>

দীর্ঘ দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থেকে ১৯৯৬ সালে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। সরকার গঠনের পরপরই চাপ দিতে থাকে বিরোধী দলগুলো। এই অব্যাহত চাপের মধ্যে সরকার পরিচালনার সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৯৯ সালের ৬ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানকে এক সাক্ষাত্কার দেন। দুই কিস্তিতে সেটি ছাপা হয় ১২ ও ১৩ ডিসেম্বর সংখ্যায়। প্রথম পাতার পর সাক্ষাৎ​কারের বিস্তারিত অংশ ছিল সম্পাদকীয় পাতায়। সাক্ষাৎ​কারে শেখ হাসিনা তাঁর সরকার পরিচালনার কৌশল, গণতান্ত্রিক ধারা, বিরোধী দলের আন্দোলন ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলেন।

default-image

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সরকারের পদত্যাগের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া চার দল সম্পর্কে বলেছেন, তারা আগেও কখনো আলাদা ছিল না। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, আদর্শগত, নীতিগত ও কাজকর্মের দিক থেকে ওই চার দলের অবস্থান বরাবরই অভিন্ন।
প্রথম আলোর সঙ্গে এক দীর্ঘ একান্ত সাক্ষাত্কারে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি ঐক্যবদ্ধ হওয়া বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোটের দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, সরকারের পদত্যাগের দাবি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
দীর্ঘ দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থেকে নির্বাচনে জয়লাভের পর বিরোধী দলগুলোর অব্যাহত চাপের মধ্যে সরকার পরিচালনার সাড়ে তিন বছরের মাথায় আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৬ ডিসেম্বর গণভবনে প্রথম আলোর সম্পাদককে এই সাক্ষাত্কার দেন। তিনি তাঁর সরকারের বিভিন্ন নীতি ও পদক্ষেপ, বিভিন্ন অভিযোগ, তাদের আন্দোলন, বিরোধী দলের মোকাবিলায় সরকারের কৌশল, আলোচনা-সমঝোতার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা, সংসদ পরিচালনা, রেডিও-টিভির স্বায়ত্তশাসন, দুর্নীতি দমন ব্যুরো প্রভৃতি সম্পর্কে সরকারের প্রতিশ্রুতি, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ অবস্থা প্রভৃতি বিষয়ে প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেন অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে, কখনো ঝাঁজালো যুক্তিতর্কসহ।

বিরোধী দলের সঙ্গে তঁার আলোচনার আগ্রহ আছে দাবি করেও তিনি বলেন, তেমন কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নেই। কারণ পদত্যাগ তো তিনি যথাসময়ে করবেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা দেওয়ার পরই নির্বাচন হবে, যা বিএনপি বুঝত না বলে মন্তব্য করে তিনি বিরোধী দল সম্পর্কে বলেন, ‘গণতন্ত্রে বিশ্বাস করলে এই ধৈর্যটুকু তারা ধরবে না?’

সাক্ষাত্কারের পূর্ণ বিবরণ এ রকম:

মতিউর রহমান: আপনার সরকার সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায় থাকার পর এখন একটা বড় বিরোধিতার সম্মুখীন হতে যাচ্ছেন। দেশের প্রায় সকল বিরোধী দল এখন আপনার সরকারের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে চারটি দল বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত এবং ইসলামী ঐক্যজোট এক হয়েছে। তারা আপনার সরকারের পদত্যাগ চাইছে এবং নতুন নির্বাচন চাইছে। এ সম্পর্কে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

শেখ হাসিনা: যে চারটি দলের কথা আপনি বললেন তারা কিন্তু কখনো আলাদা ছিল না। ওরা তো মানসিকভাবে, আদর্শিকভাবে, কর্মকাণ্ডে সব সময় এক ও অভিন্ন ছিল। বরং তারা হয়তো ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে ছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের নীতি, তাদের আদর্শ, তাদের সবকিছুই এক। সেদিক থেকে তাদের দাবির সত্যিকার অর্থে কোনো যৌক্তিকতা নেই।

কী কারণে তারা পদত্যাগ চাইছে? আমরা তো দেশ পরিচালনা করছি, দেশ চালাচ্ছি। এ কথা তো কেউ বলতে পারবে না যে আমরা দেশ চালাচ্ছি না বা আমরা পরিশ্রম করছি না বা আমরা কাজ করছি না। আমরা তো দিনরাত ২৪ ঘণ্টা খেটে যাচ্ছি, ইতিমধ্যে মাত্র তিন বছর পাঁচ মাসে আমরা দেশের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে এমনকি দেশের একজনের জন্যও বা ক্ষেত্রেও আমরা যতটুকু করতে পেরেছি দেশের আগের সরকারে যারা ছিল তারা তা পারেনি। অন্তত আমি এটুকু বলব, আমাদের আগে বিএনপির পাঁচ বছরের সরকারের অভিজ্ঞতা মানুষের আছে। তখন তো দেশের মোটামুটি অচলাবস্থা বা স্থবিরতা এসে গিয়েছিল সেটা নিশ্চয়ই দেশবাসীর মনে আছে। অন্তত সে রকম পরিস্থিতি তো আমরা সৃষ্টি করিনি।

