default-image

কুস্তি দেখতে গোটা গ্রাম ভেঙে সবাই হাজির। ব্যাটা ছেলে, নারী কিংবা বাচ্চাদের কেউ বাদ যায়নি। বড় জায়গা নিয়ে গোল হয়ে দাঁড়িয়েছে সবাই ‘পবিত্র’ তুলাগাছটার কাছে। খেলা শুরু হওয়ার আগে জনা তিনেক ঢাকবাদক তাদের সামনে রাখা সাতটা ঢাকে মাতম তুলল। আর তাতে উপস্থিত সবাই যেন উন্মাদ হয়ে উঠল। সেই বাদ্যের তালে তালে মাঠে প্রবেশ করল দুই দল কুস্তিগির।

নাইজেরিয়ার সাহিত্যিক চিনুয়া আচেবের থিংস ফল অ্যাপার্ট উপন্যাসের এই দৃশ্যের সঙ্গে চট্টগ্রামের শতবর্ষী জব্বারের বলীখেলার আশ্চর্য মিল রয়েছে। হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। যাঁরা বলীখেলা চাক্ষুষ করেছেন, তাঁরা খেলা শুরুর আগের রণবাদ্যের ধ্বনিটা এতক্ষণে ঠিকই শুনতে পাচ্ছেন। তবে মিলটা কেবল দৃশ্যগত নয়; বরং বলতে হয়, জব্বারের বলীখেলার যে মূল সুর, আচেবের ইবো বা ইগবো জনগোষ্ঠীর কুস্তিরও মর্মকথাও সেটাই। আর এই মর্মকথা হলো, বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজ দেশের মানুষের শৌর্যবীর্য তুলে ধরা। আচেবের উপন্যাস এবং জব্বারের বলীখেলা দুটোর সঙ্গেই উপনিবেশবিরোধিতার এক প্রত্যক্ষ যোগ রয়েছে। আচেবে তাঁর উপন্যাসের পাতায় পাতায় দেখাতে চেয়েছেন, ঔপনিবেশিক সভ্যতায় যে সামাজিক সম্মান আসে বংশপরম্পরায়, অর্থবিত্তের জোরে ইবো সমাজে সেই সম্মান অর্জন করা যায় কেবল কুস্তির মধ্য দিয়ে নিজের সাহসিকতার প্রমাণ দেওয়ার মাধ্যমে।

১৯০৯ সালে চট্টগ্রামের বকশিরহাটের বদরপাতি এলাকার ধনী ব্যবসায়ী ও কংগ্রেসি আবদুল জব্বার সওদাগর ব্রিটিশ কৌলীন্যের বিপরীতে স্বদেশি ঐতিহ্যের এক নতুন বীরগাথা রচনা করতে চেয়েছেন এই খেলার মধ্য দিয়ে। তাঁর প্রেরণা ছিল চট্টগ্রামেরই ঐতিহ্যবাহী মল্ল সম্প্রদায়ের মানুষজন। যাঁদের পেশা ছিল বলীখেলা।

লালদীঘির ময়দানে ১২ বৈশাখ (২৬ এপ্রিল ১৯০৯) বলীখেলার আয়োজনের মধ্য দিয়ে যেন ব্রিটিশ শাসকদের একটা বার্তা দেওয়ার ব্যাপার ছিল। জব্বার সওদাগর যেন বলতে চাইছিলেন, এই চট্টগ্রাম বীরের দেশ, ‘চাটগাঁইয়া পোয়া মেডিত পইড়লে লোআ (লাহা)।’ চট্টগ্রামের তরুণদের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে শারীরিকভাবে প্রস্তুত করে তুলতেই এই আয়োজন শুরু করেন তিনি। সেই তাঁর নামেই এখনো চলছে জব্বারের বলীখেলা।

ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখতে পাব, বাঙালিদের শারীরিক সামর্থ্যের ওপর ব্রিটিশ শাসকদের বিশ্বাস ছিল না। রুডিয়ার্ড কিপলিংয়ের মতো ব্রিটিশ লেখক বাঙালিকে বারবার তাঁর উপন্যাসে হঠকারী, ভীরু ও ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন। তবে এই বাংলাই যে শেষ পর্যন্ত অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠবে, তা উপলব্ধি করতে ইংরেজ শাসকদের মাস্টারদা সূর্য সেনের আবির্ভাবের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। তার আগে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে অনুশীলন সমিতি কিংবা যুগান্তর দল বাঙালি তরুণদের দৈহিক ও মানসিক সামর্থ্যের দিক থেকে ভেঙেচুরে নতুন করে তৈরির চেষ্টা শুরু করে।

তবে চিটাগাং সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের সদস্যসচিব ইতিহাস গবেষক শামসুল হোসাইনের মতে, চট্টগ্রামে ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীতেও বলীখেলার প্রচলন ছিল। বলীখেলার শুরুর বিষয়ে জানতে চাইলে শামসুল হোসাইন বলেন, মূলত সুলতানি আমল থেকে সেনাবাহিনীর প্রয়োজনে কুস্তির চর্চা হতো চট্টগ্রামে। তখন এই অঞ্চলের সেনারা ছিলেন মূলত পদাতিক। তাই কুস্তির মধ্য দিয়ে শারীরিক সামর্থ্য ধরে রাখার প্রয়োজন ছিল তাদের। এরপর মল্ল সম্প্রদায়ের মানুষজন গ্রামে গ্রামে বৈশাখ মাসে বলীখেলার আয়োজন করতেন। ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার পরে চট্টগ্রামে যেটা চালু করেন, তার সঙ্গে গভীর রাজনৈতিক যোগ ছিল। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে মুসলিম সম্প্রদায়ের তরুণদের টানতেই তিনি এই খেলা চালু করেন।

বিজ্ঞাপন

মেলার অর্থনীতি

জব্বারের বলীখেলা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে সেটা ছাপিয়ে একটা অঞ্চলের সাংস্কৃতিক চিহ্নে পরিণত হয়েছে। সম্ভবত ভারতবর্ষের আর কোনো সামাজিক আন্দোলন এতটা প্রবল শক্তি নিয়ে একটা জনগোষ্ঠীর অংশ হয়ে উঠতে পারেনি।

তবে কেবল ঐতিহ্য নয়, বলীখেলার অর্থনৈতিক গুরুত্বও নেহাত কম নয়। বলীখেলাকে কেন্দ্র করে তিন দিনব্যাপী যে বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয়, আগে–পরে তার রেশ থাকে এক সপ্তাহের মতো। দূরদূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী নিয়ে মেলায় ভিড় করেন। ২৪ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে বলীখেলার মেলা শুরু হলেও বেচাকেনা শুরু হয় এর আগে থেকেই। কুলা, ঢালা, মোড়া, মাটির হাঁড়ি-পাতিল, গৃহসজ্জার জিনিসপত্র, সাজসজ্জা, কারুপণ্য, গৃহস্থালি সামগ্রী, হাঁড়ি-পাতিল, মোড়া, দা, খুন্তি, মাদুর, শীতলপাটি, আসবাবপত্র, গাছের চারা, পোশাক, হাতপাখা, ঝাড়ু, খেলনা—সবই পাওয়া যায় মেলায়।

মেলা শুরু হলে নন্দনকানন, আন্দরকিল্লা, লালদীঘির মাঠ থেকে কোতোয়ালির মোড় পর্যন্ত যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। ক্রেতা আর দোকানিদের হাঁকডাকে জমজমাট হয়ে ওঠে এক থেকে দেড় বর্গকিলোমিটার এলাকা।

বলীখেলার মেলার জন্য চট্টগ্রামের সব শ্রেণির বাসিন্দাই অপেক্ষায় থাকেন। এটা যে বাড়িয়ে বলা নয়, সেটা এখানকার প্রত্যেক বাসিন্দা জানেন। বলীখেলার মেলার ঝাড়ু, দা, বঁটি, কুলা, মাটির টব, ফল-ফুলের গাছ, তোশক-জাজিম কিংবা আসবাবপত্রের গুণগত মান যেমন ভালো, তেমন দামও কম। ইলেকট্রনিক পণ্যের জন্য জাপান যেমন একটা ব্র্যান্ড, ঠিক এসব জিনিসপত্রের জন্য বলীখেলাও একটা ব্র্যান্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঝাড়ু কি টবটা দেখিয়ে যখন আপনি বলীখেলার মেলা থেকে কেনা বলে জানিয়ে দিচ্ছেন, তখন জিনিসটা যে ভালো টেকসই আর দামেও সস্তা, সেই বার্তাও দিচ্ছেন একই সঙ্গে।

বলীর লড়াই, শক্তির পরীক্ষা

প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে আঘাত না করে কিংবা তাকে আহত না করে পুরোপুরি ধরাশায়ী করাই বলীখেলার লড়াইয়ের নিয়ম। তাই এ খেলায় কেবল শারীরিক সামর্থ্যেরই পরীক্ষা হয়। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর আবদুল মালেক ৩০ বছর ধরে বলীখেলার রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বলীর লড়াইয়ের নিয়মকানুনের কথাও জানা গেল তাঁর কাছ থেকে। তিনি বলেন, বলীখেলার দিন অর্থাৎ ১২ বৈশাখ বেলা দুইটার দিকে শুরু হয় বলীর লড়াই। সারা দেশের ৪০ থেকে ৫০ জন বলী অংশ নেন লড়াইয়ে। শুরুর দিকে চলে বাছাইপর্ব। লটারির মাধ্যমে বলীরা একজন অপরজনের সঙ্গে লড়াইয়ে অংশ নেন। সেখান থেকে বাছাই করা হয় আটজন বলীকে। তাঁদের নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় কোয়ার্টার ফাইনালের চারটি, সেমিফাইনালের দুটি ও ফাইনালের একটি খেলা। জমজমাট খেলার এই আসর মাগরিবের নামাজের আগেই শেষ হয়ে যায়।

অভিজ্ঞ আবদুল মালেকের চোখে এখন পর্যন্ত অন্যতম বলী হলেন মালেক বলী ও দিদারুল আলম বা দিদার বলী। দুজনের বাড়িই কক্সবাজার। এর মধ্যে মালেক বলী মারা গেছেন ও দিদার বলী অবসর নিয়েছেন।

আবদুল মালেক বলেন, মালেক বলী দুবারের চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। লম্বা ছিপছিপে ছিলেন তিনি। তাঁর টেকনিক খুব সুন্দর ছিল। তবে শেষবার ফাইনালে হেরে আর খেলতে আসেননি তিনি। আর দিদার বলী চারবারের চ্যাম্পিয়ন। এর মধ্যে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন দুবার।

বিড়াল বা দিদার বলী

চিনুয়া আচেবের থিংস ফল অ্যাপার্ট উপন্যাসে ফিরে আসতে হলো আবারও। সেখানে ‘অ্যামালিনজ দ্য ক্যাট’ বলে এক কুস্তিগিরের দেখা পাই আমরা। ওই কুস্তিগিরের পিঠ কখনো মাটিতে লাগেনি বলে গ্রামবাসী তার নাম দিয়েছিল বিড়াল। কারণ, বিড়ালের পিঠও কখনো মাটিতে লাগে না। অবশ্য পরে উপন্যাসের নায়ক ওকোনকো তার সেই দর্প চূর্ণ করেছিল। যাহোক, বিড়াল কথাটি কিন্তু চট্টগ্রামের দিদার বলীর ক্ষেত্রেও খাটে। বলীখেলায় তিনি অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই অবসর নিয়েছিলেন। সেই দিদার বলীর সঙ্গে একবার সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল আমার। সেই সময় জেনেছি তাঁর দৈনন্দিন রুটিন ও খাবার দাবার সম্পর্কে।

বলীরা কী খান, এই নিয়ে আমার দীর্ঘদিনের কৌতূহল ছিল। তবে খুব বেশি কিছু যে তাঁরা খান না, এটা জেনে হতাশ হয়েছিলাম। বলীর লড়াইয়ে যখন সক্রিয় ছিলেন, তখন দিদার বলী দিনে তিনবার ভাত, পাঁচবার নাশতা করতেন। খাবারে থাকত পাঁচটি ডিম, কবুতর, দেশি মাছ—এসব। তবে বলীর লড়াইয়ের সাফল্যের চাবিকাঠি আসলে কঠোর সাধনা, ব্যায়াম আর অনুশীলনে।

গত দুই বছর করোনাভাইরাসের কারণে জব্বারের বলীখেলার আসর হতে পারেনি। অপেক্ষা তাই পৃথিবী স্বাভাবিক হওয়ার। করোনা জয়ের পর আবারও এই আসরে ঢাকের বাড়ি পড়বে। উন্মাদনা ছড়িয়ে বলীরা পরস্পরের দিকে ছুটে আসবেন—এই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হোক প্রতিবছর।

বিশেষ সংখ্যা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন