বিজ্ঞাপন

আকবরের দেখা নেই। রোগা একটা কুকুর ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে দোকানটার পেছনের দিকে ছুটে যায়। সামান্য যেতেই উধাও। লটকানো ‘মার্ক্স পড়ুন, জিনিশ কিনুন’ লেখা বোর্ডটা একবার ফাতনার মতো উড়ে ভেসে ওঠে, আরেকবার খুঁটির গায়ে বাড়ি খায়। মাথার ওপরের জং ধরা টিনটা মড়মড় করে, ভেঙে পড়ে নাকি—ভাবনা এলে দোকানের গায়ে ধাক্কা দিয়ে মুরুব্বিকে জাগাতে ইচ্ছে করে। হয়তো ভেতরেই ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু সাক্ষী রাখা যাবে না। মোসলেম লুঙ্গি চেপে দাঁড়ায়। ভেবে লাভ নেই, হয় এসপার না হয় ওসপার। রুটির ফ্যাক্টরিতে কাজ করার সময়ে নাকে ময়দা ঢুকে যেত।

সেখানে ময়দার ঘূর্ণিঝড়—নাক থেকে বালু সরাতে গিয়ে মোসলেমের মনে পড়ে। কিন্তু মাস শেষে বেতনটা তো পেত! বউ-ছেলে খুশি থাকত। দিনভর পাউরুটির গন্ধে যখন পেট চোঁ চোঁ করত, তখন গেলার জন্য কয়েকটা টুকরাও পাওয়া যেত। লকডাউন শুরু হতেই ফ্যাক্টরি বন্ধ। মোসলেমের কাছে অত টাকা কি থাকে যে বাড়িতে বসে খাবে? মাস তিনেকের বাড়ির ভাড়াও বাকি পড়ে। কয়েক দিন এর-ওর দানে আধাপেটা চলে।

বউটাও বাসা-বাড়ির ছুটা কাজ খুইয়ে বাড়িতে বসে থাকে। একখানে আধা বেতন পায়। সেই টাকায় চলেও না, আর বউয়ের টাকায় বসে খায় কোন মরদ? শেষে অশান্তি হতে হতে মোসলেম গাজীপুরে এক বিল্ডিং বানানোর জায়গায় যায়। সারা দিন মাথায় করে থান ইট বয়ে নেওয়া—এ আর এমন কী! কিন্তু পুলিশের দল একদিন এসে লাঠিপেটা করে। আধা বানানো দেয়াল ভেঙে দিয়ে বলে, ‘কাজ বন্ধ। করোনার কারখানা বানাইছে শালারা!’ মোসলেমের পিঠে লাঠির বাড়িতে তারা কাটাকুটি খেলে। পালিয়ে বাড়ি পর্যন্ত আসতে আসতে পিঠটা গোটাকতক খলবলে বাইন মাছের মতো ফুলে ওঠে। বউটা সারা রাত যত মালিশ করে, ততই করে গালিগালাজ। মোসলেমের মতো অপদার্থ জগতে আর হয় না। এ রকম অথর্ব লোকেরা বিয়েই–বা করে কেন আর বাচ্চাই পয়দা করতে যায় কেন!

‘ধুলায় আউগাইতে পারি না। তুই আইলি কেমনে?’ উথালপাতাল শব্দের মধ্যে আকবরের প্রশ্নে মোসলেম চমকে ওঠে। পতপত ওড়া লুঙ্গিতে গোঁজা শক্ত বাটটা চেপে ধরে। অস্ত্রবিহীন থাকতে এতটা কেঁপে ওঠেনি, যতটা ঊরুর কাছে শীতল স্পর্শ পেয়ে কাঁপে।

‘আমি ধুলা উডার আগেই আইছি,’ মোসলেম বলে।

‘তাই ক। মাল আনছিস?’

‘হ।’

ধুলার কুণ্ডলীর মধ্যে বাতাস কেটে কেটে চারটা পা এগোয়। বড় রাস্তার মন্দিরটার কাছে আসতে রিপনের অটোরিকশার সাড়ে এগারোটা বাজে। ধুলাঝড়ে আজ দেরি হবে। কাকুতিমিনতি করলে গাড়ি জমা দেওয়ার শেষ সময়ে যেতে রাজি হতেও পারে। না হলে ওখানেই কাজ সারতে হবে।

ভাবতে না ভাবতেই হেডলাইটের আলোয় ধুলার প্রদক্ষিণ স্পষ্ট হয়। অটোরিকশা উপস্থিত। বড় কয়েক ফোঁটা পানি তির্যকভাবে মোসলেম আর আকবরের মাথায় পড়ে।

বিপদে পড়া যাত্রীদের রিপন অগ্রাহ্য করতে পারে না। গুলশান মোড়ের দিকের রাস্তা ফাঁকা—একে লকডাউন তাতে ধুলার রাজ্য। সুযোগ বুঝে আকবর কনুই দিয়ে সহযাত্রীকে ধাক্কা দেয়। মোসলেম আবারও চমকায়—এখন তাকে গুঁজে রাখা দা বের করতে হবে। ঊরুকে ছুঁয়ে শাঁই করে দা বেরিয়ে এলে ভয় কেটে যায়। মাথার ওপরে তুলে বলে, ‘অটো দিয়া দে। দিয়া দে কইলাম।’

রিপন গতি বাড়ালে তার সিটের ওপরে দেয় এক কোপ। রেকসিন ছিঁড়ে এক মুঠ তুলা বেরিয়ে আসে। শক্ত ব্রেক কষতে হয় তখন। ড্রাইভারের আসন থেকে নামতেই আকবর সেখানে বসে। রিপন তার মাস্কটা টেনে খোলে, বিস্ময়ে বলে, ‘আমগো মহল্লার না আপনে?’ বাতাসের তোড়ে ভাঙা ভাঙা শব্দ কানে আসতেই মোসলেম তার ঘাড় বরাবর কোপ বসায়। রক্তের ফিনকি উল্টো হাতে চেপে ধরতেই কোপ পড়ে আরেক ঘাড়ে। নিস্তেজ হওয়া পর্যন্ত কোপানো চলে। তারপর ধুলা উড়িয়ে অটোরিকশা হাওয়া। তাজা রক্ত ধুলায় ঢাকে।

পেছনের সিটে রক্তাক্ত দা উঁচিয়ে মোসলেম থরথর কাঁপে। আয়না মুছে আকবর বলে, ‘দাওডা ফালাস নাই? দরজা খুইলা ফালায়ে দে।’

‘তারে মারতে চাই নাই, ভাই। খালি এট্টু ভয় দেখাইয়া আমি...’

‘এইডাই ভালা হইছে। হালায় চিন্যা ফেলছে কেমতে! বাদ দে, অটো বেইচা তুই ট্যাকা পায়া যাবি। তর বউ-পোলার লাইগা খাওন...’

মোসলেম ডুকরে কেঁদে বলে, ‘এই কোরুনা ক্যান আইল! আমি তারে মারতে চাই নাই, বিশ্বাস যান, ভাই।’

আকবর বিরক্ত হয়, ‘আরে মরো জ্বালা। দাওডা ফালা কইলাম।’

হাতে কাঁপতে থাকা দা-সমেত মোসলেম অটোরিকশার দরজায় ঠকাঠক বাড়ি খায়—ফেলবে? দা ফেললেই সব চুকেবুকে গেল! ধুলার ঝড়ে রাস্তা তখনো ঘোলাটে।

ঈদ আনন্দ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন