বিজ্ঞাপন

সালাম সাহেব ব্যবসার চেষ্টা করলেন। এক বন্ধুর টুপির কারখানা আছে। তার কাছ থেকে কিছু টুপি পাইকারি দরে কিনে ফার্মগেটের ফুটপাতে টেবিল নিয়ে বসলেন। কিন্তু আচমকা লকডাউনে তার মাথার ব্যবসা পায়ে এসে ঠেকল। মানে টুপির ব্যবসায় ধরা খেয়ে মোজার ব্যবসায় নামলেন। আরেক বন্ধুর মোজার কারখানা ছিল। তার কাছ থেকেও পাইকারি কিছু মোজা কিনেছিলেন। তবে যা ইনভেস্ট করেছিলেন, প্রথমদিককার সফল লকডাউনে ধরা খেয়ে একবারে বসে পড়লেন (পরের ‘কড়া লকডাউন’ হলে হয়তো দাঁড়িয়ে যেতেন)। তার পাশেই এক লোক ‘সারাজীবন বইস্যা খান...’ বলে দশ টাকা করে বসার পিঁড়ি বিক্রি করছিল, তার একটাতেই বসে পড়লেন। ব্যবসায় আর দাঁড়াতে পারলেন না। ধারকর্জ করে চলতে লাগলেন। এর মধ্যে স্ত্রী একদিন এসে বললেন—

: ঈদ তো চলে আসছে। ছেলেমেয়েদের জন্য কিছু ভাবছ?

: ভাবছি

: কী কিনবে?

: আমাদের সবার জন্যই ভাবছি।

: সে ভাবনাটা কী?

: সবার জন্য একটা করে মেলামাইনের বাটি কিনব।

: মানে?

: মানে বাটি। বাটি নিয়ে আমরা ঈদের দিন রাস্তায় বসব। মুখে থাকবে মাস্ক আর আমরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বসব। স্ত্রী সবটা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলেন! কিন্তু ক্লাস থ্রি আর টুতে পড়ুয়া ছেলেমেয়ে দুজনেই যথেষ্ট উত্তেজিত হলো। তাদের কাছে মনে হলো, এবারের ঈদটা বেশ অন্য রকম হবে।

: বাবা, মুখে মাস্ক থাকবে না?

: অবশ্যই থাকবে। মাস্ক পরে আমরা রাস্তার ধারে বাটি নিয়ে বসব। দেখবে মানুষ তোমাদের বাটিতে ঈদের সালামি দেবে।

: সত্যি? ওহ্​, দারুণ হবে।

স্ত্রী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন—

: করোনা মাস্ক না, আমাকে এমন মাস্ক দাও যেটা পরলে পুরো মুখ ঢাকে। আমি বাটি নিয়ে বসব, তবে এই মুখ আমি কাউকে দেখাতে চাই না।

: বেশ সে রকম মাস্কই কিনব আমরা, কী চাও? বাঘ–সিংহ–ভালুক—সব ধরনের মাস্কই পাওয়া যায়। প্লাসটিকের মাস্ক, ফেরিওলারা নিয়ে ঘোরে। দামও বেশি না।

: আমি বাঘের মাস্ক পরব বাবা। মেয়ে ঘোষণা দিল।

: আমি সিংহের মাস্ক। ছেলে বলল, ‘মা তুমি?’

বিষণ্ন হাসি দিয়ে মা বলল, ‘আমার একটা মাস্ক হলেই হবে, যেটা পুরো মুখ ঢাকে। রাস্তায় বাটি হাতে বসে এই পোড়ামুখ আমি কাউকে দেখাতে চাই না।’

: আমি কিনব একটা গাধার মাস্ক! বাবা ঘোষণা দিলেন। মনে মনে ভাবলেন, যোগ্য বাবা বা স্বামী হতে যখন পারিনি, বাঘ–সিংহের মাস্ক পরি কীভাবে, গাধাই হই বরং; গাধা সেই প্রাণী যে সাত রকম সাঁতার জানে। কিন্তু পানিতে পড়লে ভুলে যায় ঠিক কোন রকম সাঁতার দিয়ে সে প্রাণে বাঁচবে। আমিও প্রাণ বাঁচার সব সাঁতার ভুলে গেছি। মনে মনে ভাবলেন সালাম সাহেব।

তারপর সত্যি সত্যি ঈদের দিন সকালে দেখা গেল, সালাম দম্পতি তাদের দুই ছেলেমেয়েসহ চার মেলামাইনের বাটি নিয়ে রাস্তায় বসেছে। সবাই আশ্চর্য হলো এই পরিবারের এই অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা দেখে। ছবি তুলল কেউ কেউ, কেউ সেলফি তুলল...ফেসবুকেও দিল। আর কী আশ্চর্য, ফেসবুকে সেটা ভাইরাল হয়ে গেল। টিভি চ্যানেলের লোকজন ক্যামেরা আর বুম মাইক্রোফোন নিয়ে এল ছুটে। তারা বলতে লাগল—

‘এ্যাঁ এ্যাঁ...করোনার এই ক্রান্তিলগ্নে সমাজের মুখে চপেটাঘাত দিয়ে দুই শিশুসন্তান নিয়ে এই দম্পতি বাটি নিয়ে বসেছেন পথে...এ যেন এক জ্বলন্ত প্রতিবাদ...আসুন, আমরা ওনাদের পাশে দাঁড়াই। এ্যাঁ এ্যাঁ...’

পত্রিকার লোকজনও ছুটে এল। পরদিন বক্স নিউজ করার মতো মালমসলা পাওয়া গেছে।

দিনের শেষে সালাম দম্পতি যখন ঘরে ফিরল, তখন তাদের চার বাটিভর্তি টাকা। বাচ্চাদের বাটিতে তো টাকা উপচে পড়ে এমন অবস্থা। বাচ্চারা উত্তেজিত, বলল—

: বাবা, আমরা তো বড়লোক হয়ে গেছি!

: তাই তো দেখছি।

: এত টাকা আমরা কী করব?

: আমরা আমাদের প্লাসটিকের বাঘ–সিংহ–গাধার মাস্ক ফেলে দিয়ে চারটা সোনার মাস্ক কিনব।

: কেন? সোনার মাস্ক দিয়ে কী হবে?

: লোহার মাস্কও হতে পারে কিংবা তামার মাস্ক...সোনার মাস্কই মনে হয় ভালো হবে, টাকা যখন আছে।

: কিন্তু কেন?

: ওই সোনার মাস্কের আড়ালে আমাদের মুখের অভিব্যক্তি কেউ বুঝতে পারবে না। আমরা দুঃখে আছি না আনন্দে আছি...লজ্জা, হতাশা না ঘৃণায় আমাদের মুখ কুঁচকে উঠেছে, কেউ জানবে না...করোনাভাইরাসও না।

বাচ্চারা বাবার কথা কিছুই বুঝতে পারল না। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল তার দিকে। তাদের বাবা অবশ্য মাঝেমধ্যে এ রকম অদ্ভুত কথা বলেন।

ঈদ আনন্দ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন