প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ২০০০ সালে জাতীয় নির্বাচন করার জন্য তঁার প্রস্তাব বিরোধী দল গ্রহণ না করায় এখন তাঁদের বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে। ওই প্রস্তাব গ্রহণ না করে বিরোধী দল হরতাল-আন্দোলন চালিয়ে সময় নষ্ট করেছে এবং বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে তিনি কঠোর সমালোচনা করেন।

প্রথম আলোর সঙ্গে এক দীর্ঘ একান্ত সাক্ষাত্কারে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সন্ত্রাস বা অপরাধমূলক কাজে ছাত্রলীগ বা যুবলীগের কাউকে জড়িত দেখা গেলে তাকেও শাস্তি দেওয়া হয়েছে এবং হেছ। কিন্তু অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকেও এই দৃষ্টান্ত অবলম্বন করতে হবে। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করলে দেখা গেছে তারা কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী এবং রাজনৈতিক নির্যাতন চালানো হেছ বলে প্রতিবাদ জানানো হয়।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রেডিও-টেলিভিশনের স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হলেই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ধর্মঘট করবেন। ইতিমধ্যে প্রাইভেট চ্যানেলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। রেডিও-টিভির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বুঝিয়ে পর্যায়ক্রমে স্বায়ত্তশাসনও কার্যকর করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি দমন বিভাগ, প্রতিরক্ষা বাজেট, প্রতিরক্ষা নীতি, বিচার বিভাগের পৃথক্‌করণ, আওয়ামী লীগ ভারতের পছন্দের দল কি না, আওয়ামী লীগে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র আছে কি না ইত্যাদি অনেক প্রশ্নের জবাব দেন।

গত ৬ ডিসেম্বর গণভবনে অন্তরঙ্গ পরিবেশে প্রথম আলো সম্পাদককে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর এই সাক্ষাত্কারের পূর্ণ বিবরণের আংশিক গতকাল প্রকাশ করা হয়েছে, আজ বাকি অংশ প্রকাশ করা হলো:

মতিউর রহমান : প্রায় সাড়ে তিন বছর তো হয়ে গেল আপনাদের সরকারের। আপনার দলীয় নির্বাচনী কর্মসূচি অনুযায়ী এখনো আপনারা কিছু পূরণ করতে পারেননি। এর মধ্যে একটা রেডিও-টেলিভিশনের স্বায়ত্তশাসনের কথা আপনি বলেছিলেন, কিন্তু সেটা আপনি করেননি। এটা কি আপনার সময়ের শেষ হওয়ার আগে আর করতে পারবেন?

শেখ হাসিনা: সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, যে মুহূর্তে আমি রেডিও-টেলিভিশনের স্বায়ত্তশাসনের কথা বলব, সেই মুহূর্তে রেডিও-টেলিভিশনের কর্মচারীরা স্ট্রাইক শুরু করে দেবে এবং রেডিও-টেলিভিশন বন্ধ হয়ে যাবে। কে দায়িত্ব নেবে বলেন? এটা তো আমি ‘মুখোমুখি’ অনুষ্ঠানেও বলেছিলাম। বরং আমরা আরও এক ধাপ ওপরে উঠে প্রাইভেটে চ্যানেলের অনুমতি দিচ্ছি। আর স্বায়ত্তশাসনের ব্যাপারেও আলাপ-আলোচনা হচ্ছে, কীভাবে করা যেতে পারে।

আমাদের আশঙ্কা, ভয়টা হচ্ছে, এত টেকনিক্যাল ও স্পর্শকাতর স্থাপনা যদি যেকোনো মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যায় বা বন্ধ করে দেয় তখন তো আপনারা আবার আমাদের দোষারোপ করবেন। রেডিও বন্ধ হয়ে গেল, টেলিভিশন বন্ধ হয়ে গেল, সর্বনাশ হয়ে গেল, বাংলাদেশে মনে হয় ক্যু হয়ে গেল ইত্যাদি কথা এসে যাবে। তারপরও আমরা কমিশন করলাম এবং বিভিন্ন দেশ ও বিভিন্ন জায়গা থেকে রিপোর্ট নিয়ে ঠিক করলাম যে, এটা করতে যেহেতু সমস্যা হচ্ছে সেহেতু আমরা প্রাইভেট চ্যানেল চালু করার সিদ্ধান্ত নিলাম। কারণ স্বায়ত্তশাসন করলে যেহেতু সরকারি চাকরি আর থাকছে না, সেখানেই সকলের আপত্তি, সবাই আপত্তি জানাচ্ছে, যেমন দৈনিক বাংলা বেসরকারীকরণ করতে যে বিপদে পড়লাম তা থেকে আমরা কিন্তু একটু সজাগ। কারণ, আমরা ভেবেছিলাম সবাই যখন ডিমান্ড করছেন ঠিক আছে, আমরা দৈনিক বাংলা এবং বিচিত্রা বন্ধ করে দিই। বন্ধ করে দেওয়ার পর আমরণ অনশন শুরু হলো, যঁারা একসময় লিখেছিলেন তঁারাই আবার আমরণ অনশন শুরু করলেন। তখন আমরা তো শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। ওই শঙ্কার কারণে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম প্রাইভেট চ্যানেল চালু করার। তারপর একটা প্রাইভেট চ্যানেল চালু করার অনুমতি দিলাম। স্বায়ত্তশাসন থেকে এক ধাপ এগিয়ে গেলাম আমরা। আমরা যদি আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আস্তে আস্তে মানাতে পারি, তবে পর্যায়ক্রমে স্বায়ত্তশাসন করে দেব।

মতিউর রহমান: টেিলভিশনে যে আপনাকে এত দেখায় এটার কী জবাব দেবেন আপনি?

শেখ হাসিনা: আমি আপনাকে এর জবাব দিচ্ছি। আমার মনে আছে, একবার আপনাদের সাংবাদিকদের নিয়ে বসেছিলাম। আমি তখন কিন্তু টেলিভিশনকে আসতে দিইনি। আমার প্রেস সেক্রেটারিকে জিজ্ঞেস করতে পারেন। তখন সাংবাদিকদের দিক থেকে একটা ডিমান্ড এসেছিল, এ সংবাদটা টেলিভিশন কভার করবে না? তখন আমি টেলিভিশন ডাকি।

ব্যক্তিগতভাবে আমার টেলিভিশনে যাওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমি যে সমস্ত অনুষ্ঠানে যাচ্ছি তাদের তরফ থেকে একটা ডিমান্ড থাকে যে ওই অনুষ্ঠানটা প্রচার হোক। ওই অনুষ্ঠানে আমি উপস্থিত। তাই অনুষ্ঠান কভার করতে যেয়ে আমাকেও দেখাচ্ছে। আপনারা সেভাবে বিচার করেন, আমাকে এককভাবে দেখাচ্ছে না। ওই অনুষ্ঠানটাকেই দেখাচ্ছে। যেমন আজকে আমি সমাবর্তন অনুষ্ঠানে গেলাম। আমাকে বলেন, এখনই অনুষ্ঠানটি টেলিভিশনে দেখাতে বারণ করি। তাহলে ইউনিভার্সিটির সমাবর্তন অনুষ্ঠানটা যে হলো তারাই তো মনঃকষ্ট পাবে, সব উন্মুখ হয়ে বসে আছে দেখবে, ছেলেমেয়েরা দেখবে। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, বেশি মনে হয় এ জন্য যে, আমি তো প্রোগ্রাম বেশি করি, আমি তো কাজ বেশি করি, আমি তো খাটি বেশি। বলুন, আপনারা আমি কাজ বন্ধ করে বসে থাকি। আমার তো তাতে কোনো আপত্তি নেই।

মতিউর রহমান: এখন সন্ত্রাস নিয়ে বলি। মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনেক কিছু করছেন বলছেন কিন্তু তারপরও ব্যাপক সন্ত্রাস আছে, ঘটনা ঘটছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হচ্ছে। এমনকি শিশু অপহরণও হয়ে যায়। এসবের মধ্যে ছাত্রলীগ-যুবলীগের একটি ভূমিকাও রয়েছেএক্ষেত্রে তো আপনি কিছু করতে পারেন।

শেখ হাসিনা: ছাত্রলীগে যারা সক্রিয়, যারা ছাত্রলীগের কমিটিতে আছে এ ধরনের কোনো অপরাধ যখনই কেউ করছে, সঙ্গে সঙ্গে তার বিরুদ্ধে আমরা অ্যাকশন নিয়েছি বা ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমি কিন্তু কেউ অপরাধ করলে অপরাধীকে প্রশ্রয় দিচ্ছি না। কিন্তু এটা তো আমি এককভাবে করলে হবে না। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। তাদেরকেও করতে হবে। তারাও যদি না করে এটাকে কীভাবে ঠেকাবেন আমাকে বলেন।

দ্বিতীয় কথা হচ্ছে সন্ত্রাসের ব্যাপারে আপনাদের কি একটুও স্মরণ নেই যে, বিএনপির আমলে দেশের কী অবস্থা ছিল? মহিলারা তো সোনার গহনাই পরা ছেড়ে দিয়েছিল। স্কুল থেকে অভিভাবকদের চিঠি দেওয়া হয়েছিল যে, আপনারা ছেলেমেয়েদেরকে নিজেরা নিয়ে যান। এ রকম ভয়াবহ পরিস্থিতি ছিল। আমরা আসার পর সমস্ত চিহ্নিত সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করলাম। এখন আপনারা একদিকে বলেন সন্ত্রাস বন্ধ করতে আবার সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করলে দেখা গেছে কোনো না কোনো দলের রাজনৈতিক কর্মী। তারাই করে ছিনতাই। তখন আবার বলেন, কর্মীদেরকে হয়রানি করা হচ্ছে, মিথ্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে। তাহলে আমরা যাবটা কোথায়? বলেন আমরা কোথায় যাব? তারপরও কিন্তু আমরা বসে নেই। আপনি দেখেন, আমরা সরকার গঠন করার পর প্রথম দুই–আড়াই বছর পর্যন্ত এত কড়া ব্যবস্থা নিয়েছিলাম যে, সত্যিকার বলতে ঢাকার চেহারা একদম বদলে গিয়েছিল। ঠিক এরা যখন আবার আস্তে আস্তে জামিন পেয়ে পেয়ে ছাড়া পেয়ে আসতে শুরু করল আবার একই অবস্থা শুরু হলো। আপনারাই আপনাদের পত্রিকায় লিখেছেন যে, এরা জামিন পেয়ে ছাড়া পাচ্ছে। জামিনটা তো আমরা দেইনি। জামিনটা তো দেয় কোর্ট থেকে।

এখন যেটা হচ্ছে আমার মনে হয় কিছু কিছু পরিকল্পিত ঘটনা আছে, নইলে একেকটা কারণে একেক সময়ে এত মোমেন্টাম পায় কী করে? একেকটা কারণে একেক সময় এও ভীষণভাবে দেখা যায় যে, সাংঘাতিক আলোড়ন সৃষ্টি করে যাচ্ছে। আবার কিছুদিন পর দেখা যায় আরেকটা। এগুলো আপনারাও একটু গভীরভাবে দেখেন। আর যদি ছাত্রলীগ-যুবলীগ বা এ রকম কেউ যদি জড়িত থাকে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেব। যেমন কয়েক দিন আগে একটি শিশু অপহরণ ঘটনা, যেটা পরে নাকি সমঝোতা করে ১০ লাখকে আড়াই লাখে সমঝোতা (পত্রিকায় দেখে যা জানলাম) করে। ইতিমধ্যেই আমি নির্দেশ দিয়ে দিয়েছি কারা ছিল তাদের বিরুদ্ধে যদি মামলা নাও করে, যেহেতু ঘটনা ঘটেছে যারা এর মধ্যে ছিল তাদেরকে ধরার। ইতিমধ্যেই আমি কিন্তু এসব নির্দেশ দিয়ে দিয়েছি। সেখানে আমার ছাত্রলীগ হোক, যুবলীগ হোক, আওয়ামী লীগ হোক আমি কিন্তু কেয়ার করি না।

এখন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যান মানুষ অন্তত শান্তিতে ঘুমায়। এখন আমরা ক্ষমতায় আছি। এরা ধরা পড়েছে ঠিক আছে। কালকে আমরা থাকব না তখন এরাই হবে এদের শক্তি। তখন তারা আবার হিরো হয়ে যাবে। চাই কি এরা নির্বাচিত হয়ে সংসদেও চলে আসবে দেখবেন।

মতিউর রহমান: দুর্নীতি দমন বিভাগ নিয়ে অনেক অভিযোগ। দুর্নীতি দমন বিভাগটি যদি আপনি স্বাধীন করতেন, এটা তো আপনার মন্ত্রণালয়ের অধীনে আছে। এটাকে স্বাধীন করে দেন না?

শেখ হাসিনা: দুর্নীতি দমন বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবেই কাজ করে।

মতিউর রহমান: কিন্তু আপনার অনুমতি নিতে হয়। আপনার অধীনেই তো এটা আছে?

শেখ হাসিনা: না, সব ক্ষেত্রে না তো। সব ক্ষেত্রে না। এটা কয়েকটি নির্দিষ্ট পর্যায় আছে, সেক্ষেত্রে নিতে হয়। কিন্তু দুর্নীতি দমন ব্যুরো করবেটা কী আপনি আমাকে বলেন। এই যে রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতির যে মামলা, কালকে যদি দুর্নীতি মামলা হয় পরশুদিন বলবে যে এটা রাজনৈতিক হয়রানি। আপনি যতই স্বাধীন করেন আর যাই করেন, তারা কাজটি করবে কী?

মতিউর রহমান: স্বাধীন করে দিলে তো আর বলবে না। যেহেতু আপনার অধীনে আছে এ জন্য বলা হয় যে, এটা আপনি অনুমতি দিয়ে মামলা করিয়ে হয়রানি করছেন?

শেখ হাসিনা: কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনুমতি দেওয়া বা না দেওয়ার এখতিয়ার আছে সরকারপ্রধানের। আমি আসার পর আপনারা বোধ হয় জানেন না, বাকি অনেক ক্ষমতা আমরা ডেলিগেট করে দিয়ে দিয়েছি, আগে যেটা ছিল বিএনপির আমলে, যেসব করা হয়েছিল সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখে এবং সমস্ত কিছু যেত এ টেবিল থেকে, আমরা তো সেটা রাখিনি।

মতিউর রহমান: আপনার পুরোটা ছেড়ে দিতে কী অসুবিধা?

শেখ হাসিনা: পুরোটাই ছেড়ে দিয়েছি। পুরোই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

মতিউর রহমান: কিন্তু দুর্নীতি দমন বিভাগ তো আপনার অধীনেই তো, আপনার মন্ত্রণালয়ের অধীনে।

শেখ হাসিনা: আমার মন্ত্রণালয়ের অধীনে তো এনজিও ব্যুরোও আছে। তাহলে বলেন এটাও ছেড়ে দিতে হবে। আমার মন্ত্রণালয়ের অধীনে বেপজা, ইপিজেড তারপরে বিওআই। এসবও ছেড়ে দিই?

মতিউর রহমান: ওগুলো নিয়ে তো কোনো কথা উঠছে না বা দাবি উঠছে না বা প্রশ্নও উঠছে না?

শেখ হাসিনা: কোথাও না কোথাও দুর্নীতি দমন ব্যুরোকে থাকতে হবে। কার হাতে দেবেন আপনি? একটা রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কারও না কারও হাতে এটাকে দিতে হবে।

মতিউর রহমান: দুর্নীতি দমন বিষয়ে একটা স্বাধীন শক্তিশালী কমিশন করা যায় না?

শেখ হাসিনা: স্বাধীন কমিশন করলেও তো কারও অধীনে যেতে হবে।

মতিউর রহমান: এটা কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকল না, স্বাধীনভাবে একটা সংস্থা করা যায়?

শেখ হাসিনা: তারপরও তো একটা ছাতার নিচে দিতে হবে। না হলে তার বেতন, ভাতা, তার পরিচালনা, তার নির্দেশ কোথা থেকে হবে বলেন আমাকে। হ্যাঁ একটা করা যেত যদি ন্যায়পাল আমরা নিয়োগ করতে পারতাম, হয়তো সেখানে আমরা দিতে পারতাম। একটা অফিসের অধীনে তো থাকতে হবে। একেবারেই আপনি স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিতে পারেন না। আপনার একটা রাষ্ট্রকাঠামো তো আছে। সেই ন্যায়পালও তো আমরা নিয়োগ করতে চাই এবং ন্যায়পালের আইন-টাইন যতগুলো সংশোধন করার সেগুলো আমরা করতাম। কিন্তু ন্যায়পাল আজকে একজনকে নিয়োগ করলাম কালকে বিরোধী দল আপত্তি করল, তাহলে সে আর ন্যায়পাল হলো না। সেখানে তো তাদের কাছ থেকে আমরা কোনো পরামর্শ পাই না। আমরা তো চেষ্টা করেছি, আমরা সংসদে এসেই কিন্তু সংসদে তাদের কাছ থেকে সহযোগিতা চেয়েছি যে, আসুন, আমরা একজন ন্যায়পাল নিয়োগ করি।

মতিউর রহমান: আপনি সেদিন বলেছেন যে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরে বিচার বিভাগকে প্রশাসন থেকে আলাদা করবেন, আগে করার কোনো অসুবিধা ছিল কি? সময় চলে যাচ্ছে না আপনার? এটাও আপনার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি?

শেখ হাসিনা: অসুবিধা ছিল। নাহ্, অসুবিধা ওই যে কোর্টে মামলা থাকলে আমি করব কী করে, আপনি আমাকে বলেন। আমরা একটা ‘বিল’ করলাম। তারপর কোর্ট থেকে বলা হলো যে, না ওইটা লাগে না কারণ ইতিমধ্যে সংবিধানেই এটা দেওয়া আছে। আসলেই আমাদের সংবিধানেই আছে এবং সংবিধান কার্যকর (ইমপ্লিমেন্ট) করলেই কিন্তু তা হয়ে যায়। যেমন দেখেন, আমাদের আর্টিকেল ১১৫ আমরা ইতিমধ্যে কার্যকর করেছি। এত দিন তো করা হয়নি। এর আগে কিন্তু কক্ষনো করা হয়নি। ১১৪, ১১৫, ১১৬ আমরা কিন্তু এগুলো কার্যকর করেছি। করার ফলে আর স্বাধীন না হলে ওরা আমার বিরুদ্ধে এভাবে রায় দিতে সাহস পায়। অতীতে কোনো দিন কোনো সরকারপ্রধানকে এভাবে জিজ্ঞাসা করার সাহস পেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট? বলেন, কোনো দিন সাহস পেয়েছে? সাহসও পায়নি। কিন্তু আমরা স্বাধীনতা দিয়েছি সে জন্য পারছে।

মতিউর রহমান: আপনার সময়েও প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয় বাড়ছে।

শেখ হাসিনা: নাহ্, নাতো বাড়েনি। আমাদের যে বাজেট সেই বাজেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। ব্যয় বাড়ল কোথায়?

মতিউর রহমান: প্রতিরক্ষা বাজেটটা তো বাড়ছে?

শেখ হাসিনা: এটা একটা রুটিন প্রোগ্রামের মতো, এই বাড়াটা খুবই মিনিমাম। তেমন বেশি কিছু না। বিরোধীরা তো আওয়ামী লীগ আসলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাখবে না, তারপর প্রতিরক্ষা বাজেট আমি রাখবই না বলেছিল।

মতিউর রহমান: আপনি প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে বলছেন যে, এটা একটা রুটিন প্রোগ্রাম এবং এই বাজেট বাড়ানোটা ন্যূনতম, তেমন বেশি কিছু না। সত্যি কি তাই?

শেখ হাসিনা: সব ক্ষেত্রে আমাদের উন্নতি করতে হবে, উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা নিতে হবে, কাজেই যে যে খাতেই যেটা প্রয়োজন আমরা সেখাতে ততটুকুই দিচ্ছি। আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রতীক, তাকেও তো আমাদের শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে, তাকেও তো আমাদের উপযুক্ত ও আধুনিকীকরণ করতে হবে। যেহেতু এটা আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রতীক তাকে যদি আধুনিকীকরণ না করি আর আজকাল সশস্ত্র বাহিনী শুধু আমাদের দেশে সীমাবদ্ধ না, জাতিসংঘের বিভিন্ন মিশনে তারা যাচ্ছে, শান্তি রক্ষা মিশনে কাজ করতে যাচ্ছে। শান্তিরক্ষা মিশনে যদি তারা কাজ করতে যায় আর তাদেরকে যদি আমরা উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিতে না পারি, উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে না পারি, নতুন নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিতি যদি তাদের না হয়, তাহলে তো সেখানে গিয়ে তারা ভূমিকা রাখতে পারবে না।

মতিউর রহমান: প্রশ্নটা হলো, যেখানে প্রতিরক্ষা নীতি নাই সেখানে আপনি কীভাবে এসব করছেন, কোন লক্ষ্যে?

শেখ হাসিনা: এটা তো ঠিক না। অবশ্যই প্রতিরক্ষার নীতি আছে। প্রতিরক্ষার বিষয়ে যদি নীতি না থাকে তাহলে আগের সরকারগুলো কোনো নীতি নিয়ে চলে নাই? সেটাই আসে তাহলে, কিন্তু নিশ্চয়ই একটা প্রতিরক্ষা নীতি থাকে। আর প্রতিরক্ষা এমন একটা বিষয় যার সবকিছু জনসম্মুখে তো তুলে ধরা যায় না। আপনার যুদ্ধ পরিকল্পনার কথা যদি জনসম্মুখে বলে দেন তাহলে তো আর যুদ্ধপরিকল্পনা হলো না, হবে? তখন তো আপনার শত্রু সব জেনে গেল। কাজেই নীতি যেটুকু জনসম্মুখে জানা যায় সেটুকু আর যেটুকু নিরাপদ রাখার সেটুকু রাখতেই হবে। এটা নিয়ে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। আজকে যারা এই ইস্যুটা তোলে তারা তো ক্ষমতায় ছিল, তারা নীতি করে নাই কেন? কেন করে নাই?

মতিউর রহমান: ভারত আপনাকে সাহায্য করেছে গঙ্গা পানিচুক্তি ও পার্বত্য শান্তিচুক্তি করার জন্য। বিএনপির আমলে তারা করেনি।

শেখ হাসিনা: বিএনপির আমলে তারা সমস্যার সমাধান করতে চায়নি। সমস্যাগুলো জিইয়ে রেখে এগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে। কেউ যদি আন্তরিকভাবে চাইত তাহলে সমস্যার সমাধান করতে পারত না?

বর্তমান বিরোধীদলীয় নেত্রী যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন যখন প্রথম ভারতে গেলেন তখন কি তিনি গঙ্গার পানি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন? না, তিনি গঙ্গার পানি নিয়ে আলোচনা করেননি। অথচ বিরোধী দলে থাকতে তিনি লংমার্চ করেছেন ফারাক্কার বিরুদ্ধে, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হয়ে আর চাইতে যাননি।

আমাদের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে এই কমিটমেন্ট ছিল। আমরা যখনই এসেছি এগুলো করেছি। আমরা বলেছিলাম আমরা ক্ষমতায় আসলে এগুলো করব। আমরা করেছি। তারপর বিরোধী দল বলেছিল পাঁচ বছরের চুক্তি না হলে আমরা মানব না সেই জায়গায় আমরা ৩০ বছরের চুক্তি করেছি। আগের সরকার চাইলে এসকল সমস্যার সমাধান করতে পারত। তারা চেয়েছে এসকল সমস্যা জিইয়ে রেখে ভারতবিরোধী প্রচারণা চালিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতায় থাকা।

মতিউর রহমান: আপনার দলকে তো বলা হয় ভারতের পছন্দের দল।

শেখ হাসিনা: এটা ঠিক না। তারা তো চায় নাই, করতেই চায় নাই।

মতিউর রহমান: আপনাকে সহযোগিতা করেছে ভারতের পছন্দের দল বলে?

শেখ হাসিনা: আমি ভারতের পছন্দের দল হব কেন? আমি কারোরই পছন্দের দল নই। আমি বাংলাদেশের পছন্দের দল, বাংলাদেশের জনগণের পছন্দের দল। কারণ আমার দল বাংলাদেশের জন্য। ভারতের পছন্দের দল আমি হতে যাব কেন? বরং বিএনপি, জাতীয় পার্টি সব থেকে বেশি ভারতের পছন্দের দল। সেটা খোঁজ নিয়ে দেখেন, ভেতরটা ঘেঁটে দেখেন, দেখবেন তারাই ভারতের পছন্দের দল।

মতিউর রহমান: এখন আপনার দল নিয়ে বলি, আপনি দলের সভানেত্রী এবং সংসদ নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী। দল পরিচালনায় বা ব্যবস্থাপনায় আপনি প্রধান। দল পরিচালনায় অন্যদের ভূমিকা বা তাদের কথা বলার সুযোগ কম, অনেক ক্ষেত্রে মনে হয় যে আপনার একক সিদ্ধান্তে দল ও সরকার চলছে।

শেখ হাসিনা: আপনি আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র পড়েছেন?

মতিউর রহমান: হ্যাঁ, পড়েছি।

শেখ হাসিনা: আপনি বিএনপি ও জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্র পড়ে আমাদের গঠনতন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করেন। আপনি কি জানেন আমার দলের একটা লোককেও আমি ইচ্ছা করলে বের করতে পারি না। আমি একক সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। আমার কমিটির সিদ্ধান্ত লাগে বা আমাদের খুব জটিল প্রক্রিয়া। আমার দল যতটুকু গণতান্ত্রিক এবং আমাকে যেভাবে নিয়ম মেনে চলতে হয় এবং আমার পার্টিতে প্রেসিডেন্ট ও রকম শক্তিশালী না।

মতিউর রহমান: আপনাদের দলে সবচেয়ে শক্তিশালী কে? প্রেসিডেন্ট, আপনি প্রেসিডেন্ট, আপনিই শক্তিশালী, দল তো গণতান্ত্রিকভাবে চলে না।

শেখ হাসিনা: এটা একটা প্রতীকী ব্যাপার। যেমন রাষ্ট্রেরও সব কাজ প্রেসিডেন্টের নামে হয় ওই রকম দলের ক্ষেত্রেও কোনো কাজ করতে গেলে সেটা প্রেসিডেন্টের নামেই যায়। কিন্তু আমার পার্টিতে আমাদের গণতন্ত্রের চর্চা এত ব্যাপক যে, আমি যদি আমার পার্টির ওয়ার্কিং কমিটির একজন মেম্বারকে মনে করি ওনাকে এখানে মেম্বার রাখব না তাহলে এই সিদ্ধান্ত আমার এককভাবে নেওয়ার কোনো ক্ষমতা নেই। আমার গঠনতন্ত্র মোতাবেক কতগুলো নিয়ম আমাকে মেনে চলতে হয়।

মতিউর রহমান: কে মন্ত্রী হবে বা সংসদীয় দলের কে কী হবে, দলের কে সাধারণ সম্পাদক হবেন, অন্যরা কী হবে সেটা তো আপনি একা সিদ্ধান্ত নেন। তা ছাড়া বিভিন্ন কমিটিতে নেতারা আলোচনা করতে ভয় পায়, তাই খোলামেলা আলোচনা হয় না।

শেখ হাসিনা: এ ক্ষেত্রে আমি বলব আমার আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র সবচেয়ে বেশি গণতান্ত্রিক। এখানে প্রেসিডেন্টের কিন্তু একক ক্ষমতা নেই। ক্ষমতা হচ্ছে আমাদের কার্যকরী পরিষদের হাতে। যেকোনো সিদ্ধান্ত আমরা নিতে পারি কার্যকরী পরিষদের মাধ্যমে।

মতিউর রহমান: নেতারা যে খোলামেলা আলোচনা করতে ভয় পায়?

শেখ হাসিনা: এটা ঠিক না। যেখানেই আমি যেকোনো কাজে যাই বা কাজ করি, সেটা পার্টি চালানোর সময় হোক আর সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রেই হোক, আমি একটা চমত্কার পরিবেশ সৃষ্টি করি।

আমি সব সময় চেষ্টা করি যত কঠিন কথা হোক যাই হোক প্রথমে হচ্ছে খোলামেলা আলোচনা, যার মনে যা আছে পরিষ্কারভাবে তা বলুক। আমার সঙ্গে যদি দ্বিমতও হয় সেটাও যেন বলার সুযোগ পায়- সেই সুযোগ আমি করে দিই, সে সুযোগ থাকে এবং একেবারে নির্ভয়ে যত কঠিন কথাই হোক, যত কঠিন মতামতই হোক, সেই কঠিন মতামতও দেওয়ার সুযোগ আমি সৃষ্টি করে দিই। তারপর আমরা আলোচনা করে সিদ্ধান্তে উপনীত হই, আমি কখনো কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিই না।

মতিউর রহমান: তার মানে আপনি বলতে চান কেউ ভয় পায় না।

শেখ হাসিনা: আমি তো জানি না যে কেউ আমাকে ভয় পায়। সত্যিকার ভয় পায় নাকি? ভয় পাওয়ার কী আছে আমি তো বাঘও না, ভাল্লুকও না। কিন্তু আমি কাজ চাই। হ্যাঁ, নিয়মশৃঙ্খলা মানতে হবে, সততা-নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে হবে এবং অর্পিত দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতে হবে।

মতিউর রহমান: এখন দেশে যে ধরনের একটা বিভক্তি, একটা দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলছে এবং দেখা যায় ভবিষ্যতেও এটা চলবেপ্রশ্ন হলো, এ পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের আগামী দিনের ভবিষ্য​ আপনি কীভাবে দেখেন, কী মনে করেন, কী হতে পারে?

শেখ হাসিনা: কথাটা হচ্ছে, এ বিভক্তিটা কেন? ’৭০-এর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে শক্তি পরাজিত হলো এবং ’৭১-এর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা বিজয় অর্জন করলাম, তারই ফলশ্রুতিতে ওই শক্তি সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হলো। ’৭৫-এ জাতির জনককে হত্যা করে সে শক্তি আবার ফিরে এসেছে। এখানে একটা নীতিগত, আদর্শগত দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। আমরা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি, আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করি এবং সেভাবেই আমরা দেশকে গড়ে তুলতে চাই। আমরা সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাস করি। একটা অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় আমরা বিশ্বাস করি, যেখানে সব মানুষের সমান অধিকার থাকবে, যেখানে কেউ খাবে কেউ খাবে না তা হবে না। প্রত্যেকের বেঁচে থাকার অধিকার আছে, আইনের শাসন পাওয়ার অধিকার আছে, জীবনের ন্যূনতম চাহিদা মেটানোর অধিকার আছে।

আমরা যারা এই চিন্তাচেতনায় বিশ্বাসী আমরা দেশকে সেভাবেই গড়ে তুলতে চাই। কিন্তু এর বিপরীতে পরাজিত শক্তির দোসর যারা, যাদের আমরা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পরাজিত করেছিলাম, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি, যারা বাংলাদেশের বিজয়কে গ্রহণ করতে পারেনি সেই ধারাটা, তাদেরও শক্তি আছে, তারাই তো এই বিভক্তিটা সৃষ্টি করতে চাচ্ছে এবং তারাই তো দেশকে উল্টো দিকে টেনে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। এটা তো আমাদের দেশের সকল সচেতন মানুষকে বুঝতে হবে। আজকে বাংলাদেশ যদি একটা কিছু অর্জন করে সেটাতে তারা শামিল হতে পারে না কেন? যেমন ধরেন আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস করলাম বলুন, এই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বাঙালির জন্য কত বড় অর্জন, বাংলাদেশের জন্য কত বড় একটা সম্মান। যে সম্মান পালন করার জন্য আমরা দল-মতনির্বিশেষে সবাইকে ডেকেছি। ৭ ডিসেম্বর এই উপলক্ষে যে অনুষ্ঠান পালন করলাম সেখানে কিন্তু আমরা সব দলকে ডেকেছি। সেখানে প্রায় সব দল এসেছে কিন্তু মূল বিরোধী দল থেকে কেউ আসল না কেন? এই হিংসাটা কেন? এই হিংসা-বিদ্বেষ কেন থাকবে? বরং বিরুদ্ধে একটু লিখতে পারলে খুশি হচ্ছে। এ ধরনের হীনম্মন্যতায় যদি ভোগে কেউ, সেখানে তো আমি অসহায় বোধ করি, সেখানে আমার করার কিছু থাকে না।

মতিউর রহমান: তাহলে কিছুদিন এ রকম অনৈক্য, বিভেদ আমাদের চলবে?

শেখ হাসিনা: এটা থাকবে। তবে এখানে আপনাদের একটা দায়িত্ব আছে। আপনারা যঁারা চিন্তাবিদ, যঁারা সমাজ নিয়ে সব সময় চিন্তাভাবনা করেন, বিশেষ করে সংবাদপত্রগুলোকে জনমত সৃষ্টি করা, মানুষের মতামত সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে একটা বিরাট ভূমিকা রাখতে হবে। এখানে আপনাদেরও একটা ভূমিকা আছে বলে আমি মনে করি। এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বটা যাতে না থাকে সে চেষ্টা আপনাদের করতে হবে।

মতিউর রহমান: তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন, এ ক্ষেত্রে পত্রিকাগুলো বা সাংবাদিকদের দায়িত্ব হলো বিভেদ যাতে না থাকে?

শেখ হাসিনা: পত্রিকাকে যেহেতু সমাজের দর্পণ বলে সেখানে কেউ যদি ভালো কাজ করে অন্তত সে যাতে উত্সাহ না হারায়, উত্সাহটা যাতে ঠিক থাকে, নিশ্চয়ই সেখানে ভালো কাজের একটু স্বীকৃতি দেওয়া। কেউ যদি শ্রম দেয়, পরিশ্রম করে তার স্বীকৃতিটাও তো চাইবে। পাশাপাশি সংঘাত, দ্বন্দ্ব, হিংসা, দ্বেষ, হীনম্মন্যতায় যারা ভুগে তাদেরও জনসম্মুখে আসল চেহারাটাকে তুলে ধরা এবং তারা যাতে সংযত হয়। তারাও যাতে এসব ভুলে গিয়ে দেশ ও জাতির স্বার্থে কাজ করে সেভাবেও জনমত সৃষ্টি করা। কারণ জনমতটা হচ্ছে সবচেয়ে বড় জিনিস, জনমত সৃষ্টি করলেই কিন্তু সঠিকপথে সকলকে নিয়ে আসা যায়। আমি তো মনে করি সংবাদপত্রের উচিত এই জনমতটা সৃষ্টি করা। গঠনমূলক কাজ, জনকল্যাণমূলক কাজ, জনগণের স্বার্থে দেশকে অগ্রগতির দিকে এগিয়ে নেওয়া। কারণ আমাদের সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ, আজকে মুক্তবাজার অর্থনীতির ধাক্কায় আমরা এমনিতেই বেসামাল। আমাদের সেই ধাক্কা সামলাতে হবে। একবিংশ শতাব্দীর আরও চ্যালেঞ্জ আমাদের মোকাবিলা করতে হবে। কাজেই সেভাবেই যেন আমরা দেশকে গড়ে নিতে পারি, যেন আমরা পিছিয়ে না থাকি।

আরও পড়ুন :

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0