পাতায় পাতায় ভিনদেশিদের অনুভূতি

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে বেড়াতে আসা বিদেশি অতিথিদের দর্শনার্থী বইয়ে নানা আবেগঘন মক্তব্য
ছবি: প্রথম আলো

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের আগরতলার জিবি হাসপাতালে কাজ করতেন কমলা রানী। ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থী।

হাসপাতালে কর্মরত অবস্থায় কমলা রানীর একটি ছবি রয়েছে ঢাকার শেরেবাংলা নগরের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের তিন নম্বর গ্যালারিতে। গত বছর কমলা রানীর দুই নাতি বৈভব গাঙ্গুলি ও অনুভব গাঙ্গুলি এসেছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর পরিদর্শনে।

স্বাধীনতার জন্য একটি জাতির এত ত্যাগ দেখে আপ্লুত বৈভব ও অনুভব। দর্শনার্থী বইয়ে তাঁরা লিখেছেন, তাঁদের পরিবারের কেউ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছিল, সে জন্য তাঁরা গর্বিত।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে বেড়াতে আসা বিদেশি অতিথিদের দর্শনার্থী বইয়ে নানা আবেগঘন মক্তব্য
ছবি: প্রথম আলো

করোনা পরিস্থিতির কারণে গত ২৩ মার্চ থেকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে দর্শনার্থী প্রবেশ বন্ধ রয়েছে। এর আগে গত বছরের অক্টোবর থেকে এ বছরের মার্চ পর্যন্ত জাদুঘর পরিদর্শন শেষে দর্শনার্থী বইয়ে মন্তব্য করেছেন অনেক বিদেশি নাগরিক। ভিনদেশি দর্শনার্থীর তালিকায় বিশিষ্ট ব্যক্তিরা যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন বিদেশি সাধারণ নাগরিকেরাও। জাদুঘরের তথ্য, ছবি, নথিপত্রে বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস জেনেছেন তাঁরা। হানাদারদের নির্যাতন আর মুক্তিযুদ্ধকালীন করুণ গল্পগুলো হৃদয় ছুঁয়েছে তাঁদের। জাদুঘরের দর্শনার্থী বইটি ছোট ছোট এ রকম অসংখ্য অনুভূতিতে ঠাসা।

অন্য দেশের নাগরিক হলেও মুক্তিযুদ্ধকালীন মানুষের কষ্টের গল্প জেনে চোখের পানি আটকাতে পারেননি ভারতীয় বিনোদ রৌত। তিনি লিখেছেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তাঁর চোখে জল এনে দিয়েছে। তিনি প্রত্যাশা করেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নতুন প্রজন্মের মধ্যে অটুট থাকবে।

কম্বোডিয়ার টুয়েল স্লেং জেনোসাইড মিউজিয়ামের পরিচালক চে ভিশথ লিখেছেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যে নিষ্ঠুরতা চালানো হয়েছিল, তা গণহত্যা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে যা হয়েছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। স্বাধীন দেশ পেতে বাংলাদেশের জনগণকে অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কম্বোডিয়াকেও একই রকম পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে বেড়াতে আসা বিদেশি অতিথিদের দর্শনার্থী বইয়ে নানা আবেগঘন মক্তব্য
ছবি: প্রথম আলো

জাম্বিয়া সেনাবাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল উইলিয়াম এম সিকাজি তাঁর সফরসঙ্গীদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এসেছিলেন। দর্শনার্থী খাতায় তিনি লিখেছেন, স্বাধীনতা পেতে বাংলাদেশের জনগণকে অসহনীয় কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ বৃথা যায়নি, কারণ বাংলাদেশের নাগরিকেরা এখন স্বাধীনতার সুফল ভোগ করছে।

মুক্তিযুদ্ধে নারীদের যে ভূমিকা তা আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরতে জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানিয়ে গেছেন যুক্তরাজ্যের বাসিন্দা নিকি কিন্ডসলে।

জাদুঘরে আসা বিদেশি নাগরিকদের জন্য মন্তব্য লেখার আলাদা কোনো খাতা নেই। তবে বিশিষ্ট বিদেশি দর্শনার্থীদের জন্য একটি বিশেষ খাতা রয়েছে।

শ্রীলঙ্কার সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মোহন লাল গ্রেরো জাদুঘর ঘুরে পাকিস্তানের উদ্দেশে লিখেছেন, একটি দেশের ক্ষমতার লিপ্সা কতটা ধ্বংসাত্মক হতে পারে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তার বড় প্রমাণ। বাংলাদেশের রয়েছে ঘটনাবহুল অতীত। ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে দেশটি।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে বেড়াতে আসা বিদেশি অতিথিদের দর্শনার্থী বইয়ে নানা আবেগঘন মক্তব্য
ছবি: প্রথম আলো

ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছিল, তা নিয়ে গর্বিত ভারতের সাবেক তথ্য ও ব্রডকাস্টিং মন্ত্রী মনীশ তিওয়ারি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে লিখতে গিয়ে তিনি স্মরণ করেছেন লৌহমানবীখ্যাত ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে।

দর্শনার্থী খাতায় লেখা মন্তব্যে মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ হারানো হাজারো নিষ্পাপ নারী-পুরুষ ও শিশুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন জাতিসংঘের গণহত্যাবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি অ্যাডামা দিয়ে। তিনি লিখেছেন, এমন অপরাধ যাতে আর সংঘটিত না হয়, সে জন্য নিজেদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এই জাদুঘর। আগামী প্রজন্মকে একই ধরনের অভিজ্ঞতা থেকে সুরক্ষা দিতে প্রতিরোধই একমাত্র পথ। নিজের অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ একই ধরনের অপরাধ থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাঁচাতে আশ্রয় দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে বেড়াতে আসা বিদেশি অতিথিদের দর্শনার্থী বইয়ে নানা আবেগঘন মক্তব্য
ছবি: প্রথম আলো