এটুকু বলতে পারি, আমরা কাজ করেছি, অন্তত ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত পেলে ঘুমিয়ে থাকি না বরং মানুষ বাঁচানোর জন্য পদক্ষেপ নিই।

মতিউর রহমান: এটা তো সত্যি যে এই একই বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে আপনারাও একসময় সমঝোতা করেছিলেন, একসঙ্গে আন্দোলন করেছিলেন। এটাকে তাহলে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

শেখ হাসিনা: আমাদের মধ্যে যে সমঝোতা ছিল তা সংসদভিত্তিক সমঝোতা। এটা সবার স্মরণ রাখা উচিত, সংসদে যে কয়টি দলের প্রতিনিধি ছিল তাদেরকে নিয়ে সংসদের ভেতর থেকেই আন্দোলনের সৃষ্টি হয়। সংসদের ভেতরের একটা ঘটনার কারণে আমরা এক হয়ে বের হয়ে আসি।

আপনাদের মনে আছে, হেবরনে যখন মসজিদে ঢুকে মুসলমানদের হত্যা করা হলো, তখন আমরা চেয়েছিলাম আমাদের জাতীয় সংসদ থেকে এর বিরুদ্ধে একটা নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করা হোক। আমরা যখন বিরোধী দল থেকে এ দাবি করলাম, তখন সরকারপক্ষ কিছুতেই তা গ্রহণ করতে রাজি হলো না। কেন রাজি হলো না তা আমি জানি না। হেবরনে মুসলমানদের হত্যা করা হলো আর তার ওপরে আমরা একটা নিন্দা প্রস্তাব নিতে পারব না যা আমাদের সকলের সেন্টিমেন্টে লাগে। তার ওপর আমরা যখন এ প্রস্তাব নিয়ে আসলাম, তখন তা নিয়ে আলোচনাও করতে দেবে না।

এই আলোচনা হবে কি হবে না এ নিয়ে যখন বাগ্‌বিতণ্ডা চলছিল, তখন বিএনপির মন্ত্রী নাজমুল হুদা বলে ফেললেন, ‘তারা এখন হঠাৎ​ করে মুসলমান হয়ে গেছে’। এটা আমাদের মনে প্রচণ্ড আঘাত দিল এবং তত্ক্ষণাৎ​ আমরা সংসদ থেকে বেরিয়ে আসলাম। এই যে বেরিয়ে আসলাম আর কিন্তু আমাদের ফেরত যাওয়া হয়নি। কাজেই আমাদের আন্দোলনের শুরু এবং আমাদের যতটুকু সমঝোতা ছিল তা কিন্তু সংসদভিত্তিক ছিল। সংসদে যে কয়টা দলের প্রতিনিধিরা ছিল, তাদের নিয়েই আমরা এই আন্দোলন করেছিলাম। একজন মুসলমান হিসেবে মুসলমানের অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে একটা বক্তব্য এবং সে থেকেই আমাদের এই সমঝোতাটা হয়ে গেল।

পরবর্তী সময়ে ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের পর লালবাগে যে হত্যাকাণ্ড ঘটে গেল যাকে গণহত্যার শামিল বলা যায়, সেখানে সাত-আটটি লাশ দেখার পরও আমরা অনেক ধৈর্য ধারণ করেছিলাম। কিন্তু অনেক কষ্টে গণতন্ত্র এনেছিলাম বলে তখনো আমরা কিন্তু যথেষ্ট ধৈর্য ধারণ করি। আমরা কিন্তু গোটা ঢাকাতেও হরতাল আহ্বান করিনি। শুধু লালবাগ এলাকায় আমরা হরতাল ডাকি, ঘটনা এখানেই শেষ হয়নি। সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল বের করতে লাগল এক মাস। এরপর এল মাগুরার উপনির্বাচন। মাগুরার উপনির্বাচনে ভোটারদের ওপর এবং মানুষের ওপর অত্যাচার করা হলো। নির্বাচনের দিন মাগুরায় আমাদের আওয়ামী লীগের আসাদুজ্জামান সাহেবের (উনি মারা গেলে ওই আসনে উপনির্বাচন হয়) বাসায় রক্তাক্ত অবস্থায় মেয়েরা এসে কান্নাকাটি করে তাদের ওপর অত্যাচারের কাহিনি আমাকে বলেছিল। আশপাশের এলাকার যত খুনি আসামি ছিল তাদের সবাইকে যশোর, নড়াইল, কুষ্টিয়া বিভিন্ন এলাকা থেকে এনে এবং জেল থেকে মুক্তি দিয়ে ভোট নেওয়া হলো। এ রকম একটা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড যখন হলো তখন এখানকার মানুষের সেন্টিমেন্টের কারণে আমি মাগুরায় দঁাড়িয়ে ঘোষণা দিই যে এ সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচন করব না।

আমাদের ওই সময়ের আন্দোলনের আরেকটি যৌক্তিকতা ছিল, ’৯০ সালে আমরা একই সঙ্গে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য আন্দোলন করলাম। নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের কারণে যে সরকার ক্ষমতায় গেল, তারা ক্ষমতায় গিয়ে সেই নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার চেনে না, জানে না, বোঝে না; পাগল আর শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নেই, নির্দলীয় নেই—এ রকম বক্তব্য দিতে লাগল। এ বক্তব্যগুলোর তো কোনো যুক্তি ছিল না। আমি তখন বলেছিলাম আপনি বোঝেন না, পাগল আর শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নেই, আপনি বুঝবেন, জানবেন। উনি বুঝলেন, জানলেন। তার ফলে তাকে পদত্যাগ করতে হলো এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ইলেকশন দিতে হলো। আমার কথাটা হচ্ছে, আমাদের আন্দোলনের পেছনে যৌক্তিকতা ছিল। আর কারণগুলো তারাই সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু আমরা তো ওই ধরনের কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি করি নাই। এখন আমাদের আন্দোলনকে অনুসরণ করে বা নকল করে চলতে যেয়ে দেশের গণমানুষকে কষ্ট দেওয়ার কোনো মানে নেই। তারা যে ভুলগুলো করেছে এ ভুলগুলো তো আমরা করিনি।

মতিউর রহমান: এরপরেও তো এরশাদের সঙ্গে আপনারা সমঝোতা অব্যাহত রাখলেন। ‘ঐকমত্যের সরকার’ গঠন করলেন?

শেখ হাসিনা: সংসদে যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল পরে সেটার ধারাবাহিকতাই অব্যাহত ছিল। তারপরও আমাদের নীতিগত, আদর্শগত যে ব্যবধান সেটা তো আমরা বজায় রেখেছি। যার যার অবস্থান থেকে সে সে করেছে।

মতিউর রহমান: তাহলে কি আপনি বলছেন আপনারা একটি রাজনৈতিক কৌশল নিয়েছিলেন?

শেখ হাসিনা: হ্যাঁ, আমরা কৌশলে সফল হয়েছিলাম।

মতিউর রহমান: আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর সমঝোতার কারণে তারা তো সামাজিকভাবে স্বীকৃতি পেয়ে গেল, এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন?

শেখ হাসিনা: যারা নির্বাচিত হয়ে সংসদে গেছে তারা তো জনগণের স্বীকৃতি পেয়েই সেখানে গেছে। সেটাকে আপনি কীভাবে অস্বীকার করবেন? যেমন আপনারা কমিউনিস্ট পার্টি তো সত্তরের দশকে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে দেশের স্বার্থরক্ষা করতে গিয়েছিলেন। তখনো কিন্তু ঠান্ডাযুদ্ধের যুগের শেষ হয়নি। ওই সময়ই আপনারা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে কোদাল নিয়ে খাল কাটার জন্য নেমে গেলেন। আপনারা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করলেন, গণভোট জিয়াউর রহমানের হ্যাঁ ভোটে অংশগ্রহণ করতে জনগণকে আহ্বান জানালেন। তখন দুইজন দুই মেরুর হলেও কীভাবে আপনারা এক হলেন?

মতিউর রহমান: আমি মনে করি, সেটা আমাদের ভুল ছিল। আমাদের মধ্যে তখনো খাল কাটা কিংবা হ্যাঁ ভোট দেওয়া নিয়ে বিতর্ক ছিল। আমি গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার বিরুদ্ধে ছিলাম। আমাদের তো নিয়ম ছিল পার্টির সিদ্ধান্ত মানতে হবে।

যাই হোক, এবার বিএনপির অভিযোগ সম্পর্কে কিছু বলি। বিএনপি বলছে, বেগম খালেদা জিয়াসহ নেতা-নেত্রীদের বিরুদ্ধে অনেক দুর্নীতির মামলা দিয়েছেন, ১০ হাজারের অধিক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ৭০–৮০ হাজার মামলা দেওয়া হয়েছে, এমনও আছে যে একজনের বিরুদ্ধে ১০৭টি ১১৭টি মামলাও হয়েছে। এই যদি অবস্থা হয় তাহলে তাদের আন্দোলন করা ছাড়া অন্য পথ কী আছে?

শেখ হাসিনা: আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে শুরুতে তঁারা যখন এ অভিযোগ করতেন তখন আমরা তাঁদের কাছে মামলার তালিকা চাইলাম। ওই তালিকা যাচাই-বাছাই করে দেখা গেল যে, অধিকাংশ মামলা বিএনপির আমলে দেওয়া। তারা ক্ষমতায় থাকতেই তাদের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে এ মামলাগুলো দেওয়া ছিল, আরেকটা ব্যাপার হলো বেগম খালেদা জিয়াসহ অন্যদের বিরুদ্ধে আমরা কিন্তু রাজনৈতিক মামলা দেইনি, মামলা যা আছে সব দুর্নীতি মামলা, দুর্নীতির মামলার জন্য দুর্নীতি দমন ব্যুরো আছে। কারণ দুর্নীতির মামলা কিন্তু ষড়যন্ত্র করে দেওয়া যায় না, সরকারি অর্থ অপব্যবহার করার জন্য অর্থাৎ​ নিয়ম-নীতিমালা বহির্ভূতভাবে খরচ করার জন্য যদি মামলা হয়ে থাকে তাহলে সেগুলো তো কোর্টে আছে। কোর্টই তো এ মামলার বিচার করবে। যেহেতু কোর্টে এ মামলাগুলো চলে গেছে সেখানে আমার তো কিছু বলার নেই, যে মামলাগুলো আছে আমি বলতে পারি একটা মামলাও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে দেওয়া হয়নি। যতগুলো মামলা আছে সব হয় সন্ত্রাস, নয়তো গাড়ি ভাঙা, নয়তো বোমা মারা, নয়তো মানুষ খুন করার জন্য হয়েছে।

সচেতন নাগরিক যারা আছে তারা বলুক যে, এগুলো খুব ভালো কাজ এবং তাদের মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে হবে। আপনারা সুশীল সমাজ বলুন, গাড়ি ভাঙা জায়েজ, গুলি করা জায়েজ, বোমা মারা জায়েজ, মানুষ হত্যা করা জায়েজ। সুতরাং এসব কাজের জন্য কোনো মামলা হতে পারবে না। আপনারা দেখেন, একটা মামলাও মিথ্যা মামলা নেই। এখানে দুর্নীতির মামলায় সবাই কোর্টে যেয়ে আগাম জামিন নিয়ে নেয় এবং সব মামলা কোর্টে স্থবির হয়ে পড়ে আছে। সন্ত্রাসের যে মামলাগুলো আছে সেগুলো কোর্টে পড়ে আছে আর সন্ত্রাসীরা জামিন নিয়ে বাইরে এসে আবার খুন করছে। ৭০ হাজার মামলার লিস্ট বিএনপি দিক। তাদের পত্রিকায় তালিকা প্রকাশ করুক ধারাবাহিকভাবে। এই ৭০ হাজার মামলা কী ধরনের, কেন হয়েছে? তারা প্রকাশ করুক না!

মতিউর রহমান: বিএনপির অভিযোগ হলো তাদের মিছিল করতে দেওয়া হয় না, মিছিলে হামলা হয়, গুলি, সন্ত্রাস হয়, সংসদে কথা বলতে দেওয়া হয় না, বিরোধী দলের নেত্রীর মাইক বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তাদের অশ্লীল গালাগাল করা হয়।

শেখ হাসিনা: তারা সংসদে কথা বলবে কি? তারা তো সংসদে স্পিকারকে পর্যন্ত আক্রমণ করল। আপনারা আজ পর্যন্ত এ ধরনের ঘটনা দেখেছেন কি বাংলাদেশের সংসদে যে, সোজা গিয়ে স্পিকারের ওপর হামলা করতে এবং সামনের অফিসারদের ওপর পর্যন্ত হামলা করতে, টেলিভিশনের ক্যামেরাম্যানের ক্যামেরাতে লাথি মারতে? তারা জানত না যে, উপরে আরেকটি টিভি ক্যামেরা তাদের এ সব কর্মকাণ্ড ধারণ করছে। আমরাও তো বিরোধী দলে ছিলাম। কিন্তু কখনো একটা ফোল্ডার ভাঙিনি, মাইক ভাঙিনি, চেয়ার ভাঙিনি, আমরা বিরোধী দলে থাকাকালীন এ রকম একটা ঘটনাও ঘটেনি।

কিন্তু তারা ফোল্ডারগুলো পিটিয়ে পিটিয়ে ভেঙেছে, চেয়ার, মাইক, টেলিভিশন ক্যামেরা ভেঙেছে। সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রীকে কথা বলতে দেওয়া হয় না বলে যে অভিযোগ করা হয় সে পরিপ্রেক্ষিতে আমি বলব, আপনারা সংসদের রেকর্ড দেখুন, উনি যতবার দাঁড়িয়েছেন কোনো দিন বিরোধীদলীয় নেত্রীকে কথা বলতে দেওয়া হয়নি এমন নজির নেই। এমনকি যেদিন পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিচুক্তির ওপর ২ ঘণ্টা সাধারণ আলোচনার জন্য নির্দিষ্ট করা হলো সেদিন তিনি সংসদের কার্যক্রম পদ্ধতির নিয়ম লঙ্ঘন করে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং মনে হয় ৪৫ থেকে ৫০ মিনিট পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিচুক্তির ওপর আলোচনা বা বক্তৃতা দিয়ে গেলেন। এর ফলে ওই দিনের বাকি সব কার্যক্রম স্থগিত হয়ে গেল। তখন স্পিকার তো ইচ্ছা করলে ওনাকে বাধা দিতে পারতেন। কারণ সংসদের তো দিনের একটা কার্যসূচি থাকে যেমন, প্রথমে কোরআন ​িতলাওয়াত হয়, তারপর প্রশ্নোত্তর পর্ব থাকে এবং এরপর ১ ঘণ্টা জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর আলোচনা হয়, তারপর আসে আইন প্রণয়ন বা সাধারণ আলোচনা। সেদিন প্রোগ্রাম ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর সাধারণ আলোচনা হবে, কিন্তু তিনি এ নিয়মের ধার ধারলেন না। উনি ওনার মতো বক্তৃতা দিয়ে চলে গেলেন। এরপরও উনি কীভাবে বলবেন যে, ওনাকে বলতে দেওয়া হয় না বরং আমি যখন বিরোধীদলীয় নেত্রী ছিলাম তখনকার রেকর্ড বের করুন এবং দেখবেন যে, আমাকে কীভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। এমনও নজির আছে, প্রায় আধঘণ্টা একনাগাড়ে দাঁড়িয়ে থেকেও মাইক পাইনি। আমি উঠলেই আমার মাইক চালু হতো না।

মতিউর রহমান: এ রকম কোনো নিয়ম আছে কি বিরোধীদলীয় নেত্রী উঠলেই মাইক চালু হবে?

শেখ হাসিনা: নিয়ম ছিল, নিয়ম আছে, কিন্তু আমার সময় আমাকে দিত না।

মতিউর রহমান: এখন কি এ নিয়ম চালু আছে?

শেখ হাসিনা: এখন উঠলেই পায়। উনি উঠে দাঁড়ালেই কথা বলতে পারেন। আমি তো একটা নমুনা দিয়েই তা বুঝিয়ে দিলাম যে, সংসদের দিনের কার্যসূচির নিয়ম না মেনে তিনি তঁার ইচ্ছামতো দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিয়ে চলে গেলেন। এত আলোচনার সুযোগ যেখানে তিনি পেয়েছেন তারপরও সংসদ নিয়ে এ অভিযোগ করা অযৌক্তিক।

আমরা রেডিওতে সারা বাংলাদেশে সংসদের কার্যবিবরণী সরাসরি প্রচার করি, কই আমাদের সময়তো এটা করা হয়নি। সংসদে যা যা হচ্ছে সব সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশের মানুষ রেডিওর মাধ্যমে শুনতে পাচ্ছে, এই সুযোগ কি আমরা বিরোধী দলে থাকতে কোনো দিন পেয়েছি? টেলিভিশনের ক্যামেরার সুযোগ আমি বিরোধী দলে থাকতে কোনো দিন পাইনি। কিন্তু আমি আসার পর তার জন্য ক্যামেরাম্যান পাঠানো হয়েছে, তার ছাত্রদলের ছেলেরা তাদের মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে। কয়েকবার এ ঘটনা ঘটেছে। তারপরও এখন অন্য কোনো অর্গানাইজেশনের প্রোগ্রামে যেখানে তিনি যান তার নিউজ করা হয়। কই, আমি বিরোধীদলীয় নেত্রী থাকতে তো জীবনে কোনো দিন দেখানো হয়নি। তাই আমি বলছি, সংসদে তাকে কথা বলতে দেওয়া হয় না, এ অভিযোগ তিনি করেন কীভাবে? আমি বলব, এ অভিযোগ একটা ডাহা মিথ্যা কথা, একেবারেই মিথ্যা কথা। যেমন তিনি নির্বাচনের সময় বলতেন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় গেলে মসজিদে আজানের ধ্বনি শোনা যাবে না। আজ তিন বছর পাঁচ মাস চলে গেল, এখনো কিন্তু মসজিদে আজানের ধ্বনি আছে। এটা যেমন টাটকা মিথ্যা কথা ছিল, ঠিক তেমনি সংসদে কথা বলতে দেওয়া হয় না, এ অভিযোগটাও টাটকা মিথ্যা কথা।

মতিউর রহমান: তারপরও সুশীল সমাজ মনে করে যে সংসদের ভেতরে ও বাইরে, আপনার তরফ থেকে বা আপনার দলের তরফ থেকে যদি আরও সংযম, সহনশীলনতা প্রকাশ করা যেত বা সরকারি দল হিসেবে মনমানসিকতার দিক থেকে আরও সহনশীল হতেন তা হলে ভালো হতো।

শেখ হাসিনা: আপনি আমাদের বক্তব্যগুলো একটু শুনে দেখবেন এবং তাতেই বুঝবেন সহনশীলতা আমরা দেখিয়েছি কি না।

বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন তাদের কি ধরনের আচার-আচরণ ছিল? তারা যখন ক্ষমতায় ছিল সংসদে তাদের একজন চেয়ার ছেড়ে ছুটে আমাদের বিরোধী দলের একজনকে মারতে পর্যন্ত এসেছিল। আমাদের তরফ থেকে তো এ রকম কিছু করা হয়নি। তারা বক্তব্য দেয়, বক্তব্যগুলো রেডিওর মাধ্যমে সারা দেশে চলে যায়। যেমন বিএনপির একজন এমপি দাঁড়িয়ে বলল, পেঁয়াজের দাম বাজারে ১০০ টাকা, যা একেবারে ডাহা মিথ্যা কথা, এখন ওই অবস্থায় যদি এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয় যে, না এটা সত্যি নয়, বাজারে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ঠিক, তবে তা ১০০ টাকা নয়, ৪০ বা ৪৫ টাকায় পাওয়া যায়। এই প্রশ্নের উত্তর না দিলে তো বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা যাবে না। কারণ দূর-দূরান্তে যখন রেডিওর মাধ্যমে এ কথা শুনবে যে পেঁয়াজের দাম ১০০ টাকা, তখন সেখানকার ব্যবসায়ীরাও বলবে যে, আমরা কেন কম দামে বিক্রি করব? আমরাও ১০০ টাকায় বিক্রি করব। একতরফা কেউ যদি মিথ্যা বলে আর অন্য পক্ষ যদি সেটার জবাব না দেয় তাহলে জনগণ সেই ভুল ধারণা নিয়েই থাকবে। এ জন্য উভয় পক্ষকেই এগিয়ে আসতে হবে। সংসদে মিথ্যা কথা বলা নিষিদ্ধ। বিএনপির সাংসদরা তাই যে মিথ্যা কথা বলত, এটা কীভাবে গ্রহণ করে সুশীল সমাজ?

মতিউর রহমান: এখন তো বিরোধী দল সংসদে নেই, হরতাল-সহিংসতা চলছে, উপনির্বাচনগুলোতে তারা যাচ্ছে না, এটা তো ভালো লক্ষণ নয়। এক্ষেত্রে সরকারের তো একটা দায়িত্ব আছে। আমি বলব, এ দায়িত্ব অবশ্যই আপনার। বিএনপি সংসদের একটা বৃহত্তম বিরোধী দল, আলোচনা বা সমঝোতার উদ্যোগ তো আপনাদের নেওয়া উচিত।

শেখ হাসিনা: দেখুন, আমরা তো উদ্যোগ নেওয়ার ব্যাপারে কোনো কার্পণ্য করিনি।

মতিউর রহমান: আপনি তো আলোচনার প্রস্তাব দিচ্ছেন জনসভায়, সভা-সেমিনারে।

শেখ হাসিনা: না, না, আপনি তাহলে জানেন না। আমাদের সঙ্গে অনেক এমপির কথাও হচ্ছে। আমাদের মন্ত্রীরা এমপিদের সঙ্গে কথা বলছেন, বিএনপির নেতাদের সঙ্গেও কথা বলছেন। আমি নাম বলতে চাই না। বললে, কালকে আবার উল্টো বিবৃতি আসবে, এ রকম কয়েকজন নেতার সঙ্গে আমরা কথা বলছি। অনেকেই আগ্রহী এবং বিএনপির অনেকেই চায় একটা আলোচনা-সমঝোতা হোক, সংসদ চলুক বা সংসদে তারা ভূমিকা রাখুক। সমস্যা হচ্ছে কিছু নেতা নিয়ে, বিশেষ করে যারা এমপি না। আর বিএনপিতে যারা এখন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তারা বেশিরভাগ কিন্তু এমপি না। তারাই এখন বিএনপিকে চালাচ্ছে এবং সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

মতিউর রহমান: আপনি যে প্রস্তাবটা দিয়েছিলেন যে সেনাকুঞ্জে এলে বলবেন, সে প্রস্তাবটা আপনি বিরোধীদলীয় নেত্রীকে সরাসরি দেওয়ার উদ্যোগ তো নিতে পারেন।

শেখ হাসিনা: তিনি তো সেনাকুঞ্জের দাওয়াত সব সময় গ্রহণ করেন এবং আসেন। গতবারও এসেছেন এবং তার আগেরবারও এসেছেন। আমরা এক জায়গায় পাশাপাশি বসে চা খাই। যেহেতু তাকে কোনোমতে পাওয়াই যাচ্ছে না, তখন সিদ্ধান্ত নিলাম সেনাকুঞ্জে দেখা হলে বলব। তিনি কি বলেন? আপনি বললে, এখনই আমি ফোন করি। আমার কোনো আপত্তি নেই। আপনি সাক্ষী থাকেন, আমি ফোন করি, দেখেন তিনি ফোন ধরেন কিনা। আমি এখনই ফোন করতে পারি।

আপনারা দেখেন আমি যখন বিরোধী দলে, তখনো আমিই উদ্যোগ নিয়েছি। আবার যখন আমি সরকারি দলে, তখন আমিই উদ্যোগ নিচ্ছি। সব উদ্যোগ আমাকেই নিতে হবে কেন? আমি তো এটা বুঝি না? আপনারা উদ্যোগ নেওয়ার দায়িত্ব শুধু আমার ওপর চাপিয়ে দেবেন আর আরেকজনকে কিছু বলবেন না-এটা তো হয় না। তিনি একটা বৃহৎ​ দলের নেত্রী। দেশ ও জাতির প্রতি তারও তো কিছু দায়িত্ব, কর্তব্য আছে। এখানে শুধু একজনকে উদ্যোগ নিলে তো হবে না। তাই আমি ভাবলাম যে, সেনাকুঞ্জে এলে একটা ভালো সুযোগ পাওয়া যাবে, কাজেই তাকে প্রস্তাব দেব। কিন্তু তিনি আসলেন না। তারপর বললেন, দাওয়াতের অসুবিধার জন্য আসেননি। সাধারণত এক্ষেত্রে এএফডি (আর্মস ফোর্সেস ডিভিশন) থেকে পিএসও দাওয়াত দেওয়ার ব্যবস্থাপনায় থাকে। সংবাদপত্রে এ সংবাদ পড়ে সঙ্গে সঙ্গে পিএসওকে ফোন করেছি। তারা আমাকে পুরো রিপোর্ট পাঠালেন। সেখানে একজন স্কোয়াড্রন লিডারকে পাঠানো হয়েছিল। তিনি নিজের হাতে কার্ডটা গ্রহণও করেননি। গত বছর এবং তার আগের বছরও একই ঘটনা ঘটেছে অর্থাৎ​ কার্ড সেখানেই দিয়ে আসা হয়েছে। আগেরবারগুলোতে তিনি এসেছিলেন কিন্তু এবার আসেননি।

এ সংবাদ পাওয়ার পর আমি সঙ্গে সঙ্গে পিএসওকে বললাম, আপনি আবার দাওয়াত পাঠান। সব দলের একজন করে বিশেষ করে সভাপতিকে দাওয়াত দেওয়া হয়। তারপরও আমি বলেছি, মান্নান ভুঁইয়াসহ আরও কয়েকজনকে দাওয়াত দেওয়ার জন্য। আমরাও বিরোধী দলে থাকতে আমি একাই দাওয়াত পেয়েছি। ১৯৯৫-এ অনেক বলে-কয়ে সাধারণ সম্পাদকের দাওয়াত নিয়েছিলাম।

আসল কথা হলো, আমি তাকে দাওয়াত দেব বা ওনার সঙ্গে আলোচনা করতে চাইব, তাই তিনি আসলেন না। এর পরে আমাকে আর কী করতে বলেন? আমিও তো একটা দল করি। আমার দলের কর্মীরা আছে। বাদ দেন আমি প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু আমার একটা দল তো আছে। আমাদেরও তো নেতা-কর্মী আছে। তাদেরও তো মানসম্মানবোধ আছে। সেটাও তো আমাকে ভাবতে হবে।

মতিউর রহমান: তারপরও একজন সংসদের নেত্রীকে বা প্রধানমন্ত্রীকে তো দলের ঊর্ধ্বে উঠতে হয়, উঠতে হবে।

শেখ হাসিনা: ঊর্ধ্বে বলতে শুধু এটা না যে, শুধু নিচেই নামতে হবে। আপনি আমাকে ঊর্ধ্বে উঠতে বলছেন নাকি নিচে নামতে বলছেন সেটাও তো স্পষ্ট নয়। আপনি জানেন, আমি একটা রাজনৈতিক পরিবার থেকে এসেছি বা রাজনীতি করেই এখানে এসেছি। তাই মানুষের সঙ্গে মেলামেশায়, কথা বলায় এমনকি শত্রু-মিত্র সবার সঙ্গে আমি কথা বলতে পারি। আল্লাহর রহমতে অন্তত সেটুকু যোগ্যতা আল্লাহ্ আমাকে দিয়েছেন, সেখানে কারও সঙ্গে কথা বলতে অন্তত আমার আপত্তি নাই।

মতিউর রহমান: তাহলে বলুন, দেশ ও জাতির স্বার্থে সত্যিকার অর্থে বিএনপির সঙ্গে আপনাদের কি আদৌ কোনো আলোচনা সম্ভব নয়?

শেখ হাসিনা: দেখুন, বিএনপির জন্ম বা বিএনপির রাজনীতি কি দেশ ও জনগণের স্বার্থে? একটা দলের কীভাবে জন্ম হলো সেটাও আপনাদের ভাবতে হবে। বিএনপি বলেন আর জাতীয় পার্টি বলেন, তাদের একটার নাম দাঁড়ায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টি, আরেকটা হলো বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি। এদের নামে, এদের আদর্শ, এদের ইতিহাস এবং সৃষ্টি, জন্ম কোনো কিছুতেই তফাৎ​নেই। কাজেই তাদের জন্মটাই হচ্ছে এমন, যে-ই এই পার্টির জন্ম দিয়েছে, সে-ই আগে ক্ষমতা দখল করেছে। ক্ষমতা দখল করার পর ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য দল গঠন করেছে এবং ক্ষমতার অবৈধতাকে বৈধকরণ করেছে, এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তো তারা এসেছে। কাজেই তারা একটা ব্যাপারই বোঝে, ক্ষমতায় থাকা। ক্ষমতা ছাড়া আর কিছু বোঝে না। গণতন্ত্র মানে তো ক্ষমতায় থাকা আবার বিরোধী দলেও থাকা।

’৯১-এর নির্বাচনের পর আমার কাছে জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের প্রস্তাব ছিল সরকার গঠন করার। তখন আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াত এক হলে সরকার গঠন করতে পারত। ’৯১ সালে এই প্রস্তাব আমার কাছে এসেছিল। কিন্ত আমি এই প্রস্তাব গ্রহণ করিনি। আমি বিরোধী দল হিসেবেই থেকেছিলাম। তারপর জামায়াতে ইসলামী বিএনপিকে চিঠি দিয়ে সমর্থন দেয়। বিএনপি কিন্তু তখন জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়েই সরকার গঠন করে। বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে পারেনি। এগুলো নিশ্চয়ই আপনারা ভুলবেন না।

’৯৬-তে আমাদের মাত্র একটা আসন বেশি ছিল। তখন বিএনপির কার্যক্রম এমন ছিল যে, কখন কি করে বসে তার ঠিক ছিল না। আমার আশঙ্কা হচ্ছিল, হয়তো আমাদের দু-চারজনকে মেরে ফেলে না অপহরণ করে নিয়ে যায়, না অন্য কী করে, এ রকম একটা কিছু আশঙ্কা করছিলাম। আমি যে কারণে একটু নিরাপদে থাকার জন্য জাতীয় পার্টি বা আ স ম রবকে নিয়ে আমরা কয়েকটা সংখ্যা বাড়িয়ে রাখলাম। যেহেতু আমাদের অবস্থা একদম টাই টাই ছিল।

মতিউর রহমান: তাহলে কি বিএনপির সঙ্গে আলোচনার কিছু নেই, দুই শক্তির মধ্যে কোনো রকম মতবিনিময় বা সমঝোতা সম্ভব নয়?

শেখ হাসিনা: তারা তো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসেনি। জনগণের দাবি-দাওয়া নিয়ে, সংগঠিত হয়ে, দল করে, আন্দোলন-সংগ্রাম করে, নির্বাচন করে ক্ষমতায় আসা-এটাই হলো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। যেমন আওয়ামী লীগ এভাবে এসেছে। কিন্তু তারা এসেছে কীভাবে? আগে ক্ষমতা দখল তারপর ক্ষমতায় বসে রাষ্ট্রীয় অর্থ, রাষ্ট্রীয় সম্পদ, ভয়ভীতি দেখিয়ে কিছু লোককে এক জায়গায় করে একটা দল করা।

আর, আমি তো বললাম, বিএনপির এমপিরা কিন্তু এখন সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। নিচ্ছেন যারা এমপি না তারা। কাজেই তাদের সিদ্ধান্ত সব সময় সংসদ না, নির্বাচন না ইত্যাদি। তারা মনে করে, অন্য লাইনে যেতে হবে। এটা তো আপনার বোঝা উচিত, ’৭৫-এ বাংলাদেশে কী ঘটনা ঘটে গেছে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর এই দেশে মার্শাল ল দেওয়া হয়; ব্যালট নয়, বুলেটের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন-এসবই তো শুরু হয়েছে। এসবের বিরুদ্ধেই তো আমরা আন্দোলন করেছি। আমি সব সময় বলি, ব্যালটই হচ্ছে গণতন্ত্রের পথ, ব্যালট মানে গণতন্ত্র, ব্যালট মানে ভোটের অধিকার, জনগণের অধিকার, আমিই তো স্লোগান দিয়েছি, ভোটের সম্পর্কে সচেতন করার, ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এগুলো করে করে আমরা গণতন্ত্রকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছি। এই কথাগুলো বললাম, দুটো রাজনৈতিক দলের পার্থক্যটা বোঝানোর জন্য।

এখন যে মতটা এটা ধরে নিতে পারেন ’৭০-এর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে মুসলিম লীগকে জনগণ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল তারাই আবার আস্তে আস্তে ওই নীতি-আদর্শকে এ জায়গায় দাঁড় করিয়েছে। এখন আপনাদেরও চিন্তা করতে হবে এবং দেশের মানুষকেও ভাবতে হবে যে, এরা কারা? এদের চেহারাটা কী? যাদের উত্থান হলো ’৭৫-এর পর। ’৭৫-এর পরেই তারা হৃষ্ট-পুষ্ট হলো, এরা হচ্ছে সম্পূর্ণ স্বাধীনতাবিরোধী একটা ধারা, এদের সঙ্গে এসে মিলেছে কিছু সুবিধাভোগী। সেখানে এখন সর্বপন্থার কিছু লোক জড়ো হয়েছে, কিছু মুক্তিযোদ্ধা আছে, কিছু গণতন্ত্রীও আছে।

মতিউর রহমান: তাহলে তো আলোচনা করে দেশের রাজনৈতিক সমস্যা-সংকট সমাধান করার সম্ভাবনা মনে হচ্ছে খুব ক্ষীণ। সে রকম সম্ভাবনা তো দেখি না।

শেখ হাসিনা: আসলে আপনারা দেখুন, তেমন কোনো রাজনৈতিক ইস্যু তো দেখা যায় না। তারপর আবার বলছে, পদত্যাগ করতে হবে। আমি তো বলিনি যে, আমি পদত্যাগ করব না বা নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বুঝি না, পাগল আর শিশু ছাড়া বোঝে না, আমি তো তা বলিনি। আমি পদত্যাগ করব এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা দেব এবং নির্বাচন হবে। এই ধৈর্যটুকু তো তাদের ধারণ করতে হবে বা থাকতে হবে। গণতন্ত্রে বিশ্বাস করলে এই ধৈর্যটুকু তারা ধরবে না?

আরও পড়ুন :

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0