default-image

বাংলার জাগরণের প্রেক্ষাপটে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে (১৮৮০-১৯৩২) উদার মানবিক সাহিত্যিক বলেছেন ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের অগ্রণী কাজী আবদুল ওদুদ (বাংলার জাগরণ, বিশ্বভারতী, ১৯৫৬)। নারী সাহিত্যিক হিসেবে মূল্যায়ন না করে কাজী ইমদাদুল হক ও লুৎফর রহমানের সমমর্যাদায় মানবিক সাহিত্যিকরূপে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে রোকেয়াকে আমরা জানতে পারছি পরিপূর্ণ একজন মানুষ হিসেবে।
ডিসেম্বর ১৯৩২-এ কলকাতার এলবার্ট হলে আয়োজিত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনে প্রয়াত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের প্রতিভাকে বিশ্লেষণ করে বলা হয়, তিনি ‘ভগ্নহৃদয় মুসলমানের জন্য এক দৈব আশ্বাস।...মুসলমান অন্তঃপুরে যদি এহেন বুদ্ধির দীপ্তি, মার্জিত রুচি, আত্মনির্ভরতা ও লিপিকুলশতার জন্ম হয়, তবে আজও ভয় কেন বাংলার মুসলমানের ঘোচে না?’ (কাজী আবদুল ওদুদ, রোকেয়া রচনাবলী, বাংলা একাডেমি, ঢাকা) আলোচ্য সেই সাহিত্য সম্মেলন হয়ে উঠেছিল রোকেয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের সভা। সৈয়দ এমদাদ আলী বলেছিলেন, ‘তিনি একটা মহৎ উদ্দেশ্যের প্রেরণা লইয়া কাজ করিতেন।...তাঁহার স্মৃতির উপরে আজ বাংলার মুসলমান সমাজ যে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিতেছেন, বাংলার কোন পুরুষের মৃত্যুতে সেরূপ করিয়াছেন বলিয়া জানি না। ইহা শুধু যুগ লক্ষণ নহে, ইহা আমাদের জাগরণের লক্ষণ।’ (রোকেয়া রচনাবলী, বাংলা একাডেমি, ঢাকা)।
শুধু সাহিত্য রচনার মাধ্যমেই নয়, নারীশিক্ষার প্রতিষ্ঠান সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা এবং ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম’ নামের নারী সমিতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলার মুসলিম সমাজকে জাগিয়ে তোলার সাধনায় তিনি ব্রতী হয়েছিলেন বিশ শতকের প্রথম থেকেই। তাঁর পুরো জীবনের ধ্যান ও সাধনা ছিল সমাজকে জাগিয়ে তোলা। অত্যন্ত অমর্যাদাকর-বেদনাদায়ক-মর্মপীড়াদায়ক বাধার মধ্য দিয়ে তিনি জীবনব্যাপী সাধনা করেছেন সমাজ প্রগতির জন্য। যখন থেকে তিনি লেখা শুরু করেছেন, তখন থেকেই জীবন অবসানের কালে শেষ লেখাটিতে (নারীর অধিকার) পর্যন্ত তিনি জানিয়েছেন সমাজ প্রগতির জন্য তাঁর আকুলতা। বিভিন্ন লেখায় জানিয়েছেন অবরোধ প্রথার মধ্য দিয়ে জীবনযাপনের অভিজ্ঞতার কথা। বলেছেন বিভিন্ন স্থানে বেড়াতে গিয়ে, আনন্দের সঙ্গে সাগরতীর থেকে কুড়িয়েছেন ঝিনুক, অন্যদিকে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে কুড়াতে হয়েছে পশ্চাৎপদ কূপমণ্ডূক সমাজের অভিসম্পাত, যা তাঁর জীবনের আনন্দ মুছে দিয়েছে। বারবার তিনি বলেছেন ‘সামাজিক পর্দা’র অত্যাচারের বিষয়ে। বলেছেন অবরোধ বন্দিনীদের অত্যাচারিত জীবনযাপনের অসহনীয় যন্ত্রণার কথা।
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী, সাহসী, প্রতিবাদী ও মানবতাবাদী। তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্য ছিল সমাজ থেকে গোঁড়ামি, ধর্মান্ধতা, অসাম্য, বৈষম্য দূর করা। সেই লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য নারী-পুরুষের বৈষম্য, অক্ষমতা, অযোগ্যতা, অসম্পূর্ণতাকে চিহ্নিত করে উভয়ের মিলিত শক্তিতে সমমানবাধিকারের ভিত্তিতে একটি সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করেছেন তিনি। আজীবন চালিত তাঁর এই সংগ্রামের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ধর্মান্ধতা, নারীর প্রচলিত কুসংস্কার ও পশ্চাৎপদতা। গার্হস্থ্য জীবনের প্রচলিত ধ্যান-ধারণা, নারীর শিক্ষাগত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার-বঞ্চনার বিষয়গুলো নারী প্রগতির জন্য রোকেয়ার সংগ্রামকে বাধাগ্রস্ত করেছে। পশ্চাৎপদ রক্ষণশীল সমাজের প্রতিভূ পুরুষ (কখনো তিনি বাবা, স্বামী, ভাই বা ছেলে অথবা আত্মীয় বা অন্যতর সম্পর্কিত পুরুষ; কখনো সমাজপতি বা লেখক-সাহিত্যিক) রোকেয়ার প্রগতিশীল চিন্তাধারার ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে পথ রুদ্ধ করে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু ক্রমাগত অব্যাহত সাধনায় তিনি কর্মযজ্ঞ চালিয়েছেন সেসব বাধা ভেঙে নতুন সমাজ গড়ার অভিযানে। তাঁর জীবিতকালে তিনি দেখে যেতে পারেননি সমাজের রুদ্ধ দরজা ভেঙে অবরোধবাসিনীদের বেরিয়ে আসার অগ্রযাত্রা। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন অবরোধবাসিনীরা মুক্ত হবেই। স্বপ্ন দেখতেন সুলতানার স্বপ্ন (রোকেয়ার লেখা, ১৯০৫) বাস্তবে রূপায়িত হবেই। বিশ শতক থেকে শুরু করে বর্তমান একুশ শতকে আমরা তাঁর বিশ্বাস ও স্বপ্ন সফল হওয়ার বহু ইতিবাচক রূপান্তর ঘটতে দেখছি।

>মুক্তি পেতে হলে অবরোধবাসিনীকে শিক্ষা অর্জন করতে হবে—রোকেয়া এই লক্ষ্য থেকে সবার উদ্দেশে লিখেছিলেন ‘কন্যাগুলোকে সুশিক্ষিত করিয়া কার্যক্ষেত্রে ছাড়িয়া দাও, নিজের অন্নবস্ত্র উপার্জন করুক।’

রোকেয়া জন্মেছেন বাংলাদেশের রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে। জমিদার বাবা জহীর মোহাম্মদ আবু আলী সাবের ও মা মোসাম্মৎ রাহাতন্নেসা সাবেরা চৌধুরানীর অনুশাসনে অবরোধবাসিনীর জীবনযাপনের মধ্যে মুক্তির পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন বড় ভাই ইব্রাহিম সাবের ও বড় বোন করিমুন্নেসা খানম। শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে তাঁরা দুজন রোকেয়ার অবরুদ্ধ জীবনকে নতুন পথে যাত্রা করতে সাহায্য করেছিলেন। মোমবাতি জ্বালিয়ে, গভীর রাতে বাড়ির সবার অগোচরে বোন রোকেয়াকে ভাই ইব্রাহিম সাবের ইংরেজি শিক্ষার অনুশীলনে পারদর্শী করে তুলেছিলেন। বোন করিমুন্নেসা খানম শিখিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যচর্চা। বিয়ের আগে পর্যন্ত বাবা-মায়ের অগোচরে তাঁর লেখাপড়ার চর্চা চলেছিল। বিয়ের পর তাঁকে বিহারের ভাগলপুরে চলে যেতে হয়েছিল স্বামী সাখাওয়াত হোসেনের কর্মস্থলে। মূলত সেই সময় থেকে তিনি অবরোধমুক্ত হলেন এবং মুক্ত স্বাধীনভাবে পড়া ও লেখার চর্চা করতে থাকলেন।
রোকেয়া-সাখাওয়াতের দাম্পত্য জীবন সুখের ছিল বলে বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়। দুজনের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠা পরিচিতি, ব্যক্তি হিসেবে মানুষ হিসেবে দুজনের নিজস্ব পরিচিতি প্রমাণ করে সে যুগের এবং বর্তমান যুগেরও প্রচলিত সামাজিক-পারিবারিক ধারা, অর্থাৎ স্বামীর পরিচয়ের মধ্যেই স্ত্রীর ব্যক্তিপরিচয় বিলীন হয়ে যাওয়ার সামাজিক-পারিবারিক ধারা তাঁরা দুজনেই প্রত্যাখ্যান করতে সচেষ্ট ছিলেন।
দাম্পত্য জীবনে রোকেয়ার অতৃপ্ত বেদনা নিয়েও লেখালেখি হয়েছে। সেসব যাঁরা লিখেছেন, তাঁরা বলেছেন বিপত্নীক বয়স্ক পাত্রের সঙ্গে বিয়ে হওয়া, অসুস্থ স্বামীর সেবা করা, স্বল্পায়ু, দুই মেয়ের জন্য শোকাতুর মা হিসেবে তাঁর কষ্টের জীবনযাপন ইত্যাদি প্রসঙ্গে। পারিবারিক এসব অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতার দুঃখের উত্তরণ ঘটিয়ে রোকেয়া-সাখাওয়াত হোসেন যুগলে অন্তরঙ্গ জীবনচর্চা, সাহিত্যচর্চা, সমাজ পরিবর্তনের চিন্তাচর্চা করেছিলেন স্বল্পকালীন দাম্পত্য জীবনে (১৮৯৬ বা ১৮৯৮-১৯০৯)। বিয়ের ১১ মতান্তরে ১৩ বছর পর স্বামীর মৃত্যু হওয়ায় তিনি একা হয়ে পড়লেন তাঁর চিন্তাচর্চা, সাহিত্যসাধনা ও সমাজকল্যাণমূলক কাজের কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে। সাখাওয়াত হোসেন রোকেয়ার লেখাপড়া, সাহিত্যচর্চার জন্য আটচালা একটি ঘর বানিয়ে দিয়েছিলেন। (মুকুন্দদেব মুখোপাধ্যায়, আমার দেখা লোক, কলকাতা) সেই ঘরে তিনি ১৯০১-১৯০৭ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রচুর সাহিত্যচর্চা করেছেন।
তাঁর সুলতানা’স ড্রিম (১৯০৫) লেখাটির প্রেক্ষাপটে রোকেয়া জানিয়েছেন ‘বায়ুযানে পঞ্চাশ মাইল’ প্রবন্ধটি পড়ে সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, ‘আ টেরিবল রিভেঞ্জ’! তাৎক্ষণিকভাবে সেই লেখা পাঠিয়েছিলেন ইন্ডিয়ান লেডিস ম্যাগাজিন­-এ সরোজিনী নাইডুর কাছে এবং ছাপানোর ব্যবস্থাদিতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এই পারস্পরিক সহযোগিতা ও অন্তরঙ্গতা রোকেয়ার সাহিত্যচর্চা ও চিন্তার প্রসারতা চর্চাকে সহায়তা করেছে। দুজনে মিলে বাড়িতে বাংলা, ইংরেজি, উর্দু পত্রিকা ও বইয়ের সংগ্রহশালা-পাঠাগার গড়ে তুলেছিলেন। স্বামীর সহযোগিতা, উৎসাহ এবং বাধা না দেওয়ার সহমর্মিতার জন্য রোকেয়া উন্মুক্ত স্বাধীনতা ভোগ করেছেন।

default-image

স্বামীর অসুস্থতা ও মৃত্যুশোক, মেয়েদের মৃত্যুশোক, ভাগলপুরের বাড়ি থেকে বাধ্য হয়ে চলে যাওয়া, মা-বাবার মৃত্যুশোক ইত্যাদি তাঁর লেখা, সাহিত্য সাধনা ও চর্চা স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ১৯০৭ সালে ভারত মহিলা পত্রিকায় ‘প্রেম রহস্য’ লেখাটি প্রকাশের পর আট বছর বিরতি দিয়ে তাঁর লেখা আবার প্রকাশিত হতে থাকে ১৯১৫ থেকে।
তাঁর সাহিত্যচর্চার এই দীর্ঘ বিরতির সময়ে তিনি পারিবারিক-সামাজিক-ব্যক্তিগত জীবনে লড়াই-সংগ্রাম করেছেন, ভাগলপুরে নারীশিক্ষার স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন, পরবর্তী সময়ে সেই স্কুল কলকাতায় স্থানান্তর করেছেন—স্বপ্রতিষ্ঠত হওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। সেই সময় তিনি অবরোধ-কুসংস্কার বিষয়ে নারী-পুরুষকে সচেতন করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। নারীসমাজকে সামাজিক-পারিবারিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করার লক্ষ্যে সে সময় তিনি নারী সংগঠন গড়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। জীবনের সব অভিজ্ঞতা থেকে উৎসারিত রোকেয়ার কর্মসাধনার মূল ব্রত হিসেবে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো দেদীপ্যমান তাঁর নারীশিক্ষা আন্দোলন। নারী জাগরণের ব্রত, নারীর সামাজিক, পারিবারিক, রাজনৈতিক-নাগরিক (ভোটদানসহ) অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্রত সফল করার জন্য শিক্ষার গুরুত্ব তিনি জীবনব্যাপী উপলব্ধি করেছেন এবং বাস্তবায়ন করার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।
মুক্তি পেতে হলে অবরোধবাসিনীকে শিক্ষা অর্জন করতে হবে—রোকেয়া এই লক্ষ্য থেকে সবার উদ্দেশে লিখেছিলেন ‘কন্যাগুলোকে সুশিক্ষিত করিয়া কার্যক্ষেত্রে ছাড়িয়া দাও, নিজের অন্নবস্ত্র উপার্জন করুক।’ শিক্ষার মর্ম গভীরভাবে বুঝতেন বলেই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুল’ (প্রথম প্রতিষ্ঠা ১৬ মার্চ ১৯১১) পরিচালনায় আত্মনিবেদিত ছিলেন। চরম আর্থিক সংকট ও সামাজিক বাধা অতিক্রম করে তাঁকে শিক্ষা আন্দোলনে এগিয়ে যেতে হয়েছে। পথ মোটেই কুসুমাস্তীর্ণ বা মসৃণ ছিল না। অভিজাত মুসলিম পরিবারগুলো স্ত্রী-শিক্ষা ও স্ত্রী-স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল। তৎকালীন পূর্ববঙ্গে এবং ভারতের কলকাতায় সর্বত্রই মুসলিম সমাজের বিরোধিতায় মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বাধাগ্রস্ত ছিল। সেই অসহযোগিতার বিরুদ্ধে রোকেয়া নিরলস সংগ্রাম করেছেন। সমাজকে নারীমুক্তি ও স্ত্রী-শিক্ষা সম্পর্কে সচেতন করার দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামে ‘বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা’ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলেই তিনি গ্রহণ করেছিলেন।
সে সময় মুসলমান সমাজে নারীশিক্ষাবিরোধী মনোভাবের অচলায়তন ভেঙে নারীশিক্ষার প্রসার ঘটানোই ছিল তাঁর অঙ্গীকার। তিনি বারবার বলেছেন, শিক্ষা ছাড়া ব্যক্তিত্বের বিকাশ সম্ভব নয়। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিষয়ে, মানুষ ও সমাজের ক্রমবিকাশ বিষয়ে নারী-পুরুষ সবাইকেই জানতে হবে। নারীসমাজকে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে রাখার বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ছিলেন। নারীশিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে নারীসমাজকে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি লিখেছেন গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, স্মৃতিচারণা, নকশা ইত্যাদি। সুস্পষ্ট জোরালো ভাষায় তীক্ষ্ণ বক্তব্যে লিখেছেন তিনি পারিবারিক আইন, দাম্পত্য সম্পর্ক, বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ, যৌতুক, ধর্মান্ধতার গোঁড়ামি, উত্তরাধিকার, সমতা-সমানাধিকার, ভোটাধিকার, পরাধীনতা, দেশাত্মবোধ জাগরিত করা, সমাজসেবা, অবরোধ মুক্তি, পর্দাপ্রথা ইত্যাদি বিষয়ে। রোকেয়ার রচনাবলি পাঠ ও হৃদয়ঙ্গম করা, আলোচনা, চিন্তা এবং নারীমুক্তি-বুদ্ধিমুক্তির আন্দোলন করার এবং সেসব বক্তব্যের বিরুদ্ধে বিতর্ক তোলার কাজ শুরু হয়েছে তাঁর লেখাগুলো প্রকাশের সময় থেকেই। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন সেসব বিতর্কের উত্তর দিয়েছেন বিচক্ষণতার সঙ্গে। সেসব বিতর্ক বাংলাদেশের নারীমুক্তি আন্দোলনের অন্যতম নেত্রীবৃন্দ, রোকেয়ার পূর্বসূরি নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরী (১৮৩৪–১৯০৩) এবং উত্তরসূরি শামসুন্নাহার মাহমুদ, সুফিয়া কামালসহ অন্য নেত্রীদের আজীবন আন্দোলন-সংগ্রামে ব্যাপৃত রেখেছে।
সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুলে পড়েছেন বাংলাদেশের প্রথিতযশা নারীনেত্রী, শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবীরা। সেই স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন বাংলাদেশের স্বনামধন্য নারীনেত্রীরা। ১৯৪৬ সালে দেশভাগের পর তাঁরা পূর্ববঙ্গে ফিরে আসেন এবং এ দেশের নারী শিক্ষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। (রোকেয়ার মানসকন্যা: স্মৃতিগাঁথা, সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল এলামনাই এসোসিয়েশন, ঢাকা ২০০২)।
বর্তমান শতকেও লাখ লাখ নারীর জীবনে রোকেয়া-চিহ্নিত সমস্যাগুলো প্রকটভাবে বিরাজ করছে। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন বর্তমানে শুধু বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের তাত্ত্বিক-প্রাতিষ্ঠানিক-আদর্শিক পথিকৃৎ নন; তিনি বৈশ্বিক তাত্ত্বিক-দার্শনিক নেত্রীদের সম-অবস্থানে স্বীকৃত-সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। রোকেয়া প্রদর্শিত পথে লড়াই-সংগ্রাম করেই নারীসমাজকে মুক্তির পথে, নবজাগরণের পথে এগিয়ে যেতে হচ্ছে এবং যেতে হবে।
মালেকা বেগম: নারী–গবেষক; চেয়ারম্যান, সোশিওলজি অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি।

বিজ্ঞাপন
বাংলা নববর্ষ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন