default-image

তিন খণ্ডে প্রকাশিত পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি বই নিয়ে কথা বলেছেন বইয়ের লেখক বদরুদ্দীন উমর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফারুক ওয়াসিফ
ফারুক ওয়াসিফ: বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস রচনায় আপনার বই পথিকৃৎ। এর আগে আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস গভীর পদ্ধতিগত দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা হয়নি। কীভাবে আপনি এত বিপুল আকারের কাজে জড়িয়ে গেলেন?
বদরুদ্দীন উমর: ভাষা আন্দোলনের শুরু থেকেই আমি এর মধ্যে ছিলাম অবলোকনকারী হিসেবে। ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠিত হলো। ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে সিদ্ধান্ত হলো একটা ইশতেহার প্রকাশ করা হবে। এর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আমার বাবা আবুল হাশিমকে। তিনি সেই দায়িত্ব তুলে দিলেন আমার ওপর। সেটা ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকের কথা। আমি লিখেছিলাম এবং এটা ছাপা হয়েছিল আওয়ামী লীগের সদস্য মুশতাক আহমদের প্রেসে। ১০ হাজার কপি ছাপা হয়েছিল। এদিক-ওদিক কিছু বিলিও হয়েছিল। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের মাইকে সারা দিন অনেকবার করে এটা পড়া হতো। যা হোক, জিপে করে নেওয়ার সময় পুলিশ এগুলো আটক ও বাজেয়াপ্ত করে। এর কপি পরে আর পাওয়া যায়নি। সম্ভবত পুলিশের আর্কাইভে থাকতে পারে। আমাদের ভাষার লড়াই নামে আমার ছোট বইটি এর ভিত্তিতে লেখা।

ওয়াসিফ: ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস লেখার চিন্তা করেছিলেন কখন? কোথাও থেকে কি প্রেরণা বা তাগাদা পেয়েছিলেন?

 উমর: ভাষা আন্দোলনের ওপর বই করার চিন্তা প্রথমে আমি করিনি। আমি তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমি চিন্তা করেছিলাম পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিকাশের ইতিহাস লিখব। ভাবলাম, কারও কারও সঙ্গে আলাপ করি। আওয়ামী লীগের কামরুদ্দীন আহমদ সাহেব ছিলেন আমার বাবার খুবই ঘনিষ্ঠ। উনি আমাকে খুব সাহায্য করেছিলেন। এক পারিবারিক বন্ধু বললেন, আপনি যে কাজটা করছেন, সেটাকে ভাষা আন্দোলনের ওপর দাঁড় করান। মনে করলাম বড়জোর শ খানেক পৃষ্ঠার বই হবে। কাজে কিছু দূর অগ্রসর হয়ে দেখলাম, ক্যানভাস তো অনেক বিশাল। যা বলা হয়, ঘটনা তো সেভাবে না। ’৫২ সালে আন্দোলন হলো, গুলি হলো, অভ্যুত্থানের মতো অবস্থা হলো। গ্রামের কৃষকেরা পর্যন্ত আন্দোলিত হলো। তা থেকে মনে হলো, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর কৃষকদের বড় রকমের মোহভঙ্গ হলো, তারা দুর্ভিক্ষের মধ্যে পতিত হলো। আরেকটা জিনিস লক্ষ করে দেখলাম, ’৪৮ সালে ভাষার মিছিল পুরান ঢাকার দিকে যেতে পারত না, ’৫২ সালে পুরান ঢাকা থেকেই শক্তি-সহায়তা এল। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের ক্ষোভও দানা বাঁধল। রূপান্তরটা আমার মনে দাগ কাটল। দুই সময়ের মধ্যবর্তী সময়ে কী ঘটল, সেটা আমাকে দেখতে হবে। স্ফুলিঙ্গ কীভাবে সমগ্র দেশময় দাবানল সৃষ্টি করল, সেটা দেখতে চাইলাম। এই বড় পটভূমির মধ্যে আমি ভাষা আন্দোলনকে ধরতে চাইলাম।

