঝা, গাণিতিক বিশ্লেষণ করা, প্রোগ্রামিং সংকেত লিখে সমাধান করা তার কাজ। প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সে জটিল জটিল সমস্যার সমাধান বের করে। পুরস্কারও জিতে নেয়। এ বছরই সে আন্তর্জাতিক ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াডে (আইওআই) রৌপ্যপদক জয় করেছে। স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থীদের এই আন্তর্জাতিক কম্পিউটার প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় এর আগে আর মাত্র একবারই রৌপ্যপদক পেয়েছিল বাংলাদেশ।
তাসমীম রেজা প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম কায়কোবাদের কাছ থেকে। তাসমীম বলে, ‘কায়কোবাদ স্যার প্রতিযোগিতার জন্য আমাদের খুব ভালোভাবে তৈরি করেন। এবার আইওআইয়ে যাওয়ার আগে আমরা এক মাস স্যারের বাসায় থেকে অনুশীলন করেছিলাম।’

>তাসমীম রেজা 
 সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়ার কম্পিউটার প্রোগ্রামিং শুরু
 জাতীয় গণিত উৎসবে মাধ্যমিক পর্যায়ে ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য চ্যাম্পিয়নস’ (২০১৭)
 আন্তর্জাতিক ইনফরমেটিকস অলিম্পয়াডে ব্রোঞ্জপদক (২০১৭)
 আন্তর্জাতিক ইনফরমেটিকস অলিম্পয়াডে রৌপ্যপদক (২০১৮)
 বাংলাদেশ ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াডে পরপর দুবার শীর্ষস্থান অর্জন (২০১৭ ও ২০১৮)

ঢাকার এসওএস হারমেন মেইনার স্কুলে পড়ার সময়ই তাসমীম প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় নাম লেখায়। শুরুতে প্রোগ্রামিং করে সফটওয়্যার বানানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাতে তার মন বসেনি। শুরু করেছিল প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার সমস্যা সমাধানের চেষ্টা। ২০১৫ সালে সে অংশ নিল জাতীয় হাইস্কুল প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় (এনএইচএসপিসি)। জাতীয় পর্যায়ে পঞ্চম স্থান অর্জন করল। পরের বছর একই প্রতিযোগিতায় হলো চতুর্থ। সেবার সে বাংলাদেশ ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াডেও অংশ নিয়েছিল এবং দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিল। সুযোগ পেয়েছিল রাশিয়ায় আইওআইতে অংশ নেওয়ার।
২০১৭ সালে সাফল্য বড় হতে থাকে। এনএইচএসপিসিতে তৃতীয় স্থান ও বাংলাদেশ ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াডে প্রথম স্থান অর্জন করে সে। আবার যায় আইওআইয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে। এবার ব্রোঞ্জপদক জয় করে। চলতি বছর বাংলাদেশ ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াডে আবার শীর্ষস্থান অর্জন করে। আইওআইয়ের রৌপ্যপদকের কথা তো আগেই বলা হয়েছে।
এখন প্রোগ্রামিংয়েই তাসমীমের মূল আগ্রহ। আগে আগ্রহ ছিল গণিতে। গণিত অলিম্পিয়াডেও তার সাফল্য এসেছিল: ২০১৭ সালে জাতীয় গণিত উৎসবে মাধ্যমিক পর্যায়ে ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য চ্যাম্পিয়নস’ হয়েছিল। জানতে চাইলাম, আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পয়াডে অংশ নাওনি? উত্তরে তাসমীম বলল, ‘একসঙ্গে দুটি আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে অংশ নেওয়া যায় না। তাই প্রোগ্রামিংটাই বেছে নিয়েছি।’
তাসমীম রেজার জন্ম ঢাকায়, ২০০১ সালের ২ জানুয়ারি। বাবা রেজাউল ইসলাম পেশায় তড়িৎ প্রকৌশলী, মা মমতাজ মহল গৃহিণী। পরিবারে আছে আর মাত্র এক বোন, নহর রেজা, পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে। তাসমীমের বিশেষ কোনো শখ নেই। কম্পিউটার প্রোগ্রামিং নিয়েই সে মেতে থাকে। তবে চলচ্চিত্র দেখতে পছন্দ করে; বেশি দেখে বিদেশি ছবি।
তাসমীম রেজা মনে করে, প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় ভালো করতে অনুশীলনের বিকল্প নেই। বাসায় প্রতিদিনই সে অনুশীলন করে। সে বলে, অনলাইন প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় বেশি বেশি করে অংশ নিতে হবে। সে নিজে এটা সব সময়ই করে।
কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে তাসমীম কম্পিউটার বিজ্ঞান নিয়ে পড়বে। আপাতত তার ব্যস্ততা আইওআই নিয়ে। কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের এই আন্তর্জাতিক আসর থেকে সে আরও বড় পুরস্কার জয় করে আনতে চায়।
তাসমীম রেজার রৌপ্যপদক জয় করা হয়েছে, এরপর তার গলায় শোভা পাক সোনার পদক। জটিল সব সমস্যার সমাধানে তার প্রোগ্রামিং–দক্ষতা কাজে লাগুক।

 পল্লব মোহাইমেন প্রথম আলোর উপ–ফিচার সম্পাদক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন