default-image

আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা, কলুষ আর লজ্জা

সমস্ত দিয়েছে ঢেকে এক খণ্ড বস্ত্র মানবিক;

আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।

—‘আসাদের শার্ট’, নিজ বাসভূমে, শামসুর রাহমান

default-image

১৯৬৯ সাল। মানে ১৯৬০-এর দশকের শেষ। উত্তাল দেশ। তার চেয়ে উত্তাল ঢাকা শহর। কিন্তু ওই যে কবি বললেন, আমাদের দুর্বলতা? তার মানে কী? তা এই যে আমরা পরাধীন। কেন ভীরুতা? তা এ কারণে যে ওরা সশস্ত্র, ওরা সবল। ওরা শাসক। কিন্তু একটা শার্ট যে সমস্ত দুর্বলতা, ভীরুতা, পরাধীনতার লজ্জা ঢেকে দিতে পারে, তা কি সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব। বাংলাদেশে সম্ভব। ইতিহাস তার সাক্ষী।
ইতিহাসে মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য প্রাণ দেন কত-না মানুষ। তবু তাঁদের মধ্যেও কেউ কেউ হয়ে ওঠেন বীর। হয়ে ওঠেন সাহস আর প্রতিবাদের প্রতীক। কেন? কারণ, সব দুর্বলতা আর ভীরুতাকে জয় করে তাঁরা এগিয়ে যায় অকুতোভয়। তাঁদের আত্মত্যাগ জাগিয়ে তোলে আরও হাজার হাজার লাখ লাখ সাহসীকে। তাঁদের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে হাজার হৃদয়ের রৌদ্র ঝলসিত প্রতিধ্বনি। আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান (নরসিংদীর শিবপুরে জন্ম: ১০ জুন ১৯৪২), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র—শহীদ আসাদ—তেমনই একজন।
১৯৬৯ সালে আসাদের বয়স ২৭। একনিষ্ঠ এক ছাত্রসংগঠক। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) ঢাকা হল শাখার সভাপতি ছিলেন আসাদ। কিন্তু তার জনগণের নায়ক হয়ে ওঠার ইতিহাস বুঝতে হলে আরেকটু পেছনে যেতে হবে। আসাদ কেবল ছাত্রনেতা বা ছাত্রসংগঠকই ছিলেন, তা নয়। একজন সফল কৃষক সংগঠকও ছিলেন। নরসিংদীর শিবপুর-হাতিরদিয়া-মনোহরদী এলাকায় শক্তিশালী কৃষক সংগঠন গড়ে উঠেছিল তাঁরই নেতৃত্বে। আজ থেকে অর্ধশতক আগেই তিনি ভাবতেন এই দেশে প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। কেননা, নিপীড়িত জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের উপায় লুকিয়ে আছে সর্বজনশিক্ষায়। আজ থেকে প্রায় ৪৫ বছর আগেই ব্যক্তিগত ডায়েরিতে তিনি স্টাডি সার্কেল তৈরি করার কথা লিখেছিলেন। বন্ধুদের নিয়ে শিবপুরে ছাত্র অবস্থায়ই গড়ে তুলেছিলেন একটা নৈশ বিদ্যালয়।
১৯৬৮ সালে লেখা আসাদের ডায়েরি ইঙ্গিত দেয়, বেঁচে থাকলে হয়তো তিনি হয়ে উঠতেন একজন স্বপ্ন দেখা বিপ্লবী। তাঁর স্বপ্নগুলো তখনই দেশ, রাষ্ট্র, স্বাধীনতা ছাড়িয়ে মানুষের মুক্তির স্বপ্ন হয়ে উঠছিল। এই সবকিছু প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে তরুণ আসাদকে গড়ে তুলছিল নীরবে, নিভৃতে। আসাদ ক্রমেই হয়ে উঠছিলেন একজন অকুতোভয় বীর, একদিন যার রক্তে রাঙা হবে রাজপথ আর সেই রাজপথ কাঁপিয়ে দেবে হাজার হাজার লাখ লাখ তরুণ। একদিন যাঁর রক্তমাখা শার্ট বাংলার মানুষের পতাকায় রূপান্তরিত হবে। আসাদ আসলে এগিয়ে যাচ্ছিলেন সেই ভবিতব্যের দিকেই।
তারপর এল ১৯৬৯ সাল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আর দুই বছর পরই যে দেশে মুক্তির আশায় শুরু হতে চলেছে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, যে স্বপ্নের বীজ তত দিনে রোপিত হয়ে গেছে লাখো হৃদয়ে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে দেশ তার প্রথম রক্তপাত দেখবে এ বছর। ১৯৬৯ সালটা শুরু থেকেই উত্তাল। ৪ জানুয়ারি ১১ দফা দাবি ঘোষণা করেছিল সম্মিলিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। এরই ধারাবাহিকতায় ১৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে ১১ দফা বাস্তবায়ন ও ইপিআরের ছাত্র নির্যাতনের প্রতিবাদে ২০ জানুয়ারি ধর্মঘট ডাকা হয়। ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ধর্মঘট ও আন্দোলন নিষ্ফল করার উদ্দেশ্যে গভর্নর মোনায়েম খানের প্রাদেশিক সরকার ২০ জানুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করে দেয়। কিন্তু ছাত্র-জনতা কি সেই শৃঙ্খল মানে? ২০ জানুয়ারি সকাল থেকেই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্ররা একে একে জমায়েত হতে থাকে বটতলায়। আসতে শুরু করে স্কুল-কলেজের ছাত্ররাও। এক দুই তিন—এই করে করে ১০ হাজার ছাত্রের জমায়েত!

default-image


দুপুর ১২টার দিকে জরুরি আইন ভেঙে ফেলেন ছাত্ররা। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ১০ হাজার জনের মিছিল বেরিয়ে পড়ে রাজপথ প্রকম্পিত করে। ১০ হাজার মানুষের গগনবিদারী স্লোগানে ঢাকার রাজপথ কেঁপে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়সহ পুরো এলাকায় পুলিশ, ইপিআর, সেনাবাহিনীর ঘেরাও। শুরু হয়ে যায় সংঘর্ষ। টিয়ার গ্যাস। লাঠিচার্জ। এর মধ্যেই ছাত্ররা কখনো পিছু হটছিলেন, আবার এগিয়ে যাচ্ছিলেন। ঘণ্টা খানেক পর চানখাঁরপুল এলাকায় একটি ছত্রভঙ্গ মিছিল যেন প্রাণ ফিরে পেল। এই মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন আসাদ। বজ্রদীপ্ত স্লোগান দিয়ে এর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তিনি। চেষ্টা করছিলেন মিছিলটাকে ঢাকা হলের পাশ দিয়ে শহরের কেন্দ্রস্থলে ও রাজপথে নিয়ে যাওয়ার।বেলা দুইটার দিকে পুলিশের একটি জিপ এই মিছিলের সামনে এসে পড়ে। একজন অফিসার—অনেকের মতে, ডিএসপি বাহাউদ্দিন—খুব কাছ থেকে (পত্রিকায় লেখা হয়েছে, ১০ ফুট) গুলি ছোড়েন আসাদের দিকে। বুকে গুলি নিয়ে লুটিয়ে পড়েন আসাদ। ছাত্ররাও কম যায় না। তাদের ছোড়া ইটে মাথা ফেটে যায় অফিসারের। সংঘর্ষ বেড়ে গেলে পুলিশের জিপ দ্রুত পালিয়ে যায়।
আসাদ। স্বাধীনতার একেবারের শুরুর দিকের শহীদ। খবরটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। রক্তমাখা আসাদকে নিয়ে মেডিকেলের দিকে ছুটেছিলেন ছাত্ররা। কিন্তু জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর আগেই মারা গেছেন তিনি।
এরপরই আসাদ হয়ে ওঠে সাহস আর প্রতিবাদের প্রতীক। আসাদ হয়ে ওঠেন বীর শহীদ। আসাদের লাশ নিয়ে ততক্ষণে নোংরামিতে মেতে উঠেছে প্রশাসন। লাশ নিয়ে মিছিল বের করার পরিকল্পনা যখন চলছিল, তখনই মেডিকেলে ঢুকে পড়ে আর্মড পুলিশ ও ইপিআর। নেতৃত্বে ঢাকার ডিসি আর পুলিশের আইজি। লাশ ট্রাক থেকে নামিয়ে মেডিকেলের একটি ওয়ার্ডে লুকিয়ে রেখেছিলেন ছাত্ররা। ওদিকে পুলিশও গোটা এলাকা ঘিরে ফেলেছে লাশের খোঁজে। এসব লুকোচুরির মাঝখানে এ সময় মধ্যস্থতা করতে আসেন ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স কমিটির নেতারা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই মুচলেকার বিনিময়ে লাশ হস্তান্তর করতে রাজি হয়, যে লাশ আসাদের পরিবারের কাছে সমর্পণ করা হবে। আসাদের লাশ তাঁর ভাই নিয়ে গেলেন। কিন্তু তার আগেই ছাত্রদের হাতে চলে এসেছে আসাদের শার্ট।

আসাদের শার্ট। রক্তমাখা লাল। আসাদের শার্ট। মুক্তির কেতন। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী সেই সাহস আর প্রতিবাদের ভাষায় উজ্জীবিত হয়ে বের করে এক শোক মিছিল। উল্লেখ্য যে, মেয়েরাই প্রথম শুরু করেছিল এই মিছিল। পুরোভাগে মেয়েরা থাকলেও ক্রমে সবাই যোগ দেয় তাতে। ছাত্র, সাধারণ মানুষ, ছোট-বড় অফিস আদালতের কর্মচারী, সবাই। দুই মাইল দীর্ঘ এই মিছিল শহরের বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করেছিল সেদিন এই শার্ট নিয়ে। শেষ হয়েছিল এসে শহীদ মিনারে। ‘আসাদের মন্ত্র/জনগণতন্ত্র’—নতুন এই স্লোগান তৈরি হয়েছিল ঢাকায়। বাঙালি অবাক হয়ে দেখেছিল ভীরুতার দিন শেষ। এবার গর্জে ওঠার দিন। ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য। এবার যুদ্ধে যাবার শ্রেষ্ঠ সময়। আসাদের রক্তমাখা শার্ট গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের জ্বলন্ত মেঘের মতো ঢাকা শহরের হাওয়ায় ওড়ে। আসাদের শার্ট হয়ে ওঠে প্রাণের পতাকা। কবি শামসুর রাহমান লিখে ফেলেন তাঁর অমর কবিতা ‘আসাদের শার্ট’। এভাবেই আসাদ নামের তরুণটি বাঙালির হৃদয়ে চিরকালের জন্য ঠাঁই পেয়ে যান।

পরদিন আসাদকে গ্রামের বাড়ি ধানুয়ায় পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। ওইদিন মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয় ঢাকার পল্টনে। ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকা ২২ জানুয়ারি ১৯৬৯ সংখ্যায় লিখল: ঢাকা স্টেডিয়ামে শহীদ ছাত্রটির জন্য প্রার্থনায় লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে, যেখানে বিরোধী দলের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।

আসাদের মৃত্যু নানা দিক দিয়ে তাৎপর্যময়। কেননা, এই মৃত্যু একটি গণ-আন্দোলনকে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ দিয়েছিল। এই মৃত্যুর ঠিক চার দিন পর ঢাকা শহরের পরিস্থিতি মোনায়েম খানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং আইয়ুব শাহির পতন ঘটে। সাধারণ জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঢাকার রাস্তায় আইয়ুব নামফলক ভেঙে ফেলে সেখানে আসাদের নাম উৎকীর্ণ করে। আইয়ুব অ্যাভিনিউ হয়ে যায় আসাদ অ্যাভিনিউ। আইয়ুব গেটের নাম হয় আসাদ গেট। আসাদের এই মৃত্যু যে কেবল বাঙালির চৈতন্যে আঘাত করে জাগিয়ে তোলে তা নয়, এমনকি কাঁপিয়ে দেয় শাসকের হৃদয়ও। উনসত্তরের গণ-আন্দোলন চলাকালে সরকারি বাহিনীর হাতে নিহতের সংখ্যা কম নয়। প্রায় শতকের কাছাকাছি। পরের মাসেই সার্জেন্ট জহুরুল হক এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর শামসুজ্জোহার মৃত্যু গণ-অভ্যুত্থান ও সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। কিন্তু ইতিহাসবিদেরা বলেন, এই উত্তাল সময়ে আসাদ হত্যাকাণ্ড এককভাবেই সবচেয়ে বেশি সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। নরসিংদীর স্কুলশিক্ষক বাবার সন্তান আসাদ ২৮ বছর বয়সে নিজের রক্ত দিয়ে বাংলাদেশকে কয়েক ধাপ এগিয়ে দিয়েছিল মুক্তির সংগ্রামের পথে। আসাদের মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই কবি হেলাল হাফিজ লিখে ফেলেন ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’:

এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়

এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।

আসাদের মৃত্যু জানিয়ে দেয় যে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছে, চলে এসেছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বাংলাদেশের জন্ম হতে আর দেরি নেই।

তথ্যসূত্র: বাংলাপিডিয়া; আসাদ ও উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মেসবাহ কামাল; জন্মযুদ্ধ ৭১, ‘শহীদ আসাদ: মিছিল তরে লাশ মেলেনি, শার্ট মিলেছে’

তানজিনা হোসেন: লেখক ও চিকিৎসক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0