default-image

ওয়াসিফ: গবেষণার বেলায় আপনি কোন পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন? আপনার সামনে কোনো মডেল ছিল কি না?
উমর: এ ধরনের কাজ আগে ছিল না। আমার যে পদ্ধতি, তাতে সাক্ষাৎকার খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রথমে তো কামরুদ্দীন আহমদের সঙ্গে কথা হতো, কিছু কিছু নোট নিতাম। বাড়ি এসে সব লিখে ফেলতাম। ওখান থেকে কিউ নিলাম যে আর কার কার সঙ্গে কথা বলব। এটা ১৯৬৬ সালের দিকের কথা। (বাংলা একাডেমিতে দুই খণ্ডে যে দলিল আছে, সেখানে কাকে কবে ইন্টারভিউ করেছি, সমস্ত তারিখ দেওয়া আছে) অনেক পরে ইতিহাসবিদ সালাহউদ্দিন আহমদ যখন ওরাল হিস্ট্রি করছেন, তাঁকে আমি বললাম যে সালাহউদ্দিন ভাই, আমিই কিন্তু ওরাল হিস্ট্রির ফাউন্ডার এখানে। তিনি হেসে বললেন, তা তো ঠিকই। তখনকার কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতাপশালী চিফ সেক্রেটারি আজিজ আহমেদও খুব আগ্রহের সঙ্গে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। এর বাইরে বহু রকম দলিলপত্র, মহাফেজখানার সংগ্রহ ইত্যাদি ব্যবহার করেছি।
ওয়াসিফ:তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি আপনাকে খুব সাহায্য করেছিল।
উমর: তাজউদ্দীন আহমদের সাক্ষাৎকার নিতে গেলে উনি বললেন, দেখেন, আমার একটা ডায়েরি আছে, আপনার কোনো কাজে লাগবে কি না জানি না। তারপর ছেঁড়া থলিতে জড়ানো একটা জিনিস নিয়ে এলেন। উনি গোছানো লোক ছিলেন। সবকিছু লিখে রাখতেন। এই ডায়েরি আমার খুব কাজে লেগেছিল। তাঁর যে প্রতিদিনের ভুক্তি, তাতে ’৪৮, ’৪৯, ’৫০ সালের ঘটনাগুলোর উল্লেখ ছিল। ওখান থেকে লিড নিয়ে আমি অনুসন্ধান চালিয়েছি। ওটা থেকে কিউ নিয়ে সংবাদপত্র ঘেঁটেছি, কারও কারও সাক্ষাৎকার নিয়েছি, কলকাতার আর্কাইভে কাজ করেছি, অ্যাসেম্বলি রেকর্ডস ঘেঁটেছি। প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় তাঁর কথা খুব গুরুত্বের সঙ্গে লিখেছিলাম। এ বই কলকাতায় ছাপা হলে তাজউদ্দীন সাহেবকে অনেকে চিনতে পারে। আমি শুনেছি তাজউদ্দীন বলেছেন, এ বইটা মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় তাঁর পরিচয় তৈরিতে খুব কাজে দিয়েছিল। যা হোক, তাজউদ্দীন আহমদের কাছ থেকেই সবচেয়ে বেশি সাহায্য পেয়েছিলাম।
ওয়াসিফ: এই বিপুল গবেষণাকর্মের জন্য কি কোনো অনুদান বা সাহায্য নিয়েছিলেন
উমর: না, একেবারেই না।
ওয়াসিফ: বলা হয়, ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে বায়ান্নর আন্দোলন থেকেই। ভাষা আন্দোলনের চেতনা থেকেই অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তা গঠনের প্রেরণা এসেছিল বলে দাবি করা হয়। আপনি কি একমত?
উমর: উল্টোভাবে কথাটা বলতে হবে। এই দেশে ’৪৭ সালের পর থেকে ক্রমাগত প্রতিরোধ আন্দোলন হয়েছে। ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তর হয়েছে এভাবে বলা যায় না, বরং পূর্ব বাংলায় তখন যে প্রতিরোধ আন্দোলন চলছিল, তারই ল্যান্ডমার্ক ছিল ভাষা আন্দোলন। সেটা আরও অগ্রসর হয়ে স্বাধীনতার দিকে গিয়েছে। আমি যেভাবে আমার বইয়ে বলেছি তা হলো, ’৪৭ সালের দেশভাগের পর পূর্ব বাংলায় অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাস্তব পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। তার অর্থ, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গিয়েছিল। এই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়ার প্রতিফলন হিসেবে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল। আগে সাম্প্রদায়িকতা ছিল হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে। কারণ, হিন্দুরা সব জমির মালিক ছিল, জমিদার ছিল, মহাজন ছিল, উকিল ছিল, মোক্তার ছিল। সবখানে মুসলমানদের অবস্থান ছিল অধস্তন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পেলে মুসলমানদের হাতে রাজনৈতিক শক্তি চলে আসায় আগের সেই অবস্থা আর থাকল না। সমাজের ভিত্তির মধ্যে হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্বের একরকম নিরসন হয়ে যাওয়ার পর রাজনৈতিক উপরিকাঠামোয় সেই দ্বন্দ্ব থাকার কথা না। সুতরাং হিন্দুরা আর টার্গেট ছিল না। এর মধ্য দিয়ে একটা অসাম্প্রদায়িকীকরণ প্রক্রিয়া বা ডিকম্যুনালাইজেশন প্রসেস চলছিল। এই প্রক্রিয়া চলতে পারার ফলই হলো ভাষা আন্দোলন। তবে পাকিস্তান রাষ্ট্র নিজেকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে সাম্প্রদায়িকতা, ইসলাম ইত্যাদি চালাচ্ছিল। কিন্তু সামাজিক ভিত্তিভূমিতে অসাম্প্রদায়িকীকরণ প্রক্রিয়া চলছিল। এই প্রক্রিয়া না হলে তো ভাষা আন্দোলন হতে পারত না। কাজেই এটা বলা ঠিক না যে ভাষা আন্দোলন অসাম্প্রদায়িকতার চেতনা সৃষ্টি করেছিল, বরং অসাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি সৃষ্টির ফলেই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মানুষের চেতনা অগ্রসর হওয়ার কারণেই ভাষা আন্দোলন ঘটেছিল এবং এই আন্দোলন সেই চেতনাকে আরও এগিয়ে দিয়েছিল।

ওয়াসিফ:ভাষা আন্দোলন-পরবর্তী রাজনীতির গতিপথের আভাস কি তখনই ধরতে পেরেছিলেন? আপনি পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন শ্রেণির অসন্তোষের গভীর পর্যালোচনা করেছিলেন।

উমর: পরিস্থিতি তখন যতখানি বিকাশ হয়েছিল, আমি ততখানিই আলোচনা করেছি। তখন শ্রমিক আন্দোলন অতটা বিকশিত হয়নি, যতটা ষাটের দশকের শেষাশেষি হয়েছিল, যার প্রকাশ ঘটেছিল ’৬৯-এর অভ্যুত্থানে। আমি কিন্তু একদম পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সব শ্রমিক সেক্টরে—যেমন সিমেন্ট, বাটা শ‌ু, জুট, রেলসহ সব সেক্টরের আলোচনা করেছিলাম। ভাষা আন্দোলনের আগেই মুসলিম লীগ জনভিত্তি হারিয়ে ফেলেছিল। ১৯৪৯ সালে টাঙ্গাইলের প্রাদেশিক উপনির্বাচনে শামসুল হক প্রার্থী হলেন, সরকারের সব লোক তাঁর বিরুদ্ধে নামল। অবস্থা এমন হলো যে ভাষা আন্দোলনের আগে ১৯৪৯ সালেই মুসলিম লীগ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলো। তার মানে ওই ডিকম্যুনালাইজেশন প্রক্রিয়া শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। যেটা আমাকে খুব হতবাক করেছিল যে ’৪৭ সালের পর দুই বছরের মধ্যে মুসলিম লীগকে মানুষ পূর্ব বাংলায় খতম করে দিল! এর কারণ খুঁজতে গিয়েই আমি বিশেষত কৃষকদের অবস্থা বুঝতে নামি। মধ্য শ্রেণির মধ্যে যে পরিবর্তন এসেছিল, আরও ব্যাপকভাবে তা এসেছিল কৃষকদের মধ্যে। তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হলো না, তারা মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে গেল। কাজেই ’৫২ সালে কেবল ভাষার দাবিতে কৃষক উঠে দাঁড়িয়েছিল তা না, কৃষকের সামগ্রিক স্বার্থেই আঘাত লেগেছিল।

 ওয়াসিফ: গবেষণার দ্বিতীয় খণ্ডের জন্য আপনি প্রায় ৩০০ পৃষ্ঠা ব্যয় করেছিলেন কৃষক আন্দোলন ও দুর্ভিক্ষ বিষয়ে। রণেশ দাশগুপ্ত অভিযোগ করেছিলেন যে কৃষকদের ওপর আপনি অতিরিক্ত মনোযোগ দিয়েছিলেন। অন্যদিকে আপনার কাজকে কেউ কেউ নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চার পূর্বসূরী বলেও দাবি করেন। আপনিও উচ্চবর্গের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে কৃষক চেতনার সম্পর্ক ও বিরোধ নিয়ে আলোচনা করেছেন। এর পেছনে কী ভাবনা ছিল?

 উমর: ভারতে এত ইতিহাস লেখা হয়েছে, দুর্ভিক্ষের প্রভাব রাজনীতিতে কীভাবে পড়ল তা নিয়ে আলোচনা নেই। নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চার সঙ্গে আমার কাজের কী সম্পর্ক, তা নিয়ে অন্যরা বলবে। কিন্তু কেউ তো কথাই বলে না। একটা রিভিউ পর্যন্ত হয়নি আমার এ বইয়ের। সম্পূর্ণ নেগলেক্টেড হয়ে থাকল। যা হোক, পূর্ব বাংলার রায়ত ও কৃষকেরাই পাকিস্তান এনেছিল। তাই তাদের মোহভঙ্গের বিষয়টা ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এ জন্যই কৃষক ও দুর্ভিক্ষের বিষয়টা দরকারি ছিল। রণেশ দাশগুপ্ত শ্রদ্ধাভাজন মার্কসবাদী। তাঁর এ সমালোচনায় আমি অবাক হয়েছি। কৃষকদের ওপর যখন আমি আলোকপাত করি, তখনো কিন্তু অ্যাঙ্গেলসের জার্মানিতে কৃষক বিদ্রোহের ওপর বইটা পড়িনি। লেনিনের রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশ পড়িনি। পরে পড়ে দেখি আমার কাজ আর ওই দুটির মধ্যে একটা করপোরেশন বা যৌথতা আছে।

ওয়াসিফ:আপনি দুর্ভিক্ষের ওপর বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে এর কী সম্পর্ক?

উমর: আমার বইটা কিন্তু শুধু ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নয়, তৎকালীন রাজনীতি নিয়েও। দুর্ভিক্ষ রাজনৈতিক আন্দোলনকে কীভাবে যে প্রভাবিত করে, সেটা আমি দেখিয়েছিলাম আমার বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডে। এই প্রভাবের আরও উদাহরণ আছে। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পরে কিছু কৃষক এলাকায় আন্দোলন হয়। তখন শাসকেরাও দেখে যে কিছু সংস্কার না করলে আরও বড় বিস্ফোরণ হবে। ওয়ারেন হেস্টিংসের সময় ১৭৮০ সালের দিকে যে সংস্কার হয়, তার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল একেকটা কৃষক আন্দোলন। এর ইতিহাসটা সামনে রাখলেই সম্পর্কটা ধরা পড়বে। ’৪৩-এর দুর্ভিক্ষের পরে তেভাগা আন্দোলন শুরু হলো। দুর্ভিক্ষ কৃষকের মধ্যে যে চিন্তাটা আনে যে আমি চাল বানাই কিন্তু আমি খেতে পারি না। এই চিন্তা তাকে বিদ্রোহী করে তোলে। ভাষা আন্দোলনের আগের কয়েক বছর পূর্ব বাংলায় ভয়াবহ খাদ্য-সংকট দেখা দিয়েছিল। অনেক গ্রাম উজাড় হয়ে গিয়েছিল। এই ক্ষোভ ’৫২ সালে প্রতিফলিত হয়েছিল।

ওয়াসিফ:আপনার বইয়ের পর্যালোচনা অংশে সে সময়ের কমিউনিস্টদের সমালোচনা করেছিলেন। ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বদানে অগ্রণী ভূমিকা সত্ত্বেও স্বাধীনতাসংগ্রামের মূল নেতৃত্ব তাঁদের কাছ থেকে এল না কেন?

উমর: তারা শ্রেণিসংগ্রাম ইত্যাদি বড় বড় কথা বলতে থাকল। কিন্তু দেখতে পেল না যে ভাষাকে কেন্দ্র করে জাতীয় চেতনার বিকাশ ঘটছে। জনগণ যা নিয়ে দাঁড়াবে, তাকে তারা উপলব্ধি করতে পারল না। অথচ জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে দ্বন্দ্বটা ধরতে পারল। শেখ মুজিব দেখতে পেলেন, পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে যাচ্ছে। সরকারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক আন্দোলন দাঁড়াচ্ছে এবং একে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাঙালি বনাম অবাঙালি ধ্বনি তোলা হলো। আগে যা ছিল হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্ব, তা হয়ে দাঁড়াল বাঙালি-অবাঙালি দ্বন্দ্ব। দ্বন্দ্বের মধ্যে পরিবর্তন হলো, দাঙ্গার মধ্যেও পরিবর্তন এল। আমি ১৯৬৯-৭০ সালে বাঙালি-বিহারি দাঙ্গা নিয়ে ‘দ্য আদার রায়ট’ নামে একটা লেখা লিখেছিলাম। এই নতুন দ্বন্দ্ব যে বিকশিত হলো, কমিউনিস্টরা এর মধ্যে ঢুকতে পারল না। শ্রেণিসংগ্রামকে সৃষ্টিশীলভাবে না দেখে যান্ত্রিকভাবে দেখার জন্য তারা মার খেয়ে গেল।

বিজ্ঞাপন
অমর একুশে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন