স্বাধীনতার পর দেশের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন

>

মো. খুরশেদ আলম
মো. খুরশেদ আলম

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় শুরু থেকেই যুক্ত থেকেছেন নৌবাহিনীর সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলম। তিনি এখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাহীদ এজাজ

প্রথম আলো: সমুদ্রসীমার আইন আমরা কবে, কখন করেছিলাম। এর পরের অগ্রগতি কী ছিল?

খুরশেদ আলম: সাগরে বেশি একটা যাই না। সাগর সম্পর্কে জানি না। ঐতিহাসিকভাবে এ দেশে এটা চলছে। সাগর আর তার সম্পদকে ব্যবহার করতে পারছি না বলেই আমরা পিছিয়ে আছি সব দিক থেকেই। এমন এক পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ’৭৪ সালে সমুদ্রসীমা নিয়ে আইন করে গেছেন। যে সময়ে বসে এ ধরনের একটি আইন করাকে আমি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে দেখি। বঙ্গবন্ধুর প্রণীত আইনটি নিয়ে পরবর্তী কোনো সরকার আর কাজ করেনি। ’৮২–তে আনক্লস, অর্থাৎ জাতিসংঘের সমুদ্রসীমা আইনবিষয়ক সনদ হলো। সে বছরের ১০ ডিসেম্বর আমরা তা সই করলাম। আমাদের ’৭৪–এর সমুদ্রসীমা আইনের সঙ্গে জাতিসংঘের আইনের কিছু উপাদান অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়ল। কারণ, যার ভিত্তিতে আমাদের আইনটা হয়েছিল, (তারপর সাত বছর কিন্তু পেয়েছিলাম) সেটিকে আন্তর্জাতিক আইনে যুক্ত করা প্রয়োজন ছিল। আমাদের তো তৈরি করা বই হাতের কাছেই ছিল। কাজেই তেমন কোনো কাজ করার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু ওই সাত বছরে আমরা আইনে তেমন কিছু যুক্ত করতে পারিনি। অনিবার্যভাবে আমাদের আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকল না জাতিসংঘের সমুদ্রসীমা আইন। অথচ কেউ এটা নিয়ে আর কথা বলল না। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জাতিসংঘের আইনটিকে অনুসমর্থন করে। ফলে আমরা যখন জাতিসংঘের সনদের সদস্য হয়ে গেলাম, আমাদের ওপর কয়েকটি দায়িত্ব এসে পড়ে। সাগরসম্পদের ওপর আমাদের অধিকার এসে গেল। ২০০ এবং ৩৭০ নৌ মাইল পর্যন্ত যা কিছু পানিতে প্রাণিজ ও মিনারেল—সবকিছুর ওপর আমাদের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা পেল। ২০০ নৌ মাইল পর্যন্ত অধিকার কিন্তু আমাদের ’৭৪ সালের আইনেই ছিল।

প্রথম আলো: প্রায় তিন দশক বিরতির পর অনেকটা হঠাৎ করেই সমুদ্রসীমা নিয়ে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আলোচনা শুরু করেছিল। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আমরা আদালতের দ্বারস্থ হলাম। কোন প্রেক্ষাপটে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো?

খুরশেদ আলম: সমুদ্রসীমা নিয়ে প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের কী পরিস্থিতি, তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানতে চেয়েছিলেন। বিশেষ করে সমুদ্রসীমার ওপর দেশের অধিকার প্রতিষ্ঠা আর সমুদ্রসম্পদ আহরণে বাংলাদেশের অবস্থা কী, সে সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানতে চাইলেন। সেই সূত্রে প্রধানমন্ত্রীর সামনে ওই বছরের মে মাসে একটি উপস্থাপনা তুলে ধরি। বাংলাদেশের ২৮টি ব্লকের ২৭টি যে প্রতিবেশী দুই দেশ দাবি করেছে, সেটি তাঁকে জানানো হলো। এর সমাধান কী, প্রধানমন্ত্রী জানতে চাইলেন। তাঁকে বললাম, বাংলাদেশের সামনে পথ খোলা আছে দুটি। আলোচনা চালিয়ে যাওয়া আর আদালতের কাছে যাওয়া। ৩৫ বছর ধরে আলোচনা করেও আমরা কিন্তু এখনো সেই ’৭৪ সালেই আটকে আছি। পরের বিকল্প হচ্ছে আদালতে যাওয়া। আর আদালতের রায় বাধ্যতামূলক সমাধান। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এই দেশ দুটির কোনোটি যদি আদালত থেকে সরে দাঁড়ায়, তবে বাংলাদেশ আর কখনোই আদালতে যেতে পারবে না। তখন শুধু আলোচনার ওপর নির্ভর করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। তিন দশকের অভিজ্ঞতার আলোকে আলোচনা করে ভারত ও মিয়ানমারের কাছ থেকে ন্যায়সংগত একটা এলাকা আমরা পাব, এমনটা আশা করা বাড়াবাড়ি। সবকিছু শুনে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার ওপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ জন্য তিনি আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে বললেন।

প্রথম আলো: প্রস্তুতির শুরুটা কীভাবে হলো?

খুরশেদ আলম: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তখনকার বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে মামলা লড়েছিলেন কানাডার আইনজীবী পায়াম আখাভান। তাঁর সহযোগিতায় ওয়াশিংটনে আর লন্ডনে গিয়ে সমুদ্রসীমা বিরোধের মামলায় যুক্ত প্রখ্যাত আইনজীবীদের নিয়ে আলোচনা শুরু করলাম। বাংলাদেশের মামলাটি ছিল ২৬তম। আশির দশকে যাঁরা মামলা লড়েছিলেন, তাঁদের ডেকে নিয়ে কথা বললাম। আইনজীবী চূড়ান্ত করার পর মামলা তৈরির প্রস্তুতি শুরু হলো। এ কাজে প্রায় সাড়ে তিন মাস লেগেছিল। বলতে পারেন আগস্ট পর্যন্ত।

প্রথম আলো: দুই দেশের কাছে আদালতে যাওয়ার কথা জানালেন কখন?

খুরশেদ আলম: অক্টোবরের শুরুতে দুই দেশের রাষ্ট্রদূতকে একই দিনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠানো হলো। প্রথমে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের হাতে চিঠি দেওয়া হলো। পরে দেওয়া হলো ভারতের হাইকমিশনারের কাছে। মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের হাতে চিঠি দেওয়ার আগে ঢাকায় দেশটির দূতাবাসেও বার্তাবাহক পাঠানো ছিল। তাঁকে বলা হয়েছিল, রাষ্ট্রদূতের হাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে যখন চিঠি দেওয়া হবে, একই সময় দূতাবাসে চিঠি দিয়ে সেটিতে সই নিতে হবে। তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি এরপর বিষয়টি নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণার সঙ্গে ফোনে কথা বললেন। কিন্তু চেষ্টা করেও মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে পারলেন না দীপু মনি।

প্রথম আলো: বাংলাদেশের এই পদক্ষেপের পর ভারত ও মিয়ানমার কী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল?

খুরশেদ আলম: নিয়ম হলো, মামলার নোটিশ দেওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে দুই পক্ষকে জবাব দিতে হয়। আমরা অপেক্ষায় আছি। কিন্তু কেউ জবাব দিচ্ছে না। মিয়ানমার শেষ পর্যন্ত খুব নেতিবাচকভাবে নোটিশের জবাব দিল। তারা বলল, ‘পেছন থেকে ছুরি মারা হয়েছে।’

প্রথম আলো: আর ভারতের সঙ্গে তখন কী চলছিল?

খুরশেদ আলম: ভারতকেও আমরা আলোচনায় বসতে বলেছিলাম, যাতে একসঙ্গে কাজ করে মামলা শেষ করে দেওয়া যায়। ভারত এগিয়ে এলে আমাদের মামলা তো ২০১২–তেই শেষ হয়ে যায়। পরে তো আমরা আদালতেই থাকলাম।

প্রথম আলো: সব মিলিয়ে সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তিতে বাংলাদেশের অর্জনটাকে কীভাবে দেখেন?

খুরশেদ আলম: আমি তো বলব, স্বাধীনতার পর দেশের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন এটা। প্রধানমন্ত্রী যদি কোনো একটা পর্যায়ে এসে ন্যূনতম ছাড় দিতেন, তবে দেশের ওই অর্জন সম্ভব হতো না। কিন্তু তাঁর অবস্থান ছিল, আদালতে যখন গেছি, ফল যা হওয়ার, হবে।